ঢাকা, শুক্রবার,১৫ ডিসেম্বর ২০১৭

ইসলামী দিগন্ত

কোরবানি কল্যাণকর বিধান

মাওলানা মুফতি মো: ওমর ফারুক

২৫ আগস্ট ২০১৭,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট

জিলহজ মাসের ১০ তারিখ থেকে ১২ জিলহজ সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়ে যেসব প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্ক, মুকিম ব্যক্তির কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে ওইসব সামর্থ্যবান মুসলমানের পক্ষ থেকে উট, দুম্বা, ভেড়া, ছাগল, গরু, মহিষ ইত্যাদি মহান আল্লাহ তায়ালার নামে জবাই করার আনুষ্ঠানিকতাই কোরবানি। প্রকৃত অর্থে বান্দার পক্ষ থেকে আল্লাহর নামে কোনো কিছু আত্মত্যাগ বা উৎসর্গ করাই কোরবানি, যা শরিয়তের বিধান হিসেবে ওয়াজিব।
কোরবানি শুধু ভোগবিলাস আর পেটপুরে গোশত খাওয়ার জন্য নয়, বিশাল পশু ক্রয় করে ফেসবুকে ছবি দেয়ার জন্য নয়, নিজেকে সমাজের বড় দাতা হিসেবে পরিচিত করার জন্য নয়, এলাকায় সুনাম-সুখ্যাতি অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনায় নেয়ার জন্য নয়; বরং মহান রবের হুকুমের কাছে নিজের আমিত্ব কর্তৃত্ব গর্ব-অহঙ্কার ভুলে গিয়ে জীবনের সব কিছু তাঁর রাহে ব্যয় করার মাধ্যমে মনিবের সাথে গোলামের নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলার অতি উত্তম উপকরণ মাত্র। কোরবানির মাধ্যমে প্রত্যেক মুমিন মুসলমান নতুন করে উজ্জীবিত হয়ে এই শপথ নেবে যে, সব ধরনের অন্যায়-অত্যাচার, জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে নিজের জানমাল আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দেবে এতেই তার সফলতা!
কোরবানিতে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের অনেক কল্যাণ ও উপকার নিহিত রয়েছে। ব্যক্তিপর্যায়ে যখন কোনো সফলতা আসে তখন একজন মুসলমানের করণীয় হচ্ছে যার অসীম করুণায় সফলতা পেল তাঁকে ধন্যবাদ দেয়া, কৃতজ্ঞতা আদায় করা, শুকরিয়া জ্ঞাপন করা, মহান মালিকের কুদরতি পায়ে সিজদা দেয়া এবং তাঁর নামে পরিবার পরিজনের জন্য কিছু ব্যয় করা, পাড়া-প্রতিবেশীদের জন্য, সমাজ ও দেশের জন্য কিছু উৎসর্গ করা কোরবানির উত্তম নমুনা। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে বর্ণিত হচ্ছেÑ ‘হে নবী আমি অবশ্যই আপনাকে (নিয়ামতে পরিপূর্ণ) কাওসার দান করেছি। অতএব তোমার মালিককে স্মরণ করার লক্ষ্যে তুমি নামাজ পড়ো এবং তাঁরই উদ্দেশ্যে তুমি কোরবানি করো। (সূরা কাওসার : ১-২)।
কোরবানির পশুর রক্ত-গোশত, এর আকার-আকৃতি ইত্যাদি আল্লাহ তায়ালার কোনোই প্রয়োজন নেই বরং এর সব কিছুই আমাদের জন্য। আমাদের কোনো না কোনো উপকারার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। যখন কোনো চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, প্রবাসী অথবা অন্য কোনো পেশায় নিয়োজিত নারী পুরুষ কোনো পশু কোরবানি করতে চায় কিন্তু তার পশু নেই। সে বাজার থেকে যখন পশু ক্রয় করে তখন পরোক্ষভাবে সমাজের অপরাপর পেশায় নিয়োজিত সবার প্রতি তার অবদান শুরু হয়ে যায়, যা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের অগণিত কল্যাণ বয়ে আনে। শুধু কোরবানিতেই হালাল পশু জবাই হয় না, বরং দৈনন্দিন জীবনে মানুষের জীবন ধারণের এক অসীম প্রয়োজনীয় বস্তু হচ্ছে পশুপাখি-জীবজন্তু, যার কোনো-না-কোনো অংশ আমাদের উপকারে আসছে।
অপচয় অপব্যয় ছাড়া যদি বৈধপথে মানবতার কল্যাণে পশু জবাই করা হয়, কোরবানি দেয়া হয় তা হলে নিঃসন্দেহে তা সাওয়াবের কাজ, পুণ্যের কাজ, মানবতা-মনুষ্যত্বের কাজ। যদি কোরবানি মানুষের ক্ষতির কারণ হতো তাহলে আল্লাহ এ বিধান দিতেন না। যারা কোরবানিতে পশু নিধনের দোহাই দিয়ে জাতীয় আয়ের জন্য মায়াকান্না করে, তারা নিজেরাই জাতীয় দায়! এ দেশের বোঝা! দেশ জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শত্রু। তারা মূলত মহান আল্লাহর বিধানকে উপেক্ষা করতে চায়! তারা মুসলমান নামের কলঙ্ক! নকল মুসলমান! সরকারের উচিত যারা এজাতীয় বিভ্রান্তিমূলক কথা বলে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায় তাদেরকে প্রচলিত আইনের আওতায় এনে যথাযথ শাস্তির সম্মুখীন করা!
মানুষ সৃষ্টির সেরা আশরাফুল মাখলুকাত, মহান আল্লাহ তায়ালার প্রতিনিধি হিসেবে দুনিয়াতে তার আগমন, তার সব কর্মই ইবাদত যদি তা আল্লাহর বিধান ও রাসূল সা:-এর সুন্নাহর আলোকে হয়। আর কোরবানি হচ্ছে মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইব্রাহিম আ:-এর সুন্নত, যা আল্লাহ তায়ালার কাছে খুবই পছন্দনীয় একটি আমল। কোরবানির পশু কিয়ামতের দিন তার শিং, পশম ও খুরসহ হাজির হবে। কোরবানির পশুর রক্ত মাটিতে পতিত হওয়ার আগেই আল্লাহ তায়ালার দরবারে পৌঁছে যায়। কোরবানিকৃত পশুর প্রতিটি লোমের বিনিময়ে একটি করে নেকি দেয়ার ঘোষণা রয়েছে।
কোরবানিসহ মুসলিম জাতির দৈনন্দিন সব কর্ম সম্পাদন ইবাদত-বন্দেগি মুয়ামালাত মুয়াশারাত সব কিছু মহান মালিকের দেখানো পথে হবে। পৃথিবীর প্রথম মানুষ আমাদের আদিপিতা হজরত আদম আ:-এর ছেলে হাবিল-কাবিলের বৈবাহিক সম্পর্কের বিষয়ে কাবিলের অতিরিক্ত বাড়াবাড়ির বিরোধ নিরসনের শান্তিপূর্ণ সমাধানের উপায় হিসেবে কোরবানি দেয়া হয়েছে, যা পৃথিবীর প্রথম কোরবানি। কোরবানির শ্রেষ্ঠতম স্থান হচ্ছে পবিত্র মক্কা মুকাররমার অতি সন্নিকটে মিনা, যা হজরত ইসমাইল আ:-এর স্মৃতিবিজড়িত স্থান।
লেখক : ব্যাংকার

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫