ঢাকা, বুধবার,২২ নভেম্বর ২০১৭

অবকাশ

কোরবানি

চারাগল্প

জোবায়ের রাজু

২৭ আগস্ট ২০১৭,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

বাবা সন্ধ্যার পরপরই বিশাল সাইজের একটি কোরবানির গরু নিয়ে বাসায় ফিরলেন। গরু দেখে তো আমার চোখ ছানাবড়া। এত বড় গরু আর কোনো ঈদে আমাদের কেনা হয়নি। অন্যান্য বারের চেয়ে এবারের গরুটা সাইজে বেশ বড় দেখে আমাদের পরিবারে যতটা আনন্দ বয়ে যাওয়ার কথা, তার কোনোটাই হচ্ছে না। কাল ঈদ। মা ব্যাকুল হয়ে নিরিবিলি কাঁদছেন। রোজী আপা নীরস মুখে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সম্ভবত বিষণœ চোখে ঈদের চাঁদ দেখছে। বড়দা কিছুক্ষণ পর বন্ধুদের সাথে আড্ডা শেষে বাসায় ফিরবে। বাবা গরু কিনে এনে উঠোনের পাশে কদমতলায় বেঁধে রাখলেন। এবারের কোরবানির গরু নিয়ে ঘরের কারোরই তেমন সাড়া নেই। বাড়িময় এক নীরব শোক বইছে।
এক সপ্তাহ আগে আমাদের বাড়িটা একটা শোকের কারখানা হয়ে গেছে। আমাদের সবার প্রিয় ছোটবোন শ্যামা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। যাওয়ার সময় রোজী আপার ঘরে ছোট্ট একটা কাগজে তার বাড়ি পালানোর গল্প লিখে গেছে।
আমরা কেউ জানতাম না, দুই বছর ধরে রাফি নামে একটি ছেলের সাথে শ্যামার সম্পর্ক আছে। অথচ শ্যামা চিরকাল ছিল প্রেম-ভালোবাসার বিপরীতে। কিন্তু রাফি নামে একটি ছেলের সাথে যে সে লোকচক্ষুর অন্তরালে একটি শাশ্বত সম্পর্ক বহাল রাখবে, আমরা কেউ ধারণাই করতে পারিনি।
অবশেষে গত সপ্তাহে হঠাৎ উধাও হয়ে গেল শ্যামা। তাকে সারা বাড়ি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। শেষে রোজী আপার ঘর থেকে উদ্ধার করা হয় শ্যামার হাতের লেখা চিঠি। প্রতিটি লাইনে শ্যামা অভিব্যক্তি প্রকাশ করে গেছে রাফিকে ঘিরে। শ্যামার চিঠি আমাদের হাতে আসার পর বদলে গেছে বাড়ির চেহারা। শোকে কাতর হয়ে উঠে আমাদের নূরজাহান মঞ্জিল।
এই আকস্মিক ঘটনায় বাবা খুব সহজে নিজেকে বদলে ফেললেন। তিনি দাবি করলেন, শ্যামা নামে তার কোনো মেয়ে ছিল না। যে মেয়ে বংশের মানমর্যাদা নষ্ট করে, তাকে তিনি কখনো ক্ষমা করবেন না। বাবার সিদ্ধান্তে প্রতিবাদ করার সাহস আমরা পাইনি। তাই হয়তো মা নীরবে চোখের জল মুছে গেছেন। বাকরুদ্ধ হয়ে গেল রোজী আপা আর বড়দা।
আজ ঈদ। বড়দা, আমি আর বাবা ঈদগাহ থেকে নামাজ শেষে বাসায় ফিরলাম। গরু জবাইয়ের নানা সরঞ্জাম নিয়ে আমরা হুজুরের অপেক্ষায় আছি। একটু পর ছুরি হাতে হুজুর আসবেন পশু কোরবানি করতে। বাবা একটি খাতায় লিখছেন কার কার নামে কোরবানি দেয়া হবে। আমাদের ঘরের প্রত্যেক সদস্যের নামের পাশাপাশি আমার জান্নাতবাসী দাদা-দাদীর নামও দেখা যাচ্ছে। বাবা শ্যামার নাম লিখেননি। অথচ প্রতিবার কোরবানির নাম লেখার তালিকায় সবার আগে দেখা যেত শ্যামার নাম। এবার শ্যামার নাম না দেখে এই প্রথম আমার বুক হু হু করে উঠল। শ্যামাকে কি বাবা সত্যিই পর করে দিচ্ছেন? আমার বুকের অতল এক গহিন ব্যথায় চিনচিন করছে।
ঘর থেকে ভেসে এল বাবা-মার উঁচু গলা। মা কান্নারত কণ্ঠে বাবাকে কী যেন বলতেই বাবা হুঙ্কার ছেড়ে বললেনÑ ‘না ওই মেয়ের নামে কোনো কোরবানি দেয়া হবে না, কখনো না...।’ আমি বুঝলাম আসল রহস্য। শ্যামার নামে কোরবানি দিতে মা বাবার কাছে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তাতে বাবার মন গলল না। বাবার মন এত শক্ত হয়ে গেল কিভাবে?
মস্তবড় এক ছুরি নিয়ে হুজুর এলেন। সাথে পাড়ার উৎসুক পিচ্চির দল। বাবার এগিয়ে দেয়া খাতা দেখে হুজুর যাদের নামে কোরবানি দিতে হবে, তাদের নামে দোয়া পড়ছেন। হায়! খাতায় শ্যামার নাম নেই।
কোরবানির জন্য গরুকে বেঁধে শোয়ানো হলো। ছুরি হাতে হুজুর প্রস্তুত। বাবাকে হঠাৎ অন্য রকম দেখাচ্ছে। কী যেন বলতে চাইছেন।
হঠাৎ বাবা হুজুরের দিকে ছুটে গেলেন। মিনমিন স্বরে বললেনÑ ‘হুজুর, আরেকটা নাম পড়েন। মোসাম্মত রাবেয়া আক্তার শ্যামা।’ বাবার চোখ ভিজে উঠল। পিতৃস্নেহের কাছে অভিমানের বরফ গলতে সময় লাগেনি। হুজুর মনে মনে শ্যামার নাম জপে কোরবানি করলেন।
আমি এক দৌড়ে গেলাম মার কাছেÑ ‘মা, বাবা শ্যামার নামে কোরবানি দিয়েছেন!’ আমি টের পাচ্ছি, এ কথা বলতে গিয়ে আমার গলা কাঁপছে। যেন গলা উপছে কান্না আসবে। আমার কান্না আসার আগেই মা শিশুর মতো কাঁদতে লাগলেন। বাইরে গরুর গলা ফাটানো গোঙানির শব্দ। আমার কান্নার বেগ এত বাড়ছে কেন? শ্যামার জন্য? না আমি কাঁদব না। আজ ঈদ। ঈদের দিনে কান্নাকাটি ভালো না।
আমিশাপাড়া, নোয়াখালী

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫