ঢাকা, বুধবার,২২ নভেম্বর ২০১৭

দেশ মহাদেশ

কোরীয় উপদ্বীপে কি যুদ্ধ আসন্ন!

হামিম উল কবির

০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

উত্তর কোরিয়া সর্বশেষ যে বোমাটির পরীক্ষা চালিয়েছে তা হিরোশিমায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে আমেরিকার ফেলা বোমাটির চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি ক্ষমতাশালী। বোমাটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে মাটির নিচে বিস্ফোরণে এর চার পাশে ৬ দশিিমক ৩ মাত্রায় ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে চীনের একটি অংশ পর্যন্ত। জাতিসঙ্ঘের সনদ অনুযায়ী, পরমাণু ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নে নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে দেশটি। ৯ সেপ্টেম্বর উত্তর কোরিয়ার জাতীয় দিবস। দিবসটিকে সামনে রেখে উত্তর কোরিয়া গত বছরও আরেকটি পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তারা তখনো অভিযোগ করেছিলেন যে ওই বোমাটি ছিল হাইড্রোজেন বোমা। ২০১৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ৫ দশমিক ৩ মাত্রার একটি কৃত্রিম ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছিল কোরীয় উপদ্বীপে। গত বছর জানুয়ারিতে উত্তর কোরিয়া ৩ নম্বর পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা চালানোর পর পরবর্তী মার্চ মাসে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ দেশটির বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
গত ৩ সেপ্টেম্বর হাইড্রোজেন বোমাটির পরীক্ষা চালানোর পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কী করবেন, প্রশ্ন করা হলে তিনি এর জবাবে বলেছিলেন, ‘আমরা দেখব’। তবে আমেরিকা কিভাবে দেখবে এবং কখন দেখবে তা নিশ্চিত না হলেও উত্তর কোরীয় তরুণ নেতা কিম জং আন তার দেশকে ‘কে কিভাবে এবং কখন দেখবে’ তার তোয়াক্কা করছেন না। তিনি একের পর এক মারণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি কোনো নিষেধাজ্ঞার সামান্যই পাত্তা দিচ্ছেন। তাহলে কোরিয়াকে কেন্দ্র করে আরেকটি বিশ্বযুদ্ধ কি আসন্ন? যুদ্ধটা বাধলে কি শুধু উত্তর কোরিয়ার সাথে মার্কিনিদের যুদ্ধ হবে? সমীকরণটি মেলানো মোটেও সহজ নয়। ইতোমধ্যে যুদ্ধ অথবা উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ব্যাপারে চীনে ব্রিকস সম্মেলনের পর প্রেস ব্রিফিংয়ে রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন স্পষ্টতই উত্তর কোরিয়ার পক্ষে অবস্থান ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘উত্তর কোরিয়া বরং ঘাস খেয়ে বাঁচবে, তবু তারা পারমাণবিক প্রকল্প বাতিল করবে না। কারণ এর সাথে দেশটির নিরাপত্তার প্রশ্নটি জড়িত। উত্তর কোরিয়া যত দিন নিজেকে নিরাপদ না ভাববে তত দিন এসব থেকে নিবৃত্ত করা যাবে না বলে জানিয়ে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট পুতিন। আবার বিশ্বের আরেক সুপার পাওয়ার এবং শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ চীন তো মার্কিনিদের পাত্তাই দিতে চাচ্ছে না। তারা জাতিসঙ্ঘের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও উত্তর কোরিয়ার সাথে সব ধরনের সম্পর্ক বজায় রাখছে। দেশটির সাথে বাণিজ্য করে যাচ্ছে অবাধে। বলা হয়ে থাকে যে চীন হলো উত্তর কোরিয়ার ‘লাইফ লাইন’। চীনের সাথেই উত্তর কোরিয়ার ৯০ শতাংশ বাণিজ্য হয়ে থাকে। চীনের সাথে উত্তর কোরিয়ার ৯০ শতাংশ বাণিজ্য থাকায় দেশটির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বাগে আনা যে সম্ভব হচ্ছে না তা বেশ স্পষ্ট।
তাহলে অন্য কী বিকল্প? মার্কিনিরা সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন, উত্তর কোরিয়ার সাথে যেসব দেশ বাণিজ্য করে এদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। বিবিসি বলছে, উত্তর কোরিয়ার সাথে চীন ছাড়া বাণিজ্য করে থাকে রাশিয়া, ভারত, পাকিস্তান, সিঙ্গাপুর, জার্মানি, পর্তুগাল, ফ্রান্স, থাইল্যান্ড, ফিলিপিন্স। এ দেশগুলোর সাথে উত্তর কোরিয়া গত এক বছরে ৬৫০ কোটি ডলার ব্যবসায় করেছে। এই দেশগুলোর সবাই মার্কিনিদের বন্ধু। এই দেশগুলোর মধ্যে যদি চীনের ওপর যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা জারি করে তাহলে ক্ষতিটা মার্কিনিদেরই বেশি হবে। অন্যান্য দেশের কথা বাদ দিলে শুধু চীনের বাণিজ্যের দিকটি দেখলে দেখা যাবে মার্কিনিরা প্রতি বছর চীন থেকে ৪৫ হাজার কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করে। আবার মার্কিনিরা চীনে বছরে সাড়ে ১১ হাজার কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করে থাকে। চীনের সাথে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে ১০ লাখ মার্কিনি নাগরিক চাকরি হারাবেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প বা তার দল রিপাবলিকান পার্টির কংগ্রেসম্যান অথবা সিনেটররা মার্কিনিদের চাকরি হারানোর বিষয়টি কতটা মেনে নেবেন তা বেশ প্রশ্নসাপেক্ষ।
তাহলে উত্তর কোরিয়াকে বাগে আনতে বিকল্প হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে রয়েছে যুদ্ধ। যুদ্ধটা বাধলে তা উত্তর কোরিয়ার পাশের দেশ চীনকে অবশ্যই বৈরী করে তুলবে। এর বাইরে আরেক অর্থনৈতিক সুপার পাওয়ার জাপান অথবা উত্তর কোরিয়ার জ্ঞাতি ভাইদের দেশ দক্ষিণ কোরিয়াও কি তা মেনে নেবে? উত্তর কোরিয়া আমেরিকার বোমায় আক্রান্ত হলে প্রথমেই সে দণি কোরিয়া এবং জাপানে পারমাণবিক বোমা ছুড়ে মারবে। পরের বোমাটি হয়তো মার্কিনিদের ঘরেই ফেলবে। বোমা মারার জন্য উত্তর কোরিয়া ইত্যবসরে স্বল্প, মাঝারি ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা করেছে। পরীক্ষাকালীন অল্প কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হলেও অবশিষ্টগুলো সফল বলেই প্রতিভাত হয়েছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্রের প্রতিটি পারমাণবিক বোমা বহনেও সক্ষম বলে উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং আন ঘোষণাও দিয়ে রেখেছেন।
কিন্তু আমেরিকা যুদ্ধের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করলেও তার অন্য দুই মিত্র জাপান এবং দণি কোরিয়া কি উত্তর কোরিয়ার সাথে যুদ্ধ করতে চাইবে? দক্ষিণ কোরিয়ার কাছ থেকেই এর উত্তর ইতোমধ্যে চলে এসেছে। দক্ষিণ কোরিয়া স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিয়েছে তারা উত্তর কোরিয়ার সাথে যুদ্ধ করতে চায় না। কারণ দণি কোরিয়া বর্তমানে বিশ্বের নেতৃস্থানীয় অর্থনীতির দেশ। উত্তরের দ্বারা আক্রান্ত হলে তার শিল্পকারখানা কোনোটাই যে পারমাণবিক বোমার আঘাতে অক্ষত থাকবে না এটা দক্ষিণের রাজনৈতিক নেতারা খুব ভালো করেই জানেন। তাহলে কী হবে? উত্তর কোরিয়ার উন্মাদনা কি চলতেই থাকবে? ওয়াশিংটন পোস্টের রিপোর্ট অনুযায়ী উত্তর কোরিয়া যদি যুক্তরাষ্ট্রে হামলা করে তাহলে চীন উত্তর কোরিয়ার পক্ষে থাকবে না। কিন্তু উত্তরে মার্কিনিরা উত্তর কোরিয়ায় হামলা চালালে এবং কিম জং আনের সরকার উৎখাতের চেষ্টা চালালে চীন তা মেনে নেবে না। কারণ চীন কখনোই দুই কোরিয়া এক হয়ে যাক তা চায় না এবং উত্তর কোরিয়ায় দক্ষিণ কোরিয়ার মতো মার্কিনিদের অনুগত আরেকটি সরকার প্রতিষ্ঠা হোক চীন তা কখনোই চায় না। হ

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫