ঢাকা, মঙ্গলবার,২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭

দেশ মহাদেশ

রাবা হত্যাকাণ্ডের ৪ বছর

আলমগীর কবির

১৭ আগস্ট ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

নৃশংসতার চতুর্থবার্ষিকী পালন করল মিসরবাসী। দেশটির ইতিহাসে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতায় পুনর্বহালের দাবিতে ২০১৩ সালের ১৪ আগস্ট রাবা আল আদিয়া মসজিদ ও নাহদা স্কয়ারে জমায়েত হওয়া লাখ লাখ মানুষের ওপর বর্বর হামলা চালায় মিসরের নিরাপত্তাবাহিনী। সশস্ত্রবাহিনীর গুলিতে নিহত হন দুই হাজার ৬০০ বিক্ষোভকারী, যাদের বেশির ভাগই ছিলেন মুসলিম ব্রাদারহুডের কর্মী-সমর্থক। অবশ্য সরকারি বাহিনীর দাবি সে দিন মাত্র ৬২৩ জন নিহত হন। এরপর থেকে মুসলিম ব্রাদারহুডসহ সমমনা দলগুলো এটাকে রাবা হত্যাকাণ্ড দিবস হিসেবে পালন করে আসছে।
মূলত ২০১৩ সালের ৩ জুলাইয়ের ভয়ঙ্কর রাতের কোনো সাক্ষী না রাখতেই প্রতিপক্ষের ওপর এতটা বর্বর হয়েছিল সিসি বাহিনী। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ফাতেহ আল সিসি এই প্রতিবাদকারীদের দমনে যে ক্ষমতার প্রদর্শন করেছেন তা মানবাধিকার বিবর্জিত। সাংবাদিক, ফটোগ্রাফার, মানবাধিকারকর্মী এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের কর্মীদের এই দমননীতি থেকে গোপন রাখতে এবং ক্ষমতা ধরে রাখতে সিসি বিভিন্ন কার্যক্রম গোপনে পরিচালিত করে। মিসরীয়দের মন থেকে এই দিনের কথা মুছে ফেলতে এবং এর সব তথ্য সরাতে এবং ধ্বংস করতে প্রেসিডেন্ট সিসি আপ্রাণ চেষ্টা করেন।
মানবাধিকার বিপর্যয়ের জ্বলন্ত চিহ্ন রাবা হত্যাকাণ্ড। মর্মান্তিক এ ঘটনার পর নিরাপত্তাবাহিনীর ধরপাকড়ের মধ্যে অনেক মানুষ নিখোঁজ হয় এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়তে থাকে। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে নিরাপত্তাবাহিনী গ্রেফতার করার পর এক হাজার ৭০০ মানুষ নিখোঁজ হয়েছে এবং কেউ কেউ সাত মাস পর্যন্ত বিনা বিচারে জেল খেটেছে। এ ছাড়া কিছু ব্যক্তি হঠাৎ উদাও হওয়ার পর আর কখনো ফিরে আসেনি। এরা কোথায় কিভাবে নিখোঁজ হয়েছে এর কোনো হিসেব নেই।
ব্রাদারহুডের অনেক নেতাকর্মীকে রাস্তায় বা তাদের বাড়ি থেকে তুলে আনা হয়েছে, যাদের বাইরের কারো সাথে মিশতে দেয়া হয় না। এদের প্রায়ই জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের অফিস লাজওলিতে রাখা হয় এবং পরিবার ও উকিলের সাথে দেখা করতে দেয়া হয় না। মানবেতরভাবে কাটছে তাদের প্রতিটি দিন। মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য নিরাপত্তাবাহিনীর বিদ্যুতের শর্ট ও ধর্ষণসহ নানাভাবে নির্যাতন করছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলেছে, ওই হত্যাকাণ্ডের রেশ ধরে মিসরে মানবাধিকারের অবস্থা দিনকে দিন অবনতি হচ্ছে, যার ফলে অনেক হত্যাকাণ্ড ঘটছে যার খবর বিশ্বে অজানা রয়ে গেছে। যারাই সিসি এবং এই ঘটনার বিপক্ষে মত প্রকাশ করেছে তাদেরই করুণ পরিণতি ঘটেছে। মুসলিম ব্রাদারহুডের কর্মী এবং মুরসির সমর্থকেরা ছাড়াও সাংবাদিক, বামপন্থী, মানবাধিকারকর্মীরাও নিয়মিত নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছেন। যারা রাবার নির্মম হত্যাকাণ্ডের অংশীদার ছিল তারা বিলাসবহুল জীবনযাপন করেছে এবং যারা এর বিপক্ষে ছিল তাদের পরিণতি মৃতদের চেয়ে ভয়ঙ্কর ছিল।
মুসরি সরকারের পুনর্বহালের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন যে এমন কালো এবং দুর্বিষহ নিদে পরিণত হবে প্রতিবাদকারীরা কল্পনাও করতে পারেনি। এ ঘটনার ফলে নিরাপত্তাবাহিনী দিয়ে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত হয় এবং ঘটনা আরো খারাপের দিকে এগিয়ে যায়।
রাবা, বা রাবিয়াহ একধরনের হাতের ভঙ্গি যা প্রকাশ পায় ২০১৩ সালের আগস্ট মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং এটি মিসরের সংঘটিত অপরাধের প্রতিবাদের এক প্রতীক রূপে। মূলত মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার সময় হতে মিসরে ব্রাদারহুডের প্রতীক হিসেবে এটা ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
গত ১৪ আগস্ট রাবা হত্যাকাণ্ডের বার্ষিকীতে কায়রো আদালত ৭৩৮ জনকে আসামি করে একটি মামলা নথিভুক্ত করেছে, যেখানে সশস্ত্রবাহিনীর লোকও রয়েছে। দীর্ঘ চার বছর পর এই সিদ্ধান্ত কায়রোর জনগণের মনে স্বস্তির জোগান দিয়েছে। তাদের মনে আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা পুনরায় ফিরে আসবে বলেও মনে করা হচ্ছে এতে। এর ফলে বিশ্ব জানবে ওই দিনের আসল ঘটনাগুলো যা এতকাল লুকিয়ে রাখতে সচেষ্ট ছিল ঘটনার দিনের লোকজন। সত্য উন্মোচনের ফলে মিসরের ইতিহাস ধীরে ধীরে কলঙ্কমুক্ত হবে এবং এই নির্মম হত্যাকাণ্ড হতে জনগণ আরো প্রতিবাদী এবং সচেতন হবে অধিকার আদায় এবং রক্ষায়।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫