ঢাকা, মঙ্গলবার,২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

আওয়ামী লীগ জিততে চেয়ে হেরেছে

মাসুদ মজুমদার

১৬ আগস্ট ২০১৭,বুধবার, ১৯:২৫


মাসুদ মজুমদার

মাসুদ মজুমদার

প্রিন্ট

আইনমন্ত্রী যেদিন বললেন, বিচার বিভাগ মানে এক ব্যক্তি নন, সেদিনই দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে বিচার বিভাগের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী সাতপাঁচ না ভেবেই বলে দিলেন, যতবার ষোড়শ সংশোধনী বাতিল হবে ততবার সংসদে পাস করবেন। আইনমন্ত্রী বললেন, রায় পড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দল ও সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করবেন- এতটুকু বক্তব্য রীতিসিদ্ধ। তারপর মন্ত্রীদের বক্তব্য দেয়া, মন্তব্য করা, সুশৃঙ্খল কোনো দলের জন্যই শোভন নয়।

খাদ্যমন্ত্রী প্রধান বিচারপতিকে পদত্যাগের সময় বেঁধে দিয়ে আলটিমেটাম দেয়ার পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ললাটে একটা বিষাক্ত তারকাঁটা পুঁতে দেয়া হলো। আইনমন্ত্রী আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করার পর ভাবলাম, ঐতিহ্যবাহী দলটি আত্মহত্যার জন্য যে রশি ঝুলিয়ে দিয়েছিল, সেটা আপাতত খুলে নিয়েছে। তারপর মন্ত্রীরা যখন ক্ষ্যাপাটে ভাষায় আবার খই ফুটাতে শুরু করলেন, তখন স্পষ্ট হলো- এ যাত্রায় স্বাধীন বিচার বিভাগ আর আওয়ামী লীগ একসাথে চলার নয়। খায়রুল হক মাঠে নামার পর সব ধোঁয়াশা ভাব কেটে স্পষ্ট হলো, দল হিসেবে আওয়ামী লীগ নৈতিকভাবে দেউলে হয়ে পড়েছে। খায়রুল হক জীবনের শ্রেষ্ঠ ভুলটি কিভাবে অপনোদন করবেন আমরা জানি না। এভাবে একটি প্রবীণ রাজনৈতিক দলকে দেউলে করে দেয়ার জন্য যারা উঠেপড়ে লেগেছেন, তাদের ভেতর রয়েছেন হাইব্রিড ক’জন নেতা। বাম থেকে আসা অতি আওয়ামী লীগার সেজে যাওয়া ক’জন এবং বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী কিছু দলীয় লোক।

সর্বশেষ সংসদ সদস্য তাপস যখন বললেন, এই রায়ের ড্রাফট করে দিয়েছেন একজন সম্পাদক, যিনি কিনা একটি ইংরেজি দৈনিকের সম্পাদক, এরপর আর কোনো কথা থাকে না। ওবায়দুল কাদের একজন মন্ত্রী, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তিনি যখন প্রধান বিচারপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দূতিয়ালি করেন তখন করুণাও ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাওয়ার কথা।

একটা রায়ে যেকোনো নাগরিক বা দল কিংবা গোষ্ঠী সংক্ষুব্ধ হতে পারেন। এর জন্য আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে প্রধান বিচারপতির বাড়িতে গিয়ে হাজির হওয়া রীতিমতো বিস্ময়কর। এর মাধ্যমে যে খারাপ নজির স্থাপিত হলো, তার প্রতিবিধান কিভাবে হবে জানি না। রাজনৈতিক চাপ এবং সংলাপ সমঝোতার দূতিয়ালি রাজনীতিতে সিদ্ধ এবং কৌশলও বটে। কিন্তু বিচার বিভাগের সাথে এমনটি চলা কিভাবে সম্ভব? বিএনপিসহ অন্য দলগুলোর মহাসচিব প্রধান বিচারপতির সাক্ষাৎ চাইলে কী অবস্থা দাঁড়াবে!

রাষ্ট্রপতির সাথে রাষ্ট্রের যেকোনো নাগরিক দেখা করতে চাইতে পারেন। প্রজাতন্ত্রের অভিভাবকের আসনে বসে তিনি যেকোনো নাগরিককে সময় দিতে পারেন। তাই ওবায়দুল কাদের রাষ্ট্রপতিকে দলীয় অবস্থান জানাতে গেলে কারো কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়। তার ওপর, রাষ্ট্রপতি ক্ষমতাসীন দলেরই আস্থাভাজন হয়ে বঙ্গভবনে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু প্রধান বিচারপতির কাছে ‘দলীয় অবস্থান’ ব্যাখ্যার দায়টা কেন, প্রধান বিচারপতির তা শোনার গরজটাই বা কিসের?
ডক্টর কামাল হোসেন বললেন, রায়ে এক্সপাঞ্জ করার মতো কিছু নেই। আসলেই কিছু নেই। পর্যবেক্ষণ হজম করে ইতিবাচক রাজনীতি করলে তেমন কিছু হারাবার ছিল না। পর্যবেক্ষণে যা আছে, তা হাজার কণ্ঠে লক্ষবার উচ্চারিত হয়েছে। পর্যবেক্ষণে না থাকলেও এসব কথাবার্তা আড়ালে নেই। আওয়ামী লীগের ভেতর এত আইনজীবী থাকতে এভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা কতটা সমীচীন হলোÑ তা যখন বুঝতে সচেষ্ট হবেন, তখন দেখবেন অনেক কিছুই ‘নাই’ হয়ে গেছে কিংবা নাগালের বাইরে চলে গেছে। আইনমন্ত্রী ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তুললেন প্রমাণ ছাড়া। তাপস কিভাবে প্রমাণ করবেন, ড্রাফট এসেছে একজন সম্পাদকের কাছ থেকে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত নিয়ে এই ছেলেখেলা কিভাবে মানা যায়!

রায়ের পর্যবেক্ষণ পড়লে কোনো কোনো বিষয়ে কেউ কেউ ভিন্নমত পোষণ করার মতো বিষয় পাবেন। সেটা খন্তা-কোদাল নিয়ে রাজনীতির মাঠে হৈ হৈ করে নেমে পড়ার বিষয় নয়। এতে পর্যবেক্ষণ ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। যাদের কান পাতার কথা ছিল না তারাও কান খাড়া করে পর্যবেক্ষণ বুঝে নিয়েছে। আওয়ামী বুদ্ধিজীবীরা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে মোকাবেলা করলে পরিস্থিতি এ পর্যায়ে আসত না। পর্যবেক্ষণের সারনির্যাস সামনে টেনে আনলে যা দাঁড়ায়, তা হচ্ছে-

ক. সুপ্রিম জুডিশিয়াল প্রসঙ্গকে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ভাবা হয়েছে।

খ. সামরিক শাসনের রেশও সংবিধানে না রাখার বিষয়টি অবাস্তব বলা আছে।

গ. চতুর্থ সংশোধনী সংবিধান পরিপন্থী।

ঘ. সামরিক শাসকেরা ক্ষমতা দখলকারী।

ঙ. সামরিক-অভিজাত শাসন সংবিধানসম্মত নয়।

চ. রাষ্ট্রক্ষমতা বর্তমানে একচ্ছত্র বিষয়।

ছ. তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুই মেয়াদ রাখার সুযোগ রয়েছে বিচারপতিদের এড়িয়ে।

জ. পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের সময় আপিল বিভাগের নির্দেশনা মানা হয়নি।

ঝ. বর্তমান সংসদ অকার্যকর ও অপরিপক্ব। রাজনীতি এখন বাণিজ্য।

ট. ক্ষমতার অপব্যবহার ও দাম্ভিকতায় বাধা দেয়ার মতো প্রতিষ্ঠানের অভাব রয়েছে।

ঠ. গ্রহণযোগ্য নির্বাচনব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়নি।

ড. সব কিছুর ব্যক্তিকরণ করা হয়েছে। দেশে আমিত্ব প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

ঢ. সংবিধান সুরক্ষার ভার সুপ্রিম কোর্টের।

ণ. জনগণ সার্বভৌম; সংসদ নয়।

ত. ভুয়া ও মেকি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।

থ. কিছু বিষয় এড়ানো হয়েছে, যেমন রাষ্ট্রধর্ম, বিসমিল্লাহ, মুসলিম পারিবারিক আইন ও জাতীয়তার পরিচয়। তা ছাড়া স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার অন্তরায়গুলো চিহ্নিত হয়নি।

এর মধ্যে ক্ষমতাসীনদের জন্য কিছু বিষয় বিব্রতকর হলেও বাস্তব পরিস্থিতির সাথে কোনোটি সাংঘর্ষিক নয়। আমরা জানি না, আপিল বিভাগ রাজনৈতিক চাপ দূতিয়ালি ও রাজনৈতিক লবি এবং পরোক্ষ হস্তক্ষেপকে কিভাবে নেবেন। তবে সোজাসাপটা বলে রাখা ভালো- রাজনীতিতে পিছু হটার জায়গা থাকে, বিচারে হাকিম নড়ে হুকুম নড়ে না। চিরায়ত এই ধারণার অপমৃত্যু মানা যায় না। রাজনৈতিক ক্ষতি ও ক্ষত শুকায়; বিচার ও আইনের ক্ষতি শুকায় না। তা ছাড়া রায়ের পর্যবেক্ষণে কোনো ব্যক্তিমানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।

হ্যাঁ, আওয়ামী লীগের রচিত ‘ইতিহাস’ খানিকটা আহত হয়েছে। ক্ষমতায় বসে যে ইতিহাস রচিত হয় ব্যাকরণসিদ্ধ ইতিহাস গবেষণায় তার ঠাঁই হয় না। নির্মোহ ইতিহাসচর্চায় পক্ষপাতদুষ্ট ইতিহাস জঞ্জালের মতো ছুড়ে ফেলা হয়। ইতিহাস ও আইনের ছাত্র হিসেবে বলব, ব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠানতুল্য বঙ্গবন্ধুর মর্যাদা ও অবদানে কোনো টান পড়েনি। আওয়ামী লীগ বোকামি করে আবেগ ছড়িয়ে সে দিকে যেতে চাচ্ছে। এতেও হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ পর্যবেক্ষণ থাকল কি থাকল না, এখন সেটি আর কোনো বড় বিষয় নয়। আওয়ামী লীগ জেদের বিজয় চেয়েছে, বাস্তবে হেরেছে। 

masud2151@gmail.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫