ঢাকা, শুক্রবার,২৪ নভেম্বর ২০১৭

প্রকৃতি ও পরিবেশ

ভারতের ড্যাম ব্যারাজে শত শত নদীর মৃত্যুতেই ভয়াবহ বন্যা

মেহেদী হাসান

২৩ আগস্ট ২০১৭,বুধবার, ০৭:০১


প্রিন্ট
ভয়াবহ বন্যা

ভয়াবহ বন্যা

স্বাধীনতার পর দেশে নৌপথের পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার কিলোমিটার। বর্তমানে বর্ষা মওসুমে ছয় হাজার কিলোমিটার এবং শুকনো মওসুমে মাত্র দুই হাজার ৪০০ কিলোমিটারে এসে দাঁড়িয়েছে। কোথায় হারিয়ে গেল এই দীর্ঘ নৌপথ, ছোটবড় অগণিত নদী, খাল, বিল হাওর আর জলাশয়?

উত্তরটা শোনা যাক ভারতের বিহার রাজ্যের তিনবার নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারের কাছে। নীতিশ কুমার গত বছর ২৩ আগস্ট ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে দেখা করে ফারাক্কা বাঁধ তুলে দেয়ার দাবি জানান। ফারাক্কা বাঁধের কারণে গঙ্গায় বিপুল পলি জমছে। আর এ কারণে প্রতি বছর বন্যায় ভাসছে বিহার। নীতিশ কুমার বলেন, এর একটা স্থায়ী সমাধান হলো ফারাক্কা বাঁধ তুলে দেয়া। তিনি বলেন, আগে পলিমাটি নদীর প্রবাহে ভেসে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ত। কিন্তু ফারাক্কার কারণে এখন সে পলিমাটি নদীর বুকে জমা হয়ে ভরাট উপর্যুপরি বন্যা হচ্ছে। এ বন্যা থেকে পরিত্রাণের একটা উপায় ফারাক্কা বাঁধ তুলে দেয়া। 


নীতিশ কুমার বিহার সরকারের পক্ষ থেকে একটি তালিকা তুলে দেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে যেখানে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের আগে ও পরে বিহারে গঙ্গার গভীরতা কতটা কমেছে তার হিসাব তুলে ধরা হয়েছে।


ফারাক্কার কারণে বিহারের ৭৪ ভাগ এলাকা বর্তমানে বন্যাপ্রবণ। প্রতি বছর বন্যায় ভাসছে বিহার। ১৯৫২ সালে বিহারে মাত্র ৬০ কিলোমিটার বাঁধ ছিল। বর্তমানে তা তিন হাজার ৭০০ কিলোমিটারের বেশি। এসব ব্যারাজ ও ড্যামই বিহারে বন্যার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।


বাংলাদেশের অবস্থা বিহারের চেয়ে আরো করুণ, মর্মান্তিক। কারণ বিহার পরিণতি ভোগ করছে এক ফারাক্কার। আর বাংলাদেশে পরিণতি ভোগ করছে গঙ্গা, তিস্তা, ব্রক্ষ্মপুত্রসহ ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশকারী নদীর ওপর ভারত কর্তৃক নির্মিত সাড়ে ৪০০ ড্যাম, ব্যারাজসহ অগণিত প্রকল্প যার মাধ্যমে নদী থেকে পানি সরিয়ে নিচ্ছে ভারত। এর ফলে মরে গেছে, বিলুপ্ত হয়েছে বাংলাদেশের অগণিত নদী, খাল আর জলাশয়। বর্ষা মওসুমে বন্যায় ডোবা আর শুকনো মওসুমে তীব্র খরাসহ নানা ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলা করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। হারিয়ে গেছে জীববৈচিত্র্য আর নদীকেন্দ্রিক জীবন ধারা। বদলে গেছে পরিবেশ। সবমিলিয়ে অস্তিত্ব সঙ্কটের মুখোমুখি বাংলাদেশ। অনেকের আশঙ্কা এভাবে চলতে থাকলে কালের পরিক্রমায় একদিন হয়তো মরুভূমিতে পরিণত হতে পারে গোটা বাংলাদেশ। 


বাংলাদেশে এমন ৫৪টি নদী রয়েছে, যা ভারত থেকে এ দেশে প্রবেশ করেছে। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী এর মধ্যে ৪৩টি নদীতে ভারত তার অংশে সাড়ে ৪০০ ড্যাম, ব্যারাজ নির্মাণ করে পানি সরিয়ে নিচ্ছে এবং নিয়ন্ত্রণ করছে। ৪৩টি নদী ছাড়া বাকি নদীগুলোতে ড্যাম, ব্যারাজ নির্মাণ না করলেও নানাভাবে সেসব নদী থেকে ভারত পানি সরিয়ে নিচ্ছে। বাস্তবে ভারত বাংলাদেশে প্রবেশকারী সবগুলো অভিন্ন নদী থেকে পানি সরিয়ে নিচ্ছে। ড্যাম, ব্যারাজ নির্মাণ ছাড়াও ফেনী নদীর পানি সরিয়ে নেয়া এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। 


বাংলাদেশে প্রবেশকারী সব বড় বড় নদীতে ভারত তার অংশে পানি সরিয়ে নেয়া এবং নিয়ন্ত্রণের কারণে শুকনো মওসুমে পর্যাপ্ত পানি পায় না এসব নদী ও তার সাথে যুক্ত শাখা নদী, খাল ও অন্যান্য জলাশয়। অনেক নদী ও খাল পানিশূন্য হয়ে পড়ে। কালের পরিক্রমায় এভাবে পলি জমে ও পানির অভাবে বিলুপ্ত হয়েছে অনেক নদী, খাল ও জলাশয়। অনেকগুলো নাম মাত্র টিকে আছে। গভীরতা ও প্রবাহ। কিন্তু বর্ষা মওসুমে চীন ও ভারত হয়ে নেমে আসা এসব নদীতে যখন অতিরিক্ত পানি প্রবাহিত হয় তখন ভারত সব বাঁধের সব গেট খুলে দেয়। কিন্তু এসব বাঁধের প্রভাবে বাংলাদেশের মরা নদীগুলো বিপুল পানি ধারণ করতে পারে না। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে অভাবিত বন্যা।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুগোল ও পরিবেশ বিভাগের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবদুর রব বলেন, বাংলাদেশে যে ৫৪টি নদী চীন, নেপাল, ভুটান ও ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে তার ৯৩ ভাগ অংশ পড়েছে ওইসব দেশে। বাংলাদেশে পড়েছে মাত্র সাত ভাগ। হিমালয় পর্বতমালা থেকে নেমে আসা গঙ্গা, ব্রক্ষ্মপুত্র, তিস্তাসহ অন্যান্য নদীর হাজার হাজার মাইল বিস্তীর্ণ অববাহিকাজুড়ে যদি একসাথে অতিবৃষ্টিপাতের ঘটনা ঘটে তখন এ বিপুল পানি একসাথে বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং মেঘনায় গিয়ে একত্রে মিলিত হয়। এই বিপুল পানি তখন দ্রুত বঙ্গোপসাগরে বয়ে যেতে পারে না। এ অবস্থায় একই সময় যদি বাংলাদেশেও ভারী বৃষ্টিপাত হয় এবং সাগরে ভরাকাটাল বিরাজ করে তখন পানি সাগরে যেতে পারে না বরং ফুলে ওঠে। এবার ব্রক্ষ্মপুত্র, গঙ্গা ও তিস্তার বিস্তীর্ণ অববাহিকা তথা চীন ও ভারতে প্রায় একইসাথে ভারী বৃষ্টিপাতের ঘটনা ঘটেছে। ফলে এ বিপুল পানি নেমে এসেছে বাংলাদেশে। এটি বন্যার অন্যতম একটি কারণ। 


প্রফেসর রব বলেন, চীন ও ভারত থেকে বাংলাদেশে নেমে আসা প্রধান প্রধান সব নদী অববাহিকায় একত্রে বিপুল বৃষ্টিপাতের ঘটনা ঘটলেও বন্যা বাংলাদেশে এতটা প্রকট আকার ধারণ করত না যদি বাংলাদেশের প্রধান প্রধান নদী আগের মতো খরস্রোতা থাকত। কিন্তু ভারতে এসব নদীতে বহু ড্যাম ও ব্যারাজ নির্মাণ করায় বাংলাদেশের নদীগুলো ভরাট হয়ে গেছে। ফলে কোনো একটি বড় নদী যেমন গঙ্গা অববাহিকায়ও যদি ভারতীয় অংশে অতিবৃষ্টি এবং বেশি পানি প্রবাহের ঘটনা ঘটে তাহলে আমাদের পদ্মা বর্ষা মওসুমে তা ধারণ ও দ্রুত সাগরে অপসারণ করতে পারে না। ফলে আঞ্চলিক বন্যা দেখা দেয়। একই ঘটনা ঘটে তিস্তা ও ব্রক্ষ্মপুত্র অববাহিকার ক্ষেত্রে। তার ওপর যদি সব নদী অববাহিকায় একসাথে অধিক পানি প্রবাহের ঘটনা ঘটে তাহলে বন্যা অবধারিত হয়ে যায়। 


প্রফেসর রব বলেন, ভারত হয়ে যেসব নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে সেসব নদীতে ভারত কর্তৃক ফারক্কাসহ বিশাল বিশাল বাঁধ ও ড্যাম নির্মাণের আগে প্রতি বছর ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন টন পলিমাটি বঙ্গোপসাগরে জমা হতো। চীন ও ভারত থেকে নেমে আসা এসব নদীর বিস্তীর্ণ অববাহিকা থেকে এসব পলিমাটি বয়ে আনত। কিন্তু বাঁধ ও ড্যাম নির্মাণের ফলে এখন বছরে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন টন পলিমাটি জমা হচ্ছে। বাকি পলিমাটি নদীতে জমা হয়ে ভরাট হয়ে যাচ্ছে প্রবাহ না থাকার কারণে।


ষাটের দশকেও বাংলাদেশে সাত শতাধিক নদী থাকার তথ্য পাওয়া যায়। বর্তমানে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তালিকা অনুযায়ী নদীর সংখ্যা ৪০৫টি। বাস্তবে এ সংখ্যা আরো অনেক কম। নদী গবেষকদের মতে সারা বছর কম বেশি পানি থাকে এ রকম নদী একশ’র কিছু বেশি নয় বলে মনে করেন অনেকে। খাতা কলমে অনেক নদী আছে বটে তবে তাকে আর কোনো অবস্থাতেই নদী বলা যায় না। ভারতের পানি আগ্রাসনের ফলে গত ৫০ বছরে বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে গেছে কয়েকশ নদী। কোনো কোনো প্রতিবেদনে বলা হয়েছে এ সংখ্যা প্রায় ৫০০। এ ছাড়া হারিয়ে গেছে অগণিত ছোট বড় খাল। শুকনো মওসুমে এর সাথে যুক্ত কমপক্ষে ৮৫টি নদী পানিশূন্য হয়ে পড়ে।


এ ছাড়া তিস্তা নদীতে গজলডোবা বাঁধসহ আরো বিভিন্ন প্রকল্পের কারণে বিলুপ্ত হয়ে হয়ে গেছে অনেক নদী-খাল। বিলুপ্তির পথে লালমনিরহাটসহ গোটা উত্তরাঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত অনেক নদী ও খাল। এ ছাড়া লালমনিরহাটসহ গোটা উত্তরাঞ্চলে ৩৫টি নদীসহ অনেক খাল-বিল বিলুপ্তির পথে। 
ফারাক্কা ব্যারাজের উজানে গঙ্গা নদীতে আরো ৩০টি ড্যাম, ব্যারাজ রয়েছে, যার মাধ্যমে ভারত নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও পানি সরিয়ে নিচ্ছে আরো ১৫টি ড্যাম, ব্যারাজ নির্মাণের আইন পাস করা হয়েছে ভারতের লোকসভায়। অপর দিকে তিস্তা নদীতে ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের উজানে শুধু সিকিমেই রয়েছে আটটি ড্যাম। এ নদীতে আরো ৩০টি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে পানি সরিয়ে নেয়া ও নিয়ন্ত্রণ করা হবে। সুতরাং ভবিষ্যতে পদ্মা ও তিস্তাসহ বিভিন্ন নদী বিলুপ্তির তালিকায় চলে যেতে পারে যদি এর কোনো প্রতিকার না করা যায়। 


ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের আগে ভারতের গঙ্গা অংশ দিয়ে বাংলাদেশের পদ্মায় গড়ে প্রতি সেকেন্ডে ৭০ হাজার কিউবিক ফিট পানি প্রবেশ করত শুকনো মওসুমে। আর ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর পর বাংলাদেশে ১০ হাজার কিউসেকেরও কম পানি প্রবেশ করার রেকর্ড রয়েছে। স্বাধীনতার আগে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে এক লাখ কিউকেস পানি প্রবাহের রেকর্ড রয়েছে। আর ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধ চালুর পরপরই এখানে পানি প্রবাহ ৫০ হাজার কিউসেকে নেমে আসে। আর বর্তমানে শুকনো মওসুমে এ ব্রিজের নিচ দিয়ে গাড়ি চলে। চলে চাষাবাদ।


গত বছর ভারতের সংসদে পাস করা হয় ওয়াটার ওয়ে অ্যাক্ট যার আওতায় গঙ্গায় ফারাক্কার উজানে আরো ১৬টি ড্যাম, ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এতে তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েছে বিহার রাজ্য সরকার। কিন্তু বাংলাদেশে এ নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।

 
তিস্তা নদীতে প্রতি মার্চ-এপ্রিল মাসে শুকনো মওসুমে প্রতি সেকেন্ডে ৫ হাজার ৮৭৭ কিউবিক ফুট পানি প্রবাহের রেকর্ড রয়েছে। অথচ ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের মাধ্যমে পানি সরিয়ে নেয়ার কারণে ২০১৫ সালের ১১ মার্চ এ নদীতে মাত্র ৩৫০ কিউসেক পানি প্রবাহিত হয়েছে। এ বছরই ফেব্রুয়ারি মাসে এ নদীতে মাত্র ২৫০ কিউসেক পানি প্রবাহের খবর বের হয়। গজলডোবা ব্যারাজের কারণে অকার্যকর হয়ে গেছে বাংলাদেশের তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প যার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল জমিতে পানি সেচ। ফারাক্কার কারণে প্রায় অকার্যকর হয়ে গেছে কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প।
অপর দিকে বাংলাদেশের সবচেয়ে খরস্রোতা নদী ব্রক্ষ্মপুত্রের উজানে ভারত অরুণাচল ও আসামে অনেক ড্যাম নির্মাণ করেছে। এ ছাড়া ২০১৪ সালে চীন ব্রক্ষ্মপুত্র নদীর ওপর চালু করে সে দেশের অন্যতম বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প জাংমু ড্যাম। বৃহৎ এ প্রকল্প শুরু হয় ২০০৯ সালে। প্রকল্পের অধীনে আরো কিছু ড্যাম নির্মাণের কথা রয়েছে এবং তা শেষ হতে চার বছর লাগবে। এ প্রকল্প নিয়ে ভারত ও চীনের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে। চীনের এ প্রকল্প শুরুর সময় বিশেষজ্ঞেরা এর নি¤œ অববাহিকায় বন্যাসহ বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, দিনাজপুরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ১৯টি নদীর একটিতেও পানিপ্রবাহ নেই।


মানচিত্র থেকে মুছে যাচ্ছে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান নদী করতোয়া। তিস্তা ছাড়াও মহানন্দা, করতোয়া, আত্রাই ও ধরলা নদীর উজানেও বাঁধ দিয়ে পানি সরিয়ে নিচ্ছে ভারত। ফলে পুনর্ভবা, টাঙ্গন, চাওয়াই, নাগর, চিলফা, টেপা, ডাহুক, ভেরসা, পাথরাজ, তিরনাই, সিনুয়া, হাতুড়ির অস্তিত্ব বিলুপ্তির পথে। 


তিস্তা নদীতে ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের কারণে শুকনো মওসুমে বাংলাদেশে মাত্র ৩৫০ কিউসেক পানি প্রবাহিত হলেও বর্ষাকালে পানির চাপ সামলাতে না পেরে ভারত খুলে দেয় সব ক’টি গেট। কিন্তু বাঁধের প্রভাবে মরে যাওয়া তিস্তা ও তার সব শাখা নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় ধারণ করতে পারে না বিপুল এ পানি। ফলে দেখা দেয় বন্যা। 
ভারতের পানি আগ্রাসনের ফলে নদী-খাল ছাড়াও অসংখ্য বিল-হাওর-বাঁওড় আর জলাশয় অস্তিত্ব সঙ্কটে ভুগছে। 


এ দিকে বাংলাদেশের সবচেয়ে খরস্রোতা নদী ব্রহ্মপুত্র চীনের তিব্বত থেকে উৎপত্তি হয়ে ভারতের অরুনাচল ও আসাম হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এ নদীর ওপর ভারত তার অংশে অর্ধডজনের মতো ড্যাম নির্মাণ করে পানি নিয়ন্ত্রণ করছে। চীন ও ভারত উভয় দেশ তার অংশে এ নদীতে ড্যামসহ নানা প্রকল্প গ্রহণ করায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ। 
সিলেটের একটি স্থানীয় পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ভারত থেকে ১২টি নদী নেমে এসেছে বাংলাদেশের সিলেট বিভাগে। অভিন্ন এসব নদীর মধ্যে সারি, মনু, পিয়াইন, ধনু, খোয়াই ও ধলাই (দু’টি পৃথক নদী) নামের নদীগুলোর উজানে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে রেখেছে ভারত। 


সিলেটের সব নদীই সুরমা ও কুশিয়ারায় মিলিত হয়েছে। তবে বেশির ভাগ নদীই বর্তমানে অস্তিত্ব সঙ্কটে রয়েছে। বিশেষ করে সিলেটের সুরমা, কুশিয়ারা, খোয়াই, মনু, দাড়াইন, কালনী, পিয়াইন, সারি, গোয়াইন, সোনাই, ধলাই, জুড়ি, সুতাং নদীর নাব্যতা হারিয়ে অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে। 
আমাদের বেড়া সংবাদদাতা শফিউল আযমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পদ্মা সংযুক্ত প্রধান প্রধান শাখা-প্রশাখাসহ অন্তত ৮৫টি নদী প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। পদ্মায় পর্যাপ্ত পানি না থাকায় এর প্রধান শাখা নদী বড়াল, আত্রাই ও গড়াই প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। কুষ্টিয়ার কয়ায় গড়াই নদীর ওপর নির্মিত গড়াই রেল ও রুমি ব্রিজের নিচে ধু ধু বালুচর। জিকে প্রজেক্ট কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। পদ্মা, মধুমতি, নবগঙ্গা, কাজলা, মাথাবাঙ্গা, গড়াই, আত্রাই, চিকনাই, হিনসা, কুমার, সাগরখালি, কপোতাক্ষ, চন্দনাসহ পদ্মার ৮৫টি শাখা-প্রশাখা নদীর বুকে জেগে উঠেছে ছোট-বড় অসংখ্য চর। কোনো কোনো স্থানে বালু স্থায়ী মৃত্তিকায় রূপ নেয়ায় সেসব স্থানে ফসল আবাদ করেছেন অনেকেই। 
পদ্মা সংযুক্ত বরেন্দ্র অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত মহানন্দা, আত্রাই, বারনই, শিব, রানী ও ছোট যমুনাসহ ১২টি নদী ও ২০টি খালে এর প্রভাব পড়েছে। এসব নদী-খাল পলি ও বালু জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় এখন মৃতপ্রায়। গাঙ্গেয় পানি ব্যবস্থায় দুই শতাধিক প্রজাতির মিঠাপানির মাছ ও ১৮ প্রজাতির চিংড়ি ছিল। সেগুলোর অধিকাংশই এখন বিলুপ্তির পথে। পদ্মা নদীতে পানিস্বল্পতার কারণে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে মরুকরণ অবস্থা স্থায়ী রূপ নিতে যাচ্ছে। জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পতিত হয়েছে অনেক আগেই।


পাবনার মধ্য দিয়ে পদ্মার আরেকটি শাখা নদী মরা পদ্মা হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে মূল পদ্মা, গড়াই এবং পাবনার চাটমোহরের বড়াল, ছোট যমুনা, পুনর্ভবা, আত্রাই, ইছামতি, গুমানী, গোমতী, ভদ্রবতী, গোহালা, নন্দকুজা, গাড়াদহ, কাকন, কাকেশ্বরী, সরস্বতী, মুক্তাহার ঝবঝবিয়া, ফুলজোর এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, এসব নদীর অস্তিত্ব হারিয়ে যাচ্ছে। 


ভারতের ড্যাম ব্যারাজের কারণে মরে যাওয়া অনেক নদী-খাল পরে দখল করে নিয়েছে এ দেশের দখলদারেরা। এ ছাড়া রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে বিভিন্ন শহরের আশপাশের অসংখ্য নদী-খাল জলাশয় নগরায়নের নির্মম শিকার হয়েছে। দখলদারেরা অনেক নদী-খাল, জলাশয় দখল করে গড়ে তুলেছে আবাসিক এলাকাসহ বহুতল ভবন, রাস্তাসহ নানা প্রকল্প। ফলে সামান্য বৃষ্টিতে এখন রাজধানীসহ বিভিন্ন নগরে জলাবদ্ধতা বন্যার রূপ নেয়। বাংলাদেশে এখন অনেক নদী খাল রয়েছে যেগুলোতে শুধু বর্ষাকালে পানি জমে। শীতকালে থাকে না। বর্ষাকালে পানি জমলেও তাতে প্রবাহ থাকে না। শীতকালে এসব নদীর বুকে চাষাবাদ চলে। আবার অনেক নদী-খাল আছে যাতে সব সময়ই কিছু পানি থাকে। দেশের অভ্যন্তরে স্লুইচগেটসহ নানা প্রকল্পের কারণে এতে নেই পানির প্রবাহ। ফলে এগুলো পরিণত হয়েছে বদ্ধ দূষিত জলাশয়ে। আবার কিছু নদী-খাল আছে যা ভরাট ভরাট হতে হতে স্থলভাগের সাথে মিশে গেছে। মানুষ শুধু জানে এখানে এক নদী ছিল একসময়। নদীমাতৃক বাংলাদেশ থেকে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে নদী-খাল-বিল-পুকুর। এর পরিণতি নির্মম পরিস্থিতি ডেকে আনবে বলে মনে করেন অনেকে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫