ঢাকা, মঙ্গলবার,২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭

দেশ মহাদেশ

সৌদি আরব-ইরান সম্পর্কে নতুন মোড়

আলফাজ আনাম

১৭ আগস্ট ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট
সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সাথে সাক্ষাৎ করেন ইরাকের শিয়া নেতা মুকতাদা আল সদর

সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সাথে সাক্ষাৎ করেন ইরাকের শিয়া নেতা মুকতাদা আল সদর

ইরানের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা ও ইয়েমেন যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে সৌদি আরব। সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের এই উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর পরস্পরবিরোধী অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। ইরানের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার মধ্যস্থতার প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট রয়েছে ইরাক সরকার। ইরাকের প্রভাবশালী শিয়া নেতা মুকতাদা আল সদর প্রকাশ্যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। গত মাসের শেষের দিকে সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সাথে তিনি সাক্ষাৎ করেন। সৌদি আরব সফর শেষ করে মুকতাদা আল সদর আরব আমিরাতের ক্রাউন প্রিন্স শেখ মুহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সাথেও সাক্ষাৎ করেন।
মার্কিনবিরোধী এই শিয়া গেরিলা নেতার ওপর ইরানের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে বলে মনে করা হয়। এ ছাড়া বর্তমান ইরাক সরকারের নীতিনির্ধারণে ইরান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ইরাকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কাশিম আল আরাজি রিয়াদ ও তেহরানের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার অংশ হিসেবে গত মাসে সৌদি আরব সফর করার পর ইরানের নেতাদের সাথে বৈঠক করেন। আরাজি ইরানের নেতাদের জানান, মোহাম্মদ বিন সালমান ইরানের সাথে উত্তেজনা কমিয়ে আনতে আগ্রহী। ইরানের বার্তা সংস্থার খবরে বলা হয়, এই বৈঠকে ইরাক ও ইরান আঞ্চলিক বিভিন্ন ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান নিয়ে আলোচনা করেন।
ইয়েমেনে অনিশ্চিত যুদ্ধে সৌদি আরব বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। যুদ্ধের বিপুল ব্যয় বহনের পাশাপাশি সৌদি আরবের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে। এই যুদ্ধে পশ্চিমা বিশ্ব এবং মুসলিম দেশগুলোর পক্ষ থেকে রিয়াদ যে ধরনের সমর্থন আশা করেছিল তা পায়নি। বরং ইয়েমেনে ১০ হাজার মানুষের মৃত্যু, শিশুহত্যা, কলেরাসহ মানবিক বিপর্যয়ে সৌদি আরবের ভাবমর্যাদা মারাত্মক ক্ষুণœ হয়েছে। অপর দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পর ইরানের ওপর বড় ধরনের চাপ বিশেষ করে নতুন করে অবরোধ আরোপ করা হবে বলে মনে করেছিল সৌদি আরব। এ জন্য সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের লবিস্টরা নানাভাবে প্রচেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সাথে সম্পর্ক কিছুটা নি¤œমুখী করলেও ইউরোপীয় দেশগুলোর সাথে ইরানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। এ ছাড়া উপসাগরীয় দেশ কুয়েত, কাতার ও ওমানের সাথে আগে থেকেই ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। গত বছরের শুরুতে সৌদি আরবের সাথে ইরানের সম্পর্ক অত্যন্ত খারাপপর্যায়ে চলে যায়। সৌদি আরবের শিয়া ধর্মীয় নেতা নিমর আল নিমরকে ফাঁসি দেয়ার পর ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা তেহরানে সৌদি দূতাবাসে হামলা করে। এরপর থেকে ইরানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক সীমিত করে সৌদি আরব।
ইরানবিরোধী অবস্থান গ্রহণের জন্য সৌদি আরব দেশটিতে আরব আমেরিকান ইসলামিক সামিটের আয়োজন করলেও কার্যত তা ফলপ্রসূ হয়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সম্মেলনে যোগ দিয়ে সৌদি আরবের সাথে কয়েক বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির চুক্তি করলেও অর্থনৈতিকভাবে ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগের বড় ধরনের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেননি, যা ছিল সৌদি আরবের জন্য হতাশাজনক।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে সৌদি আরবের নেতৃত্বে উপসাগরীয় দেশগুলো কাতারের ওপর অবরোধ করলে তা ব্যর্থ হয়, বরং কাতারের সাথে ইরানের সম্পর্ক বাড়তে থাকে। দুই দেশের একটি অভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র থেকে একসাথে গ্যাস উত্তোলনের ব্যাপারে চুক্তি স্বাক্ষর করে। কাতারে নিয়মিতভাবে ইরান থেকে খাদ্য সরবরাহ করা হয়। ফলে এ অঞ্চলে সৌদি আরবের প্রভাব আরো কমে যেতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে দেশটি ইরান নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে ইরান ও ইরাকের শিয়া নেতাদের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার ক্ষেত্রে সৌদি আরবের কৌশলগত লক্ষ রয়েছে। দীর্ঘ ২৭ বছর পর সম্প্রতি ইরাকের সাথে সৌদি আরবের সীমান্ত খুলে দেয়া হয়েছে। মুকতাদা আল সদরের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর প্রভাব রয়েছে সৌদি আরবের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে। তিনি নাজাফকেন্দ্রিক শিয়া নেতা নন। আরব এই শিয়া নেতার সাথে কাতারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। বিশেষ করে লেবাননে হিজবুল্লাহকে নানাভাবে কাতার যে সহায়তা দিয়ে আসছে তাতে মুকতাদা আল সদরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করা হয়। এখন সৌদি আরব সরাসরি এই শিয়া নেতার সাথে বিশেষ সম্পর্ক রাখতে আগ্রহী। কারণ সৌদি আরব মনে করে আরব বংশোদ্ভূত এই শিয়া নেতাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখলে ইরাক-সৌদি সীমান্ত নিরাপদ থাকবে। মুকতাদা আল সদরের সাথে ক্রাউন প্রিন্স সালমানের বৈঠকের দুই সপ্তাহ না যেতেই সীমান্ত খুলে দেয়া হলো। এ ছাড়া কাতারের ওপর অবরোধ আরোপের পর দেশটি ইরানের সাথে সম্পর্ক বাড়ানোর দিকে মনোযোগী হয়ে ওঠায়, এর মাধ্যমে তার মোড় ঘুরিয়ে দেয়া সম্ভব হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ইরানের সাথে সম্পর্কের সুফল সৌদি আরব পেতে চাইছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যে জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তাতে ইয়েমেনে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ করা সৌদি আরবের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। সৌদি আরবের সমর্থনপুষ্ট মানসুর হাদি সরকার ইয়েমেনের ওপর পুরোপুরি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ইয়েমেন এখন রাষ্ট্র হিসেবে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে সমঝোতা ছাড়া ইয়েমেনের যুদ্ধের অবসান সম্ভব নয়। অপর দিকে ইয়েমেন যেকোনো সমঝোতার জন্য ইরানকে পক্ষভুক্ত করতে হবে। কারণ হুতি বিদ্রোহীরা ইরানের সমর্থন নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। সৌদি আরব সফরের পর মুকতাদা আল সদরের আরব আমিরাত সফর থেকে ধারণা করা হচ্ছে শিয়া সম্প্রদায়ের আরব নেতাদের সাথে উপসাগরীয় দেশগুলো সামগ্রিক সম্পর্ক তৈরি করতে চাইছেন। এ ক্ষেত্রে ইরানের আস্থা অর্জনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
প্রকৃতপক্ষে কাতার ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর ভূমিকায় সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক বোঝাপড়ায় নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে। ইরানকে বাদ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা দূরে থাকে আরব শাসকদের ক্ষমতা সংহত করা কঠিন হবে তা স্পষ্ট হয়ে গেছে। সিরিয়া ও ইয়েমেনে অনিশ্চিত যুদ্ধ ও কাতারের বিরুদ্ধে ব্যর্থ অবরোধ নতুন এই উদ্যোগ গ্রহণে বাধ্য করেছে। তবে ইরানের সাথে সৌদি আরবের এই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের উদ্যোগ কতটা সফল হবে তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। কারণ শিয়া-সুন্নি বিভাজনের সুযোগ নিয়ে আরব বিশ্বে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছে। আরব দেশগুলোর মধ্যে যে অস্ত্র কেনার প্রতিযোগিতা তার নেপথ্যে শিয়া ইরানকে মোকাবেলার চেতনা প্রবল থাকে। পারস্য বনাম আরব আভিজাত্যের বিরোধ মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুধু বাড়ায়নি; ইসরাইলকেও নিরাপদ করে তুলেছে। ফলে ইরান-সৌদি সুসম্পর্কের বাতাস হঠাৎ করে লুহাওয়ায় রূপ নেবে না তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫