ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৪ ডিসেম্বর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

করপোরেট গ্লোবালাইজেশনের নামে কী চলছে?

হারুন-আর-রশিদ

১৭ আগস্ট ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৮:৪২


হারুন-আর-রশিদ

হারুন-আর-রশিদ

প্রিন্ট

‘বিশ্বায়ন’ এখন একটি বহুল আলোচিত শব্দ। প্রযুক্তির নানা উৎকর্ষের কারণে পৃথিবী ছোট হয়ে আসছে। একে অন্যকে জানার সুযোগ ঘটছে আগের চেয়ে বেশি। এ দিকে বিশ্বায়ন নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে অনেকেই। ইতোমধ্যে অভিন্ন মুদ্রার প্রচলনসহ ভিসা পদ্ধতিরও সংস্কার শুরু হয়েছে। গোটা ইউরোপ এখন ইউনিয়নভুক্ত। অভিন্ন মুদ্রা ইউরো চালু হয়েছে অনেক আগে থেকেই। ডলারের সাথে চলছে এর বাজার নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতার যুদ্ধ। মূলত বিশ্বে মুক্তবাজার অর্থনীতি চালু হয়েছে অনেক আগে ’৮০-এর দশক থেকে। আমাদের দেশে সরকারিভাবে ১৯৯০ সালে এর প্রচলন শুরু হয়। মনে করা হয়েছে, এর মাধ্যমেই ত্বরিত উন্নয়ন সম্ভব। বিশ্বায়ন বলতে কী বুঝায়, এর উদ্দেশ্যই বা কী, এটা নিয়ন্ত্রণ করছে কারা, সুযোগ-সুবিধা কারা বেশি ভোগ করছে- এগুলো জানার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সমানে সমানে প্রতিযোগিতা হয়। সবল আর দুর্বলের মাঝে বন্ধুত্ব বেশি টেকে না।

বিশ্ববাণিজ্য বিশ্বকোষে গ্লোবালাইজেশনের ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে- গ্লোবালাইজেশন বিশ্বসভ্যতার প্রসার ও এর ব্যাপকতা দান করার একটি পথনির্দেশক বা রোডম্যাপ। সেই আলোকে ২০০৪ সালের ১ মে জানা যায়, ইউরোপীয় ইউনিয়নে ২৫টি দেশ সংযুক্ত হয়েছে এবং এই ফোরাম বিশ্বের সর্ববৃহৎ ইউনিয়নে পরিণত হয়ে বহুকেন্দ্রিক বাজার সৃষ্টি করেছে। কিন্তু দরিদ্র জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত দেশগুলোতে এর প্রতিফলন ও প্রভাব বিরূপ। অস্তিত্বের স্বার্থে এর বিশ্লেষণ নেহায়েত জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশ্বায়ন সাম্রাজ্যবাদীদের বাজার কায়েম বা দীর্ঘমেয়াদি শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে কি না, সেটাই দেখার বিষয়। বাণিজ্য ও ভাবের আদান-প্রদান ভালো; কিন্তু আদান-প্রদানের নামে একক আধিপত্য বজায় রাখার প্রয়াস চলছে কি না সে দিকে লক্ষ রাখা প্রয়োজন। বিশেষ করে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যেসব রাষ্ট্র যুদ্ধে লিপ্ত, তাদের লক্ষ রাখা জরুরি। অপ্রিয় সত্য যে, কয়েকটি দেশ গ্লোবালাইজেশনের নামে গোটা বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালাচ্ছে, বিশ্বপুঁজি তাদের দখলে।

বহুজাতিক ব্যবসায়ীরা বিশ্বায়নের নামে ঢুকে পড়ছে তৃতীয় বিশ্বের সম্পদশালী দেশগুলোতে। দাতাগোষ্ঠীর মাধ্যমে নানা ফর্মুলার ব্যাখ্যা উপস্থাপন করছে এবং বলছে ওদের নির্ধারিত ফর্মুলা অনুযায়ী চলতে হবেই, অন্যথায় সাহায্য বন্ধ করে দেয়া হবে। বেসরকারীকরণের মাধ্যমে দাতা সংস্থা পুঁজি খাটিয়ে অধিক মুনাফা লুটে নিচ্ছে। পরামর্শ দিচ্ছে চটকদার বাক্যের মাধ্যমে। তৃতীয় বিশ্বের সরকারগুলো সাহায্য পেতে চাইলে দাতা সংস্থার প্রেসক্রিপশন বাস্তবায়ন করতে হবে। ঋণ দেয়া হয়, যদি বেসরকারীকরণের নীতিমালা তাদের ফর্মুলা অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা হয়। এভাবে নানা শর্ত জুড়ে দিচ্ছে তারা।

বিশ্বায়নের একক নেতৃত্ব এখনো মূলত থাকছে যুক্তরাষ্ট্রের কব্জায়। চীন আর জাপানও বসে নেই। তারাও কোমর বেঁধে নেমেছে বাজার দখলের যুদ্ধে। কিন্তু এই যুদ্ধে শুধু হেরে যাচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলো। ২০০৫ সালে পবিত্র হজ উপলক্ষে সৌদি আরবে গিয়ে নিজ চোখে দেখে এসেছি, কিভাবে কয়েকটি দেশের পণ্য বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারত মধ্যপ্রাচ্যের বাজার দখল করে নিয়েছে। করপোরেট গ্লোবালাইজেশনের প্রবক্তারা উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোতে সুন্দরী নারী আর বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে কিছু দালাল পোষেন। তারা সরকারের মন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতা হতে পারেন। হতে পারেন সরকারি আমলা বা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক এবং তাদের মাধ্যমেই পরিকল্পিত মিশন বাস্তবায়নের কাজ ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। দেশের সার্বিক উন্নয়নের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থকে যারা প্রাধান্য দেন, মূলত তারাই বিশ্বায়নের ফ্রেমে আবদ্ধ হন এবং তাদের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী কাজ করেন। দাতাগোষ্ঠীর বিশাল ফান্ড কিভাবে গঠিত হলো, কোথা থেকে ফান্ডের বিশাল অঙ্ক সংগৃহীত হলো তা নিয়ে আমরা অনেকেই ভাবছি না। নিজ নিজ অস্তিত্বের স্বার্থে তা ভাবা একান্ত প্রয়োজন। ওরা যে ঋণ দেয়, এ টাকা ওদের নয়। বাণিজ্যের ছদ্মাবরণে তৃতীয় বিশ্ব থেকে লুণ্ঠন করা অর্থ, চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ-আসলে পুনরায় শোষণ করার জন্য উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের সরকারকে দেয়া হয়। প্রাইভেটাইজেশন হলে দাতা সংস্থার লাভ এ কারণে যে, তখন তাদের শোষিত অর্থের বিনিয়োগের সুযোগ ঘটবে এবং প্রতি বছর বিনিয়োগকৃত অর্থের ওপর প্রচুর মুনাফা লুটাও সম্ভব হবে।

এভাবেই কৌশলগত পদ্ধতিতে শোষণপ্রক্রিয়া চলতে থাকে যুগের পর যুগ ধরে। এ প্রসঙ্গে সাবেক অর্থমন্ত্রী মরহুম সাইফুর রহমানের একটি সহজ-সরল উদ্ধৃতি এখানে তুলে ধরব। ৪ মার্চ ২০০৪ সালে সংসদে তিনি বলেছিলেন, এনজিওরা দারিদ্র্য নিরসনকে পুঁজি করে নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার করছে। না হলে তারা কিভাবে বড় বড় টাওয়ার, ব্যাংক নির্মাণ করে? কোথা থেকে এ টাকা আসে? দারিদ্র্যের কথা বলে এনজিওরা বিদেশ থেকে বিনা সুদে টাকা এনে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ সুদ নিচ্ছে গরিব মানুষের কাছ থেকে। এক শ্রেণীর অর্থলোভী মানুষ গ্রামগঞ্জে গরিব মানুষের ছবি তুলে ‘ঢাকাভিত্তিক দাতা সংস্থার বিভিন্ন অফিসে দেনদরবার করছে এই বলে যে, তারা গরিব মানুষের উন্নয়নের জন্য গলদঘর্ম হয়ে কাজ করছে। আর নারী ও শিশু উন্নয়নে এবং দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে তাদের ভূমিকা অপরিসীম।’ এভাবে তারা বিদেশীদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়ে জনকল্যাণে তা ব্যয় না করে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যয় করছে। ছোট-বড় মিলিয়ে ৪০ হাজার এনজিও যদি আন্তরিকভাবে দেশের জন্য কাজ করত, তাহলে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ঘটত এবং বেকার সমস্যা ভয়াবহ রূপ নিত না। ৪৬ বছরে এখনো উন্নয়নশীল রাষ্ট্র বাংলাদেশ উন্নত রাষ্ট্র হতে পারেনি।

অধুনা গ্লোবালাইজেশনের সংজ্ঞা দিয়েছেন ড. তুর্ক উল হামদ। তার মতানুসারে, গ্লোবালাইজেশন পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার শুধু উন্নতি ও অগ্রগতির কর্মপদ্ধতিই নয়, বরং এই কর্মপদ্ধতিকে মেনে নেয়ার একটি সার্বজনীন দাওয়াতের নাম। এটি গোটা দুনিয়ার ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ইচ্ছাকে পরোক্ষভাবে অস্তিত্ব দানের একটি মাধ্যম বা উপায়। সংক্ষেপে ‘বিশ্বায়ন’ বলতে বুঝায়, ক্ষমতা ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার দিকে অগ্রসর হওয়া এবং প্রতিটি ভালো ও উপকারী বস্তুকে নির্মূল করা।

যেসব রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড শক্ত নয়- অর্থাৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নেই, ব্যাপক সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি এবং অসহনশীল সমাজব্যবস্থার কারণে একটি শক্ত অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে ওঠে না, এদের সম্পদ আছে; কিন্তু সম্পদের আহরণ ও তার সুষ্ঠু বণ্টনের বিজ্ঞানভিত্তিক কোনো ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে বহুজাতিক ব্যবসায়ীদের পণ্য বাজারজাত করার সুযোগ ত্বরান্বিত হয়। বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম একটি রাষ্ট্র। ভারতের সাথে বাংলাদেশের অসম বাণিজ্য চলছে। বিগত দুই দশক ধরে এর আনুপাতিক হার ১০০ : ২ (দুই)। নতুন একটি বিশ্ববাজার চাই, যা সাম্রাজ্যবাদী দখলমুক্ত বাজার হতে হবে। এই চিন্তা-চেতনা প্রবল না হওয়ার কারণে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো স্বনির্ভর হতে পারছে না। এটা নিজ নিজ দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের প্রশাসনিক ব্যর্থতায় রূপ নিয়েছে বলে তারা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকছে।

এরপরও আশার আলো দেখা গেছে- ২০০৩ সালের শেষের দিকে করপোরেট গ্লোবালাইজেশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হতে দেখা যায়। মেক্সিকোর রাজধানী কানকুনে নব্য সাম্রাজ্যবাদীদের বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার মহাসম্মেলন ব্যর্থ হয়েছে বিশ্বের নিপীড়িত নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর প্রতিবাদের মুখে। অন্যটির আয়োজক ছিলেন তৃতীয় বিশ্বের ডেলিগেটরা তথা শিল্প উদ্যোক্তারা। তারা জড়ো হয়েছিলেন মুম্বাই শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরের একটি স্থানে। তারা স্বনির্ভর বাজারব্যবস্থার পক্ষে জোরালো বক্তব্য রেখেছিলেন। বৃহৎ শ্রেণীর মানুষ কথিত গ্লোবালাইজেশনের কারণে যে নিষ্পেষিত হচ্ছে এবং তারা যে প্রতিবাদমুখর তারই দৃষ্টান্ত ছিল সম্মেলন দুটো। কারা শোষক এবং কারা শোষিত হচ্ছে অর্থাৎ ‘শোষক এবং শোষিত’ এই দুই শ্রেণীর চরিত্র, মানুষ এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি অনুধাবন করতে পারছে। হালের যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাক বিশ্বায়নের প্রবক্তাদের মর্জিমাফিক না চলার ফলে সাদ্দাম ও তার সরকারের করুণ পরিণতি ঘটেছে। তেলের মালিকানা যদি তিনি দিয়ে দিতেন এবং বহুজাতিক কোম্পানির ভোগ্যপণ্যের অবাধ প্রবেশ যদি ইরাকে ঘটানো হতো, তাহলে সাদ্দাম খারাপ মানুষ হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও তার দোসরদের কাছে জামাই আদরে থাকতেন। এক সময়ের প্রবল প্রতিবাদী রাষ্ট্রনায়ক লিবিয়ার কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফি (জাতীয়তাবাদী নেতা) সাদ্দামের করুণ পরিণতি দেখে সাম্রাজ্যবাদী নাটের গুরুদের সাথে আপসরফা করেছিলেন, তবু বাঁচতে পারেননি। তথাকথিত বিশ্বায়নের মোড়লদের একক আধিপত্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে সোচ্চার হতে না পারলে কোনো দেশেরই সত্যিকার অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটবে না, এটাই বাস্তব। বিলম্বে হলেও জাতিসঙ্ঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান অতি সত্য কথাটি বিবিসিকে বলেছেন- যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক হামলা ছিল সম্পূর্ণ অবৈধ (এএফপি ১৬-৯-০৪)। বিশ্বায়নের নামে ইঙ্গ মার্কিনিদের মোড়লিপনার বিপক্ষে এই জোরাল উক্তিটি প্রণিধানযোগ্য।


এবার বিশ্বায়নের গোলকধাঁধার ফাঁদে আমরা কিভাবে পা দিয়েছি সে সম্পর্কে দু-একটি কথা বলতে হয়। বাজার অর্থনীতির সুবাদে সারা বিশ্বে পণ্যসামগ্রীর আদান-প্রদান ঘটবে, প্রতিযোগিতার মাধ্যমে টিকে থাকতে হবে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু শুল্কমুক্তির মতো নানা বাহানা দিয়ে পণ্যের চাপিয়ে দেয়া একক আধিপত্য অগ্রহণযোগ্য এবং সে ক্ষেত্রে নিজ নিজ দেশের অস্তিত্বের স্বার্থে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হতে হবে। বিদেশী পণ্যের প্রভাব সম্পর্কে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমান (কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর) সম্প্রতি এক সেমিনারে বলেছেন, ‘মুক্তবাজার অর্থনীতির সুবাদে আমাদের দেশে নানা ধরনের বিদেশী পণ্য অবাধে ঢুকে পড়েছে। এসব বিদেশী পণ্যের আধিপত্যের কারণে আমাদের দেশের উৎপাদিত পণ্য বাজার হারাতে বসেছে। অনেক ছোট-বড় কারখানা বন্ধ হয়ে আমাদের শ্রমের বাজারে বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। শুধু গড়ে উঠছে অনুৎপাদনশীল খাত আধুনিক শপিংমল, যেখানে বিদেশী পণ্যে ঠাসা থাকে। এভাবেই স্বদেশী বাজার দখল করে নিচ্ছে বিদেশীরা মুক্তবাজার অর্থনীতির ধুয়া তুলে। চোখ-কান খোলা রাখতে হবে; যাতে করে স্থানীয় শিল্পবাজার ধ্বংস হয়ে না যায়। তাহলে আমরা হারিয়ে যাব। একটি দেশ থেকে আমরা শুধু আমদানি করব ৮০ শতাংশ পণ্য; অথচ সে দেশটি আমাদের দেশের পণ্য ক্রয় করবে মাত্র ১০ শতাংশ। এ ধরনের অসম বাণিজ্য দেশকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে দেয়।

মুক্তবাজারের নামে পরিকল্পিত এ শোষণের ফাঁদে আমরা পা দিয়েছি। অতীত ও বর্তমান সরকার বিশ্বায়নের নামে কি এ ধরনের একটি উদার বাণিজ্যনীতি প্রবর্তন করেছে? ভেঙে ফেলেছে কি সব নিয়ন্ত্রণ কাঠামো? যেমন ধরুন, সরকার গুঁড়ো দুধের ওপর থেকে আমদানি শুল্ক কমানো সত্ত্বে¡ও কেজিপ্রতি দুধের দাম বেড়েছে ১৬৫ টাকা। ভোক্তাদের শোনানো হয় নানা কথা। যেমন- আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বেড়েছে, ডলারের দাম বেড়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভর্তুকি বন্ধ হয়ে গেছে, দক্ষিণ আমেরিকায় ডাল সয়া ফলন হয়নি, অতি বৃষ্টির ফলে ভারতের দক্ষিণাঞ্চলে পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে গেছে, সরবরাহ কম, ভালো জিনিসের দাম বেশি, হরতাল-চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের অজুহাত ইত্যাদির কথা শুনতে হয়। মূলত ১৯৯০ সাল থেকে মুক্তবাজার অর্থনীতি বাংলাদেশে কার্যকর হওয়ার পর থেকে বাজার নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে।

’৯০-এর দশকের আগে এ দেশে বাজারদর সরেজমিন পর্যবেক্ষণ ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারের অধীনে মূল্য যাচাই ও বাজার নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর নামে একটি প্রতিষ্ঠান ছিল। মুক্তবাজার অর্থনীতি চালু হওয়ার পর ১৯৯০ সাল থেকে ডব্লিউটিও চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকার এটি বিলুপ্ত করে দেয়। ভোক্তাদের পক্ষে গড়ে ওঠা নীতি নয়- দাতাদের চাপে বাণিজ্যনীতি অবাধ করে দেয়া হয়। বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করা হলো। এতে বেসরকারি উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও কর্তৃত্ব সীমাহীনভাবে বাড়তে থাকে। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সরকারের এই ভ্রান্তনীতির কারণে পণ্যমূল্য বাড়ছে। বাজারের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ কমে যাচ্ছে। অনেকটা ঠুঁটো জগন্নাথের মতো অবস্থা দাঁড়িয়েছে সরকারের। মাত্র এক যুগের ব্যবধানে দেশের বাজারদর ওঠানামার ব্যাপারটি গুটিকয়েক আড়তদার মহাজনের খেয়ালখুশির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এসব কিছুই কথিত বিশ্বায়নের খপ্পরে পড়ার কারণে ঘটছে।

বিশ্বায়নের মোড়লদের নেতৃত্বে রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। গ্লোবালাইজেশনের নামে বাজার দখল, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি দখল তথা দেশের সার্বভৌমত্ব দখল- এ কাজগুলো যাতে না হয়, সে ব্যাপারে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর সরকার ও সচেতন জনগোষ্ঠীকে তৎপর ভূমিকা পালন করতে হবে। বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা যাবে, কিন্তু প্রভু হিসেবে কাউকে গ্রহণ করা হলে সর্বনাশ ঘটবে- এই উপলব্ধি জাগরিত হোক বিশ্বের শোষিত জনগোষ্ঠীর হৃদয়ে। তাহলেই তারা শির উঁচু করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে, আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচতে পারবে।
E-mail : harunrashidar@gmail.com

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫