ঢাকা, মঙ্গলবার,২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭

দেশ মহাদেশ

রোহিঙ্গা নির্মূল নাকি গণহত্যা

আলমগীর কবির

০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট
মানবেতর জীবনযাপনকারী শান্তিপ্রিয় অসহায় রোহিঙ্গার জীবনের মূল্য নেই মিয়ানমার সরকারের কাছে

মানবেতর জীবনযাপনকারী শান্তিপ্রিয় অসহায় রোহিঙ্গার জীবনের মূল্য নেই মিয়ানমার সরকারের কাছে

প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশুদের ঢল থামছেই না। নিজ ভূমিতে পরবাসী হওয়ার এই মানুষগুলোর দুর্দশায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ইউএনএইচসিআর বলেছে, রাখাইন (আরাকান) থেকে যেভাবে রোহিঙ্গা মুসলিমদের তাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে তা অমানবিক। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বের হয়ে লোকজন মারা যাচ্ছে, যারা বাংলাদেশে পৌঁছেছে, তারাও দুরবস্থার মধ্যে আছে।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মূল অংশ মুসলিম এবং পারিপার্শি¦ক অবস্থানগত কারণে ভাষার মিল খুঁজে পাওয়া যায় বাংলাদেশী মানুষের সাথে। এই ইস্যু এবং আরো অন্যান্য ইস্যুকে কেন্দ্র করে বৌদ্ধপ্রধান দেশ মিয়ানমারের এই নির্যাতন যুগ যুগ ধরে। কালের প্রবাহে নির্যাতনের মাত্রা কখনো কম, কখনো বেশি ছিল। কিন্তু অং সান সু চির সরকার ক্ষমতায় আসার পর তা ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করে। বিভিন্ন গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্র একে গণহত্যার শামিল রূপে মত প্রকাশ করেন।
গত ২৫ আগস্ট থেকে নতুন করে শুরু হওয়া সহিংসতার পর ১০ দিনে ১ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশ প্রবেশ করে। যা এই নির্যাতনের স্বপক্ষে সবার সম্মুখে প্রতীয়মান হয় (খবর ইউএন সংস্থা)। ুদ্র এই জনগোষ্ঠী মূল ভূমি মিয়ানমারের এক পিছিয়ে পড়া জাতি। যারা যুগ যুগ ধরে সব নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। অবহেলিত এই জনগোষ্ঠী সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে নিজেদের সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। আর এরই সুযোগ গ্রহণ করে মিয়ানমার সরকার তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে সমূলে নির্মূল করতে বর্তমানে এই ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞে অংশ নেয়।
মানবেতর জীবনযাপনকারী শান্তিপ্রিয় অসহায় রোহিঙ্গার জীবনের মূল্য নেই মিয়ানমার সরকারের কাছে। তাদের এ হত্যা মিশনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব পড়েছে সঙ্কটে। রোহিঙ্গারা নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে পাশের দেশ বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করেছে। এত দিন আন্তর্জাতিক মহল নিশ্চুপ থাকলেও কয়েক দিনের পরিস্থিতিতে গণমাধ্যম ও মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্রগুলো এই ইস্যুতে সরব হয়েছে।
তুরস্ক ও ইন্দোনেশিয়া মানবিক দিক বিবেচনায় বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গার সহায়তার কথা বলেছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেঘলুত কাভাসোগলু বৃহস্পতিবার কক্সবাজারে আসার কথা। ভূমধ্যসাগরের উদ্ধারকারী জাহাজ সাহায্যের জন্য বঙ্গোপসাগরে আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে এসে পৌঁছবে। পোপ ফ্রান্সিস ও রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক মহলকে অনুরোধ করেছেন। কিন্তু বিশ্ব যাদের রাষ্ট্রীয় মোড়ল রূপে জানে সেই যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য ও ভারতসহ অন্যান্য দেশের নিশ্চুপ আচরণ শান্তিপ্রিয় সব মানুষকে অবাক করেছে। বিপর্যস্ত এই রোহিঙ্গাদের সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে আশ্রিত রূপে রাখা ও নিরাপত্তা প্রদানে করা নি¤œমধ্য আয়ে পরিণত বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই এরই মধ্যে বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক সাহায্যের আবেদন করেছে। ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো মারসুদি বলেছেন, রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের জন্য যে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা নিরসনে সহযোগিতা করতে তার দেশ প্রস্তুত আছে।
শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া অং সান সু চির এই ইস্যুতে মৌন ভূমিকা সবাইকে ব্যথিত করেছে। প্রায় তিন লাখ লোক অনলাইনে তার নোবেল পুরস্কার ফেরত নেয়ার বিষয়ে আরজি জানিয়ে স্বাক্ষর করেছে। রোহিঙ্গা নির্মূলের জন্য সরকার তাদের সন্ত্রাসীরূপে আখ্যায়িত করেছে, অথচ এ জাতি সব ধরনের নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। পিছিয়ে পড়া এক জনগোষ্ঠী। বহু যুগ ধরে চলে আসা নির্যাতনের বিরুদ্ধে দু-একজন রোহিঙ্গা নিজেরা সংগঠিত হয়ে নির্যাতনের প্রতিবাদ জানায়, আর এই গুটিকয়েক প্রতিবাদী মানুষকে সন্ত্রাসী পরিচয়ে পুরো রোহিঙ্গা জাতি উৎপাটনের যে রক্তের খেলায় মেতে উঠেছে মিয়ানমার সরকার, তা পালিয়ে আসা জনগোষ্ঠীর মুখের বর্ণনায় স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়।
‘মানবাধিকারকর্মী যারা এই রোহিঙ্গা ইস্যুতে কাজ করছেন তাদের ভাষ্য মতে ুদ্র এই জাতিকে ভিটেমাটিছাড়া করার জন্যই এই ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে মিয়ানমার। এই অসহায় মানুষের বাঁচার আকুতি এবং জাতি হিসেবে তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের এই চিত্র বিশ্বসমাজে গত কয়েক দিনে আরো স্পষ্টভাবে সামনে আসে।’
১২০ বছর বয়স্ক রোহিঙ্গা এক ব্যক্তির মুখে তার নিজস্ব ভূমি ছেড়ে আসার কথা সবার মুখে মুখে। তিনি বর্ণনা করেন তাদের নির্যাতন ও অধিকার বঞ্চনার কথা এবং জাতি হিসেবে কিভাবে তারা অগ্রহণযোগ্য ছিল মিয়ানমার সরকারের কাছে।
সরকারি তথ্য মোতাবেক ২৫ আগস্ট যখন রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা মিয়ানমার প্যারামিলিটারি পোস্টগুলোতে হামলা চালায় তখন প্রায় ৪০০ লোকের প্রাণহানি ঘটে। মিয়ানমার সরকার দাবি করে তারা এই আক্রমণ চালিয়েছিল ুদ্র জাতিগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের উৎপীড়ন হতে বাঁচতে। সামরিক বাহিনী এই হত্যাযজ্ঞকে ‘অপারেশন কিয়ারেন্স’ নাম দিয়েছে এবং ঘোষণা দেয় এই অপারেশনে নিহত বেশির ভাগ মানুষই বিদ্রোহী ছিল। কিন্তু রোহিঙ্গা মানবাধিকারকর্মীরা বলেন, এই যুদ্ধে এক হাজার বেসামরিক লোক মারা যায় সেনাবাহিনীর মাধ্যমে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ‘বার্মিজ রোহিঙ্গা প্রতিষ্ঠানে’র প্রেসিডেন্ট তুন কিন বলেন, ‘এক হাজার রোহিঙ্গা মারা যায় বার্মিজ সামরিক বাহিনী দিয়ে এবং এ সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাবে।’ টেলিগ্রাফ পত্রিকাকে তিনি আরো বলেন, ‘সামরিক বাহিনী গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস করে যাচ্ছে এবং শিশুদের ওই আগুনে নিক্ষেপ করছে।’
সরকার পরিচালিত ‘গ্লোবাল নিউ লাইট’-এর প্রতিনিধিরা স্বীকার করেন ২৫ আগস্ট কোটানকুক, মাইনলুট এবং কাইকানপিয়ন গ্রামের দুই হাজার ৬২৫টি ঘর এবং দু’টি ওয়ার্ড মুংটাও-এর সম্পূর্ণ পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
সরকার ‘আরকান রোহিঙ্গা সুরক্ষা বাহিনী’কে (এআরএসএ) তাদের এ যুদ্ধের জন্য দায়ী করেন। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই প্রমাণের সপক্ষের কোনো দলিল সরকারের হাতে পায়নি।
মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর প্রধান মিন অং লায়েং বলেন, ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অংশ হিসেবে এ ঘটনার সূত্রপাত এবং বাঙালিরা এই হত্যা এবং আক্রমণে জড়িত।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে দেবো না এবং মিয়ানমারকে এআরএসএ উগ্রপন্থী বাঙালি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী থেকে সুরক্ষিত রাখব।’ জাতিসঙ্ঘসহ বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোর উদ্বেগ সত্ত্বেও ১ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের প্রশাসনিক রাজধানী নেইপিডোতে এক অনুষ্ঠানে মিন অং লায়েং রাখাইনের অসমাপ্ত এজেন্ডা বাস্তবায়নের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তার দাবি, আগের সরকার সেখানকার সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। বর্তমান সরকার তা গুরুত্বের সাথেই দেখছে।’
প্রশ্ন হচ্ছে চার দিকের চাপ সত্ত্বেও তারা এই বর্বরতার সাহস পায় কোথা থেকে? মিডলইস্ট আই ও হারেৎজ জানায়, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর গণহত্যা চালানোর জন্য যেসব সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে তা মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে সরবরাহ করেছে ইসরাইল। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের হত্যা-ধর্ষণ চালানোর জন্য অভিযুক্ত মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর সদস্যদের প্রশিণও দিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের ইহুদিবাদী অবৈধ রাষ্ট্রটি।
মানবাধিকারকর্মী ও মিয়ানমারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইসরাইল মিয়ানমারের শতাধিক ট্যাংকসহ সামরিক অস্ত্র এবং নৌযান বিক্রি করেছে, যা দেশটির সীমান্ত পুলিশ ব্যবহার করছে। এ ছাড়া বর্তমানে রাখাইনে মোতায়েন রয়েছে এমন বার্মিজ বিশেষ বাহিনীকে প্রশিণের সাথে জড়িত রয়েছে ‘টার আইডিয়াল কনসেপ্ট’সহ ইসরাইলি সামরিক অস্ত্র ও সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো।
মিয়ানমারকে অস্ত্রসরবরাহের এ ঘটনাকে রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান গণহত্যার প্রতি ইসরাইলের সমর্থন বলে অভিহিত করেন যুক্তরাজ্যের শিক পেনি গ্রিন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের গণহত্যা তীব্রতর আকার ধারণ করলেও তাদের অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ না করার বিষয়ে মোটেই অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ ইসরাইলের নিজেরই গাজায় ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর সহিংসতা ও সন্ত্রাস করার নজির রয়েছে, যাতে প্রমাণ হয় যে, ইসরাইলি সরকারের মানবাধিকারের বিষয়ে কোনো বিকার নেই।’
২০ বছর যাবৎ মিয়ানমারে কাজ করেছেন মানবাধিকারকর্মী বেনডিক্ট রজার। তিনি এই হত্যাযজ্ঞকে রুয়ান্ডা, দারফুর ও কসোভোর গণহত্যার সাথে তুলনা করেছেন। অং সান সু চি সরকারের নীরবতা এই ঘটনাকে আরো বিরাট হত্যাকাণ্ডের ও মানবিক বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই নীরবতাকে তার সমর্থন রূপে সবার কাছে প্রকাশ পায়। সু চি ২৫ আগস্টের ঘটনাকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সাথে সামরিক বাহিনীর যুদ্ধ দাবি করে গণমাধ্যমে এই সন্ত্রাসীদের ‘বাঙালি সন্ত্রাসী’ রূপে ব্যাখ্যা দেন। তার এই বক্তব্যে রোহিঙ্গা জাতিকে তার সরকার কোনো রূপে দেখে তার মনোভাব প্রকাশ পায়। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী তার চোখে মিয়ানমার জাতির অংশই নয়। 

 

  • সর্বশেষ
  • পঠিত

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫