ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২৩ নভেম্বর ২০১৭

প্রথম পাতা

দ্বিতীয় দফার বন্যায় ২০ জেলার ৬ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত : ত্রাণমন্ত্রী

বিশেষ সংবাদদাতা

১৫ আগস্ট ২০১৭,মঙ্গলবার, ০০:০০


প্রিন্ট

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেছেন, চলতি মওসুমে দ্বিতীয় দফার বন্যায় এ পর্যন্ত দেশের ২০ জেলার ৫৬ উপজেলা বন্যাকবলিত। এতে প্রায় ৬ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সারা দেশে বন্যায় এ পর্যন্ত ২০ জন মারা গেছেন। এ ছাড়াও উত্তরাঞ্চলের বন্যার পানি মধ্যাঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সাগরে নেমে যাচ্ছে। এতে ঢাকার নি¤œাঞ্চলসহ আরো ৯টি জেলায় বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। তবে ১৯৮৮ সালের চেয়ে বড় বন্যা হলেও মোকাবেলার জন্য আমাদের প্রস্তুতি আছে।
গতকাল মহাখালীর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব তথ্য জানান। সংবাদ সম্মেলনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব গোলাম মোস্তফা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের মহাপরিচালক রিয়াজ আহমেদসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বন্যার সবশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, উজানের দেশ চীন, ভারত, নেপাল ও ভুটানে মারাত্মক বন্যার বিষয়টি মাথায় রেখেই সরকার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছে। আমরা উজানের দেশের বন্যা পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণে রাখছি। উজানের দেশগুলোতে বন্যা হলে ভাটির দেশ হিসেবে উজানের প্রভাব আমাদের ওপর পড়বে, এটাই স্বাভাবিক। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী সব জেলার বন্যা পরিস্থিতি নজরে রাখছেন এবং দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। মন্ত্রণালয় সে নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করছে। সব জেলায় মন্ত্রণালয় থেকে একজন সিনিয়র পর্যায়ের কর্মকর্তাকে সংযুক্ত করা হয়েছে, যার কাজ হবে জেলাপর্যায়ে বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, সমন্বয় ও ত্রাণকার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় সহযোগিতা করা।
মন্ত্রী বলেন, সিলেট, সুনামগঞ্জ, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, নীলফামারী, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, নেত্রকোনা, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিসহ ২০ জেলার ৩৫৬টি উপজেলার ৩৫৮টি ইউনিয়ন দ্বিতীয় দফার এই বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। গত তিন দিনে পানিতে ডুবে, ভেসে গিয়ে বা সাপের কামড়ে ২৭ জনের মৃত্যুর খবর জানা গেছে। এর মধ্যে কেবল দিনাজপুরেই ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া কুড়িগ্রামে ১১ জন এবং লালমনিরহাটে তিনজনের মৃত্যুর খবর এসেছে।
ত্রাণমন্ত্রী বলেন, এ পর্যন্ত বন্যায় পাঁচ লাখ ৮৬ হাজার ৩৯০ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত এসব এলাকার তিন লাখ ৬৮ হাজার ৫৮৬ জন মানুষকে ৯৭৩টি আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। বন্যা মোকাবেলায় সরকার ঘরে বসে নেই। জেলা প্রশাসকদের চাহিদা মতো প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য ও আর্থিক বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। একটি লোকও যাতে খাবারের অভাবে কষ্ট না পায় জেলা প্রশাসনকে সে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে বন্যাপ্রবণ জেলাগুলোয় দশ হাজার ৬৩০ টন চাল, তিন কোটি ১০ লাখ টাকা এবং ৬০ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্লাবিত জেলাগুলোতে গত কয়েক দিনে এক হাজার ২০০ টন চাল ও ৬০ লাখ নগদ টাকা দেয়া হয়েছে।
বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের সমালোচনাকারীদের উদ্দেশে ত্রাণমন্ত্রী বলেন, বিদেশে বসে ফাঁকা আওয়াজ দিয়ে কোনো কাজ হবে না। সরকার বন্যাকবলিত মানুষের পাশে আছে। ত্রাণসামগ্রী বিতরণের সামর্থ্য না থাকলে মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে হলেও জনগণের পাশে দাঁড়ান। বন্যা পরিস্থিতির সর্বশেষ তথ্য তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, এ পর্যন্ত দেশব্যাপী ৫৬২টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৪ হাজার ৯৫০টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ১ লাখ ২৮ হাজার ৭৬৯টি। এ সংখ্যা ধীরে ধীরে কমবে। এখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন নদীতে ২৭টি পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, উত্তরাঞ্চল থেকে পানি নামার সময় মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জ, চাঁদপুর, রাজশাহী, টাঙ্গাইল ও ভোলা জেলা প্লাবিত হতে পারে। পানি এলে ঢাকার নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কাও আমরা দেখছি। তিনি জানান, দুর্গত হয়েছে এবং হতে পারে এমন ৩৩টি জেলায় ১০ হাজার ৬৩০ টন চাল ও তিন কোটি ১০ লাখ টাকা ইতোমধ্যে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে ২৪ ঘণ্টা যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। কোথায় কী প্রয়োজন, সেভাবেই আমরা চাহিদা মেটাচ্ছি।
মায়া বলেন, আমাদের হাতে খাদ্যের কোনো অভাব নেই, পর্যাপ্ত খাবার আছে। এ ধরনের পরিস্থিতির (বন্যা) আশঙ্কা বিবেচনা করেই প্রধানমন্ত্রী বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি করতে শুরু করেছেন এবং ইতোমধ্যে আসা শুরু হয়েছে। খাদ্যাভাব হবে বলে আমার মনে হয় না। আমরা সেটা মোকাবেলা করতে পারব।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের মহাপরিচালক রিয়াজ আহমেদ বলেন, উদ্ধারকারী যানবাহন ও নৌকা আগে থেকেই প্রস্তুত রাখতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। জিআরের টাকা দিয়ে নৌকা কিনতে বলা হয়েছে। কয়েক জায়গায় উদ্ধারকার্যক্রমের জন্য ফায়ার সার্ভিস, সিভিল ডিফেন্স, বিজিবি এবং সেনাবাহিনীর সহায়তাও নেয়া হচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্রে আসা মানুষ বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত যাতে খাবার ও অন্যান্য সহযোগিতা পান সে ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া থেকে ৫ থেকে ৭ লাখ টান খাদ্যশস্য আনার প্রক্রিয়া চলছে, আরো খাদ্যশস্য আনা হবে।
রিয়াজ আহমেদ বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৯০টি পর্যবেক্ষণ পয়েন্টের মধ্যে ৬৯টিতে সোমবার সকালেও পানি বাড়ার প্রবণতা অব্যাহত ছিল। এর মধ্যে ধরলা, তিস্তা, যমুনেশ্বরী, ঘাঘট, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, ধলেশ্বরী, পুনর্ভবা, টাঙ্গন, আত্রাই, সুরমা, কুশিয়ারা, মনু, খোয়াই, যদুকাটা, সোমেশ্বরী ও কংস বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে। দুর্গত জেলাগুলোর সাথে সড়ক যোগাযোগ মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। রেলপথে সারা দেশে থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে দিনাজপুর জেলা। জেলা শহরের বেশির ভাগ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের ঘোষণা দিয়েছে জেলা প্রশাসন। আগস্টের শেষে ফের ভারি বর্ষণ হলে সেপ্টেম্বর নাগাদ অন্তত ২৫ জেলায় বন্যার বিস্তার ঘটতে পারে।
উল্লেখ্য, গত কয়েক দশকে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল ১৯৯৮ সালে, তখন ৬৮ শতাংশ এলাকা পানিতে ডুবে গিয়েছিল। ১৯৮৮ সালের বন্যায় প্লাবিত হয় ৬১ শতাংশ এলাকা। ২০০৭ সালে বাংলাদেশের ৪০ শতাংশের বেশি এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। ২০১৩ সালে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাতে মাত্র ১০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। ২০১৫ সালে প্রায় ৩০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫