ঢাকা, সোমবার,২০ নভেম্বর ২০১৭

আলোচনা

সৌন্দর্য সততা ও নিষ্ঠা

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

৩১ আগস্ট ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৪:৫৮


প্রিন্ট

যা কিছুই আমি করি না কেন তার মধ্যে সৌন্দর্য, সততা, নিষ্ঠা ও নিয়মতান্ত্রিকতা থাকার আবশ্যকতা আমার স্বার্থেই রয়েছে। আমার কাছ থেকে সমাজ, সংসার, দফতর ও দেশ সবসময় ভালো কিছুই আশা করতে পারে। আমারো উচিত আমার ভালো কিছুই ডেলিভারি করা। আমার পদবি, পর্যায় এবং অবস্থানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ আচার-আচরণই আমার থেকে প্রত্যাশিত। সুতরাং পরিবেশ পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ চলন-বলন সম্পাদন নিয়ন্ত্রণ অনুধাবন প্রজ্ঞাপন প্রকাশ পাওয়া উচিত। সব কাজে যথাযথ সচেতনতা, গাম্ভীর্য ও মর্যাদাবোধকে মেনে চলা উচিত। আমার অনবধানতা, অজ্ঞতা কিংবা অবজ্ঞা দ্বারা আমি নিজে, আমার সংসার, সমাজ, দফতর ও দেশ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, যেন বঞ্চিত না হয়, সে দিকে লক্ষ রাখতে হবে। আমার কাছ থেকে সময় ও সমাজ যত খানি নিষ্ঠা, দায়িত্বশীলতা ও কর্তব্যপরায়ণতা প্রত্যাশা করে তা পূরণে আমার চেষ্টা অবশ্যই থাকতে হবে। এভাবেই আমি যদি আমার কাছে জবাবদিহির পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে সার্থক হবে আমার পথ চলা এবং আমার দ্বারা উপকৃত হবে দেশ, সময় ও সমাজ।
পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক, দাফতরিক সব বিষয় সামগ্রিকভাবে মনমানসিকতার ওপর প্রচণ্ড প্রভাব ফেলতে সক্ষম। আবার মনমানসিকতার সার্বিক সুস্থতার ওপরই পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক, দাফতরিক সব পর্যায়ে বলিষ্ঠ পদচারণার প্রকৃতি ও সুযোগ নির্ভর করে। অর্থাৎ এরা একে অপরের পরিপূরক। সুতরাং পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণে ভালো, সুস্থ ও সাবলীল করতে ও পেতে উপযুক্ত মনমানসিকতাও থাকতে হবে। আবার মনমানসিকতার সার্বিক সুস্থতা ও সমৃদ্ধির জন্য ভালো পরিবেশ থাকতে হবে। দু’টিই আপেক্ষিক। অতএব তা নিয়ন্ত্রণ, তদারকি, পোষণ ও তোষণে সজাগ সদা সচেতন থাকতে হবে। পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থান, বয়স, পদমর্যাদা, প্রায়রিটি অনুযায়ী ছোটখাটো ব্যাপারগুলোতে সময় ব্যয় বা মন নিবদ্ধ করা অনুচিত। বড় কাজের জন্য বড় মন বড় প্রত্যাশা ও বড় আয়োজন প্রয়োজন। থাকা চাই সুনিয়ন্ত্রিত আবেগ ও মনোনিবেশ। ছোটখাটো ব্যাপারে ব্যাপৃত হওয়াতে মন ছোট হয়; সময়, ক্যালরি, এনার্জি সবই অপব্যয় হয়, দরকার নেই। কাউকে কৌশলে ঘায়েল করার জন্য বুদ্ধি আটতে যেয়ে কিংবা কিভাবে কাউকে, এটাকে, সেটাকে বেকায়দায় ফেলা যায়, সে চিন্তায় সুচিন্তারা অস্থিরতায় ভোগে। অতএব তা পরিত্যাজ্য। এটা সার্বজনীনভাবে স্বীকৃত সত্য যে, উন্নত হতে হলে নত হতে হবে আগে। কারো উপকার করা মানে নিজে উপকৃত হওয়া আর কারো ক্ষতি করা মানে নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত করার পথ প্রশস্ত করা।
ঈমান অর্থ আল্লাহর ওপর আস্থা বা বিশ্বাসী বা নির্ভরশীল হওয়া বা থাকা এটি একটি সাধারণ কথার কথা হতে পারে না। ঈমানদার ব্যক্তির জন্য অনেক ফজিলত ও উপকার বা পুরস্কারের প্রতিশ্র“তি রয়েছে। এটিও শুধু কথার কথা না। ঈমান রাখা বা অবলম্বন করা বা অর্জন করা সাধারণ একটি ব্যাপার না। এর জন্য সাধনা প্রয়োজন। যেকোনো সাফল্য অধ্যয়ন, অধ্যাবসায়ের মাধ্যমেই অর্জিত হয়, এর জন্য আন্তরিক সদিচ্ছা থাকতে হয়। নিজের অভিপ্রায় উদ্দেশ্য-বিধেয় সুস্পষ্ট থাকতে হয় বা করতে হয়। কোনো সাফল্য আপনা-আপনি এসে ধরা দেয় না। ‘আল্লা যার পূর্ণ ঈমান কোথা সে মুসলমান’- কবি কাজী নজরুলের আক্ষেপ বা প্রক্ষেপ যথেষ্ট তাৎপর্যবাহী। ‘পূর্ণ ঈমান’ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হাফ হার্টেড সাদামাটা দোদুল্যমানতা যখন যেমন তখন তেমন হেলাখেলার ব্যাপার নয় ঈমান। ‘মুসলমান’ একটি সাধারণ শব্দ নয়- আল্লাহর ওপর পূর্ণাঙ্গ নিঃশর্ত নিরঙ্কুষ ও নির্ভেজাল আত্মসমর্পণকারীই হচ্ছে মুসলমান। সুতরাং যে তার সৃষ্টিকর্তার সাথে সচেতনভাবে যত্নসহকারে বন্দেগি ও বন্ধুত্ব সংস্থাপন করেছে- তার তো দুশ্চিন্তা, সংসয় ও সন্দেহ থাকে না। যেকোনো ব্যাপারে সে কাজ করে যাবে অনবরত নিঃসঙ্কোচে সুচারুরূপে, টাল্টিবাল্টি তার কাছে পাত্তা পাবে না, সবসময় আল্লাহর মর্জির ওপর যার ভরসা এবং আল্লাহকে রাজিখুশি করানোর কথা স্মরণ রেখে যে কাজ করবে, তার আবার দুশ্চিন্তা থাকবে কেন? সে তো কাজ করে যাবে নিত্যনতুন উদ্যমে চিরজাগ্রত শিরে ও আত্মবিশ্বাসে।
মানুষ দুনিয়াদারির শান্তি, সমৃদ্ধি, নিরাপত্তা ও নিরাপদ সাফল্যের জন্য যার যার মতো সৃষ্টিকর্তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে দোয়া ও মোনাজাত করে আর তাঁর প্রেরিত মহাপুরুষদের প্রতি সালাম ও দুরুদ পাঠ করে শাফায়াত বা সুপারিশ প্রার্থনা করে। প্রত্যাশা করে নিরাপদ ও নিরাময়ের। অনেকে মনে করেন এ প্রার্থনা ও প্রত্যাশা শুধু মুখে মুখে। বিপদে পড়লে প্রভুকে স্মরণ করা, আর বিপদ থেকে পরিত্রাণ লাভের পর আর তার কথা তেমন একটা মনে আসে না। আসলে প্রভুর হুকুম-আহকাম পালন হয় কি না সে বিচার বিবেচনা বড় একটা আসে না। শুধু তার কাছে সাহায্য চাওয়া, প্রেরিত পুরুষদের সাধুসন্তদের শাফায়াত চাওয়া। কিভাবে চললে আমরা শান্তি পেতে পারি, নিরাপদ থাকতে পারি, সাফল্য লাভ করতে পারি, বিপদ এড়িয়ে চলতে পারি, কোন কাজে কল্যাণ আর কোন কাজে অকল্যাণ তা বাছবিচার করি না, আমল করি না। আর তা করি না বলেই শান্তি পাই না, নিরাপত্তা পই না, বিপদাপন্ন হয়ে পড়ি, স্বাস্থ্য হারাই, সম্পদ হারাই, সাহস হারাই, হিম্মত হারাই, বিভ্রান্ত হয়ে পড়ি দিগি¦দিকশূন্য হয়ে হা-হুতাশ করি। আর মুখে মুখে তার কাছে সাহায্য চাই। পরিত্রাণ চাই। অলৌকিক সাহায্যের প্রত্যাশায় বসে থাকি। পরীক্ষায় পাসের জন্য পড়াশোনা করি না, অথচ দৈব মেধাশক্তি এসে যেন আমাকে পরীক্ষা তরণী পার করিয়ে নেয় সে আশায় বসে থাকি। নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের কাছে জবাবদিহির ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেই না, অথচ ভাবি আমি যেন অদৃশ্য এক সাহায্যদাতার সাহায্যে আমার যাবতীয় অন্যায় অপকর্ম থেকে নিস্তার ও নিষ্কৃৃতি লাভ করি। অথচ আমরা কিতাব পাঠ করি সুর করে, না বুঝে এবং তা অনুসরণের কোশেশ না করে। বল ও ব্যাটের সমন¦য় না হলে ক্রিকেটে যেমন রান ওঠে না; তেমনি চিন্তা, বিশ্বাস ও কর্মের মধ্যে সমন্বয় না হলে সিদ্ধিলাভ হবে না, হতে পারে না।
বয়স বাড়লে অভিজ্ঞতা বাড়ে এবং সে অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে অনেক ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন সহজতর হয়, কম সময় ও শ্রমে বেশি কাজ করার ফলাফলও পাওয়া যায়, কিন্তু বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে ধৈর্য, কর্মোদ্যম, শক্তি ও সাহসেও ভাটা পড়ে। শ্রান্তি আসে ক্লান্তি বাড়ে। অবসাদের আত্মীয়রা এসে বাসা গাড়ে। দৃষ্টি, শ্রবণ ও স্মৃতিশক্তি কমে যায়, নানান রোগবালাই শরীরকে কর্মে অক্ষম করে তালে। ফলে অভিজ্ঞতা দিয়ে এক দিকে যে বাড়তি লাভ হয় এসব অনিবার্য অতিথির আগমনে ক্ষতি বাড়তেই থাকে। ফলাফল প্রায় আগের মতোই থাকে। তাও আবার অর্থনীতির সেই অনিবার্য শর্তÑ ‘আর সব যদি ঠিক থাকে’। অর্থাৎ পরিবেশ, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, অন্যের সাহায্য-সহযোগিতা এবং নিজের মনোবল, বুদ্ধি বিবেক ও চিন্তাশক্তির ন্যূনতম সজাগ পরিস্থিতি ঠিকঠাক থাকলেই না ওপরে যা বললাম তা সাধিত হতে পারে। এসব বাস্তব বিষয় বিবেচনায় এনেই বলিÑ মনরে! সময় থাকতে হও সাবধান। শরীরের যত্ন নাও, মনকে ভালো খাবার দাও, পরিবেশকে বান্ধব করে তোলার পদক্ষেপ নাও, অহেতুক ঝক্কি ঝামেলায়, বকাঝকায় নিজের বল বুদ্ধি মন ও মনোযোগকে অবচয়, অপচয় ও অপব্যবহার না করে পজিটিভ চশমা পরো, নেগেটিভ ভাবনা ছাড়ো, নিয়মতান্ত্রিকতায় ঘাঁটি গাড়ো। উদার উন্মুক্ত প্রকৃতির কাছে ফিরে যাও, তার থেকে শক্তি সাহস ও শান্তির প্রেরণা নাও, বৃষ্টির রিমঝিম শব্দে, শ্রাবণের জোয়ারে নদীর পথচলা, পাখির কূজনে, কুহেলি কুয়াশায় ঢাকা শীতের ভোর, শরতের নির্মেঘ আকাশ, কৃষ্ণচূড়া, বাগানবিলাস আর আজালিয়ার সৌন্দর্যে মুখ লুকাও, শ্বাস-প্রশ্বাস নাও। শান্ত সকালের মেধাবী প্রহরে সৃজনশীলতায় হও সমর্পিত চিত্ত। পশুপাখালির নিত্যদিনের জীবনযাত্রায় কান পেতে শোনো তাদের সবার সাথে একাত্ম হও। এরা সবাই বিধাতার, বিধাতাও এদের সবারই। মনের সব জড়তা, কূপমণ্ডূকতা, দীনতা, হীনতা, ঝেড়েমুছে ফেলো, নির্ভার করে তোলো তাকে। হিংসা, বিদ্বেষ, ঈর্ষা, রাগ, ক্ষোভ, ভয়, আশঙ্কা, সঙ্কোচ, শঙ্কা, সক্সক্ষুব্ধতা সবই করো পরিত্যাগ। নিত্যনতুন উদ্যমে গৌরব প্রত্যাশায় উদ্বেল হয়ে ওঠো। Enjoy the life and help to make it long. .
জীবনের প্রতিটি দিন নতুন নতুন অবয়বে হাজির হয়। সে কারণে সফলতা-ব্যর্থতার খতিয়ান টেনে আনন্দ কিংবা বিষাদে নতুন দিনের আলিঙ্গনকে দায়িত্বহীন করা সমীচীন নয়। নামাজ পাঠে সবসময়ই প্রভুর সমীপে আত্মসমর্পণের মানসিকতা জাগ্রত থাকা উচিত। জীবনে ভুলভ্রান্তি অন্যায় ভালো-মন্দ থাকবেই। নিত্য এটি যেহেতু প্রশিক্ষণ ও অর্জনের পালা, সেহেতু ভালো-মন্দের মধ্যেও অব্যাহত থাকবে প্রয়াস। অজানা আশঙ্কা উদ্বিগ্নে ভোগার কোনো দরকার নেই। প্রতিদিনের জীবনকে নতুন অর্থে অর্থবহ করে তোলা দরকার। হিসাবের খতিয়ান মিলবে জীবনের শেষে দিন একভাবে কেটে যাবে। উদ্বেগ উৎকণ্ঠা রহিত, দুশ্চিন্তাহীন জীবনযাপনে নিষ্ঠ আত্মপ্রত্যয়ী জীবন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা থাকবে সর্বদা। সে লক্ষ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, আশঙ্কা দুর্ভাবনায় আকীর্ণ হয়ে নয়, আশাবাদী ও সৃজনশীল হয়ে। প্রচেষ্টা ঠিক ও অব্যাহত থাকলে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, হয়েছে কি কোনো দিন? তবে...?
মানুষের জীবনের স্থিতিপত্রের দর্শন শুধু মোদ্দাকথায় বকবক করে বললে বলার বা প্রকাশের উদ্দেশ্য পূর্ণতা পাবে না। একে দর্শন হিসেবে শিল্পকলার মাধ্যমের শক্তিশালী সব শাখায় ফুটিয়ে তোলা বাঞ্ছনীয় হবে। ছোটখাটো কাজে, আলাপ-আলাপনে, ব্যবহার-বক্তব্যে, উক্তি-উপলব্ধিতে, সামাজিক-অর্থনৈতিক জীবনযাপনে সর্বত্র তার প্রকাশ চাই। প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ চাই, সে ভাবনার কায়িক ও অবয়বগত প্রকাশে। আর এর জন্য প্রয়োজন নিবিড় দর্শন। সময় ও সুযোগের অপব্যয়ের অবকাশ নেই। সত্য আবার একে মনের বোঝা ভেবে রেখে হতাশা আকীর্ণ হওয়ার কারণ দেখি না। মুক্ত হতে হবে সঙ্কোচ ও বিহ্বলতা থেকে। আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস বোধের সজিব-সতেজ প্রকাশ প্রয়োজন। সব কাজে আগ্রহ ও সুচিন্তা, সযত্নের ছাপ রাখতে হবে। মনকে বিশ্রাম দিতে হবে সবল চিন্তার দোসর হওয়ার জন্য।
কেউ কোনো এক সচেতন অবসরে যদি তার অতীতের দিকে তাকায়, তাহলে সে দেখতে পায় কত বিচিত্র অবয়বে তার এই পথচলা। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে সে এগিয়ে চলেছে অনাগত ভবিষ্যতের পানে। শূন্য থেকে যাদের শুরু তারা যদি বিয়োগ করে তার বর্তমানকে তা হলে বেরিয়ে যাবে অর্জনের প্রকৃত খতিয়ান। এই প্রাপ্তি এই অর্জন কতটা বৈষয়িক কতটা ন্যায়সঙ্গত ও সহজাত তার বিচার বিশ্লেষণ করা দরকার। কোনো প্রতিজ্ঞা বা কোনো প্রত্যয় তাকে এই অভীষ্ঠে এনে দিয়েছে তারও শুমারি প্রয়োজন। তার সাহচর্যে যারা এসেছে, তাদের সাথে সে কেমন আচরণ করেছে, তার কাছ থেকে কী তারা পেয়েছে তার পর্যালোচনা করতে হবে। তা-ই যদি সে করে তাহলে সে দেখে অনেকের হৃদয়ে হয়েছে তার ঠাঁই, আবার অনেককে দিয়েছে মর্মাঘাত। এ সবের শুমারকরণে তাকে প্রত্যয়দীপ্ত হতে হয় ভবিষ্যতের জন্য। আর এর থেকে সে প্রেরণা পেতে পারে আরো বেশি শ্রদ্ধাশীল ও সহনশীল মানবতাবাদী ও পরোপকারী হওয়ার।
মানুষের ভেতরের ভাবনা এবং বাইরের বাস্তবায়নের মধ্যে একটা সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। অন্তরের বিতৃষ্ণ ঘৃণা, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাইরের আচরণে প্রকাশ পায় এটা স্বাভাবিক। সুতরাং অন্তরের বিষয়কে নিয়ন্ত্রণ ও শাসন না করে বাইরের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ ও সুশীল করতে চাইলে তা হয় বোকামি এবং নীতিশাস্ত্রের বিবেচনায় তা হয় ভণ্ডামি। এ ধরনের প্রয়াস সুফল বয়ে আনতে পারে না। মনে যেসব বিষয় ঘোরাফেরা করে তাদের একটা শ্রেণীকরণ, বৈশিষ্ট্য নির্ণয় ও বিচার-বিশ্লেষণ হওয়া দরকার। জন্মগত বা সহজাতভাবে কিছু প্রবণতা সেখানে থাকেই। সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজসাধ্য হয় না, তবে সাধ্যের অতীতও নয়। সুচিন্তিত ও সুশিক্ষা ও আত্মোপলব্ধি, আত্মসমালোচনার নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে তার বেশ কিছু সংশোধন ও পরিমার্জন করা সম্ভব। আল কুরআনে, বাইবেলে, ত্রিপিটকে, বেদে, উপনিষদে অর্থাৎ সবধর্ম ও শাস্ত্রে এ কথা বলা হয়েছে স্পষ্ট করেÑ যে নিজেকে চিনতে শিখেছে বা আত্মসমালোচনা করতে জানে, সেই প্রকৃত বুদ্ধিমান।
সুতরাং নিজেকেই নিজের সমালোচনা করতে হবে। চিহ্নিতকরণের চেষ্টা চালাতে হবে নিজের দোষত্র“টি, প্রবণতার ভালো ও মন্দ দিকগুলোকে। কিভাবে কোন মুহূর্তে তা চিন্তা ও কর্মকে প্রভাবিত কিংবা নিয়ন্ত্রিত করছে তা দেখতে হবে। দেখা যায় একধরনের বিতৃষ্ণা, পরশ্রীকাতরতা, বিদ্বেষ, অসহিষ্ণুতা এবং অন্তর্মুখিতা বেশির ভাগ আচরণকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। সীমাবদ্ধ চিন্তাভাবনা এবং সংশয়-সন্দেহ ও বহুমুখী কিছু অপয়া ধ্যানধারণা সুচিন্তার সুযোগকে করছে সীমাবদ্ধ। মনকে আচ্ছন্ন রাখছে অন্য চিন্তায়। এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
দৈনন্দিন জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই আমাদের অগোচরে ও অমনোযোগিতায় বিনষ্ট হয়। অনেক তাৎপর্যহীন বিষয় এসে তাৎপর্যপূর্ণতাকে আমাদের থেকে দূরে সারিয়ে রাখে। প্রকৃতপক্ষে কোনটি গুরুত্বপূর্ণ এবং স্থায়িত্ব কোনটির বেশি কিংবা বেশি দরকারি সেটি উপলব্ধির সীমানায় আসতে যথেষ্ট দেরি হয়। বিভিন্ন ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতে তা বারেবারে বিভিন্ন অবয়বে আমাদের চিন্তাচেতনায় ধরা দেয়। অদরকারির বেড়াজাল ছিন্ন করে, গুরুত্বহীনের গহ্বর থেকে গুরুত্ববহকে বের করে এনে মনোযোগ ও কার্যকারিতায় ঠাঁই দেয়াটাই- দিতে পারাটাই বিশেষ বিবেচনায় আনা উচিত।
আমরা অনেকেই হয়তো বেশির ভাগ সময় অকাজের পেছনে অধিক সময় ব্যয় করে ফেলি। কাজের জন্য সময়ের বরাদ্দ কমে যায় তাতে কর্মস্থলে বিরূপ পরিবেশ, অন্যায় আবদার, অপকর্ম, ষড়যন্ত্রকে অধিক আমল দিতে গিয়ে সে চিন্তা-চেতনায় বেশির ভাগ সময় আচ্ছন্ন থাকতে গিয়ে নিজের অনেক অমূল্য সময়কে হারিয়ে ফেলি। অথচ আমাদের ওই অহেতুক প্রতিক্রিয়া প্রকাশের কিংবা মনোযোগের মূল্যবান সময় ব্যয়ে কোনো তাৎপর্যবাহী অর্জন নেই। অন্যের চরিত্র-চারিত্র্যের গোষ্ঠী উদ্ধারে গিয়ে সময় বিনষ্ট করার অবকাশ যত কম হয় ততই মঙ্গল। কেননা সেগুলো নিতান্তই সাময়িক এবং তাকে কেন্দ্র করে কোনো মহৎ স্থায়ী এবং কালোত্তীর্ণ কিছু করা সম্ভব নয়।
স্রষ্টার প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের কারণের অন্ত নেই। এ পর্যন্ত এসেছি- শারীরিক সাংসারিক বৈষয়িক ঐহিক ও পারিত্রিক যেটুকুু সঞ্চয় ও সাফল্য তার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাতে হয়। মানুষ যদি তার শৈশব, কৈশোর, যৌবন ও পূর্ববর্তী জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোর দিকে তাকায়, তাহলে স্পষ্টতই বুঝতে পারে; কিভাবে সে বড় হয়েছে। তার পেছনে যে অতীত তা অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আসার অতীত। দারিদ্র্য, শোষণ-বঞ্চনার ভেতর দিয়ে কষ্ট, যাতনা সীমাবদ্ধতা ও সমস্যা মোকাবেলার মধ্য দিয়ে তাকে এ পর্যায়ে আসতে হয়েছে। তাকে দেখতে হয়েছে অনেক কিছুই। সইতে হয়েছে অনেক কিছু, কিন্তু সব পর্যায়ে বিধাতার, যিনি অতিশয় দয়ালু ও দাতা, তার দয়া, মেহেরবানি ও সাহায্যে সে এগুলো পাড়ি দিতে সক্ষম হয়েছে। সে যদি মনে করে তার বিপদ দিনগুলোর কথা, জটিল পরিস্থিতি থেকে নিষ্কৃতি লাভের কথা, সফলতা, ব্যর্থতায় ভরা দিনগুলোর কথা, কত উপলক্ষে কত শত জনের সাথে লেনদেন ও আচার ব্যবহারের কথা, তাহলে সে বুঝতে পারবে, তার উপলব্ধি জাগবে সে এখন এখানে কিভাবে এসেছে।
আল্লাহর ওপর পূর্ণ ঈমান রাখা ব্যক্তির বৈষয়িক বা ইহলৌকিক লাভ-লোকসান নিয়ে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠার কোনো কারণ দেখি না। এটি হলে এটা হবে না ওটা হবে এসব বিবেচনায় নিজের বিশ্বাস বা ঈমানের সুদৃঢ় অবস্থান নিশ্চিত করার বিষযটিই প্রাধান্য পাওয়া উচিত। লোকে কী ভাববে এ চিন্তা নয়, কিভাবে নিজের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস বজায় রাখা যাবে। কেননা বড় ক্ষণস্থায়ী এ সময়ে যা এখানে করছি সেটিই মুখ্য বিষয় হবে ফলাফল অর্জনের। সুতরাং কোনো প্রকার ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ নয়; প্রার্থনা তাঁর কাছে, তিনি যেন সৎপথে থাকার, পাবার পথ ও পন্থাকে সহজ করে দেন।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫