ঢাকা, শনিবার,২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭

আগডুম বাগডুম

কাউফি

সারমিন ইসলাম রতœা

১৯ আগস্ট ২০১৭,শনিবার, ০০:০০


প্রিন্ট
অলঙ্করণ : হামিদুল ইসলাম

অলঙ্করণ : হামিদুল ইসলাম

গরুটা বেশ বড়সড়। এত বড় গরু আমাদের বাসায় আগে কখনো কেনা হয়নি। গরুটার সঙ্গে একটা সেলফি তুলি। ঠিক সেলফি না কাউফি। মোবাইল হাতে নিয়ে গরুটার সামনে দাঁড়াল সুমন। দাঁত বের করে একটা হাসি দিলোÑ হি হি, ক্লিক ক্লিক। ওহ! দারুণ ছবি উঠেছে। দেখ তো কেমন লাগে, এই বলে সুমন তার মোবাইলটা বাড়িয়ে দিলো পুঁচকে ছেলে রাসেলের হাতে। রাসেল তার বন্ধু। পুঁচকে বলার কারণ একেবারে চিকনচাকন তাই। রাসেল ঠোঁট দুটো ভেংচি কেটে বলল, একটুও ভালো ওঠেনি। মোবাইলটা আমার কাছে থাক, আমি এই গরুটার সঙ্গে একটা সেলফি না মানে একটা কাউফি তুলি। তুই আমার মোবাইল দিয়ে কাউফি তুলবি কেন, মোবাইল দে বলছি। এটা আমাদের গরু। রাসেল সুমনের কথা শুনে তার বত্রিশটা, না ঠিক বত্রিশটা দাঁত এখনো ওঠেনি, এই সাতাশ-আটাশটা হবে হয়তো, দাঁত বের করে বলল, এটা যে তোদের গরু গায়ে কি নাম লেখা আছে। যদি প্রমাণ দিতে পারিস তাহলে আমি কাউফি তুলব না। সুমন কিছু না বলে বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল। সত্যিই সে প্রমাণ দেবে কী করে, এটা যে তাদের গরু, গরুর গায়ে তো নাম লেখা নেই। সে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল পুঁচকেটার কাণ্ড। পুঁচকেটা গরুটার পাশে দাঁড়িয়ে খুব নায়ক নায়ক ভাব নিলো। তারপর ক্লিক ক্লিক, হয়ে গেছে, ছবি তোলা শেষ। সুমন বলে উঠল, তবে এখন মোবাইলটা দে। উহু, এখন মোবাইলটা দেয়া যাবে না। মানে? মানে আমি ছবিগুলো এক্ষুনি আমার ম্যাসেঞ্জারে পাঠিয়ে দিচ্ছি তোর মোবাইল থেকে। তারপরই ফেসবুকে আপলোড, কি মজা! রেগে গিয়ে সুমন বলল, খবরদার আপলোড করবি না বলছি। আপলোড করব না মানে, এক শ’ বার করব, হাজার বার করব। বলতে বলতে রাসেল ছবিগুলো তার ম্যাসেঞ্জারে পাঠিয়ে দিলো। সুমন থ হয়ে গেছে। সে কিছু বলতে পারছে না। পুঁচকেটা কি জাদু জানে। রাসেল তার কাজ শেষ করে মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে মোবাইলটা তুলে দিলো সুমনের হাতে, নে ধর। আমার কাজ শেষ। এবার আমি যাই। সুমন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রাসেলের যাওয়া দেখল। পুঁচকেটা কি তাকে হিপনোটাইস করে ফেলল।
গরুটা অনেকক্ষণ ধরে এসব দেখছিল। সে ভীষণ জোরে একটা হাম্বা ডাক দিলো- হাম্বা-আ-আ-আ। ভয় পেয়ে সুমন একটা লাফ দিয়ে উঠল। দূরে সরে যেতে চাইল, কিন্তু পারল না। গরুটা তার বড় বড় চোখ দুটো আরো বড় করে সুমনকে বলল, অনেকক্ষণ ধরে তোমাদের কাণ্ড দেখছিলাম, বিষয়টা কি বল তো। সুমন এবার যেন কিছুটা সাহস পেল, সে বলল, বিষয় কিছুই না, তুমি তো বেশ বড় গরু তাই তোমার সঙ্গে একটু সেলফি তুলতে চাইছিলাম। সেলফি না মানে ঠিক কাউফি। গরুটা আবারো একটা হাম্বা ডাক দিলো, বিস্ময় নিয়ে তার চোখ দুটো কপালে তুলে বলল, আমি বড় হয়েছি তো কি হয়েছে, আমার সঙ্গে ছবি তুলতে হবে কেন? ছবি তুলতে হবে এই কারণে যে তুমি আমাদের এলাকার সবচেয়ে বড় গরু এবং তোমাকে আমরাই কিনে এনেছি। ওহ! বুঝতে পেরেছি। আচ্ছা তোমরা আমাকে কেন কিনে এনেছ? কারণ আগামীকাল কোরবানি ঈদ আর তোমাকে আমরা আল্লাহর রাস্তায় কোরবানি করব। গরুটা কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল, কোরবানি কী জিনিস? সুমন গরুটার দিকে তাকিয়ে বলল, এ জন্যই বলি তুমি একটা গরু, আসলেই একটা গরু। কোরবানি হলো আগামীকাল আমরা তোমাকে আল্লাহর রাস্তায় জবাই করব। গরুটা এবার কেঁদে ফেলল, কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমাকে ছেড়ে দাও, যেতে দাও আমার পরিবারের কাছে। গরুটার কান্না দেখে সুমনের খুব মায়া হলো। সে গরুটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, কেঁদো না দেখা যাক কিছু করতে পারি কি না?
গরুটাকে শান্ত করে সুমন চলে এলো তার ঘরে। এসেই মোবাইলটা পকেট থেকে বের করে ফেসবুক চালু করল। আর করেই সে রাগে ফেটে পড়তে চাইল। দুষ্ট রাসেলটা, পুঁচকে রাসেলটা তাদের গরুর সঙ্গে ছবি আপলোড করেছে। তখনি সে মন্তব্য করল, আমাদের গরুর সঙ্গে ছবি তুলে বাবুগিরি দেখাচ্ছিস। রাসেলও সাথে সাথে লিখে দিলো, তোদের গরু যদি প্রমাণ দিতে পারিস তাহলে ছবিটা এক্ষনি ডিলিট করে দেবো। সুমন আরো রেগে গেল। সেও তার কাউফিটা ফেসবুকে আপলোড করল। এভাবে কিছুক্ষণ দুই বন্ধুর মধ্যে ঝগড়া চলল। সুমন মন খারাপ করে তার ছবিটিই ডিলিট করে দিলো।
আজ ঈদের দিন। সুমন ঈদের নামাজ পড়ে বাসায় ফিরছে। রাস্তায় অনেকের সঙ্গেই দেখা হলো। সে সবার সঙ্গে কোলাকুলি করল। হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন তাকে জড়িয়ে ধরল। সুমন ভয় পেয়ে চিৎকার দিতে যাবে অমনি শুনতে পেল পুঁচকে ছেলে রাসেলের কণ্ঠ। রাসেল বলল, ঈদ মোবারক বন্ধু। সুমনও বলল ঈদ মোবারক। তারপর দুই বন্ধু মিলে সেকি কোলাকুলি। গতকালের ঝগড়ার লেশমাত্র নেই। ভুলেই গিয়েছে একেবারে। সুমন রাসেলের হাত ধরে তার বাসায় নিয়ে এলো। দু’জনে এক সঙ্গে মায়ের হাতের রান্না সেমাই খেল।
এখন শুরু হবে কোরবানি । সুমন গরুটাকে বলেছিল সে কোনো ব্যবস্থা করতে পারে কি না দেখবে। সে গরুটার কাছে এগিয়ে গেল। গরুটা সুমনের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাল। সুমনের চোখ বেয়ে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। গরুটা সুমনকে বলল, তুমি কান্না করো না। আমি আল্লাহর রাস্তায় কোরবানি হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছি। আমি সারা রাত চিন্তা করে অবশেষে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আমি আল্লাহর রাস্তায় কোরবান হবো। তোমাদের দুই বন্ধুকে একসঙ্গে দেখে আমি খুব খুশি হয়েছি, খুব ভালো লাগছে আমার। তোমরা আর কখনো ঝগড়া করো না। গরুটাকে কথা বলতে দেখে রাসেল অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল। গরুটা বলল, এভাবে তাকিয়ে না থেকে চলো আমরা তিনজনে মিলে এবার একটা কাউফি তুলি। তারপর রাসেল, সুমন ও গরুটা মিলে একটা পোজ দিলো এবং ক্লিক ক্লিক। গরুটা আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল, তখনি সুমনের বাবা এসে গরুটাকে কোরবানির জন্য নিয়ে গেলেন।
সকাল গড়িয়ে দুপুর হতে চলল। সব গোশত প্রস্তুত করা শেষ। রাসেলরা কোরবানি দিতে পারেনি। ওরা কোরবানি দেয় না। কারণ ওরা খুব গরিব। সুমন তার বাবাকে বলল, বাবা এবার আমি রাসেলদের বাসায় গোশত নিয়ে যাবো। সুমনের কথা শুনে বাবা খুব খুশি হলেন। সুন্দর একটা হাসি দিয়ে বললেন, অবশ্যই নিয়ে যাবে। উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল সুমন, তার চোখে মুখে ছড়িয়ে গেল ত্যাগের মহিমায় নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার অপার আনন্দ।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫