ঢাকা, শনিবার,২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭

আলোচনা

বিশ্ব সাহিত্যে নজরুল

শামসুদ্দোহা চৌধুরী

২৪ আগস্ট ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৫:০৪


প্রিন্ট

বিশ্ব সাহিত্যে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মূল্যায়ন কতটুকু? বিশ্ব সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষীর কাছে তাঁর সাহিত্যকে অনুবাদের মাধ্যমে যেভাবে পৌঁছতে পেরেছেন নজরুল কিংবা নজরুলপ্রেমীরা সেভাবে তাঁর সাহিত্যকে বিশ্ব সাহিত্য দরবারে উপস্থাপিত করতে কি পেরেছেন, সম্ভবত নয়। বিশ্ব সাহিত্যাঙ্গনে নজরুল সাহিত্য পৌঁছে দেয়ার দৈন্য কিন্তু শুধু নজরুল কিংবা নজরুলপ্রেমীদেরই নয় এ দৈন্য কিন্তু সবার আমাদেরও। এর পশ্চাতে এ উপমহাদেশের সে সময়ের প্রেক্ষাপটও কম দায়ী নয়। ব্রিটিশ উপনিবেশের নাগপাশ ছিন্ন করতে নজরুল যেখানে কবিতার এবং গানের অগ্নিঝরা লেখনী অস্ত্র নিয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন সেখানে কলকাতার জোড়াসাঁকোর প্রভাবশালী জমিদার ঠাকুর পরিবারকে ইংরেজদের সাথে প্রত্যক্ষ না হোক পরোক্ষভাবে হলেও লিয়াজোঁ করে জমিদারির বিস্তৃতি এবং টিকিয়ে রাখতে হয়েছিল। সে সময়ের কলিকাতার এলিট শ্রেণীর সাথেই ইংরেজদের দহরম মহরম এবং লন্ডনভিত্তিক ব্যবসায় বাণিজ্য ছিল সে সুবাদে কলকাতার এলিটদের লন্ডনে এবং পাশ্চাত্যে যাতায়াতের পথও অবারিত ছিল। মেধাবী রবীন্দ্রনাথ তাঁর সাহিত্য প্রতিভাকে পাশ্চাত্যে প্রচার ও প্রসার করার এই সুযোগকে কাজেও লাগিয়েছিলেন। লন্ডনের দেনস্টাইন এবং ওয়াটসনের, ইয়েটসের মতো সাহিত্যবোদ্ধাদের কাছে তাঁর সাহিত্য পৌঁছে গিয়েছিল কিন্তু তৃণমূল থেকে উঠে আসা নির্মম দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত নির্যাতিত শোষিত মানুষের প্রতিনিধি কলমযুদ্ধের সৈনিক নজরুলের পক্ষে সেখানে পৌঁছা সেই সময় কোনো ক্রমে সম্ভব ছিল না। সে সময়ে শিক্ষাদীক্ষায় অনগ্রসর মুষ্টিমেয় কোণঠাসা মুসলিমরা ব্রিটিশ আনুকুল্যবর্জিত ছিল। ধর্মীয় বিভাজনের কারণও এর জন্য অনেকাংশে দায়ী বিধায় নজরুল ছিলেন চরমভাবে অবহেলিত এমনকি জাতীয় কবি হওয়া সত্ত্বেও এখনো।

নজরুল বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম মানবতাবাদী অসাম্প্রদায়িক গণমানুষের কবি। কী ছিল না নজরুল সাহিত্যে মানবপ্রেম, শোষকের বিরুদ্ধে কথা বলা, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লেখনী, মুসলিম রেনেসাঁ স্ফুরণে, মুসলিম ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায়কে কবিতা এবং গানের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত, তুর্কিবীর কামাল পাশা থেকে শুরু করে পারস্যের ওমর খৈয়াম, হাফিজ এমনকি পারস্যের নূরজাহানকে গানের মাধ্যমে উপস্থাপন, দামামার বাজনার সাথে শির উঁচু করে নিশান নিয়ে ভাঙা কেল্লায় নিশান উড্ডয়ন, পরাধীনতার নাগপাশ থেকে জাতিকে মুক্ত করার জন্য যে নবীন তরুণ নওজোয়ানকে চল চল বাঁধভাঙা ধ্বনি তুলে সম্মুখ সমরে ঝাঁপিয়ে পড়ার অদম্য মনোবল জোগানো, জেলখানায় বসে শিকল বাজিয়ে শিকল ভাঙার গান গেয়ে পরাধীন জাতিকে উদ্বুদ্ধ করার মোহমন্ত্র, প্রেমিকার মনোরঞ্জনে যে কবি তারার ফুল প্রিয়ার খোঁপায় গুঁজে দিয়েছেন, সে কবিরই অগ্নিঝরা কলমে ‘বল বীর চির উন্নত মম শীর’ ধ্বনির মাতম তাণ্ডবে বিশ্বের কোটি কোটি নির্যাতিত নিগৃহীত মানুষ অত্যাচারীর বিরুদ্ধে এক হয়ে রুখে দাঁড়ায় এমনকি একটি জাতির বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’- এ সঙ্গীতের মাধ্যমে গোটা জাতি আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উৎসবের আঞ্জামে ব্যস্ত হয়ে ওঠে, কবিতার গাঁথুনিতে ভিন ভাষাভাষীর শব্দের অপূর্ব মূর্ছনায় শতাব্দীর বাঁক বদলকারী নতুন প্যাটার্নের কবিতা যখন কালবৈশাখী ঝড়ের মতো একটি এক্সপ্রেস ট্রেন হয়ে যায় সে কবিই তো বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম কবি, তাতে কি সন্দেহের অবকাশ আছে? পাবলো নেরুদা, খলিল জিবরান, মাহমুদ দারবিশ, চে গুয়েভেরার পথ তো সে পথই। পরাধীনতার বিরুদ্ধে নজরুলের কবিতা পৃথিবীর সেরা রাজনীতিবিদদের রাজনীতির সংগ্রামের চেয়ে কম কিসে? সম্ভবত সে সময়ের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা সারা পৃথিবীতে রচিত কবিতার মধ্যে সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী কবিতা। বিদ্রোহী কবিতার মতো এত আলোড়ন সৃষ্টিকারী কবিতা তখন রচিত হয়েছিল কি না আমার জানা নেই। অথচ বিশ্বের এমন একজন অন্যতম কবিকে যুগের চারণ কবি, বিদ্রোহী কবি আখ্যায়িত করে নজরুলকে বৃত্তাবদ্ধ করার এক সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র, এ বৃত্তাবদ্ধ সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র থেকে নজরুলকে উদ্ধার করার গবেষকের বড়ই অভাব।

ভিন্ন ভাষায় অনুবাদ সাহিত্য সাহিত্যিককে পৃথিবীর মানুষের কাছে পরিচয় করিয়ে দেয়। সেক্ষেত্রে একজন অনুবাদকের ভূমিকা নিজ নিজ দেশের সাহিত্যের ভিনদেশে প্রচার প্রসারে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দুঃখের বিষয় নজরুল একটি জাতির জাতীয় কবি হওয়া সত্ত্বেও নজরুল সাহিত্য বিদেশী ভাষায় অনুবাদের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য নয়। হাতে গোনা কয়েকজন খ্যাতিমান পণ্ডিত যে নজরুল সাহিত্যের অনুবাদ নিয়ে এগিয়ে আসেননি তাও নয়, তবে সংখ্যায় তা নিতান্তই অপ্রতুল। কথাশিল্পী আবু রুশদ ‘সিলেকটেড পয়েমস অব কাজী নজরুল ইসলাম’ নামে নজরুলের ছাব্বিশটি কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। আরো কয়েকজন খ্যাতিমান কবি সাহিত্যিক নজরুলের কবিতা অনুবাদ করেছেন তম্মধ্যে আমীর হোসেন চৌধুরী, মিজানুর রহমান, আবদুল হাকিম, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, বিনয় কুমার সরকার, সৈয়দ মুজিবুল হক অন্যতম। কিছু পণ্ডিত আবার এ কথাও উল্লেখ করেছেন নজরুল সাহিত্যে যেহেতু আরবি, ফার্সি, উর্দু, ইংরেজি শব্দ বহুল ৮ পৃষ্ঠার পর

পরিমাণে ব্যবহার হয়েছে সে কারণে নজরুল সাহিত্যের ভাবার্থ বিদেশী ভাষায় অনুবাদ করা বেশ কষ্টসাধ্য। ইংরেজি অনুবাদ ছাড়াও নজরুল সাহিত্যের স্প্যানিস ভাষায় প্রথম অনুবাদ করেন মারিয়া অ্যালেন বারবেরা। বিভিন্ন পণ্ডিতদের ধারণায় এ কথা প্রমাণিত সত্য নজরুল সাহিত্য রুশ ভাষায় সবচেয়ে বেশি অনূদিত এবং পঠিত হয়েছে। রুশ লেখক বরিস পোলিয়নিস্কি নজরুল কবিতার ব্যাখ্যা করেছেন এবং মিখাইল কুরগানাৎসিয়েভ নজরুল কবিতা রুশ ভাষায় অনুবাদ করেছেন। নজরুল সম্পর্কে রাশিয়ার পণ্ডিত কুজনসেভ লিখেছেন, ‘সোভিয়েট রাশিয়ার অনেক পাঠকই নজরুল কবিতার ভক্ত, অনেক খ্যাতিমান রুশ কবিদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় নজরুলের কবিতা রুশ জনগণের কাছে পৌঁছেছে।’ অনেক বিদেশী এও স্বীকার করেছেন রবার্ট ব্রিজেস, কিপলিং, ওয়াটসনও নজরুলের মতো ভালো কবিতা লিখতে পারেননি।

নজরুল সাহিত্য বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক উইনস্টন ই ল্যাংলি। কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে তার উল্লেখযোগ্য বই হলো ‘কাজী নজরুল ইসলাম দি ভয়েস অব পয়েট্রি অব দি স্ট্রাগল ফর হিউমেন হোলনেস’। ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মবিজ্ঞান বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফিলিস কে হারমান নজরুলবিষয়ক গবেষকদের অন্যতম। নজরুলের কবিতার চিত্রিত চারুকল্পে বহুরৈখিক সংস্কৃতির্চচা, মানবতাবাদ, প্রেম, শত বছরের কবিতার বাঁকবদল, দ্রোহ, শোষকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, উত্তরাধুনিকতা, বৈশ্বিক পরিবেশ চিন্তা, কৃষকের ভাতের অধিকার, নারীর অধিকার, তৃণমূল মানুষের মৌলিক অধিকার সর্বোপরি সবার উপরে মানুষ সত্যের অমোঘ দর্শনের যে উপাদান বিদেশী পণ্ডিতেরা পেয়েছেন তাতে বিদেশী পণ্ডিতেরা মোহিত এবং আকৃষ্ট হয়েছেন।

নজরুলকে পাশ্চাত্যে পরিচয় করে দেয়ার জন্য প্রফেসর ল্যাংলির ভূমিকা প্রশংসনীয়। আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচ্যের কবিদের কবিতা সম্পর্কিত সেমিনার সিম্পোজিয়ামে প্রফেসর ল্যাংলি নজরুল সম্পর্কে তার গবেষণার মূল্যায়ন তুলে ধরেন। বিশেষ করে নজরুল সম্পর্কে যেসব কনফারেন্স আমেরিকায় হয় সেখানে তিনি নজরুলকে নিয়ে প্রবন্ধ পাঠ করেন। ২০০২ সালে লসএঞ্জেলসে অনুষ্ঠিত অষ্টম নজরুল কনফারেন্সে প্রফেসর ল্যাংলি সর্বপ্রথম নজরুলকে নিয়ে প্রবন্ধ পাঠ করেন। তিনি তার প্রবন্ধে নজরুলকে সমসাময়িক বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। নজরুল সম্পর্কিত এ ধরনের সম্মেলন নিয়মিত না হলেও হচ্ছে। আরেকটি তথ্যে জানা যায় পরবর্তী নজরুল সম্মেলন হয়েছিল আমেরিকার কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৬ সালে। বিশ্ব মানের এই কবির সাহিত্যকে প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে বাংলাদেশের বিদেশী দূতাবাসগুলো নজরুল সম্পর্কে বিভিন্ন সেমিনার সিম্পোজিয়ামের নিয়মিত আয়োজন করে আমাদের জাতীয় কবির সাহিত্য তথা বাংলাদেশের কৃষ্টি, ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতিকে অনায়াসে তুলে ধরতে পারে। মনে রাখতে হবে বিশ্বমানের খেলা যেমন একটি ক্ষুদ্র দেশকে পৃথিবীর মাঝে তুলে ধরতে পারে, ঠিক তেমনি একজন মানবপ্রেমীর লেখা সাহিত্যকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার অর্থ হলো বাংলাদেশকে পৃথিবীর মাঝে পরিচিত করে তোলা। মুসলিম জাতিকে একতাবদ্ধ করতেও আজ বেশি প্রয়োজন নজরুলের কবিতা বেশি বেশি পাঠ করা। এ ব্যাপারে বিদেশে বাঙালিরা যে যেখানে আছেন তারা যদি স্বপ্রণোদিত হয়ে নজরুল সম্পর্কে সেমিনার করেন। তাতে নজরুলচর্চায় বিদেশী পণ্ডিতরা বেশি বেশি আগ্রহান্বিত হবে এবং নজরুলকে তাদের ভাষায় তুলে ধরবে। এ কথাটি মনে রাখতে হবে প্রকাশনা, সেমিনার যত বেশি তত বেশি নজরুল প্রচার ও প্রসার। তবে আশার কথা আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. গুলশানআরা এবং কাজী এম বেলালের নেতৃত্বে সেখানে নজরুলচর্চার জন্য গঠন করেছেন ‘নজরুল এনডাওমেন্ট ফান্ড’। এবং এ ধরনের প্রচেষ্টার সাথে জড়িত আছেন ড. জুন ম্যাকডিনেল এবং ড. ফিলিস কে হারমান।

চীনা ভাষায়ও নজরুলের কবিতা অনুবাদ হয়েছে, চীন আমাদের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক বন্ধু, দেড় সহস্রাধিক বছর আগে বহু চীনা পণ্ডিত বাংলায় এসে বাংলার সাহিত্য এবং ধর্মকে চীনে নিয়ে গেছেন সে সুবাদে বলা যায় ইতিহাসগতভাবেই চীনা পণ্ডিতরা নজরুলের কবিতার প্রতি মোহাবিষ্ট হয়েছেন নজরুলের কবিতার শক্তিমত্তার কারণে। চীনা গবেষক পাই খাই তার একক প্রচেষ্টায় নজরুলের কবিতা চীনা ভাষায় অনুবাদ করেছেন। এখনো অনেক নাম না জানা চীনা গবেষক আছেন যারা নিভৃতে নজরুল চর্চা করে যাচ্ছেন তাদের হয়তো আমরা চিনি না বা জানি না।
ইংরেজি ছাড়াও ফরাসি, ষ্প্যানিশ, চীনা, তুর্কি, রুশ, জার্মানি, জাপানি, উর্দু, হিন্দি, আরবি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। আমাদের উচিত বিশ্বমানের প্রকাশক যেমন ‘পেঙ্গুইন পাবলিকেশন্স’-এর মতো বিশ্বখ্যাত প্রকাশকের কাছে নজরুলের সাহিত্য পৌঁছে দেয়া। এ বিষয়ে বিদেশে অধ্যয়নরত আমাদের মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা যদি নজরুলচর্চায় এগিয়ে উটিৎ। এ দেশের প্রিন্টমিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। যত বেশি নজরুল, তত বেশি দেশপ্রেম।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫