ঢাকা, মঙ্গলবার,২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

লেবাস ফেলে গোপন বিদায়

আলমগীর মহিউদ্দিন

১৭ আগস্ট ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৯:০২ | আপডেট: ১৭ আগস্ট ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৯:০৮


আলমগীর মহিউদ্দিন

আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রিন্ট

সে দিন ছিল ১২ আগস্ট, ১৯৪৯। বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো জেনেভাতে বসে এক দলীলে স্বাক্ষর করল, যা জেনেভা একর্ড বা জেনেভা চুক্তি বলে পরিচিত হলো। এর মূল লক্ষ্য ছিল বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না হয় এবং সব রাষ্ট্র যেকোনো সঙ্ঘাতে কতগুলো নিয়ম মেনে চলে, যার ফলে সাধারণ মানুষ আক্রান্ত হবে না। বিশ্বের ১৯৩টি রাষ্ট্র এই সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করেছে। আজ ৬৮ বছর পর, যদি কেউ প্রশ্ন করে, জেনেভা চুক্তি কি সত্যি বাস্তবায়িত হয়েছে? সহজ জবাব হবে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ‘না’।

জেনেভা চুক্তিকে গণতান্ত্রিক প্রচেষ্টার অন্যতম সাফল্য হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। ধারণা করা হয়েছিল- যুদ্ধ, সংঘর্ষ ও অবিচারকে যেমন একাধারে ঠেকানো যাবে, অন্য দিকে গণতন্ত্রের প্রসার হবে অবধারিত। ওয়েস্টচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লরেন্স ডেভিডসন সবার হয়ে তাই প্রশ্ন করেছেন, তেমনটি কি হয়েছে?

এটা সত্য, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়নি, তবে ৬৮ বছর রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে সঙ্ঘাত হয়েছে, যুদ্ধ হয়েছে, রাষ্ট্রের নির্মমতা বেড়েছে। কয়েকটি উদাহরণই হবে যথেষ্ট। ভিয়েতনাম যুদ্ধে ১৫ লাখ লোক হত্যা করা হয়, আফগানিস্তান যুদ্ধে রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পর্যায়ক্রমে দখল করছে এবং অব্যাহতভাবে হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে দেড় যুগ ধরে, ইরাক যুদ্ধে দেশটির ওপর চলছে হত্যাকাণ্ডের এক উৎসব, ফিলিস্তিনে ইসরাইল চালাচ্ছে ইচ্ছেমতো ধ্বংস ও হত্যার উৎসব এবং তার সহায়তায় পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম গান গায়, চেচনিয়ায় রুশ সামরিক অভিযানে অবর্ণনীয় যন্ত্রণার রাজত্ব কায়েম হয়েছে। এ ছাড়া আফ্রিকা ও এশিয়ায় শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমা শক্তিবর্গের নানান সামরিক অভিযানে যে হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংস চলেছে এবং ক্রমাগত হচ্ছে তার ক্ষতিগুলো একত্র করলে দেখা যায়, দুই বিশ্বযুদ্ধের চেয়ে তা কয়েকগুণ। ডেভিড লরেন্স লিখেছেন, আন্তর্জাতিক রেডক্রস এসব সঙ্ঘাত ঠেকাতে পারেনি বা বিশ্বজনমতও সৃষ্টি করতে পারেনি। তবে এসবের কিছু কিছু ইঙ্গিত দিয়েছে মাত্র। অথচ রেডক্রসের দায়িত্ব ছিল জেনেভা চুক্তি বাস্তবায়ন করা ও সঙ্ঘাত এড়ানো।

তবে অনেকেই বলেছেন, রেডক্রস অসহায়। কারণ, তাদের শক্তিশালী সৃষ্টিকর্তারাই আন্তর্জাতিক কোনো আইনকানুনের তোয়াক্কা করছে না। এ সংস্থা যদি সত্যের পথে চলে, তবে এটা বন্ধ হয়েও যেতে পারে।

তবে একটি বক্তব্যের কোনো প্রতিবাদ হয়নি। সব সঙ্ঘাত-সংঘর্ষের ফল বইতে হয় নিরপরাধ সাধারণ মানুষকে ও গণতন্ত্রকে। আর নেতা, কূটনীতিবিদ, সামরিক নেতারা যারা নানা অজুহাতে যুদ্ধ-সঙ্ঘাত শুরু করে, তাদের বলা হয় ‘নৈতিকতাহীন মহামূর্খ’। সমস্যা হলো বেশির ভাগ জনবিরোধী কর্মকাণ্ডের নেতৃত্ব দেয় এরা। কেননা, তারা ছলে-বলে-কৌশলে ক্ষমতায় থাকে।
এবং এই গোষ্ঠীর প্রধান শক্তি, অস্ত্র ও বাহন হলো গণতন্ত্রের বুলি। এখানে একটি ঘটনার উদ্ধৃতি দেয়া যায়। বিখ্যাত সাংবাদিক স্টিফেন ট্যালবট ভিয়েতনাম যুদ্ধ সম্পর্কে এর পরিচালকদের মত জানতে ২০০০ সালে রবার্ট ম্যাকনামারার সাথে সাক্ষাৎ করেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় ম্যাকনামারা ছিলেন মার্কিন সরকারে প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং তিনিই সে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। ম্যাকনামারা তার প্রতিক্রিয়ায় ট্যালবটকে বলেন, ‘আমি অত্যন্ত দুঃখিত এবং নিজেকে অপরাধী মনে করি।’ এরপর ট্যালবট হেনরি কিসিঞ্জারের সাক্ষাৎকার নেন। কিসিঞ্জার ভিয়েতমান যুদ্ধের শেষের দিকে রিচার্ড নিক্সনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন। ট্যালবট যখন কিসিঞ্জারকে জানান, ম্যাকনামারা এ যুদ্ধের জন্য অত্যন্ত দুঃখিত, তখন (ট্যালবটের ভাষায়) কিসিঞ্জার এক নাটকের অবতারণা করেন। ‘হু হু হু’ বলে কান্নার মতো শব্দ করে চোখ মুছতে থাকেন। কান্নার সুরে জিজ্ঞেস করেন, ‘তিনি কি দুঃখে এখনো বুক চাপড়ান’। এ কথা বলে নিজের বুক চেপে ধরে কান্নার সুরে জিজ্ঞেস করেন, ‘তিনি কি নিজেকে অপরাধী মনে করেন?’

ট্যালবট লিখেছেন, ‘এ নাটক দিয়ে ভিয়েতনাম ও সেখানের ধ্বংসলীলাকে কত অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্যের মনোভাব পোষণ করতেন তারই প্রকাশ করেছেন।’ আসলে ক্রিস্টোফার হিচেনস তার বই ‘ট্রায়াল অব হেনরি কিসিঞ্জার’ (২০০১) বইতে অপরাধের বিশদ বিবরণ দিয়ে বলেছেন, ম্যাকনামারার অপরাধ কিসিঞ্জারের চেয়ে কম। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মন্তব্য হলো ‘আসলে তার কোনো দুঃখবোধই ছিল না। কেমন করে এটা সম্ভব?’ আসলে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অভাবই কাউকে এমন নির্মম করতে পারে এবং এ জন্যই দুই বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ঘটনার পরও এর নেতারা একই ধারায় অন্যায়-অবিচার-হত্যাকাণ্ডগুলো ৬৮ বছর ধরে করে চলছে। প্রাজ্ঞ ও অনুসন্ধানীরা বারবার একই কথা বলছেন। সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সচল না থাকলে এ অবস্থার অবসান হবে না।

তাহলে কি গণতন্ত্র সচল নয়? সারা বিশ্বে তো এখন শুধু গণতন্ত্রের চর্চা ও আলোচনা হচ্ছে। হচ্ছে আন্দোলন এবং সংগ্রাম। তাহলে এ প্রশ্ন উঠেছে কেন? এর জবাবের আগে গণতন্ত্রের স্বরূপ নিয়ে দু’টি কথা বলা উচিত। এক কথায় রাষ্ট্রের এবং এর পক্ষে সরকারের সব ক্ষমতার উৎস যদি জনগণ হয়, সেটাই হবে গণতন্ত্র। জনগণের শাসন থাকলে সবাই সমান এবং সব সুযোগ-সুবিধা সমভাবে সবাই ভোগ করবে। যদি এর ব্যতিক্রম ঘটে, তখন বুঝতে হবে গণতন্ত্রের নামে অন্য যেকোনো প্রচলিত ২৪ রকমের শাসন চলছে। এ বিষয়ে মার্কিনি সংস্থা ফ্রিডম হাউজ তাদের অনুসন্ধানে পেয়েছে, ২০০৫ সাল থেকে গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা ক্রমাগত কমে যাচ্ছে।

এথেন্সে গণতন্ত্রের জন্মের পর রাজতন্ত্রের সাথে এর সঙ্ঘাত চলতে থাকে। অষ্টাদশ শতাব্দীর মার্কিনি বিপ্লব প্রথম সার্থক গণতন্ত্রের উদ্ভব ঘটালেও এর সমাপ্তির কর্মকাণ্ডও সাথে সাথে চলতে থাকে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে এ সঙ্ঘাত ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ফলে বিংশ শতাব্দীর প্রথম পাদে জার্মানি, স্পেন ও ইটালি থেকে শিশুগণতন্ত্র বিদায় নেয়। ১৯৪১-এ এসে মাত্র ১১টি দেশে গণতন্ত্র চালু বলে ফ্রিডম হাউজ উল্লেখ করেছে। তারা আরো উল্লেখ করেছে, বিশ্বের ৪০ ভাগ মানুষ এখন ভোট দিলেও গণতন্ত্রের অগ্রগতি থেমে গেছে। সংস্থা বলেছে, গণতন্ত্র নিয়ে সংখ্যার হিসাব সত্যিকারের কোনো অবস্থার প্রতিফলন নয়। সত্যিকারের চিত্র হচ্ছে- জনগণ ভোট দিচ্ছে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য। অথচ এর পরই তারা স্বৈরাচারে রূপান্তরিত হচ্ছে, যদিও বাহ্যিক দিক দিয়ে তারা গণতন্ত্রের ধারক। তারা বলছে, গণতন্ত্রের চারটি উপাদান রক্ষার কাজ করছে। সে চারটি উপাদান হচ্ছে : ০১. পক্ষপাতহীন অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার নির্বাচন বা পরিবর্তন করা, ০২. সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে নাগরিক হিসেবে সক্রিয় অংশ নেয়া, ০৩. সব নাগরিকের মানবিক অধিকার সংরক্ষণ করা এবং এমন আইনে শাসনের প্রবর্তন করা, যেখানে সব নাগরিকের সমান অধিকার থাকবে এবং ০৪. আইন সমভাবে প্রযোজ্য হবে।

এখন নাগরিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনব্যবস্থায় কি গণতন্ত্রের এই চারটি মূল উপাদানের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়? প্রশ্ন করেছেন লেখক পল ম্যাসন। নিজেই উত্তর দিয়েছেন। এখন লেবাস ছাড়া সত্যিকারের গণতন্ত্রের উপাদান কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। তার সাথে সুর মিলিয়ে ম্যাক্স হেস্টিংস ব্রিটিশ ডেইলি মেইলে (২২ জুন ২০১৩) লিখেছেন, এমনকি সাম্যবাদ (কমিউনিজম) যেন ‘মৃত হাঁস’ এবং সর্বত্র গণতন্ত্রের লেবাসে একনায়কত্ব কায়েম হয়েছে। হেসটিংস বলেছেন, ফ্রান্সিস ফুকুয়িমা ‘অ্যান্ড অব হিস্টোরি’তে (১৯৯৩) লিখেছিলেন ‘কোল্ড ওয়ার’ শেষ হওয়ার পরে যে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে, তার অগ্রগতি থামবে না। এটা সরকারের চূড়ান্ত অবয়ব বলে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন। অথচ তার কলমের কালি শেষ হওয়ার আগেই ফুকুয়িমার ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যে হয়ে যায়।

হেস্টিংসের একটি মন্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। ‘এখন সর্বত্র গণতন্ত্রের নামে দুর্নীতি ও অনাচারের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। সেখানে সাধারণ মানুষ একেবারেই অনুপস্থিত। এলিটেরাই শুধু রাজত্ব করছে।’ উদাহরণ হিসেবে অনেক দেশের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ভারতের কথা তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। ‘বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র বলে পরিচিত ভারত দুর্নীতিতে ডুবে আছে। তেমনি দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারও ডুবে আছে দুর্নীতির সাগরে।’ তিনি লিখেছেন, বিশ্বের ১২০টি দেশে নিয়মিত নির্বাচন হয় এবং প্রতি নির্বাচনের পরই আবির্ভূত হয় নতুন স্বৈরাচার এবং স্বেচ্ছাচারী শক্তি। তবে সবারই লেবাস গণতন্ত্র এবং দুর্নীতিমুক্ত নির্বাচন এখন কল্পনাই করা যায় না।
তাই একটা প্রশ্ন সবাইকে নাড়া দেয় : গণতন্ত্র নিয়ে তবে এত আলোচনার কী আছে? জবাবে অনেকে বলেছেন ‘গণতন্ত্রের আবিষ্কার এবং ব্যবহারের সাথে মানুষের জীবনব্যবস্থা জড়িত। মানুষ বাঁচতে চায় বাধা-বন্ধনহীনভাবে। আর রাজনীতির জন্ম হয়েছে এই বন্ধনহীন জীবনব্যবস্থা নির্মাণ এবং অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি নিয়ে। এর বাহন হিসেবে এসেছে গণতন্ত্র। তাই এটা জনগণের কাছে গ্রহণীয় হয়েছে।’

মজার কথা, ইংরেজি ‘পলিটিকস’ শব্দটি এসেছে ল্যাটিন ভাষা থেকে। ল্যাটিন ভাষায় এর অর্থ মাত্র একটি, তা হলো রাজনীতি। কিন্তু ইংরেজিতে এর অর্থ দু’টি। একটি হলো- সরকারপদ্ধতি-যন্ত্রপাতি এবং অপরটি হলো- ‘দূরদৃষ্টি অন্তর্দৃষ্টি, দৃশ্যশক্তি’। সমস্যা এখানেই। এ দেশে অনেকেই রেগে গেলে বলেন, ‘আমার সাথে পলিটিকস করছ’। অর্থাৎ এ ব্যবস্থার ব্যবহারকারীরা সাধারণ মানুষের কাছে একাধারে প্রয়োজনীয়, অপর দিকে নিন্দনীয়। দুই ধারার এই ব্যবস্থা তাই মানবজীবনকে, বিশেষ করে আধুনিক মানবজীবনকে করে তুলেছে জটিল, সংঘর্ষ ও সঙ্ঘাতময়।

অনেকেই চিকিৎসাশাস্ত্রের অ্যান্টিবায়োটিক এবং গণন্ত্রকে সমার্থক মনে করেন। অ্যান্টিবায়োটিক যেমন বহু রোগের চিকিৎসায় যেমন বাহিক সাফল্য দেয়, তেমনি গণতন্ত্র সবাইকে সাময়িক সম্মোহিত করে এক সুন্দর চিত্রের নির্দেশনা দেয়। আবার অ্যান্টিবায়োটিকের গোপন বিপদ ও ক্ষতিগুলো যেমন মহাবিপদের সৃষ্টি করে, তেমনি গণতন্ত্রের প্রধান ব্যবহার হয়ে ওঠে জননিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে। এটাকে প্রধান বাহক হিসেবে ব্যবহার করে বিশ্বে আবির্র্ভূত হয়েছে বিশালসংখ্যক স্বৈরশাসকের। এদের ক্ষমতা দখলে সামরিক শক্তির প্রয়োজন পড়েনি। প্রায়ই দেখা যায়, এরা সামরিক শাসনের চেয়ে কঠোর এবং জন-অধিকার বঞ্চনায় অতীব পারঙ্গম। এক বিখ্যাত লেখক বিচার্ড প্লাট গণতন্ত্রের সমস্যার কথা আলোচনা প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন, ‘যত দিন সবার জন্য সব কিছু দেয়ার প্রতিশ্রুতি পালিত হয়, তত দিন গণতন্ত্রের সমৃদ্ধির পথ খোলা থাকে।’ ফ্রিডম হাউজ তাদের অনুসন্ধানে পেয়েছে ‘বাহ্যিকভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিকব্যবস্থা নিশ্চিত দেখা গেলেও আসলে গণতান্ত্রিক অধিকার বা প্রতিষ্ঠাগুলো প্রায়ই হারিয়ে গেছে অথবা যাচ্ছে। শুধু আছে লেবাসটি। এক জরিপে দেখা গেছে- গণতন্ত্রের ধারক-বাহক বলে দাবিদার পশ্চিমা রাজতন্ত্রী শক্তিবর্গ বিশ্বব্যাপী সব স্বৈরাচারের দখলী নির্বাচনপ্রক্রিয়াকে সমর্থন করে। সম্প্রতি হাঙ্গেরি ও পোল্যান্ডসহ এমন ৩০টি দেশে স্বৈরতান্ত্রিক সরকার গঠিত হয়েছে নির্বাচনের মাধ্যমে। তৃতীয় বিশ্বে এখন সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সরকার নেই বলেই এই জরিপ উল্লেখ করেছে। ইটালীয় রবার্টো সার্ভিও আইপিএসের এক নিবন্ধে লিখেছেন, ‘গত দুই দশকের গ্লোবালাইজেশনের (বিশ্বায়নের) ধাক্কায় বৈষম্যের পাহাড় সৃষ্টি হয়েছে।’ ফলে দারিদ্র্য বেড়েছে, চাকরি হারিয়ে যাচ্ছে। এক কথায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবিচার প্রসার হয়েছে বিশাল। এখন সব কিছু অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির নিক্তিতে বিচার করা হয়। শিক্ষা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, চিন্তা ও বক্তব্য সব কিছু। প্রশ্ন করা হয়, ‘এটা করলে কী লাভ’? নীতির প্রশ্ন অবান্তর।

ফরাসি বিপ্লবী নেতা স্টিফানে হেসেল ‘এখন ক্রুদ্ধ হওয়ার সময়’ বক্তব্যে (২০১০) বলেছিলেন, ‘১৯৪৮ সালের ‘ইউনিভার্স্যাল ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটস’ গ্রহণের সময় যে অবস্থা ছিল তার কোনো পরিবর্তন হয়নি। এই ঘোষণার খসড়া তৈরির সময় শক্তিশালী দেশগুলো ইন্টারন্যাশনাল (আন্তর্জাতিক) শব্দটি ব্যবহার করতে চেয়েছিল। হেসেল তার প্রতিবাদ আন্দোলন শুরু করেন এবং ‘ইউনিভার্স্যাল’ (সার্বজনীন) শব্দটি গ্রহণে বাধ্য করেন। কারণ, তিনি সঠিক ধারণা করেছিলেন, কোনো এক সময়ে মানবিক অধিকার বিষয়টি বিভিন্ন দেশ বাদ দেবে। সার্বজনীন হলে তা হবে না। গণতন্ত্রের জন্যও তা প্রযোজ্য।

আজ সারা বিশ্বে নির্বাচনের পথ ধরে কেবলি গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষাকারীরা ক্ষমতায় যাচ্ছে এবং জনগণের অধিকার নানা ছলে সীমিত করছে। স্বৈরশাসকেরা জন-অধিকার এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতের নামে তাদের সব অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। ফলে গণতন্ত্র তার লেবাসটা দিয়ে গোপনে বিদায় নিয়েছে। এখন শুধু গণতন্ত্রের লেবাস আছে, গণতন্ত্র নেই।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫