ঢাকা, শুক্রবার,২৪ নভেম্বর ২০১৭

গল্প

দায়

আহমদ আবদুল্লাহ

১৭ আগস্ট ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৬:৪৬


প্রিন্ট

ফাহিম সব কথা জানে না। যদিও কাহিনীটি সে নিজের চোখেই দেখেছে। ঘটনাটা শুরু হয় একটি মানিব্যাগ হারানোর মধ্য দিয়ে। সেটা অবশ্যই বড় কথা। তার চেয়ে বড় কথা, শুরু থেকে শেষ অবধি সব কাজেই রাশেদ নানা জড়িত। ফাহিম সে জন্য ব্যাগ হারানো কথাটা তার কাছেই তুলে ধরল। রাশেদ নানা ওর আপন নানা নন। মামার বাড়ির পাড়াতুতো সম্পর্কে ওর মায়ের মামা। সুতরাং তার পক্ষ থেকে ওর নানা এবং ওর পক্ষ থেকে তার নাতি হওয়া ছাড়া উপায় নেই। তিনি ডাকেনও নাতি বলে, আর আদরও করেন তেমনই। তবে রাশেদ নানার আদরের ভাগি একা নয়, ছোটরা সবাই তার আদরের পাত্র।
পেশায় তিনি ক্ষেতমজুর। তার দিন কাটে মানুষের ক্ষেতখামারে কাজ করে। এ জন্যই তার অবস্থা কোনো দিন ভালো ছিল না। তবুও ছোট ছেলেমেয়েদের দেখলে তিনি যেন নেচে ওঠেন। শিশুদের কিছু দেয়ার সাধ্যমতো চেষ্টাও করেন।
কিন্তু রাশেদ নানার বরাত খারাপ। তার এ অভ্যাসটা কেউই ভালো চোখে দেখেন না। ফাহিম তার কথাটা মায়ের কাছে বলতে গিয়ে শুনেছে, ‘এক ধরনের লোক আছে, যাদের বরাতে সব সময় নাকি শুধু দুর্নাম জোটে’। রাশেদ নানা সেই দলের একজন। লোকদের সন্দেহ, তিনি গরিব হয়েও এত দান করেন কিভাবে? নিশ্চয় চুরি-ডাকাতি করে। তিনি চুরি করা জিনিসপত্র বখাটে ছেলেদের হাতে বিলিয়ে দেন, যেন তারা তার পক্ষে সাপাই গায়। তাদের কাছ থেকে পরের ঘরদোরের খবর নেন; যাতে চুরি করতে অনেকটা সুবিধা হয়।
অথচ চুরির কথা ফাহিম একটাই জানে। তাও আসলে চুরি কি না, কে বলবে! ওর ধারণা ওটা কোনো হারিয়ে যাওয়া ঘটনা। কিন্তু সবাই যখন তার সাথে রাশেদ নানাকে জড়িয়ে ফেলে, তখন ওর বড্ড খারাপ লাগে। হ্যাঁ, রাশেদ নানার কাছে যাওয়া মূলত এ জন্যই।
নানা কিন্তু ওর মুখে কথাটা শুনে ওসবের পাত্তা না দিয়ে শুধু বললেন, ‘নাতি তুই এসে পড়েছিস, ভালোই হলো। একটা পেয়ারা পেকে আছে। খাবি? শিগগিরই তোর নানীর কাছে যা। নইলে তোর খুদে মামু-খালারা খেয়ে ফেলবে। ফাহিম হতাশ হলো। এখন ও কার কাছে কী শোনে।
সব কথা বলতে পারত শাহিন নিজে। কিন্তু সে কাউকে বলার অবকাশই পায়নি। ব্যাগ হারানোর দিনে সে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। হারিয়েছিল তারই কিছু টাকা। তার মা বলেন, হাজারখানিক টাকা হবে। শাহিনের বাবা শহরে চাকরি করেন। মাঝে মধ্যে দু-এক দিনের ছুটি নিয়ে বাড়িতে আসেন। যখনই তিনি বাড়িতে আসেন, হাতে থাকে রকমারি উপহার ছেলেমেয়ের জন্য। সে হিসেবে এবারো তিনি নিয়ে এসেছিলেন চামড়ার একটি মানিব্যাগ। তবে শুধু মানিব্যাগ বোধহয় উপহার হিসেবে মানায় না। তাই শাহিনের বাবা তার ভেতর কিছু টাকা ভরে দিয়েছিলেন।
ফাহিম গরমের ছুটি কাটাতে মামার বাড়িতে আছে। ব্যাগটা ও দেখেছে। কিন্তু তার ভেতর কত ছিল, তা ফাহিমের জানা ছিল না। শাহিন ব্যাগটি হাতে নিয়ে সারা দিন ওদের সাথে খেলা করেছে। ভেতরে কি আছে তা কাউকেই দেখায়নি শাহিন। ফাহিম কিছু জানতে চাইলে বলত; ‘এখন নয়, পরে। আমি টাকা জমাচ্ছি। যখন অনেক টাকা হবে, তখন দেখাব।’
কিন্তু শাহিন টাকা জমানোর সুযোগ বেশি দিন পায়নি। তার বাবা শহরে চলে যাওয়ার দুই দিন পর ফাহিম শুনে, ব্যাগটা হারিয়ে গেছে। তার মায়ের ভাষায় ‘চুরি’।
যে ব্যাগটা সব সময় তার কাছেই থাকত, তা কিভাবে চুরি হলো? কেবলই শাহিনই বলতে পারবে। কিন্তু সে তো জ্বরে ধুঁকছে। তবে চোর ধরতে তার মায়ের অসুবিধা হলো না। তিনি নাকি স্বচক্ষে দেখেছেন, ব্যাগটা শাহিন একসময় ভুলে আঙিনায় ফেলে আসে। সেখান দিয়ে খানিকটা পর এক লোক তা দেখে চুপিসারে নিয়ে নেয়। লোকটি আর কেউ নন। ফাহিমের রাশেদ নানা। গ্রামের সবারই চেনা মানুষ। শাহিনের মা সে দিন তাকে ডেকে দরজার আড়াল থেকে বললেন, ‘আমার ছেলের ব্যাগটা দিয়ে দাও’।
পাড়ার সম্পর্কে শাহিনের মা আর মিনহাজ নানা ভাবী-দেবর। শাহিনের মায়ের কথা শুনে নানা তো আকাশ থেকে পড়লেন। কিন্তু তিনি তখনই নিজেকে সামলে নিয়ে হেসে হেসে বললেন, ‘দেবরের কাছে শুধু ব্যাগ কেন? যা খুশি চাইতে পারেন। তবে কিসের ব্যাগ ভাবী?’
এবার শাহিনের মা আকাশ থেকে পড়ার পালা। জলজ্যান্ত ব্যাগ। তাও কি না লোকটা না জানার ভান করছে। কিন্তু তিনিও নিজেকে সামলে নিলেন। আর তার পরই তার গলায় ধমকের সুর। ‘ওসব রসিকতা রাখো। শাহিনের ব্যাগটা তুমি সকাল বেলা আঙ্গিনা থেকে নিয়ে যাওনি? আমি স্বচক্ষে দেখেছি।’ ধমক খেয়েও নানার হাসি যায় না। তিনি হাসতে হাসতেই বললেন, ‘আপনার হয়তো ভুল হয়েছে ভাবী!’
সকাল বেলা আমি এ দিকে এসেছিলাম বটে। কিন্তু কারো ব্যাগ-ট্যাগ তো আমার চোখে পড়েনি। শাহিনের মায়ের গলা এবার আরো চড়ে গেল। থাক, আর ন্যাকামি করতে হবে না। ব্যাগ-ট্যাগ তো তোমার চোখে পড়েনি। আচ্ছা, ভালো কথা শুনলে না। ব্যাগ তুমি এরপর কিভাবে হজম করো আমি দেখছি, আমাকে তুমি চিনো না। কিন্তু শাহিনের মা কথা রাখলেন। পরদিন বিকেল বেলা ফাহিম দেখে, তাদের বৈঠকখানায় এক সভা বসে আছে। সেখানে পাড়ার মুরুব্বিদের সবাই উপস্থিত। আর তাদের সামনে আসামি হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন রাশেদ নানা।
সভায় আলোচনা হলো অনেক। ফাহিম তার বেশির ভাগই বুঝল না। কিন্তু সভা শেষ হলে ও দেখে, রাশেদ নানার মুখখানা অন্ধকার। মানে কিনা তিনি হেরে গেছেন। আর তার কারণ তিনি যে ব্যাগটি নেননি এর কোনো প্রমাণ নেই। অথচ ব্যাগ হারানোর সময় শাহিনের মা স্বচক্ষে তাকে আঙিনার পাশ দিয়ে যেতে দেখেছেন। সুতরাং আর কোনো কথা নেই। সভার রায় হলো, রাশেদ নানা অপরাধী। মানিব্যাগ আর টাকা যেন তিনি রাতের ভেতর ফিরিয়ে দেন।
রায় শুনে নানা বললেন, বেশ। এই যদি আপনাদের বিচার হয়, তাহলে হোক। কিন্তু শুধু টাকা। ব্যাগসহ নয়। যে জিনিস আমি আদৌ নেইনি, তা আমি কোথা থেকে দেবো। সভায় চূড়ান্ত হলো, টাকা দিতে পারবে। তার মানে তুমি টাকা নিয়েছ। কিন্তু টাকা তো ব্যাগের মধ্যে ছিল। তুমি টাকা নিলে সেটা কোথায় যাবে? রাশেদ নানা এবার ক্ষীণ গলায় প্রতিবাদ জানালেন, ‘আমি তো কিছুই নেইনি’। কিন্তু সভার মুরুব্বিরা তার কথাটা কানে নিলেন না। বললেন, ‘তুমি টাকা যদি দিতে পারো, তবে ব্যাগও দিতে পারবে। না পারলে দাম দিয়ো আজ রাতের ভেতর।’
তার পরই ফাহিম নানার কাছে যায়। কিন্তু তার কাছে ওর কিছুই শোনা হলো না। শুধু কি তাই? নানা রাতেই টাকা দিলেন কি না, তাও জানা হলো না। তবে ও রাতে মামিমার সাথে শাহিনকে দেখতে যায়। তখন শুধু শোনে, ‘তিনি একবার এ দিকে ঘুরে গেছেন।’
পরদিন ঘটে আরেক আজব ব্যাপার।
ফাহিম ভিনপাড়া থেকে শাহিনদের বাড়ির পাশ দিয়ে মামার বাড়ি ফিরছে। হঠাৎ শোনে শাহিনের মা ওকে ডাকছেন, ‘একটা কথা শুনবে বাবা? তারেক বাড়িতে নেই। আর কাউকে পাচ্ছি না।’
তার মুখখানা শুকনো শুকনো। ফাহিম শুধাল! কী মামিমা শাহিনের জন্য কিছু আনতে হবে নাকি? ও কেমন আছে?
- জ্বর এখনো আছে। কিন্তু... না। বাবা, কিছু আনাটানা নয়। একবার রাশেদকে ডেকে আনতে পারিস?
ফাহিম অবাক মুখে বলল, ‘কেন? কাল টাকা পাননি? গম্ভীরভাবে মামিমা উত্তর দিলেন তুমি একটু বেশি বুঝো। ফাহিম আর কিছু না বলে রাশেদ নানাকে ডাকতে গেল। নানা ওকে দেখে এক গাল হাসি দিয়ে বললেন, ‘এই যে নাতি এসো এসো! আজ তোমাকে কী খাওয়ানো যায়, বলো দেখি?’
ফাহিম হেসে ফেলল, আমি কেমন করে বলব!
- তাই তো, তাই তো তাহলে আমিই বলি। তোমার নানী বোধহয় আজ চাল ভেজেছিল। একটু দাঁড়াও দেখে আসি।
- থাক, নানা। আমি একটা খবর দিতে এসেছি।
- কিসের?
- শাহিনের মা আপনাকে যেতে বলেছেন।
নানা এবার আরো অবাক।
- শাহিনের মা আমাকে? কিন্তু কেন?
- আমাকে কিছুই বলে নি।
নানা তার পর কী যেন ভাবতে লাগলেন।
- আমি তাহলে এখন যাই।
- আচ্ছা।
তার পর খোঁজ নিয়ে জানা গেল। রাশেদ নানা শাহিনের মায়ের কাছে যাননি। শুধু সে দিন নয়, তার পরও।
তার সাথে ওর দেখা হলো সপ্তাহখানেক পর। তারই বাড়িতে। শাহিন তার আগের দিন মারা গেছে, কিন্তু নানা তার জানাজায় আসেননি। তবে এ কারণে নয়। নানার কাছে ও গেল একটা অদ্ভুত কথা শুনে।
শাহিনের জ্বর যখন খুব বেড়ে যায়। গাঁয়ের কবিরাজ দিয়েও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। রাশেদ নানার পাঠানো ডাক্তার দিয়েও বাঁচাতে পারল না।
ফাহিম নানার কাছে গিয়ে ঘটনাটা শোনাতেই তিনি একটি লম্বা নিঃশেষ ফেললেন। সবই জানিরে নাতি। ছেলেটাকে বাঁচাতে পারলাম না। সে দুঃখে জানাজায় যাওয়া হয়নি।
ফাহিম বললো, ‘ওরা আপনাকে চোর বানাল, তবুও আপনি ডাক্তার ডেকে দিয়েছেন।’
- না ডেকে আর কী করি নাতি? লোকমুখে শুনলাম, ছেলেটা খুব খারাপ অবস্থা, কিন্তু ডাক্তার ডাকবার লোক নেই। তখন কি আর বসে থাকতে পারি? হাজার হলেও ওর পড়শি। আর পড়শিদের বিপদে আমার একটা দায় আছে। তা ছাড়া শাহিন তো আমার কাছে কোনো অপরাধ করেনি।
ফাহিম কথাগুলোর মানে বুঝতে পারল না। ওর বয়স কেবল বারো। তবু এর মধ্যে নানান রকমের দায়ের কথা শুনেছে। যেমন : পিঠের দায়, মানের দায়, মনের দায়, জানেরর দায়। আরো কত কি...
কিন্তু এমন দায়ের কথা আগে কখনো শোনেনি।
তা... নাইবা শুনল এমন কথা। নাই বুঝুক এর মানে। ওর কিন্তু মনে হলো এর মধ্যে নতুন কিন্তু আছে। যা ওর এত দিনের চেনা নানাকে ওর কাছে অচেনা করে তুলছে।
ও এবার বড় বড় চোখে তার দিকে চেয়ে রইল, যেন নতুন নানাকে চেনার চেষ্টা করছে।
তার পর ওর মুখখানা হঠাৎ ঝলমল করে উঠল। এই তো ও নানাকে চিনতে পেরেছে। সঙ্গে সঙ্গে তাকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠল, ‘নানা! আপনি এ রকম!’

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫