ঢাকা, বুধবার,২২ নভেম্বর ২০১৭

অবকাশ

এসেছে মহিমান্বিত ঈদুল আজহা

মুহাম্মদ কামাল হোসেন

২৭ আগস্ট ২০১৭,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর ঈদুল আজহা হচ্ছে মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব। প্রতি বছর হিজরি, ক্যালেন্ডার অনুযায়ী জিলহজ মাসের ১০ তারিখ পবিত্র ঈদুল আজহা হাজির হয় পশুপ্রবৃত্তির কোরবানি করে মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করার সুমহান আদর্শ নিয়ে। ত্যাগের আনন্দে উদ্ভাসিত পবিত্র ঈদুল আজহা মানুষকে মানবিক চেতনায় পুষ্ট হয়ে জগতের সব সৃষ্টির কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করার শিা দেয়। উৎসাহ জোগায় একটি সাম্যপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শামিল হতে। সঙ্গত কারণে সমগ্র মুসলিমজাহান তো বটেই সমগ্র বিশ্বমানবের কাছে পবিত্র ঈদুল আজহার সীমাহীন গুরুত্ব ও তাৎপর্য রয়েছে। ঈদুল আজহা মানে ত্যাগের ঈদ। এই ঈদ মহান কোরবানির শিা দেয়। কোরবানি হচ্ছে মূলত ত্যাগ। ত্যাগের মধ্যেই এর সার্থকতা ও তাৎপর্য নিহিত। পবিত্র ঈদুল আজহা আমাদের এ শিাই দেয়। তবে ঈদ কেবল ত্যাগের নয়, উৎসব-আনন্দেরও। এ আনন্দের ধারা আমরা ল করি সর্বত্র। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের মধ্যে বাঁধভাঙা জোয়ার দেখা দেয়, যা নির্মল আনন্দেরই প্রকাশ। ইসলামে কোরবানির ঈদ ও ত্যাগের মর্যাদা অত্যধিক। এ প্রসঙ্গে হাদিসে এসেছে, ‘হজরত জায়িদ ইবনে আরকাম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, ‘সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই কোরবানিটা কী? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাব দিলেন, এটা তোমাদের পিতা হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের সুন্নাত বা আদর্শ। অতঃপর তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! এতে আমাদের জন্য কি ফায়দা বা সওয়াব রয়েছে? তিনি বললেন, কোরবানির পশুর প্রতিটি পশমের পরিবর্তে একটি করে নেকি রয়েছে। সাহাবারা আবার জানতে চাইলেন, ভেড়া, দুম্বার পশমের ব্যাপারে কী কথা? তিনি বললেন, এর প্রতিটি পশমের বিনিময়েও একটি করে নেকি পাওয়া যাবে।’ (ইবনে মাজাহ, মিশকাত) হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় দশ বছরের জীবনযাপন করেছেন। সেখানে প্রত্যেক বছরই তিনি কোরবানি করেছেন’ (তিরমিজি)। কোরবানির গুরুত্ব সম্পর্কে বিশ্বনবীর এ হাদিস দিয়ে বোঝা যায়, ‘যে ব্যক্তি কোরবানি করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের ধারে কাছেও না আসে।’ (ইবনে মাজাহ) অন্য হাদিসে হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘মানুষের আমলের মধ্যে কোরবানির দিন অন্য কোনো আমলই আল্লাহর নিকট কোরবানি অপো অধিক পছন্দনীয় নয়। অবশ্যই কিয়ামতের দিন কোরবানির পশু তার শিং, লোম ও খুর নিয়ে উপস্থিত হবে। যে কোরবানি শুধু আল্লাহর জন্য করা হয়, নিশ্চয় সেই কোরবানির রক্ত জমিনে পতিত হওয়ার আগেই আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যায়। অতএব, তোমরা একনিষ্ঠতা ও আন্তরিক আগ্রহ নিয়ে কোরবানি আদায় কর।’ (তিরমিজি)
কোরবানির মূল উদ্দেশ্য যেহেতু নিজেদের পশুপ্রবৃত্তির কোরবানি করে মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করা, সেহেতু এই উদ্দেশ্যকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের গৌরব-মর্যাদার প্রতীক হিসেবে কোরবানিকে বিবেচনা করা উচিত নয়। বর্তমান সময়ে অনেকেই কোরবানির মাধ্যমে নিজের আর্থিক সামর্থ্য জাহির করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। প্রকৃতপে এই প্রতিযোগিতাপ্রবণ কোরবানির কোনো মূল্য নেই আল্লাহর কাছে। মহান আল্লাহ কেবল ওই কোরবানিকেই কবুল করে থাকেন, যেটা কেবলই তাঁরই প্রেম-ভালোবাসায় হয়ে থাকে। বস্তুত মানুষের স্বচ্ছ-নির্মল হৃদয়ে পশুর স্বভাব বিদ্যমান থাকে। তাতে মানুষের স্বভাবে প্রকাশ পায় হিংসা-বিদ্বেষ, গর্ব-অহঙ্কার, কপটতা, পরশ্রীকাতরতা, পরনিন্দা ইত্যাদি। মানবহৃদয়ের এ পশুত্ব মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে প্রধান বাধা। ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বিশ্বের নানা স্থানের মতো বাংলাদেশেও ব্যাপক। জনসংখ্যার বেশির ভাগ শোষণ-বঞ্চনার শিকার এবং মানবেতর জীবনযাপনই যেন তাদের নিয়তি। এই বৈষম্যের ভারে জর্জরিত সমাজের সব মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং তাদের আনন্দের অংশীদার করে নেয়ার মধ্যেই ঈদের আনন্দ ও সম্পূর্ণতা সার্থকতা পায়। এটা সত্যি যে, বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে, ধনী-গরিবের ব্যবধান ঘোচাতে না পারলে এবং সবার জন্য উন্নত জীবনযাপনের সুযোগ অবারিত না করতে পারলে সমাজে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং কাক্সিত বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে আমাদের ত্যাগ, সহমর্মিতা, ভালোবাসার আদর্শে অনুপ্রাণিত হতে হবে। বিত্তহীনদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে হবে বিত্তবানদের। ঈদুল আজহা মানুষকে সেই মহৎ আদর্শের দিকেই আহ্বান করে। তাই পশু কোরবানির পাশাপাশি নিজেদের পশুত্বকে কোরবানি দিতে হয় তাকওয়ার শাণিত ইচ্ছার মাধ্যমে। আর তখনই পশুর কোরবানি সার্থক হবে।

 

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫