ঢাকা, সোমবার,২০ নভেম্বর ২০১৭

বিবিধ

গীত ও সুরের ভিন্ন ঊর্মিমালায় নজরুল সঙ্গীত

ফাতেমাতুজ জোহরা

২৪ আগস্ট ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৪:৩১


প্রিন্ট

কাজী নজরুলের গানে বাণী ও সুরের গভীরতা ও বৈচিত্র্য প্রাণমুখর হয়ে উঠেছে রাগের প্রত্যক্ষ এবং প্রাকৃতিক সংযোগে। প্রেমের গানের মোহময় চালের সাথে ও রাগের ছোঁয়ার বিভিন্ন স্টাইলে মিলেমিশে অভূতপূর্ব ছবি আঁকে প্রকৃতি এবং জীবনের ক্যানভাসে। মিশ্র-পিলু, পিলু-মিশ্র, মাঢ় বা মান্দ, সিন্ধু, কাফি, দুর্গা, খাম্বাজ, মালবশ্রী, ভৈরবী, ভায়রোঁ, আরো কত রাগ যে তিনি কত রকমভাবে মিশিয়েছেন বিভিন্ন আধুনিক পর্যায়ের গানের সাথেও তার শেষ নেই। প্রেমের গানের মেলোডির সাথে রাগের ‘মেল’ মিশিয়ে যে বন্ধন সৃষ্টি হয়েছে, আমরা সব শ্রেণীর মানুষ তা উপভোগ করি। প্রেম বুঝে বা না বুঝেও সেই প্রেম মানবপ্রেম, স্রষ্টাপ্রেম কিংবা প্রকৃতিপ্রেম।

যেমন একটি গান-
‘দোলনচাঁপা বনে দোলে
দোল-পূর্ণিমা রাতে চাঁদের সাথে
শ্যাম পল্লবকোলে যেন দোলে রাধা
লতার দোলনাতে।’
শুধু কাব্য বা আধুনিক গানের আবহে আবদ্ধ থাকেনি। রাগের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এই গানটি অপূর্ব এক সৃষ্টি কিন্তু তাই বলে তাতে তান সরগামের কোনো অবকাশ তো নেই। ‘দোলনচাঁপা’ রাগটিও তাঁরই সৃষ্টি।
যিনি লিখেছেন-
মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী
দেব খোঁপায় তারার ফুল,
কর্ণে দোলাব তৃতীয়া তিথির
চৈতী চাঁদের দুল।’

এই কাব্যগীতি পর্যায়ের গানটিকে আধুনিক গান বলা হচ্ছে। অর্থাৎ বাণীর যে চিরন্তনতা, সমসাময়িকতা, প্রেম-অনুভূতি মানবপ্রেমের স্পষ্ট ইশারা জানিয়ে দেয়। এই আধুনিক গানটির বাঁকে বাঁকেও তিনি রাগের অর্থাৎ ‘কাফি’র সাথে কি দেখা করিয়েছেন আমাদের? এটিই তাঁর বৈশিষ্ট্য। প্রেম তা সে যেকোনো প্রেমই হোক না তিনি সেই প্রেমকে মানুষ, প্রকৃতি, রাগের সাথে মিশিয়ে এক ইন্দ্রধনু তৈরি করেছেন গানের ভেতর যেখানে সুরের সুরধুনী শুধু এক অতীন্দ্রিয় ঐশ্বরিক মায়াজাল বুনে দেয়। এই সাথে আরো কতকগুলো প্রেমের গান বা কাব্যগীতি পর্যায়ের গানের নাম উল্লেখ করছি-
১. আমার ভুবন কান পেতে রয়
২. তোমার আঁখির মত
৩. আমি চির তরে দূরে চলে যাব
৪. আকাশে আজ ছড়িয়ে দিলাম
৫. তুমি শুনিতে চেয়ো না
৬. তুমি সুন্দর তাই
৭. ঘুমাও ঘুমাও দেখিতে এসেছি
৮. গানগুলি মোর আহত
৯. এস প্রিয় মন রাঙায়ে
১০. যবে তুলসী তলায় প্রিয়
১১. বনের তাপস-কুমারী আমি গো
১২. সাঁঝের পাখিরা ফিরিল কুলায়
আরো অনেক গান। এই সব গানে তিনি যে কত রকম শব্দ ব্যবহার করেছেন। কত নতুন ধরনের প্রচলিত শব্দ। বিভিন্ন রকমের প্রেমের গানের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের শব্দাবলির ব্যবহার ঘটিয়েছেন। শুধু ফারসি, হিন্দি, উর্দুই নয়- বাংলা ভাষারই বিভিন্ন শব্দ-বাক্য তিনি বসিয়েছেন। কয়েকটি মাত্র উদাহরণ দিতে গেলে তা বোকামির প্রমাণ রাখা হবে। পাঠক, যদি কখনো তাঁর রচিত গানগুলোতে চোখ বুলিয়ে যান তবে দেখবেন শব্দ বাক্যের কী বিশাল বাহার তাঁর গানে।
প্রেমের গানগুলোর মধ্যে কাজী নজরুলের যে সব বৈশিষ্ট্যে ভরপুর, তার মধ্যে গালিব, হাফিজ, খৈয়াম, মির, ইকবাল, দাগ প্রমুখ ফারসি ও উর্দু কবিদের ছায়া পাওয়া যায়। বিভিন্ন প্রেমের গানের সাথে আবার রাগও মিশে গেছে। যেমন ভীমপলশ্রীতে:
‘বিদায় সন্ধ্যা আসিল ওই
ঘনায় নয়নে অন্ধকার।
হে প্রিয় আমার যাত্রাপথ
অশ্রুপিছল করো না আর॥

যদি স্রষ্টাপ্রেমের কথায় আসি:
ভক্তিপ্রেমের রসে- খাম্বাজ রাগে

পেয়ে কেন নাহি পাই
হৃদয়ে মম হে চিরসুদূর প্রিয়তম।
তুমি আকাশের চাঁদ
আমি সরসী পাতিয়া ফাঁদ
জনম জনম কাঁদি কুমুদিনী সম॥
টপ্পা অঙ্গের গানটিতে রাগ ও অলঙ্কারে এর বাণীর গভীরতা প্রমাণ করে। আর মেলোডি তো কথাই নেই। ভক্তিগীতিতেও প্রেমের সুরের সুরধ্বনী।
তার গজলও প্রেমের বা বিরহের ভাব বোঝাতে কম যায় না। কাজী নজরুলকে বাংলা গজল গানের প্রবর্তক বলা হয়। একইভাবে তিনি আধুনিক গানের অর্থাৎ এসবের বাংলা ফর্মের প্রবর্তক। ভক্তিগীতি, পল্লী বা লোক, ইসলামি, নাতিয়া গজল, হামদ-ই-বারিতা’লা, দেশ গান, এমনকি তাঁর হিন্দি গানগুলোতেও তিনি প্রেমের ঝরনাধারা বইয়েছেন। আসলে এই সব গানকে আলাদা করে বর্ণনা করা কঠিন।

যেমন একটি গান :
মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর নমো নমো
শ্রাবণ-মেঘে নাচে নটোবর রমঝম ঝমঝম ঝমরম।
আরেকটি গান-
পরদেশি বঁধু ঘুম ভাঙায়ো চুমি আঁখি
এই জটিল বিষয়টি একমাত্র গাইবার সময়ই শ্রোতাকে বোঝানো যেতে পারে ততখানি বলে সম্ভব না। যেমন তাঁর স্বকণ্ঠে গীত ওই গানখানি,
দিতে এলে ফুল হে প্রিয় কে আজি সমাধিতে মোর
এতদিনে কি আমারে পড়িল মনে মনচোর।
‘যোগিয়া’য় মেশানো এই গজল গানটি তাঁর একটি অনবদ্য সৃষ্টি। এই ধরনের জটিল কাজ করেছেন কাজী নজরুল ইসলাম। যদি ইসলামি অর্থাৎ খোদাপ্রেমের গানে আসি, দেখা যাবে অজস্র সংখ্যক গান, যেখানে খোদাভক্তি একেবারে চূড়ান্তপর্যায়ের প্রেমের রসধারায় ভেসে যাচ্ছে।

কয়েকটি গানের উদাহরণ দিই:
১. হে নামাজী আমার ঘরে
২. আল্লাতে যার পূর্ণ ঈমান
৩. বহিছে সাহারায় শোকেরই লু-হাওয়ায়
৪. খোদা এই গরিবের শোনো মোনাজাত
৫. হেরা হতে হেলেদুলে
৬. যে দিন রোজ হাশরে
৭. নামাজ রোজা হজ যাকাতে
৮. মোহাম্মদের নাম জপেছিলি
৯. মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই
১০. মোহাম্মদ মোর নয়নমণি
এত সংখ্যক ইসলামি গান আর কোনো কবি রচনা করেননি, সেখানে খোদা এবং রসূল (স.) এর প্রতি অন্ধপ্রেমের সুরধুনীতে ভরে আছে আমাদের মনোরাজ্য।
আবার শ্যামাতে আসতেই হয় সেই কথা বলতে গেলে। এত অধিকসংখ্যক শ্যামা আর কোনো গীতিকার লেখেননি। কী অপূর্ব সেই বাণী সুর। শ্যামাপ্রেমের জোয়ার ছাপিয়ে দেয় চোখ আর মনের দুকূলকে যেন। কয়েকটি গানের কথা একটু মনে করি এই প্রসঙ্গে।
১. শ্যামা নামের লাগল ওরে
২. কে পরালে মুণ্ডু-মালা
৩. শ্মশানে জাগিছে শ্যামা
৪. মাগো চিন্ময়ী রূপ ধরে আয়
৫. মহাকালের কোলে এসে
৬. আয় মা উমা দেখব এবার
৭. সৃজন-ছন্দে আনন্দে
৮. দেখে যারে রুদ্রাণী মা

আরো বহু শ্যামাপ্রেমের গান রচনা করেছেন কাজী নজরুল। একজন মুসলমান কবি হয়েও তিনি শ্যামাকে ধারণ করেছিলেন পরমতসহিষ্ণু দৃষ্টি। এই পারঙ্গমতা কার থাকে? বিদ্রোহের প্রেম, প্রতিবাদের প্রেম, যুদ্ধের প্রেম তাঁর জীবনকে অস্থির করে রেখেছিল ২২-৩০ বছর পর্যন্ত মন্দ-ভালো চড়াই-উতরাই পেরিয়ে যিনি বারবার প্রেমের বাণী ছড়িয়েছেন মানুষের মধ্যে। যেখানে গিয়ে তিনি বারবারই হয়ে উঠেছিলেন দুর্বোধ্য এক মানব। যিনি সীমার মাঝে অসীমকে চিনে নিয়ে আবার সীমায় গ্রন্থিত করতে চেয়েছিলেন। যিনি ভ্রাতৃত্বের মন্ত্রে নিখিল মানবকে এক স্বর্গীয় রাজ্য-দর্শন লাভে দীক্ষিত করতে চেয়েছেন, তিনিই হয়েছেন যেন এক অভেদ্য। যে কবি জীবনে শুধু প্রেমেই ভরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন আত্মা ও সমাজকে সেই তিনিই হয়েছেন সমাজের কাছে অপাঙ্ক্তেয়।
কাজী নজরুল ইসলাম ইরানের কবি হাফিজ এবং ওমর খৈয়ামের রুবাইয়াতগুলোর মাঝে হয়তো নিজের জীবনের দুঃখব্যথা দর্শনের মিল খুঁজে পেয়েছিলেন বলেই বাংলা ভাষায়ও সেগুলো অনুবাদ করে আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন, সমাজজীবনে যে ভুল ধারণার শিকার হওয়ার যন্ত্রণা কী। তিনি যে অনুবাদ করেছিলেন তা অনবদ্য। সেই অনুবাদগুলো থেকে আমরা অন্য ভাষার কবির লেখনীর মর্মও বুঝতে পারি।

এই অনুবাদগুলো তিনি প্রেম দিয়েই সম্পৃক্ত করতে পেরেছিলেন, চেয়েছিলেন ইরান, পারস্য ও বাংলাকে। তাই তো তার দান সেই বিশাল অজানাকে জেনে নেয়ার। ভোগবিলাসী, নাস্তিকতার সব কিছুর ঊর্ধ্বে গিয়ে বিশ্বাস করেছেন এক আল্লাহ এবং প্রেরিত রসূল (স.) কে। তিনি প্রেম দিয়েই সেই দর্শনকে একটি স্থানে অভিষিক্ত করেছেন। মজার এবং লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই যে এতগুলো অনুবাদ তাঁর। সেগুলো থেকে অনেক শব্দ, অর্থ, উদাহরণ অনেক কিছুই তিনি নিয়েছেন। কিন্তু হুবহু একই বাক্য তিনি তাঁর কোনো গজল বা অন্য কোনো গানে ব্যবহার করেননি। শুধু উপমা, চিত্রকল্প নিয়েই গানের দৃশ্যকল্প তৈরি করেছেন। যা সত্যিই বিস্মিত করে দেয়। আর বহু অনুপ্রাসের খেলা বাংলা গানে আর কেউ কখনো ব্যবহার করেননি। সেসব কারণে তাঁর সঙ্গীত হয়ে উঠেছে ভিন্ন স্বাদের, ভিন্ন স্রোতের।

তাঁর যত গান তাঁর সজ্ঞান অবস্থার রেকর্ড হয়েছিল সেসব গানে যন্ত্রানুষঙ্গের ব্যাপারটিও তাই অনেকখানি প্রাসঙ্গিক ও পরিমিত ছিল। তাতে তাঁর সঙ্গীতের আধুনিকায়ন প্রমাণ করে। বর্তমানে সেই সুযোগ আরো পরিবর্ধিত হয়েছে। কারণ তার সঙ্গীতায়োজনে কোনো কুলীনতা রক্ষণশীলতা ছিল না। তিনি যেমন আধুনিক মানসিকতার মানুষ ছিলেন তেমনি তাঁর সঙ্গীত এবং তাঁর সঙ্গীতায়োজনেও। গায়কীতে তিনি পরিমিতির কথা লক্ষ করতে বিশেষভাবে খেয়াল করিয়েছেন। অপরিমিত গায়কী শুনে ভীষণ আহত হতেন। যদিও তাঁর সবকিছু ওভাবে গোছানো আমাদের কাছে আসেনি। প্রচুর কষ্ট স্বীকার করে আমাদের কয়েকজন শ্রদ্ধেয় অগ্রজ এগুলো আমাদেরই হাতে পৌঁছে দিয়েছেন। তাই আমরা যারা নজরুলকে ভালোবাসি তাদের জীবন ধন্য ওগুলো গুছিয়ে হাতে পেয়ে। তাঁদের ঋণ তো আমরা কোনো দিনও শোধ করতে পারব না। তবে আমাদের বিরাট দায়িত্ব থেকে যাবে ‘পরিমিত’ শব্দটি বুঝে থাকার। না হলে নজরুলকে ভালোবাসি ভালোবাসি বলে নজরুলকেই অপমানিত অবহেলা করা হবে। যিনি ঢেলে দিয়েছেন তাঁর জীবনবোধের সম্পূর্ণ সুরসুধা, রসধারায় চমকিত করেছেন জলপ্রপাতের মতন। যার নিজের জীবনধারাই ছিল মানবের জন্য, কল্যাণের জন্য, প্রেমের জন্য। যিনি হিসাব কষতে জানতেন না। অসম্ভব অবিস্মরণীয় এক সৃষ্টিশীল মানুষ। তাঁর আয়ুষ্কালের বিন্দুমাত্রও যিনি নিজের বা ‘আমি’র করে কিছু বোঝেননি। আজ তাঁরই চর্চা করতে গিয়ে আমরা অপরিমিত অথবা হিসাব কষার কে? বিচারের বল্গা ধরার কে?

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫