ঢাকা, শনিবার,২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭

আগডুম বাগডুম

দুই বন্ধু

আব্দুস সালাম

১৯ আগস্ট ২০১৭,শনিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

অনেক দিন আগের কথা। রহমতপুর গ্রামের উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি বেশ নামকরা ছিল। বোর্ড পরীক্ষায় স্কুলের ফলাফল ভালো হতো বলে শহর থেকে অনেক ছেলেমেয়ে ওই বিদ্যালয়ে পড়তে যেত। স্কুলের পরিবেশও বেশ ভালো ছিল। শহর থেকে যারা পড়তে আসত তাদের অনেকেরই আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল। আর গ্রামের বেশির ভাগ ছাত্রছাত্রীর মা-বাবা খেটে খাওয়া মানুষ ছিল। কেউ কৃষিকাজ করত, কেউ দিনমজুরের কাজ করত, কেউ আবার ছোটখাটো ব্যবসা-বাণিজ্যও করে জীবিকা নির্বাহ করত। দরিদ্র হওয়ার কারণে গ্রামবাসী তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে আগ্রহী ছিল না। একটু বড় হলেই সন্তানদের রোজগারের জন্য কাজে লাগিয়ে দিত। লেখাপড়ার মর্যাদা কী তা তারা জানত না। ফলে তারা লেখাপড়ার বিষয়ে কোনো গুরুত্ব দিত না।
রহমতপুর বিদ্যালয়ে আবুল হোসেন নামে একজন ছাত্র ছিল। জন্মের পরপরই তার বাবা মারা যায়। আবুল ও তার দুই ছোট বোনকে নিয়ে তাদের মা খুব কষ্ট করে জীবন যাপন করত। গৃহকর্মীর কাজ করে মা কোনোরকমে জীবিকা নির্বাহ করত। আবুল হোসেনের দুই বোন অবশ্য স্কুলে যেত না। আবুল হোসেন খুব মেধাবী ছিল। সে ক্লাসের সব পরীক্ষায় ভালো করত। সংসারে টানাটানির কারণে সে ও তার দুই বোন ভালো কোনো জামাকাপড় পরতে পারত না। একই পোশাক পরে আবুল স্কুলে আসা-যাওয়া করত। শহর থেকে আসা অনেক বন্ধুই তার সাথে তেমনভাবে মিশত না। কায়সার হামিদ নামে আবুল হোসেনের এক সহপাঠী ছিল। সে শহর থেকে আসত। তার বাবা একজন সরকারি কর্মকর্তা ছিল। আবুল হোসেন ও কায়সার হামিদ দুইজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল।
একদিন কায়সার লক্ষ করল যে, আবুল হোসেন বেশ কিছু দিন ধরে স্কুলে আসছে না। বন্ধুর অনুপস্থিতিতে কায়সারের ক্লাসে একদম মন বসত না। সব সময় তার মনটা খারাপ থাকত। একদিন সে আবুল হোসেনের বাড়িতে গেল বন্ধুর খোঁজ নিতে। সেখানে তাদের দু’জনার দেখা হলো। কায়সারকে আবুল হোসেন তাদের কুঁড়েঘরের মেঝেতে বসতে দিলো। তারা দু’জনা অনেক কথাবার্তা বলল। আবুল কেন স্কুলে যায় না সে বিষয়ে কায়সার বারবার জিজ্ঞেস করার পরও সে মুখ খুলল না। কায়সার তাকে বলল, তুই কেন স্কুলে যাস না? তুই স্কুলে না গেলে যে আমার একদম ভালো লাগে না। তুই কবে যাবি বল?
Ñনারে, আমার আর স্কুলে যাওয়া হবে না। মা সারা দিন অন্য লোকের বাড়িতে কাজ করে। এতে সামান্য কিছু টাকা আয় হয়। তাই দিয়ে আমাদের কোনো রকমে সংসার চলে। তা ছাড়া মায়ের শরীরটাও ইদানীং ভালো যাচ্ছে না। প্রায় সময়ই অসুস্থ হয়ে পড়েন।
Ñতাহলে তুই কী করতে চাস?
Ñভাবছি শহরের কোনো একটি দোকানে কাজ করব। আমাদের মতো গরিব মানুষের পড়ালেখা করে কী হবে, বল?
Ñতুই কাল থেকে স্কুলে যাবি। তোর পড়াশোনা করার খরচ আমি দেবো।
-বলিস কী!
- তুই কোনো চিন্তা করিস না। আমার বাবা প্রতিদিন আমাকে টিফিন খরচের জন্য কিছু টাকা দেন। আমি ওই টাকা থেকে তোর জন্য কিছু কিছু রেখে দেবো। এতে আমার কোনো সমস্যা হবে না।
Ñএটা যদি তোর মা-বাবা জেনে ফেলে, তাহলে?
Ñও নিয়ে তুই ভাবিস না। কেউ জানবে না। আর তোর কাছে আমার অনুরোধ বিষয়টি অন্য কাউকে বলবি না। শুধু তোর আর আমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
বন্ধুর পীড়াপীড়িতে আবুল শেষ পর্যন্ত স্কুলে যেতে রাজি হলো। পরের দিন থেকে আবুল নিয়মিত স্কুলে যাওয়া শুরু করল। হামিদ টিফিন খরচের টাকা থেকে প্রতিদিন কিছু কিছু টাকা জমিয়ে রাখত। মাস শেষে জমাকৃত টাকা আবুলকে দিয়ে দিত। হামিদের সহযোগিতা ও উৎসাহে আবুল পূর্ণোদ্যমে পড়ালেখা চালিয়ে গেল। কায়সার হামিদ শহরে ভালো একজন স্যারের কাছে গণিত ও ইংরেজি শেখার জন্য প্রাইভেট পড়ত। আবুলের কোনো সমস্যা হলে হামিদ তাকে ভালোভাবে বুঝিয়ে দিত। বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলে দেখা গেল তারা দু’জনই পরীক্ষায় ভালো করেছে। কায়সার হামিদ প্রথম আর আবুল হোসেন দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে। উপর ক্লাসে ওঠার পর হামিদ আবুলকে একইভাবে সাহায্য করত। বিষয়টি হামিদ ও আবুল ছাড়া কেউই জানত না। এভাবে দেখতে দেখতে আবার বার্ষিক পরীক্ষা চলে এলো। দু’জনাই ভালোভাবে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করল। কী আশ্চর্য! সেবার পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলে দেখা গেল আবুল প্রথম স্থান আর হামিদ দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে। এতে হামিদের কোনো মন খারাপ হয়নি। সেও ভীষণ খুশি হয়েছিল। পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার সুবাদে আবুলের স্কুলে পড়াশোনা করতে আর কোনো বেতনভাতাদি দিতে হলো না। সে বিনা বেতনে পড়ালেখা করার সুযোগ পেল।
হঠাৎ হামিদের বাবা অন্য একটি জেলাতে বদলি হয়ে গেল। ফলে হামিদকে বাধ্য হয়ে রহমতপুর গ্রামের বিদ্যালয়টি ত্যাগ করতে হলো। হামিদ আর বিদ্যালয়ে আসবে না জেনে আবুলের ভীষণ কষ্ট হলো। বিদ্যালয় থেকে বিদায় নেয়ার সময় তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে খুব কান্নাকাটি করল। হামিদ বারবার আবুলকে অনুরোধ করল তুই কখনো পড়ালেখা ছাড়বি না। আবুলও বন্ধুকে কথা দিয়েছিল সে পড়ালেখা বন্ধ করবে না। যত কষ্টই হোক না কেন নিয়মিত পড়ালেখা চালিয়ে যাবে।
এভাবে দেখতে দেখতে একদিন আবুল ভালোভাবে এসএসসি পাস করে কলেজে ভর্তি হলো। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর আবুল টিউশনি করত। টিউশনির টাকা দিয়ে সে পড়ালেখার খরচ জোগাত। একইভাবে এইচএসসি পরীক্ষায়ও সে ভালো করল। মেডিক্যালে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে সে ডাক্তারি পড়ার চান্স পেয়ে গেল। যথারীতি পড়াশোনা শেষ করে একজন ভালো ডাক্তার হয়ে বের হয়ে এলো। চাকরি পাওয়ার পর রহমতপুর গ্রামের পাশের শহরে পোস্টিং নিলো। গ্রামের দরিদ্র মানুষদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য নিজ গ্রামে একটি দাতব্য চিকিৎসালয় গড়ে তুলল। চিকিৎসা কেন্দ্রটির নাম দিলো তার বন্ধুর নামানুসারে রহমতপুর কায়সার হামিদ দাতব্য চিকিৎসালয়।
বিদ্যালয় থেকে বিদায় নেয়ার পর আবুল হোসেনের সাথে আর কায়সার হামিদের দেখা হয়নি। বন্ধুর ঠিকানা না থাকায় আবুল তার সাথে দেখা করতে পারেনি। আর হামিদও আবুলের সাথে দেখা করার জন্য গ্রামে আসেনি। অবশেষে প্রায় দেড় যুগ পর কায়সার হামিদ রহমতপুর গ্রামে এলো তার বাল্য বন্ধু আবুল হোসেনের সাথে দেখা করতে। গ্রামে ঢুকতেই তার চোখে পড়ল রহমতপুর কায়সার হামিদ দাতব্য চিকিৎসালয়টি। সৌভাগ্যক্রমে এখানেই তার বাল্যবন্ধু আবুল হোসেনের সাথে দেখা হয়ে গেল। দু’জন দু’জনাকে বেশ কিছুক্ষণ জড়িয়ে ধরল। কথাবার্তা বলার সময় কায়সার হামিদ যখন জানতে পারল যে, তার নিজের নামানুসারেই আবুল হোসেন দাতব্য চিকিৎসালয়ের নাম রেখেছে কায়সার হামিদ দাতব্য চিকিৎসালয়। তখন হামিদের দুই চোখ খুশিতে জলে ভরে গেল। দীর্ঘ দিন পর দুই বন্ধুর দেখা হওয়ায় তারা আবেগাপ্লুত হয়ে গেল। আবুল হোসেন অকপটে বন্ধুর প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করল। তার অবদানের কথা স্মরণ করে আবুল বলল, সেদিন যদি তুই আমার পাশে না দাঁড়াতি তাহলে আমি এ পর্যন্ত আসতে পারতাম না। হামিদ বলল, সবই আল্লাহর ইচ্ছায় হয়েছে। আমি শুধু অছিলা ছিলাম মাত্র। কায়সার হামিদও একজন বড় সরকারি কর্মকর্তা। সে মা-বাবার সাথেই থাকে। সেদিন তারা দু’জনে সুখ-দুঃখের অনেক গল্পগুজব করল। হামিদ আবুলদের বাড়িতে দুই দিন থেকে সহপাঠীদের খোঁজখবর নিলো। তাদের সাথেও দেখা-সাক্ষাৎ করল। এরপর থেকে দুই বন্ধু যখনই সময় পেত একে অপরের কাছে ছুটে যেত।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫