ঢাকা, শনিবার,১৮ নভেম্বর ২০১৭

ভ্রমণ

অনন্ত বৃষ্টিধারাস্নাত চেরাপুঞ্জি

শ্রেয়সী লাহিড়ী

১৭ আগস্ট ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৬:৩১


প্রিন্ট
চেরাপুঞ্জির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ নোহকালিকাই ফলস

চেরাপুঞ্জির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ নোহকালিকাই ফলস

‘বিশ্বের সর্বাধিক বৃষ্টিপাতের স্থান চেরাপুঞ্জি’- ভূগোল বই থেকে এই বাক্যটা মুছে গেলেও ভ্রমণ মানচিত্রে চেরাপুঞ্জি একটি আকর্ষণীয় নাম। ১৩০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই স্থানটির স্থানীয় নাম ‘সোহরা’। খাসি সাহিত্য ও সংস্কৃতির পীঠস্থান চেরাপুঞ্জি। খাসি ভাষাতে সাহিত্যচর্চা শুরু হয় এই সোহরাতেই। ১৮৪২ সালে খাসি ভাষায় রচিত প্রথম বই প্রকাশিত হয়। শিলং শহর থেকে ৫৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই যাত্রাপথটি অনুপম পাহাড়ি শোভায় ঘেরা। অনুচ্চ পাহাড়ের বুক চিরে মসৃণ রাস্তা। চলার পথের সঙ্গী ছোট ছোট গ্রাম, সবুজ উপত্যকা, খণ্ড খণ্ড কৃষিজমি, পাইন গাছের ছায়া, নাসপাতি ও কমলালেবুর বাগান এবং টেবলটপ পাহাড়। এ ছাড়া আছে কয়লার খনি। রাস্তাতেই পড়বে ঝুলন্ত লোহার ব্রিজ মওকডং। এখান থেকেই সিঁড়ি নেমে গেছে দুয়ানসিং সিয়েম ভিউ পয়েন্টে। এখান থেকে দৃশ্যমান হয় ঘন সবুজ মাডক উপত্যকার মনোরম শোভা।

শহরে ঢোকার মুখেই ওয়াকাবা ফলস। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা বিনুনির মতো সরু জলধারা হারিয়ে গেছে নিচে। চারিদিক উন্মুক্ত। দূরে দেখা যায় শুধু পাহাড়ের সারি। নিচের দিকে তাকালে দেখা যায় না ঝর্নার প্রবাহপথ।

বহু ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে এই প্রেসবিটারিয়ান চার্চ

চেরাপুঞ্জি পৌঁছে প্রথম গন্তব্য রামকৃষ্ণ মিশন। ১৯৫২’র ২০ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু চেরাপুঞ্জি রামকৃষ্ণ মিশনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। খাসি উপজাতিদের জীবনে উন্নতির আলো জ্বালতে এই মিশন অনেকটাই সাহায্য করেছে। শিক্ষার প্রসার, দাতব্য চিকিৎসালয় এবং সমাজসেবামূলক কাজে মিশনের অবদান অনস্বীকার্য। স্কুল ভবনের ঠিক পিছনেই দিগন্ত বিস্তৃত ঢেউ খেলানো পাহাড়ের মিছিল। রামকৃষ্ণ মিশনের নৃতাত্বিক সংগ্রহশালাটি অসাধারণ। উত্তর-পূর্ব ভারতের উপজাতীয় মানুষদের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে একটি সম্যক ধারণা পাওয়া যায়।

পরবর্তী গন্তব্য নোহকালিকাই ফলস। প্রায় এক হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ের মাথা থেকে অনেক নিচে সটান আছড়ে পড়ছে ঝর্ণার পানি। বিশাল উন্মুক্ত অঞ্চল। বিস্তীর্ণ স্থান জুড়ে পাহাড়ের পাথুরে শরীরটার মাথাটা সবুজ চাদরে ঢাকা। নিচে জমাট বাঁধা সাদা মেঘ। অনেক নিচে সৃষ্টি হয়েছে ছোট জলাশয়। স্নিগ্ধ নীল তার রং। হাজার সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাওয়া যায় জলাশয়ের কাছে। বর্ষায় ঝর্নাটি যৌবনে ভরপুর হয়ে ওঠে।

নোহকালিকাই ফলসের কাছেই আছে বাংলাদেশ ভিউ পয়েন্ট। পরিষ্কার আবহাওয়ায় দেখা যায় বাংলাদেশ। এখানে চলার পথে দূর-দূর পাহাড়ের গায়ে দেখা মেলে অসংখ্য কবরস্থানের। খাসি উপজাতিরা বর্তমানে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। শহরের মাঝখানে ১৫৭ বছরের পুরনো প্রেসবিটারিয়ান চার্চটি সেই সাক্ষ্য বহন করে।

শহরের মধ্যেই ফুলের বাগান, অর্কিড দিয়ে সাজানো মনোরম ইকো পার্ক। এখান থেকেও দেখা যায় বাংলাদেশ। পাশেই আছে সেভেন সিস্টার ফলস। পাহাড়ের গা বেয়ে সাতটি ধারায় নেমে এসেছে এই ঝর্নাটি।

আকর্ষণীয় দেখার জায়গা হলো মোসামাই কেভ। এক আরণ্যক পরিবেশে এই প্রাকৃতিক গুহায় প্রবেশের অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে রোমাঞ্চকর। গুহার ভিতরে বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থা আছে। আগে পর্যটকেরা টর্চ ও গাইডের সাহায্যে এই গুহায় প্রবেশ করতেন। এখন আলোর ব্যবস্থা থাকায় আর সে প্রয়োজন হয় না। কখনও বসে, কখনও সরু ফাঁকের মধ্যে দিয়ে শরীরকে গলিয়ে এগিয়ে যেতে হয়।

মোসামাই গুহায় প্রাকৃতিকভাবে চুনাপাথরে তৈরি একটি স্থাপনা

গুহার ভিতরে প্রাকৃতিক উপায়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা আকৃতি- কখনও মানুষের মুখ, কখনও হাঁস বা পাখি। গুহার এক মুখ দিয়ে প্রবেশ করে রোমাঞ্চের স্বাদ নিয়ে আর এক মুখ দিয়ে প্রস্থান।

চেরাপুঞ্জির অন্যান্য দ্রষ্টব্য হলো কেইনরেম ফলস, খো-রামা, সাংকারাংগ পার্ক, মোসামাই ফলস, ডাইনথলেন ফলস, নংগিথিয়াং ফলস প্রভৃতি।

চেরাপুঞ্জির বিস্ময়কর আকর্ষণ ডবল ডেকার লিভিং রুট ব্রিজ। জৈবপ্রযুক্তির এই সেতু বহু প্রাচীন। ত্যারণা গ্রাম থেকে তিন কিলোমিটার দূরত্বে সিঁড়িপথে হেঁটে দুই হাজার চারশ’ ফুট নিচে নেমে পৌঁছতে হবে উমশিয়াং নদীর ওপর তৈরি এই বিস্ময়কর সেতুর কাছে। রবার গাছের শিকড় পেঁচিয়ে এই সেতুর সৃষ্টি। মেঘালয় ছাড়া পৃথিবীতে কোথাও আর এই অসামান্য প্রাকৃতিক শৈলী দেখা যায় না। কষ্টকর পথের জন্যই পর্যটক সমাগম খুব কম। এটি দেখতে হলে চেরাপুঞ্জিতে রাত্রিবাস আবশ্যিক।

কেনাকাটা: চেরাপুঞ্জি থেকে কমলালেবুর মধু, দারচিনি, চেরি, তেজপাতা কিনতে পারেন।

যাত্রাপথ: মেঘালয়ের রাজধানী শিলং থেকে ভাড়া গাড়িতে অথবা মেঘালয় ট্যুরিজমের কন্ডাক্টেড ট্যুরের বাসে দিনে দিনে চেরাপুঞ্জি ও মাওলিনং দেখে নেয়া যায়। চেরাপুঞ্জি ভ্রমণের জন্য শিলং থেকে মেঘালয় ট্যুরিজমের কন্ডাক্টেড ট্যুরের সময়সীমা সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা। ভাড়া জনপ্রতি ৩৫০ টাকা। প্রতি বৃহস্পতিবার রাত ১০টায় শিলংয়ের উদ্দেশে ঢাকার কমলাপুর থেকে শ্যামলী পরিবহনের গাড়ি ছেড়ে যায়। আসা-যাওয়ার ভাড়া পাঁচ হাজার টাকা। এজন্য আগে থেকে ভারতের ভিসা সংগ্রহ করতে হবে।

থাকার জায়গা: চেরাপুঞ্জিতে রাতে থাকার জন্য আছে মেঘালয় পর্যটনের হোটেল চেরাপুঞ্জি হলিডে রিসোর্ট (ফোন: ০৯৬১৫৩-৩৮৫০০, ০৯৪৩৬১-১৫৯২৫)। দ্বিশয্যা স্ট্যান্ডার্ড ঘরের ভাড়া ৩৭০০ টাকা। দ্বিশয্যা ডিলাক্স ঘরের ভাড়া ৩৯৪০ টাকা। দ্বিশয্যা এক্সিকিউটিভ ঘরের ভাড়া ৪৪২৫ টাকা। (ট্যাক্স, ব্রেকফাস্ট ও ডিনারের খরচ ধরা আছে)। এ ছাড়া কিছু সাধারণ মানের হোটেল আছে। সৌজন্যে: আনন্দবাজার

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫