ঢাকা, রবিবার,১৯ নভেম্বর ২০১৭

রকমারি

এইখানে ছিল মায়ের কবর

অবকাশ প্রতিবেদক

১৯ আগস্ট ২০১৭,শনিবার, ১৪:৩০


প্রিন্ট

মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার কাঞ্চনপুর এলাকায় হাশেম আলীর বসতি প্রায় তিন যুগের। বছর তিনেক ধরে উত্তাল পদ্মার আগ্রাসী ভাঙন সেই গ্রামের দুই শতাধিক বাড়ি, বাজার ও রাস্তা শেষ করে দিয়েছে। এখন তার বাড়ির পাশে এসে উঁকি দিচ্ছে পদ্মার ভয়ঙ্কর ঢেউয়ের জল। আট বছর আগে মা ফুলবুরু বেওয়া মারা যাওয়ার পর তার কবর দেয়া হয়েছিল বসতভিটার পাশে। এখন মায়ের কবরের দোরগোড়ায় আগ্রাসী পদ্মা। নিজের পরিবার ও ঘরবাড়ি সরিয়ে নিলেও নিতে পারছেন না মায়ের কবরটি। মায়ের শেষ স্মৃতি হিসেবে থাকা সেই কবরটি নদীতে হারিয়ে যাচ্ছে চিরতরে, চোখের সামনে এমন দৃশ্য দেখে বিষাদে ভরে উঠছে বুকটা। কবরের পাশেই সারাটি দিন কেঁদে পার করেন হাশেম আলী ও তার ছোট মেয়ে রওশনা আক্তার। পাশেই চলছে ঘরবাড়ি ভাঙাচুরার খেলা।

শুক্রবার দুপুরে হাশেম আলীর সাথে যখন কথা হয়, তখন পদ্মার ঢেউ আছড়ে পড়ছে সজোরে, পাকা কবরের অর্ধেক অংশ ঝুলে আছে নদীতে। একেকটি ঢেউ যেন আঘাত হানছে হাশেম আলীর অন্তরে। কথা বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। এরপর হঠাৎ দৌড়ে গেলেন তার মায়ের কবরের পাশে। শেষবারের মতো ছুঁয়ে দেখলেন। মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল কবরটি পদ্মার অতল গহ্বরে। সেই সাথে চিরতরে হারিয়ে গেল হাশেম আলীর সবচেয়ে আপন মমতাময়ী মায়ের শেষ স্মৃতিটুকু। বিলাপ করতে লাগলেন, একটু আগে এইখানে ছিল মায়ের কবর; পদ্মার ফেনিল ঢেউয়ের পানে ইশারা করে অস্ফুট স্বরে শুধু বললেন, আমার সব শেষ হইয়া গেল রে, সব গেল।

পাশ থেকে তার স্ত্রী রাশিদা বেগম বলেন, ‘এই গ্রাম ভাঙব কহনও ভাবতে পারি নাই, এই গ্রামের আগে আরেক গ্রাম আছিল, তা ভাইঙা গেছে। কম কইরা হইলেও এক শ’ পরিবার গ্যাছে। এইব্যার ভাঙন আরো বেশি মনে হইত্যাছে। অনেক বাড়িঘর চইল্যা গেছে নদীতে।

শুধুই হাশেম আলী আর রাশেদা বেগমই নয় এই ইউনিয়নের বেদ্দকান্দি, মোহম্মদপুর, শুদ্রকান্দি এলাকার কৃষক আলাল ফকির, তোতা মিয়া, ইউসুব আলী ভূঁইয়া ও শের আলীর বাড়িঘর সব কিছুই চলে গেছে পদ্মার পেটে। শের আলী জানালেন, বাড়িঘর হারিয়ে সে পার্শ¦বর্তী ইউনিয়ন বাল্লা এলাকায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এসব বিধ্বস্ত জনপদের সব মানুষের অনাহারি শীর্ণ মুখ। ভিটে নেই, শুধু ধ্বংস্তূপ। আর এমন চিত্র প্রতি বছর বর্ষা মওসুমে ফিরে এলেও ভাঙন রোধে নেই কোনো কার্যকরী উদ্যোগ।

গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে সেই সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে নদীভাঙন। মানিকগঞ্জের পদ্মা যমুনা ও কালিগঙ্গার তীরবর্তী উপজেলা দৌলতপুর, ঘিওর, হরিরামপুর এবং শিবালয় এলাকায় ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনের ফলে শত শত একর ফসলি জমি, গাছপালা ও বাড়িঘর নদীতে চলে যাচ্ছে। হুমকির মুখে রয়েছে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার ও আশ্রয়ন প্রকল্প। অথচ ভাঙন ঠেকাতে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না বলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অভিযোগ।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫