ঢাকা, শনিবার,২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭

নারী

দুর্যোগের প্রধান শিকার নারী

আবদুর রাজ্জাক

২৮ আগস্ট ২০১৭,সোমবার, ০০:০০


প্রিন্ট

মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার প্রত্যন্ত সোদঘাটা গ্রামের গৃহবধূ আছমা আক্তারের পাঁচ সদস্যের সংসার। অসুস্থ স্বামী, বৃদ্ধা শাশুড়ি আর দুই সন্তান নিয়ে সপ্তাখানেক ধরে তার প্রতিদিনের কষ্টের পরিসংখ্যান চোখে না দেখলে বোঝা মুশকিল। চার দিকে শুধু পানি আর পানি। ঘরের মেঝেতে হাঁটুপানি। ইট দিয়ে উঁচু করে পাতা হয়েছে চৌকি। তাতেই সবার বসবাস। তলিয়ে গেছে রান্নাঘর ও টয়লেট। প্রতিবেশী আর আত্মীয়স্বজনের সহায়তায় খেয়ে-না-খেয়ে কোনো রকম বেঁচে আছে পরিবারটি। আর স্বামী, শাশুড়ি ও দুই শিশুসন্তানকে দেখাশোনা, দু’মুঠো রান্নার ব্যবস্থা, তাদের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা করার সবটুকু দায়িত্বই আছমা আক্তারের করতে হয়। সহায়তার চাল-ডাল কিছু পেলেও রান্না করার জ্বালানি সঙ্কটে একবেলা রান্না করেন তিনি। শুক্রবার সকালে নৌকা নিয়ে তার বাড়ি গেলে দেখা যায় হাঁটুপানিতে দাঁড়িয়ে তিনি রান্নাঘরের চালে মাটির চুলায় ভাত রান্না করছেন। ভেজা কাঠ আর স্যাঁতসেঁতে চুলায় আগুন যেন ধরতেই চায় না। চার দিকে ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মধ্যে অনবরত ফুঁ দিয়ে আগুন জ্বালানোর চেষ্টারত গৃহবধূটির কাশতে কাশতে হেঁচকি উঠে যায়। এমনি পরিস্থিতিতে সীমাহীন কষ্টে পরিবারের সদস্যদের দু’মুঠো খাবারের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে জেলার কমপক্ষে ৩০ হাজার নারীকে।
প্রকৃতির ঘনঘটা ও জোয়ারভাটার অমোঘ বিধান অনুযায়ী মওসুমি জলবায়ুর দেশ হিসেবে আমাদের দেশে আষাঢ়-শ্রাবণে নিয়মিত বর্ষা হওয়ার কথা। কিন্তু কয়েক দশকে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে অনিয়মিত বর্ষা ও হঠাৎ বন্যা, খরা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগেই আছে। রাজধানীর নিকটবর্তী মানিকগঞ্জ জেলা। এখানে কৃষিক্ষেত্রে রয়েছে বৈচিত্র্য, রয়েছে জলাবদ্ধতা ও জলজটের সমস্যা আর সেই সাথে দেখা দেয় প্রচণ্ড জ্বালানি সঙ্কট। এই প্রতিকূল পরিস্থিতি অনবরত মোকাবেলা করে টিকে আছে গ্রামবাংলার প্রান্তিক হাজারো নারী। হঠাৎ বর্ষা ও বন্যার প্রস্তুতির অন্যতম হলো জ্বালানি সুরক্ষা।
তীব্র জ্বালানি সঙ্কটে মানিকগঞ্জের বন্যা উপদ্রুত এলাকার নারীদের জনজীবন কাটছে নিদারুণ কষ্টে। বন্যায় জমি ও আশপাশের জায়গা তলিয়ে যাওয়ায় এবার জ্বালানি সঙ্কটের পাশাপাশি গবাদিপশু নিয়ে বেকায়দায় পড়েছেন এ অঞ্চলের হাজারো নারী।
মানিকগঞ্জের গাংডুবী গ্রামের নারীরা এখন বাছনা পাট নিতে ব্যস্ত। জেলেপাড়ার আরতী রানী রাজবংশী (৭০) বলেন, ‘আমরা বছরে একবার বাছনা পাট নেয়ার সুযোগ পাই, সেটি ভালো পাটের মধ্যে যেগুলো ছোট সেগুলো কেটে জাগ দেয়া হয়। আমরা সেগুলোর আঁশ ছাড়িয়ে কৃষকদের দিয়ে দেই। আমরা শুধু খড়ি পাই তাতেই আমরা খুশি। কারণ এই খড়ি দিয়ে বাড়ির চার পাশে, রান্নাঘর ও শৌচাগারে বেড়া দেই।’ তিনি আরো বলেন, ‘সবচেয়ে বড় উপকার হলো সারা বছর প্রথমেই খড়ি দিয়ে জ্বাল ধরাতে হয়, তাতে সারা বছরের জ্বালানি হয়। যারা এই কাজ করেন না তারা আমাদের কাছ থেকে খড়ি কিনে নেয় প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকায়। এতে আমরা কিছু টাকা পাই এবং আমাদের তো আর কিনতে হয় না। এতে সংসারে উন্নতি হয়।’
বানিয়াজুরী ইউনিয়নের রাথুরা এলাকার আছিয়া বেগম বলেন, ‘আমরা এখন জ্বালানি সাশ্রয় করার জন্য শিকের চুলা ব্যবহার করি। এতে গোবর দিয়ে গোবর লাঠি ও ঘসি ব্যবহার করা যায়। জ্বালানি কম ব্যয় হয় এবং ধোঁয়া কম লাগে।’
মানিকগঞ্জের সবচেয়ে নিচু এলাকা হিসেবে পরিচিত গাংডুবি গ্রাম। চার দিকে থৈ থৈ পানি। ঘরবাড়ি পানিতে নিমজ্জিত। এ গাঁয়ের জেলে পেশায় যাদের জীবন তাদের অধিকাংশ সময় নৌকার মধ্যে থাকতে হয় এবং নৌকার মধ্যে রান্নাবান্না হয়। এ প্রসঙ্গে নেধুরাম মাঝির স্ত্রী লক্ষ্মী রাজবংশী বলেন, ‘পুরুষ মানুষ মাছ ধরার জন্য নৌকা, জাল, বেসাল, বাঁশ ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আর আমরা রান্নাবান্না নিয়ে ব্যস্ত থাকি। তিনি আরো বলেন, আমাদের পেশাকে বাঁচাতে হলে প্রাকৃতিক সম্পদ প্রচুর থাকতে হবে যাতে মায়েরা পর্যাপ্ত জ্বালানি পায়।
এদিকে বন্যার অজুহাতে কাঠ, লাকড়ি, শুকনো বাঁশ, পাটকাঠি, কাঠের ভুসিসহ অন্যান্য জ্বালানির চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি দামও বেশি হাঁকছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে গ্রামের নি¤œ আয়ের মানুষজন পড়েছেন বেশ বেকায়দায়।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫