ঢাকা, সোমবার,২০ নভেম্বর ২০১৭

অর্থনীতি

প্রতি ভেড়া দুই লাখ ১২ হাজার টাকা! মারা গেল ১৭টি

হামিদ সরকার

০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭,বুধবার, ১৯:৫১


প্রিন্ট
অস্ট্রেলিয়ান ভেড়া

অস্ট্রেলিয়ান ভেড়া

প্রকল্পের নামে হচ্ছে পুকুরচুরি। প্রকল্প অনুমোদনের পর সেগুলোর ব্যাপারে তেমন কোনো খোঁজও থাকে না। ভেড়া উন্নয়নের নামে নেয়া প্রকল্পে অস্ট্রেলিয়া থেকে দুই লাখ ১২ হাজার টাকা দরে আমদানিকৃত ১৭টি ভেড়া মারা গেছে। প্রস্তাবনায় অনুমোদিত দরের চেয়েও ৯৭ হাজার টাকা বেশি দরে ভেড়া কেনা হয়েছে। এই ভেড়া কিনতে চারটি টিম অস্ট্রেলিয়াতে যাওয়ায় ব্যয় বেড়েছে বলে বিএলআরআইয়ের ডিজি ড. তালুকদার নুরুন্নাহার জানান।


সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পটি যখন অনুমোদন দেয়া হয় তখন প্রতিটি ভেড়ার মূল্য ধরা হয়েছিল এক লাখ ২৫ হাজার টাকা, যা বাজার মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি। এ কারণে ভেড়ার মূল্য নিয়ে তখনো প্রশ্ন উঠে। তারপরও জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় (একনেক) প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু বাস্তবায়নের সময়ে দেখা যায় অস্ট্রেলিয়া থেকে যে ভেড়া কিনে আনা হয় তার মূল্য পড়েছে দুই লাখ ১২ হাজার টাকা। যেখানে মহিষ উন্নয়ন প্রকল্পে মহিষের প্রতিটির মূল্য ধরা হয়েছিল এক লাখ টাকা সেখানে ভেড়ার দাম তার চেয়েও বেশি। সমাজভিত্তিক ও বাণিজ্যিক খামারে দেশী ভেড়ার উন্নয়ন ও সংরক্ষণের জন্য সরকার এবার ৪৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প অনুমোদন করে। একটি অংশ দেশের সাতটি জেলার ১২টি উপজেলায় বাস্তবায়ন করার কথা। আর অপর অংশ সমগ্র বাংলাদেশে বাস্তবায়ন হবে। ভেড়া পালনের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং দারিদ্রবিমোচনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। ভেড়ার তিনটি ডেমোনেস্ট্রেশন খামার স্থাপনের মাধ্যমে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রকল্পের অন্যতম একটি লক্ষ্য। প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নেয়া প্রথম পর্যায়ের প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই না করেই দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্প অনুমোদন।


মূল প্রকল্পের ব্যয় বিভাজনে দেখা যায়, বিদেশী ভেড়া কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে ১০০টি। যার মোট মূল্য ধরা হয়েছে এক কোটি ২৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি ভেড়ার দর হলো এক লাখ ২৫ হাজার টাকা। আর দেশী ৯৬০টি ভেড়ার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। এখানে দেশীয় ভেড়ার মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ছয় হাজার টাকা। প্রকল্পে তিন জাতের ৪২টি ভেড়া অস্ট্রেলিয়া থেকে আনা হয়। এদের মধ্যে সাফক ১৩টি, প্যারেনডাল ১৪টি ও ডরপার ১৫টি। অভিযোজনের সময় মোট ১৭টি ভেড়া মারা যায়। আর এগুলো হলোÑ সাফক ছয়টি, প্যারেনডাল চারটি এবং ডরপার সাতটি।


প্রকল্পটি নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর আগে গত ২০১০ সালে সরকার ৩৩ কোটি ৭১ লাখ ১০ হাজার টাকা ব্যয়ে মহিষ উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। তার কোনো অগ্রগতি আমাদের কাছে নেই। পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানো, লাভপ্রদ, গোশতের গুণাগণ, বাজার দর ইত্যাদি সম্পর্কে ভেড়া, গরু ও ছাগলের তুলনামূলক চিত্র প্রকল্প প্রস্তাবনায় নেই। প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত ভেড়ার পাঠা এবং ভেড়ির বিক্রয় মূল্যসংক্রান্ত পত্রসংযোজন করা হয়নি। উল্লেখ্য, মহিষ উন্নয়ন প্রকল্পে ৮০০ মহিষ কেনার জন্য প্রকল্প ব্যয় ধরা হয় ৩৩ কোটি টাকা।


প্রকল্পের ব্যাপারে প্রকল্প পরিচালক ড. মো: এরশাদুজ্জামানের সাথে ফোনে যোগাযোগ করে প্রকল্পের ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তিনি নয়া দিগন্তকে জানান, প্রকল্প পরিচালক আমি ঠিকই। কিন্তু এ ব্যাপারে কথা বলতে হলে মহাপরিচালকের অনুমতি লাগবে। ওনার অনুমতি ছাড়া আমি কথা বলতে পারব না। প্রকল্প পরিচালক পর্যালোচনা সভায় জানান, অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানিকৃত ভেড়াগুলোকে সফলভাবে কোয়ারেন্টাইন প্রক্রিয়া অতিক্রম করে বিএলআরআইয়ের মূল খামামে নেয়া হয়। পরে ভেড়াগুলো রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে এবং কিছু ভেড়া মারা যায়। বাকি ভেড়াগুলোকে রক্ষার জন্য প্রকল্পের আওতায় দেশী ভেড়ার খামার থেকে কিছুটা দূরে বিদেশী ভেড়ার জন্য আলাদাভাবে অস্থায়ী শেড নির্মাণ করা হয়।


বিএলআরআইয়ের ডিজি ড. তালুকদার নুরুন্নাহারের সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, এ ব্যাপারে প্রকল্প পরিচালকের সাথে কথা বলতে হবে। কিন্তু প্রকল্প পরিচালক আপনার অনুমতি ছাড়া কথা বলবেন না বলে জানিয়েছেন এ কথা ডিজিকে বলা হলে তিনি বলেন, এই প্রকল্পে ভেড়া কেনার জন্য প্রি-ইন্সপেকশন টিম, মেডিক্যাল টিম, চূড়ান্ত টিমসহ মোট চারটি টিম অস্ট্রেলিয়াতে যায়। সে খরচ তো এই ভেড়ার দরের ওপর পড়বে। তিনি বলেন, ভেড়ার মূল্যের সাথে অনেক বিষয় জড়িত আছে।


আমদানিকৃত ভেড়ার মধ্যে ১৭টি মারা যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, যে ক’টি ভেড়া মারা গেছে, তার চেয়েও বেশি আমরা যুক্ত করেছি। ফলে ঘাটতি তো নেই। এখন ভেড়ার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৩টিতে।


এ দিকে, পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্পটি সংশোধনের জন্য পাঠানো হলে পিইসি সভা থেকে বলা হয়, মধ্যবর্তী কোনো মূল্যায়ন প্রকল্পটিতে করা হয়নি। সংশোধনীতে বিদেশ ভ্রমণের প্রস্তাব দেয়া হয়। কিন্তু তা না করে বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানোর প্রস্তাব দেয়া হয় কমিশনের পক্ষ থেকে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫