ঢাকা, শুক্রবার,২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭

বিবিধ

দেশ ও দ্রোহের কবি আবুবকর সিদ্দিক

সৈয়দ তোশারফ আলী

১৭ আগস্ট ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৬:৫৪


প্রিন্ট

কবি আবুবকর সিদ্দিক এখন আর আগের মতো লিখছেন না। তাই বলে কবিতা লেখা একেবারে ছেড়েও দেননি। শরীর মন কবিতা লেখার অনুকূল না থাকলেও অনুরোধের মর্যাদা রাখতে তাকে মাঝে-মধ্যে লিখতে হয়। সাত দশক ধরে যিনি কাব্যলক্ষ্মীর সেবা করে চলেছেন তার সুবিশাল শিল্পকর্মের মূল্যায়ন করা মোটেও সহজ ব্যাপার নয়। দীর্ঘ বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে কবিতা লেখার পর তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ধবল দুধের স্বরগ্রাম’ বের হয় ১৯৬৯ সালে। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘বিনিদ্র কালের ভেলা’ বের হয় ১৯৭৬ সালে। ‘হে লোক সভ্যতা’ তার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ, বের হয় ১৯৮৪ সালে। এরপর তার আরো কাব্যগ্রন্থ মাঝে-মধ্যে বের হয়েছে। সর্বমোট ১২টি কাব্যগ্রন্থের পর তার ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ প্রকাশিত হয় অমর একুশে গ্রন্থমেলায় ২০০২ সালে। এটি তার নিজের বাছাইকৃত কবিতার একটি সংকলন গ্রন্থ। তার কাব্য সাফল্য নিয়ে আলোচনার জন্য এটি একটি মূল্যবান দলিল।
আধুনিক জীবনের মতো আধুনিক কবিতাও বেশ জটিল। প্রতিটি কবিতাই একটি শিল্পকর্ম। যার ভেতরে কবিমনের ছবি ধরা পড়েছে। বাছাই করা শব্দ, ধ্বনি, উপমা ইত্যাদি ব্যবহার করে কবি তার প্রতিটি শিল্পকর্ম আকর্ষণীয় করে তুলেছেন। কবিতায় ব্যবহৃত শব্দের সঙ্গে কবির ব্যক্তিগত জীবনের অনুসঙ্গ অনেক সময় জড়িয়ে থাকে। তাই অনুসঙ্গটি জানলে কবিতার অর্থ বুঝতে সুবিধা হয়। কবির দেখা নিসর্গ, ঘটনা, নর-নারী সবই যদি কবিতায় সরাসরি বর্ণিত হয় তাহলে তা হবে সাংবাদিকতা-কবিতা হতে হলে তা কবিমনে কিভাবে গৃহীত হয়েছে তার সামগ্রিক জ্যোতির্ময় রূপ প্রকাশ পেতে হবে কবিতায়। কাজটি কঠিন এবং সাধনার ব্যাপার। পাঠক কবিতায় সৌন্দর্যের দীপ্তি দেখতে চায়। বাস্তব জীবনের রূঢ়তা, দুঃখ-বেদনা, হতাশা বিষণœতা ইত্যাদি কবিতায় থাকতে পারবে না, এমন আবদার করা নিরর্থক। তবে বেদনাকে আনন্দে রূপান্তর ঘটাবার ক্ষমতা রাখেন শিল্পী, কবি, গরলকে পারেন অমৃত রূপে পরিবেশন করতে। আশা-ভালোবাসা এবং বিশ্বাসের ছবি আঁকবার ব্যাপারে কবি, শিল্পীদের কোনো জুড়ি নেই। পঙ্কে পদ্ম ফুল ফোটানোর দায়িত্বও নিতে পারে কবি। কবিতা লেখার সময় পাঠককে প্রলুব্ধ বা আকৃষ্ট করার কথা ভাবতে হয় কবিকে। শব্দের, ধ্বনির, উপমার, দার্শনিকতার- এক কথায় রস সৃষ্টির একাধিক উপাদান যথাসম্ভব ঢোকাতে হয় কবিতায়। তা সে বাণীর মহিমা হোক, প্রকাশ ভঙ্গির ভিন্নতা হোক, রচনাশৈলীর বৈচিত্র্য হোক কিংবা চিত্রময়তা হোক। কবিতার কাঁধে কোনো বোঝা চাপানো যাবে না, এমন মতই পোষণ করে গেছেন কবি ও সাহিত্য সমালোচক বুদ্ধদেব বসু। শিল্পের জন্য শিল্প, এটাই ছিল তার প্রত্যয়। তাই কাজের কথা, প্রয়োজনের কথা, দার্শনিকতার বিরোধী ছিলেন তিনি। কবিতা হবে নির্ভার শিল্প। কিন্তু তার এ মতের অনুসারী কবির সংখ্যা নিতান্তই সীমিত। জীবনানন্দ দাশতো ইতিহাস চেতনা, কাল চেতনা দিয়ে তার কবিতার অবয়ব নির্মাণ করেছেন। তাকে অবশ্য বুদ্ধদেব বসু ‘এক বিমূঢ় যুগের বিভ্রান্ত কবি’ হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু যেটা বিবেচ্য বিষয় তাহলো কবিতার ভেতরে কাল চেতনা, ইতিহাস চেতনা ঢোকানোর ফলে জীবনানন্দ দাশের কবিতায় কী নতুন মূল্য যোগ হয়নি? আর দার্শনিকতার সংযোগ কী তার কবিতাকে মহার্ঘ করে তোলেনি? এখানে তার একটি কবিতার কয়েকটি লাইন উদ্ধৃত করা নিশ্চয়ই অপ্রাসঙ্গিক হবে না- “যেখানেই যাও চলে, হয় নাকো জীবনের কোন রূপান্তর;/ এক ক্ষুধা এক স্বপ্ন এক ব্যথা বিচ্ছেদের কাহিনী ধূসর/ ম্লান চুলে দেখা দেবে যেখানেই বাঁধো গিয়ে আকাক্সক্ষার ঘর।/ বলিল অশ্বত্থ সেই ন’ড়ে ন’ড়ে অন্ধকার মাথার উপর।”
কবির ব্যক্তি জীবনের হতাশা ও নৈরাশ্য তার কবিতায় গভীর ছায়া ফেলেছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়ছে অনাকাক্সিক্ষত অমানবিক বাস্তব অবস্থা। ‘আমরা ঢাকায় যারা নিরুপায় বসবাস করি/ ভাড়াবড়িতে, ট্রাফিক জ্যামে ঝুলে থাকি দিনমান,/ গত্যন্তরহীন, ঈশ্বরের করুনাবিহীন; মরে বেঁচে আছি।’ [মৃত্যু হচ্ছে আমারও]।
কবি যে প্রত্যয় নিয়ে কাব্যচর্চা শুরু করেছিলেন, সময়ের ধারায় সে প্রত্যয় নিঃশেষিত। এখন তিনি ভাগ্যকে দোষারোপ করছেন, বিধির বিধানের ন্যায্যতাকে প্রশ্নবানে বিদ্ধ করছেন। লিখছেন, “জনারণ্যে সন্ত খোঁজে/ শব্দ ধ্বনির নিদান;/ কবির বেলায় সাগর শুকায়/ এ কী বিধির বিধান!” [কবিভাগ্য]
এটা বিধির বিধান নয়, তবে বাজার অর্থনীতির বিধান হতে পারে। তার মতো রাজনীতি সচেতন কবি কেন বুঝবেন না বিদ্যমান সমাজ বাস্তবতায় সমাজ পরিবর্তনকামী কবিদের উপেক্ষিত হওয়াটা মোটেই অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। এর কারণ নানাভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ রয়েছে।
কবিতায় যথা শব্দ খুঁজে প্রয়োগ করার ব্যাপারে কবি আবুবকর সিদ্দিক বরাবরই একটু খুঁতখুঁতে। বলায়, লেখায় এবং কবিতায় সর্বত্র শব্দ নিয়ে খেলা করার একটা প্রবণতা তার মধ্যে আছে। একে মুদ্রাদোষ না বলে তার অন্যতম বিশিষ্টতা হিসেবে গণ্য করতে হবে। কবিতা বোঝার জন্য কবিতায় ব্যবহৃত শব্দের অনুসঙ্গ বোঝার প্রয়োজন অনস্বীকার্য। আবুবকর সিদ্দিকের কবিতায় বিভিন্ন জনপদের স্থানীয় ও আঞ্চলিক অনেক ব্যক্তি, ঘটনা ও জায়গার নাম ব্যবহৃত হয়েছে। এসব ব্যক্তি ও ঘটনা সম্পর্কে সব পাঠকের সম্যক ধারনা থাকার কথা নয়। যেমন ‘বাহিরাদিয়া’ শীর্ষক কবিতায় তিনি বলেছেন, ‘... আমার বড়ো প্রিয়/ছাত্র ছিলে ললিত, তোমার নামে বুক মোচড়ায়/ আজো এই বাহিরহিয়ার পথে এসে।’ কবিতায় দেয়া তথ্য মতে ললিত ছিল ফুলটাইম পার্টি ক্যাডার এবং সে শ্রেণীশত্রু খতমের রাজনীতি করতে গিয়ে জীবন হারায়। বাহিরদিয়া ছিল ললিতদের কথিত বিপ্লবের অন্যতম ঘাটি বা মুক্ত এলাকা। সময়ের ধারায় আজ আর সেখানে তাদের কোন স্পন্দন শোনা যায় না। ভুল-ভ্রান্তির চোরাবালিতে আটকা পড়ে সে রাজনীতি আর উত্তরণের সঠিক পথ খুঁজে পায়নি। কবি আবুবকর সিদ্দিক তার ‘ভবিতব্য’ শীর্ষক কবিতায় সে রাজনীতিকে ব্যঙ্গ করতেও কসুর করেননি। দেখুন তার কবিতার ভাষা: “আমাদের হবে না ঘরবাড়ি, আমাদের হবে না/ সমতা কস্মিন কালে। বাসা ও বাসের চির/ অনটন, আমাদের রাজবেশ ধূলোয় গড়াগড়ি।/ হে ভিখিরী! দুঃখ নেই, নিজেকে ক’জনা চেনে!/ রিকশার টিউব ফাটার শব্দে চমকে ওঠে আজ। চারুবাবুর ক্যাডার।”
নিজের কবিতা শেষ পর্যন্ত সময়ের মাড়াইকলের বর্জ্যে পরিণত হবে কিনা, সে সম্পর্কে কবিমনে যে সন্দেহের ছায়াপাত ঘটেছে সে সম্পর্কে মন্তব্য করা কঠিন। জীবনানন্দ দাশ তার ‘কবিতার কথা’য় একটা কঠিন সত্য উচ্চারণ করেছেন। বলেছেন, অনেকের কবিতা বইয়ের শুষ্ক পাতায় বন্দী হয়ে থাকে, মানুষের হৃদয়ে মুদ্রিত থাকে না। কথাটা সাধারণভাবে কবিদের জন্য দুঃসংবাদই বলতে হবে। এজন্যই তিনি বলেছেন, ‘সবাই কবি নয়, কেউ কেউ কবি।’ তার এ কথাটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তাহলে আমরা ধরে নিতে পারি যে, যার কবিতা কেবল বইয়ের শুষ্ক পৃষ্ঠায় মুদ্রিত থাকবে সে আসলে কবি নয় এবং যার কবিতা মানুষের হৃদয়ে মুদ্রিত থাকবে সে-ই প্রকৃত কবি। কে কবি আর কে কবি নয় তা নিরূপণের এটা একটা চমৎকার মাপকাঠি।
যার কলম থেকে বেরিয়েছে, ‘বিপ্লবের রক্ত রাঙা ঝাণ্ডা ওড়ে আকাশে।/ সর্বহারা জনতার জিন্দাবাদ বাতাসে।’ কিংবা ‘পায়রার পাখনা বারুদের বহ্নিতে জ্বলছে।/ শান্তির পতাকা অজগর নিঃশ্বাসে টলছে-’ এবং যার একাধিক গণসঙ্গীত স্বাধীন বাংলা বেতারে প্রচারিত হয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণা জুগিয়েছে, তার সৃষ্টি কালের মাড়াই কলের বর্জ্য বিবেচিত হওয়ার নয়। হয়তো নতুন ‘সূর্য ওঠার’ প্রতীক্ষায় প্রহর গুণতে গুণতে হাঁফিয়ে উঠেছেন তিনি। তার সৃষ্টির মধ্যে নানা প্রশ্ন, বিস্ময়, ক্ষোভ, আক্ষেপ, দুঃখ, আশা, স্বপ্ন এবং স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনা এমনভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে যা পাঠকের সমবেদনা কাড়বার জন্য যথেষ্ট। আমার বিশ্বাস সবাই স্বীকার করবেন যে তিনি দেশকে, দেশের সাধারণ মানুষকে প্রগতির পথে এগিয়ে দেয়ার অঙ্গীকার নিয়ে লিখেছেন এবং একটানা সত্তর বছর ধরে সাহিত্যের সেবায় নিবেদিত আছেন। অজ্ঞাত কারণে অন্তত আমার জানার বাইরে তিনি যদি গৃহলক্ষ্মীর ভালোবাসা বঞ্চিত হয়েও থাকেন তবে কাব্যলক্ষ্মীর স্নেহ-ভালোবাসা থেকে তিনি বঞ্চিত হবেন না- একথা আমি জোর দিয়ে বলতে পারি।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫