ঢাকা, রবিবার,১৯ নভেম্বর ২০১৭

রকমারি

ঢাকায় এত যানজট কেন?

মাহমুদুল হাসান

২১ আগস্ট ২০১৭,সোমবার, ১৯:৫৫


প্রিন্ট
ঢাকায় এত যানজট কেন?

ঢাকায় এত যানজট কেন?

ঢাকায় দিন যত যাচ্ছে, সড়কে বাড়ছে গাড়ির সংখ্যা। কিন্তু এত বছরেও ঢাকায় একটি কার্যকর ট্রাফিকব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ঘর থেকে বের হলেই নগরবাসীর নিত্যসঙ্গী হচ্ছে যানজট। মহাদুর্ভোগে পড়ছেন ঢাকাবাসী। যদিও এখন নগরবাসী এটি নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়েছেন। ঢাকার যানজট নিয়ে লিখেছেন মাহমুদুল হাসান

উন্নত দেশগুলোতেও যানজট আছে; কিন্তু সেখানকার জনগণ আইন মেনে চলে। সেখানে সিগন্যাল বাতি যে নির্দেশনা দেবে, সে অনুযায়ী চালক গাড়ি চালান। আর আমাদের রাজধানীর যানজট নিরসনে কোটি কোটি টাকার সিগন্যাল বাতিগুলো অকেজো হয়ে গেছে। বাতির জায়গায় বাতি আছে, কিন্তু সেগুলো জ্বলে না। গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে হাতের ইশারায়। বিশ্বের উন্নত দেশ ও নগরে পরিবহনব্যবস্থা অটোমেটিক সিগন্যালনির্ভর হয়েছে অনেক আগে। এর অনুকরণে ’৯০-এর দশকে ঢাকা মহানগরে অটোমেটিক সিগন্যাল সিস্টেম প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয় সরকার তথা ঢাকা সিটি করপোরেশন। সেই থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সিগন্যাল বাতি-পোস্ট স্থাপনের নামে কোটি কোটি টাকা খরচও হয়েছে।

অযথাই সিগন্যাল বাতি
ঢাকার যানজট নিরসনে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যালের কাজে গত ১৬ বছরে কয়েকটি প্রকল্প নেয়া হয়। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০০০ সালের দিকে ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রকল্পের আওতায় ৭০টি জায়গায় আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি বসানোর কাজ শুরু হয়। শেষ হয় ২০০৮ সালে। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবহার না হওয়ায় অল্প দিনেই বেশির ভাগ বাতি অকেজো হয়ে পড়ে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০১০-১১ অর্থবছরে নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেইস) নামে আরেকটি প্রকল্পের আওতায় স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যালব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে সরঞ্জাম কেনা হয়। এর আওতায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ৯২টি মোড় বা ইন্টারসেকশনে সোলার প্যানেল, টাইমার কাউন্ট ডাউন, কন্ট্রোলার ও ক্লেব স্থাপন করা হয়। এ স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালব্যবস্থাও এখন অকার্যকর।

স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যালব্যবস্থা কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়ে ঢাকা সিটি করপোরেশন ও পুলিশ আধা স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যালব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেয়। নতুন পদ্ধতিতে মোড়ে দাঁড়ানো ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের হাতে থাকবে রিমোট কন্ট্রোল। যে সড়কে যানবাহনের চাপ বেশি থাকবে, রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে পুলিশ সদস্যরা সেখানে সবুজ বাতি জ্বালাবেন। অন্য সড়কে তখন লাল বাতি জ্বলবে। মূলত হাতের ইশারার উন্নত সংস্করণ এ আধা স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালব্যবস্থা। নগরীর ট্রাফিকব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে পুলিশ। কিন্তু স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ এবং সরঞ্জাম সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ঢাকা সিটি করপোরেশনের। ফলে দুই সংস্থার মধ্যে ট্রাফিকব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়। ফলে এ উদ্যোগটিও বিফলে যায়।

গত কয়েক দিনে গুলিস্তান, মতিঝিল, পল্টন, মৎস্য ভবন, শাহবাগ, কাওরান বাজার, ফার্মগেট, আসাদগেট, কাকলী, বনানী, দৈনিক বাংলা মোড়, ফকিরাপুল, শেরাটন মোড়, বাংলামোটর ঘুরে দেখা গেছে কোনো সিগন্যাল বাতি জ্বলে না। বাতির দিকে ট্রাফিক পুলিশ কিংবা চালক কেউ ফিরেও তাকান না। চিরচেনা হাতের ইশারায় যানবাহন চলে আর থামে। সব জায়গায়ই যানজট, হাতের ইশারায় নিয়ন্ত্রণ করছেন ট্রাফিক পুলিশ আর সার্জেন্টরা। তারা বাঁশি দিয়ে ইশারা দিলেই গাড়ি থামছে আর চলছে। আর এতে অনেক পয়েন্টেই গাড়ির অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়ে যানজট লাগছে।

আবার সিগন্যাল বাতি না থাকায় অনেকেই বেপরোয়া গাড়ি চালান সার্জেন্টের ইশারা অমান্য করে। অপরিকল্পিত এ ব্যবস্থাপনার কারণেই নগরীর যানজট নিরসন কঠিন হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন নগরবিদেরা।

ট্রাফিক পুলিশের ভরসা দড়ি
সিগন্যাল বাতি কাজে না আসায় অবাধ্য চালকদের সামলে রাস্তায় শৃঙ্খলা আনতে লাঠি, বাঁশি আর হাতের ইশারায় ব্যর্থ হয়ে এবার দড়ি হাতে নেমেছে পুলিশ। ঢাকার বিজয় সরণি মোড়ে ট্রাফিক পুলিশকে ইদানীং দেখা যাচ্ছে দড়ি টেনে রাস্তা আটকে অন্য পথের যানবাহন পার করে দিতে। এই দৃশ্য দেখে কোনো মোটর রেসের সূচনা বলে মনে হতে পারে।

রফিকুল ইসলাম নামের একজন গাড়ির মালিক বলেন, এখন কোনো জায়গায় সিগন্যাল লাইটের জন্য কেউ অপেক্ষা করে না। আগে যাওয়া নিয়েই ব্যস্ত সবাই। দড়ি দিয়ে রাস্তা আটকানোর বিষয়টি হাস্যকর হলেও চালকদের ট্রাফিক সিগন্যাল মানাতে বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখছে।

বিজয় সরণি মোড়ের কাছেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দফতর। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের বিভাজনে সিগন্যাল বাতি থাকলেও তা কার্যকর নয়। ফলে এক দিকে বেশি গাড়ি জমে গেলে ট্রাফিক সদস্যরা রাস্তার দুই পাশের দুই খুঁটিতে দড়ি বেঁধে অন্য পাশের যানবাহন আটকে দিচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর অন্য পাশের গাড়িও একইভাবে পার করে দেয়া হচ্ছে।

দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের একজন বলেন, দড়ি দিয়ে না বাঁধলে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কার থামিয়ে রাখা যায় না। তারা সিগন্যাল মানতে চায় না। অনেক গাড়ি, বিশেষ করে মোটরসাইকেল সিগন্যাল অমান্য করে চলতে শুরু করে। এতে বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়ির সাথে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। আমরা উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করব। আপাতত দড়ি দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে।

আবার কার্যকর হচ্ছে সিগন্যাল বাতি
রাজধানীতে আবারো সিগন্যাল বাতির মাধ্যমে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। ৮৮টি স্থানে বাতি ও বিশেষ ক্যামেরা স্থাপনের মাধ্যমে যানবাহন চলাচলের সংখ্যা এবং গাড়ির গতি বিশ্লেষণ করে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে সিগন্যালের টাইম নির্ধারণ করা হবে। সিগন্যালগুলোতে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা থাকলেও তারা হাত তুলে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করবেন না। তারা শুধু আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন। রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে ফিক্সড টাইমিং ট্রাফিকিং সিস্টেম চালু করলে যানজট অনেকটাই কমে আসবে বলে দাবি করেছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়ন এবং যানজট কমাতে ফিক্সড টাইমিং ট্রাফিকিং সিস্টেম চালুর কাজ চলছে। প্রতিটি সিগন্যাল দিয়ে যাওয়া গাড়ির সংখ্যা এবং গাড়ি যেতে কত সময় লাগে তার ওপর ভিত্তি করে সিগন্যালের টাইম নির্ধারণ করা হবে। রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে এ ব্যবস্থা পরিচালিত হবে। বিশ্বব্যাংক ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাথে পুলিশ এটা নিয়ে কাজ করছে।

আগামী সেপ্টেম্বর থেকে কয়েকটি সিগন্যালে পরীক্ষামূলক সিগন্যাল বাতি চালু করা হবে। কয়েক মাসের মধ্যেই পুরোপুরি রিমোট কন্ট্রোল আমরা হাতে পেয়ে যাব। এরপর রাজধানীর ট্রাফিকব্যবস্থা রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এতে লোকবলের কাজও কমবে। বর্তমান লোকবল দিয়েই ভালোভাবে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। তবে নগরবাসীর সহযোগিতা এবং আইন মানার প্রবণতা না বাড়ালে এ ব্যবস্থার পুরোপুরি সুফল পাওয়া যাবে না।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫