ঢাকা, বুধবার,২২ নভেম্বর ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

আরাফা দিবসের রোজা ও নতুন চাঁদ প্রসঙ্গে

আশরাফ আল দীন

২৫ আগস্ট ২০১৭,শুক্রবার, ২১:০২ | আপডেট: ২৫ আগস্ট ২০১৭,শুক্রবার, ২১:১০


প্রিন্ট
আরাফা দিবসের রোজা ও নতুন চাঁদ প্রসঙ্গে

আরাফা দিবসের রোজা ও নতুন চাঁদ প্রসঙ্গে

‘ইয়াওমাল আরাফা’ বা আরাফাত দিবস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। এ দিনটিতে আল্লাহর মেহমান হয়ে আসা হাজীরা আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করেন আর বাকি পৃথিবীর প্রত্যেক মুসলিম, যারা আরাফাতের বাইরে অবস্থান করছেন তারা রোজা রাখেন নফল ইবাদত হিসেবে। আমরা বাংলাদেশীরা তাহলে কোন দিনটিতে রোজা রাখব?

ইয়াওমাল আরাফা কোন দিন? হাজীরা যে দিনটিতে মক্কার নিকটবর্তী আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করেন, সেটাই আরাফা দিবস। তারিখ হিসেবে দিনটি হলো ৯ জিলহজ। ধরে নিলাম এবার ৯ জিলহজ হলো বৃহস্পতিবার। আমরা তো তাহলে ওই বৃহস্পতিবারই রোজা রাখব। ইয়াওমাল আরাফার রোজা। যদি আমি তার পরদিন শুক্রবারে রোজা রাখি তাকে আমি ইয়াওমাল আরাফার রোজা বলি কিভাবে? যেদিন টিভির পর্দায় দেখতে পাচ্ছি হাজীরা আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করছেন সেদিনই আমরা বাংলাদেশে ‘আরাফাতের রোজা’ রাখব, নাকি এর পরদিন?

প্রতি বছরই দেখা যাচ্ছে চাঁদের হিসাবে আমরা এক দিন পিছিয়ে আছি। আমাদের দেশের ‘চাঁদ দেখা কমিটি’র গণনা (যা সরকারিভাবে গ্রহণ ও প্রচার করা হয়) প্রায়ই কারো সাথে মেলে না। বাংলাদেশের হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের চান্দ্র-গণনার সাথেও মেলে না, আবার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত লুনার ক্যালেন্ডার বা মুন-সাইটিং হিসাবের সাথেও মেলে না। তাই মেলে না বিশ্বের বেশির মুসলিম দেশের সাথে। টিভির পর্দায় স্পষ্টভাবেই দেখতে পাচ্ছি (মাত্র তিন ঘণ্টা সময়ের ব্যবধানে) হাজীরা আরাফাতে অবস্থান করছেন, কিন্তু বাংলাদেশের ‘চাঁদ দেখা কমিটি’র সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বলা হচ্ছেÑ বাংলাদেশের জন্য ওই দিনটি ৯ জিলহজ নয়, বাংলাদেশে ওই দিনটি ৮ জিলহজ। ফলে আমাদের রোজা রাখতে হবে শুক্রবার। রোজা না হয় রাখা হলো। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাবে, রোজা কি ‘ইয়াওমাল আরাফার রোজা’ হবে?

আরাফাতে (বা মক্কায়) যেদিন ‘ইয়াওমাল জুম্মা’, টিভির মাধ্যমে আমরা সরাসরি দেখতে পাই তারা জুমার নামাজ পড়ছে, সেদিনই তো আমরা বাংলাদেশেও জুমার নামাজ পড়ি। আমরা বলি না, আমরা বাংলাদেশে পরদিন বা শনিবারে জুমার নামাজ পড়ব। কারণ, স্থানিক তারতম্যের কারণে ওদের সাথে আমাদের সময়ের ব্যবধান মাত্র তিন ঘণ্টা, ১২ ঘণ্টা বা তার বেশি নয় যেমনটা আমেরিকার ক্ষেত্রে! সে ক্ষেত্রেও স্থানিক ব্যবধানের কারণে সময়ের তারতম্য হবে, কিন্তু তারিখ ও দিন হবে একই।

অর্থাৎ পুরো পৃথিবীতেই এ বছরের জন্য ৯ জিলহজ হবে বৃহস্পতিবার। এটা হতেই পারে না যে, কোথাও ৯ জিলহজ হবে বৃহস্পতিবার আর কোথাও শুক্রবার। অথচ এমনটিই হচ্ছে। একই দেশে মুসলিমরা তিন দলে ভাগ হয়ে ঈদ উদযাপন করছে : একদল বলছে ১০ জিলহজ শুক্রবার, আর একদল বলছে ১০ জিলহজ শনিবার এবং অন্য একদল বলছে ১০ জিলহজ রোববার। প্রত্যেকেই অনড় অবস্থানে। এই তিনটি দলের মধ্যে একটিই কেবল সঠিক। একসাথে বসে আলোচনা করলে সমাধান বেরিয়ে আসার কথা। এটাকে জটিল কোনো বিষয় মনে করার কোনো কারণ নেই।
যেদিন আরাফাতে বা মক্কায় ৯ জিলহজ সেদিন বাংলাদেশেও ৯ জিলহজ হওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের পর্যবেক্ষণের সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা আমাদের চর্মচক্ষুতে চাঁদ দেখতে ব্যর্থ হলেই বলছি- ‘বাংলাদেশে আজ ৯ জিলহজ নয়, বরং আজ ৮ জিলহজ। এটা কিভাবে সম্ভব! কারণ, সূর্যোদয় ও চন্দ্রোদয় দুটোই আন্তর্জাতিক নির্ঘণ্ট বা ইন্টারন্যাশনাল ক্যালেন্ডার। এর কোনোটাকেই স্থানীয় নির্ঘণ্ট বা লোকাল ক্যালেন্ডার বানিয়ে ফেলা যাবে না। কোনো নির্দিষ্ট দিন ও তারিখের সূর্য যেমন সমগ্র পৃথিবীতে একবারই ওঠে, চাঁদও তেমনি সারা পৃথিবীর জন্য কোনো চান্দ্রমাসের ঘোষণা দিতে একবারই ওঠে। সেই দিন ও তারিখটা হবে সমগ্র পৃথিবীর জন্য একই। ‘চাঁদ উঠেছে’ এই তথ্য শেয়ার করে নিশ্চিত হলেই হলো। বিভিন্ন গ্রামে চাঁদকে বারবার উঠানোর দরকার নেই। চান্দ্রমাসের চাঁদ কোন দিন-তারিখে কোথাও না কোথাও দৃষ্টিগোচর হলো কি না সে খবরই গুরুত্বপূর্ণ, পৃথিবীর সব জায়গা থেকেই ‘নতুন চাঁদ’ (কুরআনের ভাষায় ‘আহিল্যা’) দৃষ্টিগোচর হওয়া সম্ভবও নয়, গুরুত্বপূর্ণও নয়।
আমাদের দেশে একটি ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গেছে, আমাদের দেশে সব অনুষ্ঠানের প্রতিপালন হবে সৌদি আরবের এক দিন পর! তারা যেদিন রোজা শুরু করবে আমরা তার পরদিন রোজা শুরু করব, তারা যেদিন ঈদ করবে আমরা তার পরদিন ঈদ করব। এই ভ্রান্তি তৈরি হয়েছে মূলত দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা ‘চন্দ্রোদয় হলো কি না’ তা নিশ্চিত করতে ‘ভ্রান্তি’র কারণে।

একটা সময় ছিল যখন টেলিস্কোপ-বাইনোকুলার-কম্পাস-ক্যামেরা কিছুই ছিল না। এমন এক যুগ ছিল যখন সময় হিসাব করার ঘড়িও ছিল না। কিন্তু তখনো চন্দ্র-সূর্য ছিল, মানুষের সময় হিসাব করার প্রয়োজন ছিল। তখন তা করা হতো অভিজ্ঞতা, বিবেকবুদ্ধি আর অনুমানের ওপর ভিত্তি করে। মানুষ ছিল প্রকৃতির কাছে অসহায়। তাই সময়ের হিসাব করতে গিয়ে কোনো কোনো সময় ভুলও হয়ে যেত। ইসলামের অভ্যুদয় ও উন্মেষকালে অবস্থা এমনই ছিল। কোনো ঘড়ি ছিল না। সময় নির্দেশের উপায় ছিল না। এখনকার দিনের মতো ‘ঘড়ির কাঁটায় সময়’ চলত না। সময় চলত মানুষের বিবেচনা ও আন্দাজের ওপর। এর মধ্যে সমন্বিত কিছু ভুল হলেও তাকে ইসলাম উদারতা দিয়ে গ্রহণ করেছে। পরবর্তীকালে আল্লাহর দেয়া প্রজ্ঞা ব্যবহার করে মানুষ সেই সময়গুলো চুলচেরা হিসাব করে চিহ্নিত করেছে এবং তৈরি করেছে টাইমটেবিল ও ক্যালেন্ডার। অন্য দিকে ঘড়ির মাধ্যমে সময়ের হিসাব রাখা হচ্ছে প্রতি সেকেন্ড পর্যন্ত কাঁটায় কাঁটায়। আমরা এখন সেই ঘড়ি-ক্যালেন্ডার ব্যবহার করেই সেহরির শেষ সময় সম্পর্কিত ‘কুরআনে বর্ণিত আল্লাহর নির্দেশ’ প্রতিপালন করে থাকি। আমরা এখন আর নিজ চোখে আকাশ পর্যবেক্ষণের জন্য ঘরের বাইরে যাই না।

এক দিন দীর্ঘক্ষণ ধরে চতুর্দিক এত কালো মেঘে আচ্ছন্ন ছিল যে সর্বোত্তম বিবেচনায় আল্লাহর রাসূল সা: মনে করলেন সূর্য ডুবে গেছে। তিনি হজরত বেলাল রা:কে বললেন আজান দিতে। আল্লাহর রাসূল সা: সবাইকে নিয়ে ইফতার করছেন আর এর মধ্যে দেখা গেল মেঘ সরে গিয়ে সূর্য দেখা দিয়েছে। এটা ছিল মানবিক বিবেচনার ভুল। বর্তমানে ঘড়ি-ক্যালেন্ডারের কারণে এ ধরনের ভুল এড়ানো সম্ভব। তাহলে আমরা তা করব না কেন?

সালাত ও সিয়ামের জন্য আমরা যদি ঘড়ি-ক্যালেন্ডারের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে পারি, ‘নতুন চাঁদ’ উদয়ের নির্ভুল তথ্যের জন্য কেন আমরা ক্যালেন্ডারের ওপর নির্ভর করছি না বরং চর্মচক্ষুতে আকাশ পর্যবেক্ষণের কম-নির্ভরযোগ্য পন্থা অনুসরণের জন্য জেদ করছি? আল্লাহর তরফ থেকে মানুষকে দেয়া প্রজ্ঞার সঠিক ব্যবহার কি জরুরি নয়?

আসুন, বিষয়টি আরো সহজ করে বোঝার চেষ্টা করি। ‘বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই’ কবিতা পড়তে পড়তে আমরাও হয়তো ভাবি : ওই তো কাছে-পিঠেই চাঁদ। আসলে চাঁদ নামের বিশাল উপগ্রহটি আমাদের পৃথিবী নামক গ্রহ থেকে লাখ লাখ মাইল দূরে ঘোরাফেরা করছে। এই দূরত্ব কখনো বাড়ে, কখনো কমে। গড় দূরত্ব ২৩৮৮৫৫ মাইল বা ৩৮৪৪০০ কিলোমিটার। সে আল্লাহর এক শান। পৃথিবী, সূর্য ও চাঁদ বিশাল মহাশূন্যে লাখ লাখ মাইল দূরে অবস্থান করছে এবং প্রত্যেকেই নিজ অক্ষরেখায় ও আপন কক্ষপথে তীব্র বেগে চলমান। তারপরও তাদের আপেক্ষিক অবস্থানে (রিলেটিভ পজিশন) এতটুকু হেরফের নেই, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর।

কুরআন বলছে, আল্লাহ চাঁদকে সময়ের নির্ঘণ্ট হিসেবে তৈরি করে রেখে দিয়েছেন। চিরস্থায়ী ক্যালেন্ডার। কোনো হেরফের নেই। গবেষকেরা এই চান্দ্র হিসাব বা লুনার ক্যালেন্ডারের বিস্তারিত তথ্য লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। যেভাবে ক্যালকুলেট করা হয়েছে সৌর বা সোলার ক্যালেন্ডার। আমরা আজ, সারা বিশ্বে, ইন্টারনেটে বা মোবাইল ফোনে, সৌর ক্যালেন্ডারের টাইম দেখে নামাজ পড়ছি, সেহরি খাচ্ছি, রোজা রাখছি অথচ লুনার ক্যালেন্ডার দেখে চন্দ্র উদয়কে গ্রহণ করতে চাচ্ছি না। চাঁদ নিয়ে এই হিসাব নতুন কিছু নয়। চাঁদের প্রভাবেই যেহেতু পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটা হয়, সে কারণে সাগর-নদীতে চলাচলকারী জাহাজগুলো একটি বিশেষ ধরনের টাইমটেবিল (আলমানাক) ব্যবহার করে, জোয়ার-ভাটার হিসাবের জন্য।

পৃথিবীর প্রতিটি অঞ্চলের ‘নিউ মুন’ (নতুন চাঁদ) আর ‘ফুল মুনে’র (পূর্ণিমা) সময় হিসাব করে লেখা হয়ে থাকে কয়েক দশকের একসাথে। শত শত বছর আগেই মানুষ এই অভিজ্ঞান অর্জন করেছে। তাই চাঁদ উঠেছে কি না নিশ্চিত হওয়ার জন্য লুনার ক্যালেন্ডার দেখুন, মেঘলা আকাশে হয়রান হওয়ার দরকার কী? ব্যাপারটা তো এমন নয় যে, আপনি আমি দেখিনি বলে চাঁদ ওঠেনি। চোখের দেখাকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে যে কনফিউশন তৈরি হয়েছে তা হলো- গত বছর বাংলাদেশের পূর্বের দেশ অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় এবং পশ্চিমের দেশ সৌদি আরবে চাঁদ দেখার খবর পেলাম, কিন্তু বাংলাদেশের কোথাও চাঁদ দেখার খবর আমাদের ‘জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি’ দিতে পারল না এবং পরদিন বাংলাদেশের আকাশে যা দেখা গেল তা আকৃতিতে বড় চাঁদ। একে কোনোমতেই ‘প্রথম দিনের অত্যন্ত সরু ও ক্ষণস্থায়ী’ চাঁদ বলা যায় না। বুঝতে কষ্ট হয় না, আগের দিন চাঁদ উঠেছে ঠিকই, তবে আমরা দেখিনি। ফলে আমাদের পূর্ব ও পশ্চিমের দেশগুলো যে দিবসকে ১ শাওয়াল হিসেবে গ্রহণ করল আমরা তার পরের দিবসকে ১ শাওয়াল বললাম। এটা কেমন জ্ঞান যে, একই তারিখকে দুই দিবসে চিহ্নিত করা হবে? এতে আল্লাহর দেয়া ক্যালেন্ডার কি ব্যর্থ হয়ে যায় না?

ব্যাপারটা এমন, অনেক দূরের চাঁদ পৃথিবীর যেকোনো স্থান থেকে দৃশ্যমানতায় এলো আর চান্দ্রমাস শুরু হয়ে গেল। এরপর এই চান্দ্রমাসের দিবস বা তারিখ আর ওয়াক্ত বা ঘণ্টা-মিনিট ইত্যাদি ক্যালকুলেট করা হবে সৌর হিসাব মোতাবেক। চাঁদের হিসাব দিয়ে দিন-ঘণ্টা-মিনিট হিসাব করা হয় না। আসুন, আমরা বিতর্কে আটকে না থেকে চান্দ্রমাসের শুরুর তারিখকে বিশ্বব্যাপী একই দিবসে হিসাব করার মতো যৌক্তিক হই। হিসাব মোতাবেক, এ বছর ৯ জিলহজ ইয়াওমাল আরাফা হবে ৩১ আগস্ট বৃহস্পতিবার এবং ঈদুল আজহা প্রতিপালিত হবে ১ সেপ্টেম্বর ২০১৭, শুক্রবার।

লেখক : কবি, গবেষক ও শিক্ষাবিদ

(এই বিভাগের সব মতামত একান্তই লেখকের)

 

  • সর্বশেষ
  • পঠিত

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫