ঢাকা, রবিবার,১৯ নভেম্বর ২০১৭

প্রথম পাতা

হোটেলে অভিযান বিস্ফোরণে উগ্রবাদী নিহত

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৬ আগস্ট ২০১৭,বুধবার, ০০:০০ | আপডেট: ১৬ আগস্ট ২০১৭,বুধবার, ০১:০৬


প্রিন্ট
হোটেলে অভিযানের পরের চিত্র। ইনসেটে বোমা বিস্ফোরণে নিহত সাইফুল ইসলাম : আবদুল্লাহ আল বাপ্পী

হোটেলে অভিযানের পরের চিত্র। ইনসেটে বোমা বিস্ফোরণে নিহত সাইফুল ইসলাম : আবদুল্লাহ আল বাপ্পী

রাজধানীর পান্থপথের একটি আবাসিক হোটেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে সাইফুল ইসলাম নামে এক উগ্রবাদী নিহত হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে পান্থপথের হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালে অভিযান শুরু করেন সোয়াত ও বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা। এর আগে বিভিন্ন মাধ্যমে উগ্রবাদীর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে ভোর ৩টা থেকে ওই হোটেলের চার পাশে অবস্থান নেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তারা এ অভিযানের নাম দিয়েছেন ‘অপারেশন আগস্ট বাইট’।
পুলিশ বলছে, ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে আসা মিছিলে আত্মঘাতী হামলা চালানোর পরিকল্পনা ছিল সাইফুলের। যে কারণে সে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের কাছের ওই হোটেলে অবস্থান নেয়। তবে সাইফুলের পরিবারের সদস্যদের দাবি, সে বাড়ি থেকে চাকরির উদ্দেশ্যে ঢাকায় এসেছিল। তিন সন্তানের মধ্যে বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে সে।
যেভাবে শুরু ‘অপারেশন আগস্ট বাইট’ : ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানাতে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের দিকে যাওয়ার অন্যতম রাস্তা সোনারগাঁও ক্রসিং হয়ে পান্থপথ। অথচ ব্যস্ততম ওই সড়ক ভোর থেকে থমথমে সুনসান। শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের আনাগোনা। টার্গেট ৩২ নম্বর থেকে আধা কিলোমিটারেরও কম দূরত্বের পান্থপথের ওলিও ইন্টারন্যাশনাল আবাসিক হোটেল। এই হোটেলেরই একটি কক্ষে অবস্থান নিয়েছে উগ্রবাদীরাÑ এমন তথ্য পায় পুলিশ।
ভোর রাত থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য ওই হোটেলের আশপাশে অবস্থান নেন। সকালের আলো ফুটতেই সেখানে উপস্থিত হয় পুলিশের বিশেষ বাহিনী সোয়াত ও বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট। হাজির করা হয় ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্স। এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা হোটেলে প্রবেশ করে ওলিও হোটেলের বোর্ডারদের একে একে বের করে আনেন। এর মধ্যে চলতে থাকে পুলিশের বিভিন্ন প্রস্তুতি। হোটেলের আশপাশের সব রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয়। সাধারণ মানুষ তো দূরে থাক, সংবাদকর্মীদেরও ধারে-কাছে যেতে দেয়া হয়নি। সংবাদকর্মীরা দূরে অবস্থান নেন।
সকাল ৯টা ৪৫ মিনিট। শোনা যায় গুলির শব্দ। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ। এতে দেখা যায় হোটেলটির চারতলার দেয়ালের বড় অংশ ধসে পড়ছে রাস্তার ওপর। ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে ইট-সুরকি আর হোটেলের দরজা ভাঙা টুকরা। তার সাথে হোটেলের বিছানার তোষকও রয়েছে। এ সময় ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে পুরো এলাকা। তার মধ্যে চলতে থাকে মুহুর্মুহু গুলি। অল্প সময় বিরতি দিয়ে আবারো গুলির শব্দ। গুলির শব্দ থামার পর হোটেল থেকে এক যুবককে নিয়ে যাওয়া হয় পাশের স্কয়ার হাসপাতালে। তখনো কিছু জানা যায়নি। পরে আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ওই যুবকের নাম সাইফুল ইসলাম। সে আত্মঘাতী হামলায় নিহত হয়েছে। তিনি আরো বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে তথ্য পেয়েছি সাইফুলের গ্রামের বাড়ি খুলনার ডুমুরিয়ায়।
অভিযান সম্পর্কে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, নব্য জেএমবির সদস্যরা নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে চেষ্টা করে আসছিল। যার কিছু অস্পষ্ট তথ্য পাচ্ছিলেন গোয়েন্দা সদস্যরা। কিন্তু ১৫ আগস্ট সামনে রেখে ওই অস্পষ্ট তথ্যের স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। যে কারণে মরিয়া হয়ে ওঠেন গোয়েন্দা সদস্যরা। একপর্যায়ে তারা সফলও হন। তারই ধারাবাহিকতায় গত সোমবার আমরা নিশ্চিত হই যে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরকে টার্গেট করা হয়েছে। সেই হিসেবে মাঠে নামে পুলিশ। ৩২ নম্বর টার্গেট হলে হামলাকারীদের আশপাশেই থাকার কথা। গুরুত্ব বুঝে তিন রাস্তার পাশাপাশি পান্থপথকে খুব গুরুত্ব সহকারে চিহ্নিত করা হয়। বিশ্বস্ত সূত্র, তথ্য ও প্রযুক্তির মাধ্যমে নিশ্চিত হই, পান্থপথ ও আশপাশে এক বা একাধিক ব্যক্তি অবস্থান নিয়েছে। এরপর ওই দিন থেকেই শুরু হয় ব্লকরেইড। একপর্যায়ে নিশ্চিত হওয়া যায় তারা কোনো আবাসিক হোটেল বা মেসে অবস্থান নিয়েছে। শুরু হয় দ্বিতীয়বারের মতো ব্লকরেইড। তিনি বলেন, রেইড চলাকালে হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালের সব কক্ষ নক করে পুলিশ। সব রুমের গেস্ট দরজা খুললেও চার তলার কর্নারের ৩০১ নম্বর রুম খোলেনি। আবার নক করলে ভেতর থেকে জানানো হয় ‘সকালের আগে খুলব না।’ পরে পুলিশ করিডোরের পাশে জানালা দিয়ে ব্যাগ ও পা দেখতে পায়। তখন পুলিশ সদস্যরা বুদ্ধিমত্তার সাথে দরজার বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দেয়। যাতে (ভেতরে থাকা ব্যক্তি) পালাতে না পারে। সাইফুলকে বারবার আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হলেও সে আত্মসমর্পণ করেনি। মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী আমাদের প্রস্তুতি আগে থেকে নেয়া ছিল। খুব দ্রুত সময়ে সোয়াত ও বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। একপর্যায়ে আমরা অভিযানের সিদ্ধান্ত নিই। অভিযানের নাম দেয়া হয় ‘আগস্ট বাইট’।
তিনি বলেন, সোয়াতের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনাকারী সদস্যরা গুলি করতে করতে রুমের সামনে চলে যায়। তখন সাইফুল একটা বিস্ফোরণ ঘটায়। গুলি ও বিস্ফোরণে রুমের দেয়ালের একটি অংশ ও দরজা ভেঙে যায়। তখন সে (সাইফুল) বিস্ফোরকসহ বাইরে বেরিয়ে আসে। সে বিস্ফোরণ ঘটানোর চেষ্টা করলে সোয়াত সদস্যরা গুলি চালায়। গুলির পাশাপাশি বোমাটি বিস্ফোরিত হয়। তিনি বলেন, বোমাটি শক্তিশালী। মূলত সাইফুলের ট্র্যাভেল ব্যাগে তিনটি বোমা ছিল। এর প্রথমটি দরজা ভাঙার সময় বিস্ফোরিত হয়। দ্বিতীয়টি সে নিজে ফাটায় এবং তৃতীয়টি বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট নিষ্ক্রিয় করে। মনিরুল ইসলাম বলেন, ৩২ নম্বরে শ্রদ্ধা জানাতে আসা মিছিলে ঢুকে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে প্রচুর লোক হতাহত করার পরিকল্পনা ছিল উগ্রবাদীদের। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় শিরোনাম করে নিজের অবস্থান জানান দিতে চেয়েছিল তারা।
আইজিপি যা বললেন : সোয়াতের অভিযানের প্রায় আধা ঘণ্টা পর ঘটনাস্থলে পৌঁছান আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক। বেলা সাড়ে ১১টায় তিনি ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শ্রদ্ধা জানাতে আসা মিছিলে আত্মঘাতী হামলা চালিয়ে বিপুল হতাহতের পরিকল্পনা ছিল উগ্রবাদীদের। তিনি বলেন, তারা জানত ‘আজ (গতকাল) জাতীয় শোক দিবস। এই উপলক্ষে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানাতে এই ৩২ নম্বরে আসবে। তাই মিছিলে ঢুকে আত্মঘাতী হামলা চালাবে। কিন্তু ‘আমাদের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের গোয়েন্দারা বিষয়টি জানতে পারে। তারা বিষয়টি ফলো করে আস্তানার সন্ধান পায়। আইজিপি বলেন, ওই জঙ্গিকে আত্মসমর্পণ করতে অনেকভাবে বলা হয়েছিল। কিন্তু সে আত্মসমর্পণ করেনি। পুলিশ অপারেশন চালাতে বাধ্য হয়েছে। যখন পুলিশ অপারেশন শুরু করে তখন তার সাথে থাকা সুইসাইডাল ভেস্ট দিয়ে সে নিজে আত্মঘাতী হয়েছে। এতে জানালা, বারান্দা উড়ে গেছে। বোঝা যাচ্ছে এটি শক্তিশালী বিস্ফোরক। এটা যদি কোনো জনসমাবেশে বিস্ফোরিত হতো তাহলে বড় ধরনের ক্ষতি হতো। কিন্তু পুলিশের কাউন্টার টেররিজমের গোয়েন্দা তৎপরতার কারণে এই বিপদ থেকে আল্লাহ আমাদের রক্ষা করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের কেউ হতাহত হয়নি। তবে একজন পুলিশের গায়ে স্পিøন্টার লেগেছে। আত্মঘাতীর পরিচয় সম্পর্কে আইজিপি বলেন, ‘আমরা যতদূর জেনেছি তার নাম সাইফুল ইসলাম। সে মাদরাসায় পড়ত। পরে খুলনা বিএল কলেজে পড়েছে। ছাত্রজীবনে সে ছাত্রশিবির করত। তার বাবা একটি মসজিদের ইমাম। তার বাড়ি খুলনার ডুমুরিয়া থানায়।’
চাকরির সন্ধানে এক সপ্তাহ আগে ঢাকায় আসে সাইফুল।
আমাদের ডুমুরিয়া সংবাদদাতা জানান, চাকরির সন্ধানে গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকায় যায় বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে সাইফুল। গত ৪ আগস্ট শুক্রবার জুমার নামাজ আদায় করে চাকরি খোঁজার কথা বলে বাড়ি থেকে চলে যায়। খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার সাহস ইউনিয়নের নোয়াকাটি গ্রামের হাফেজ আবুল খায়ের মোল্লার একমাত্র ছেলে সাইফুল ইসলাম। ২০১১ সালে সাইফুল উলা দাখিল মাদরাসা থেকে দাখিল পাস করে। ২০১৩ সালে খুলনা আলিয়া মাদরাসা থেকে আলিম পাস করে খুলনা বিএল কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়ে শেষ বর্ষে পড়াশোনা করত।
সাইফুলের বাবা নোয়াকাটি বাড়ির পাশে মাঠের হাট জামে মসজিদে ইমামতি করেন। সাইফুলের মা আসমা বেগম প্রতিবন্ধী। অভাব অনটনের মধ্যে চলে তাদের সংসার। সাইফুলের বোন সাবিয়া খাতুন ইরানী জানান, তার ভাই দৌলতপুর বিএল কলেজে পড়াকালে একটি মেসে থাকত এবং মাঝে মধ্যে বাড়ি আসত। তবে সে কারো সাথে মিশত না। তার ভাই জুমার নামাজ আদায় করে চাকরি খোঁজার কথা বলে বাড়ি থেকে চলে যায়। তবে এলাকায় সে কোনো রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল না বলে জানান তিনি। ডুমুরিয়া থানার ওসি হাবিল হোসেন জানান, সাইফুলের বাবাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে আসা হয়েছে।
এ দিকে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে সাইফুলের লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। এসআই আমিনুল লাশটি নিয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গেলে সেখান থেকে লাশটি হাসপাতালের জরুরি বিভাগের লাশ ঘরে রাখা হয়। সাইফুলের খোঁজে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত হাসপাতালে কেউ যায়নি।
এ দিকে পান্থপথের এই অভিযানকে কেন্দ্র করে গতকাল সকাল থেকে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়ক বন্ধ করে দেয়া হয়। সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকা থেকে মিরপুর রোড বন্ধ রাখে পুলিশ। পান্থপথের মোড় থেকে বন্ধ করে দেয়া হয় ওই রাস্তাটি। অভিযানের সময় ওই এলাকার রাস্তা সাধারণের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়।
থানা পুলিশ গত রাত সাড়ে ৮টায় জানায়, ঘটনার ব্যাপারে থানায় কোনো মামলা হয়নি। স্থানটি তখন পর্যন্ত পুলিশ ঘিরে রেখেছে।
ঘটনাস্থল হোটেল ভবনটির মালিক হলেন ফিরুজুর রহমান ওলিও। তার নামেই হোটেলটি। তবে হোটেলটি তিনি ভাড়া দিয়েছেন। হোটেলের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, নিহত সাইফুল গত রোববার হোটেল কক্ষটি ভাড়া নেয়। তবে হোটেল মালিক বা ম্যানেজারের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের পাওয়া যায়নি।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫