ঢাকা, সোমবার,২০ নভেম্বর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

অসতর্ক মন্তব্য নয়

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

১৭ আগস্ট ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৮:৫০ | আপডেট: ১৭ আগস্ট ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৯:০৪


 ড. আবদুল লতিফ মাসুম

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

প্রিন্ট

‘বেটার লেট দ্য নেভার’। অবশেষে আইনমন্ত্রী বললেন, ‘কথা বলতে হবে সতর্কতার সাথে।’ সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পর প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিরুদ্ধে লাগামহীন মন্তব্য করছিলেন আওয়ামী লীগের নেতা, পাতিনেতা ও সিকি নেতারা। প্রাথমিকভাবে শীর্ষ নেতৃত্বের কথায় ‘সংযম’ পরিলক্ষিত হলেও পরবর্তীকালে বাঁধ ভেঙে যায়। রায়ের চেয়ে পর্যবেক্ষণ নিয়ে মাতম বেশি লক্ষ করা যায়। বাংলা ভাষায় ‘বারো হাত কাঁকুড়ের তের হাত বিচি’ অথবা ‘বাঁশের চেয়ে কঞ্চি বড়’ বলে প্রবাদ আছে। সে রকম রায়ের চেয়ে পর্যবেক্ষণ নিয়ে যখন আবোল-তাবোল মন্তব্য শুরু হয় তখন বোঝাই যাচ্ছিল, ‘তাহারা রায় এবং পর্যবেক্ষণ আদৌ অধ্যয়ন করেন নাই’।

কারণ, প্রধান বিচারপতি যা বলেননি, তা নিয়ে তারা তার চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করছিলেন। যেমন একক নেতৃত্বের প্রসঙ্গটি। তিনি যা বলেছিলেন তা হলো ‘নো ন্যাশন, নো কান্ট্রি ইজ মেড অব অর বাই ওয়ান পারসন’ কোনো জাতি বা দেশ কোনো এক ব্যক্তি দিয়ে গড়ে ওঠে না কিংবা একজনের মাধ্যমে তা গঠিত হয় না। এ রকম একটি নীতিবাক্যকে তারা বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতাযুদ্ধের অবদানের সাথে গুলিয়ে ফেলেছেন। অথচ এই বাক্যের পরে এস কে সিনহা জাতির জনক এবং তার স্বপ্নের সোনার বাংলা সম্পর্কে ইতিবাচক মন্তব্য করেন। আর একটি বিষয় হলো, বর্তমান সংসদ সম্পর্কে প্রধান বিচারপতির মন্তব্য। বর্তমান সংসদ ‘অকার্যকর’ সরাসরি এ রকম কোনো মন্তব্য রায়ে নেই। তবে বর্তমান সংসদের ৭০ পার্সেন্ট রাজনীতিকের আইন প্রণয়নে কোনো ভূমিকা নেই, এ ধরনের একটি মন্তব্য রয়েছে। এ মন্তব্যকে প্রকারান্তরে ‘অকার্যকর’ ব্যাখ্যা করে বিরোধী দল তাদের নৈতিক ভিত্তিকে সুদৃঢ় করতে চায়।

অপর দিকে এ ধরনের মন্তব্যে ক্ষমতার মসনদে কোনো টানাপড়েন ঘটে কি না, তা চিন্তা করে ক্ষমতাসীনেরা বিচলিত। আরেকটি অভিযোগ সরকার পক্ষ থেকে করা হয়, রায়ে সংসদ সদস্যদের ‘অপরিপক্ব’ বলা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে মূল বাক্যটি ছিল ‘সংসদীয় গণতন্ত্র অপরিপক্ব’। বিষয়টি সরকারি দলের নেতারা গভীরভাবে বিবেচনা না করে যেভাবে ঢালাও মন্তব্য করেছেন তাতে এসব নেতার হাজারবার আদালত অবমাননার অভিযোগ করা যায়। একজন মাহমুদুর রহমান একটি বাক্য উচ্চারণ করে যদি চার বছর দণ্ডিত হয়ে থাকেন, তাহলে এদের ৪০ বছর শাস্তি হওয়ার কথা।

পেন্ডোরার বাক্সটি খোলা হয় মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে। মন্ত্রীরা যাচিত-অযাচিত মন্তব্য করেন। প্রধানমন্ত্রী রায়ের বিরুদ্ধে জনমত গঠনের কথা বলেন। নিয়মতান্ত্রিকভাবে জনমত গঠনে কোনো বাধা দেখি না। কিন্তু গালাগালি, ভীতিপ্রদর্শন ও অবমাননাকর মন্তব্য নিশ্চয় জনমত গঠনের পর্যায়ে পড়ে না। ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের নেতা- নেত্রীরা কে কী বলেছেন, তার একটু হিসাব-নিকাশ নিলে বিষয়টি বোঝা সহজতর হয়।

১. ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের মধ্য দিয়ে প্রধান বিচারপতি পাকিস্তানের পাতা ফাঁদে পা দিয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। ২. সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। পাশাপাশি তিনি হিন্দু সম্প্রদায়কে স্মরণ করিয়ে দেন যে, মাইনোরিটি কমপ্লেক্স নিয়ে থাকলে দুর্বৃত্তরা সুযোগ নেবে। ৩. ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়কে ‘মতলবি রায়’ বলে মন্তব্য করেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী। এ ছাড়া তিনি প্রধান বিচারপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ৪. সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী রায়কে ‘ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত্রের অংশ’ বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, মহাজোটের সমন্বয়ক ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। ৫. নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বলেছেন, ‘ষোড়শ সংশোধনী রায়ে সংসদ অবমাননা করা হয়েছে। এ রায়ে ১৬ কোটি বাঙালিকে অপমান করা হয়েছে’। ৬. গাজীপুরে ১৫ আগস্ট স্মরণ সভায় মুক্তিযোদ্ধা বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘সংসদে যখন আইন পাস করে, বেতন বাড়ানো হয় তখন সংসদ খুব যোগ্য হয়। আর যখন বলা হয়, সংসদে বিচারকদের ভুলের বিচার হবে তখনই সংসদ অযোগ্য লোকদের কেন্দ্র্রে পরিণত হয়’। ৭. ‘প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার, আলবদর ও পাকিস্তানিদের সহযোগী শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন’ বলে মন্তব্য করেন আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ও দলের অন্যতম মুখপাত্র ড. হাসান মাহমুদ। ৮. প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ দাবি করেন খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম। তিনি আরো মন্তব্য করেন যে, বিএনপি প্রধান বিচারপতির ঘাড়ে চেপে রাজনীতি করতে চায়। ৯. ‘সংসদ সদস্যরা ‘ইমম্যাচুরড’ হলে আপনিও ‘ইমম্যাচুরড’- প্রধান বিচারপতিকে লক্ষ্য করে তোফায়েল আহমেদ বলেন। ১০. ‘জনগণের প্রজাতন্ত্র নয়, বরং বিচারকদের প্রজাতন্ত্রে বাস করছি’ ষোড়শ সংশোধনী সমালোচনা করেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলকারী, আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক। ১১. ‘ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে লাজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে গেছে’ বলে এ মন্তব্য করেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ। ১২. ‘ষোড়শ সংশোধনী যতবার বাতিল করা হবে, ততবারই সংসদে বিল পাস করা হবে’ বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ১৩. ‘রায়কে রাজনীতিকরণের চেষ্টা করা হয়েছে’ বলে অভিযোগ করেছেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের প্রবীণ আইনজীবী ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন। ১৪. সভাপতিমণ্ডলীর অন্য এক সদস্য ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বুধবার সহযোগী সংগঠন যুবলীগের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে প্রধান বিচারপতির উদ্দেশে বলেন, ‘আপনি মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তির সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে যা বলছেন, তা ঠিক নয়। বাংলার মানুষ জানে, আপনি শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন। আপনি সাংবিধানিকভাবে নিয়োগ পেয়েছেন, আপনাকে সংবিধান মানতে হবে। সংসদ ও রাষ্ট্রপতিকে মানতে হবে, আপনাকে সংবিধান মেনে কাজ করতে হবে। আপনি সংবিধানের ঊর্ধ্বে নন।’ ১৫. ‘পাকিস্তানের প্রেতাত্মারা সক্রিয়, সুযোগ পেলেই ছোবল মারবে’ আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্তব্য করেন।

উপরোল্লিখিত মন্তব্যগুলো পর্যালোচনা করলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একটি বৈশিষ্ট্য অকাট্যভাবে প্রমাণিত হবে, তারা ‘রাজনৈতিকভাবে অসহিষ্ণু’। অথচ একটি গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের প্রধান শর্ত হচ্ছে সহনশীলতা, সমঝোতা, উদারতা ও অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা।

বর্তমান সময়ের উদাহরণ দিয়ে বোঝানোর দরকার নেই। সাধারণ মানুষের সামনে সব কিছুই প্রকাশিত। যে ব্যক্তি রাষ্ট্রের একটি শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন তাদের মাধ্যমে, তিনি যখন নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে আইনগত ও ন্যায্য কথা বলেছেন তখন সেই ব্যক্তিই তাদের চোখের শূলে পরিণত হলেন। আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী ও মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার (এয়ারভাইস মার্শাল) এ কে খন্দকার যখন অপ্রিয় সত্য কথা বলেন, তখন তিনি ‘রাজাকারে’ পরিণত হন। একজন বীর উত্তম কাদের সিদ্দিকীকেও তারা ‘রাজাকার’ বলার ধৃষ্টতা দেখায়। একজন প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসা যখন তাদের ভুল চিহ্নিত করতে চান, তখন তিনি তাদের শত্রুতে পরিণত হন। একজন জিয়াউর রহমান যিনি বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীনতা ঘোষণা দিয়েছিলেন, জেড ফোর্সের প্রধান হিসেবে ‘বীর উত্তম’ খেতাব অর্জন করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার ছিলেন, তিনি শুধু ক্ষমতার বৈরী বিচারে হয়ে যান আইএস এজেন্ট অথবা রাজাকার। যারা তাদের বিরোধী তাদের সবাইকে একই কাতারে ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ বলে চিহ্নিত করা তাদের একটি বদ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। একজন সংখ্যালঘু মানুষ যারা ছিলেন পাকিস্তান বাহিনীর প্রথম লক্ষ্য, তিনিও তাদের সামান্য বিরোধিতার কারণে ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ চিহ্নিত হন। অতীত ও বর্তমান ঘেঁটে দেখা যাবে, এটি তাদের বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। তারা নিজের স্বার্থ, সুবিধা ও নেতৃত্ব সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। অপরের কথা শুনতে চান না।

যে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের ২৩ বছরে গণতন্ত্রের জন্য জেল-জুলুম খেটেছেন তার হাতে যখন একদলীয় প্রথা ‘বাকশাল’ প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন জাতিকে গভীরভাবে হতাশ হতে হয় বৈকি? বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের ১০ জানুয়ারি বাকশাল বিল উত্থাপনের প্রাক্কালে দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলেছিলেন- ‘রাজা যা বলে পারিষদ বলে তার শতগুণ’। ঘরের শত্রু বিভীষণরা ‘এক নেতার এক দেশ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’ বলে তাকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল। আর উগ্র বামরা, যারা এখন তাদের সহযোগী তারা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র নামে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করেছিল। এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদকেও নিগ্রহের শিকার হতে হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের মর্মান্তিক ঘটনাবলির পরে আব্দুল মালেক উকিল, জোহরা তাজউদ্দীন ও ড. কামাল হোসেন- যারা কঠিন সময়ে হাল ধরেছেন, তারা কেউই সম্মানের সাথে বিদায় নিতে পারেননি। শুধু বাংলাদেশ আমল নয়, পাকিস্তান আমলেও একই দৃশ্যপট লক্ষ করা গেছে। ১৯৪৯ সালে জন্ম থেকে অসহিষ্ণুতার শিকার হয়েছেন অনেক রাজনীতিবিদ। এদের মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা ভাসানী, প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক, পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান, আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা আবুল মনসুর আহমদ, বিশিষ্ট আইনজীবী আব্দুস সালাম খান, আমেনা বেগম ও তাজউদ্দীন আহমেদ। এসব প্রবণতার জন্য আওয়ামী লীগকে কোনো কোনো বিশ্লেষক ‘ফ্যাসিবাদের’ সহযোগী বলতে চান। কারণ হিটলার-মুসোলিনিরা গণতন্ত্রের লেবাস ধরেই ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছিল এবং ক্ষমতাসীনদের মতোই ‘নির্বাচন প্রকৌশল’ কায়েম করেছিল। তাদের একটি ভয়ানক বৈশিষ্ট্য সবাইকে শত্রুজ্ঞান করা। সেই জুনিয়র বুশের মতো কারো ‘তৃতীয় মাত্রায়’ থাকারও সুযোগ নেই। মনীষী প্লেটোর ভাষায়- ‘তারা ঔদ্ধত্যকে অভিহিত করে আভিজাত্য বলে, অরাজকতাকে বলে স্বাধীনতা এবং অপব্যয়কে মহানুভবতা আর মূর্খতাকে বলে বিক্রম। (রিপাবলিক ৮:৫৬০)’’
লেখক : সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
mal55ju@yahoo.com

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫