ঢাকা, মঙ্গলবার,১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭

ঢাকা

ফরিদপুরে উদ্ধারের পরদিন আবার যৌনপল্লীতে অপহৃত কিশোরী

হারুন আনসারী, ফরিদপুর

১৪ আগস্ট ২০১৭,সোমবার, ১৭:৪২ | আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০১৭,সোমবার, ১৭:৫২


প্রিন্ট
পুলিশের হাতে আটক দুই পাচারকারী।

পুলিশের হাতে আটক দুই পাচারকারী।

ফরিদপুরে র‌্যাবের বিশেষ অভিযানে সম্প্রতি উদ্ধার হয় তিন কিশোরী। আটক হয় মানবপাচার চক্রের দুই সদস্য। এরপর তাদের থানায় হস্তান্তর করলে অপহরণকারীদের বিরুদ্ধে কোতয়ালি থানায় মানবপাচার আইনে একটি মামলাও দায়ের করা হয়। কিন্তু পুলিশের কাছ থেকে অপহৃত এক কিশোরী (১৭) মুক্ত হয়ে আবার সেই অপরহণকারীদের ডেরাতেই ফিরে গেছে। বর্তমানে ওই কিশোরীকে দিয়ে আবারও অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে অপহরণকারী চক্র। এখনও সেখানে আটক কয়েকশ’ কিশারীর মুক্ত হওয়ার স্বপ্নও এ ঘটনার পর দু:স্বপ্নে পরিণত হয়েছে।

উদ্ধার হওয়া কিশোরীর বাড়ি হবিগঞ্জের মাধবপুর থানার তুলশীপুর গ্রামে। ছোটবেলায় সে মা-বাবকে হারিয়ে ভাইয়ের কাছে থাকতো। সেখান থেকে চাকরির প্রলোভনে ফরিদপুরে এনে ৩০ হাজার টাকায় তাকে রথখোলা পতিতাপল্লীতে বিক্রি করে দেয়া হয়।

র‌্যাব-৮, সিপিসি-২ ফরিদপুর ক্যাম্পের কোম্পানি অধিনায়ক (ভারপ্রাপ্ত) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রইছ উদ্দিনের নেতৃত্বে গত ৮ আগস্ট শহরের রথখোলা যৌনপল্লী থেকে পুলিশ অপহৃত ওই তিন অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীকে উদ্ধার করা হয়।

সাংবাদিকদের জিজ্ঞাসাবাদে কিশোরী জানায়, ছোটবেলায় মা-বাবা মারা যাওয়ায় অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার পর আর পড়াশোনা হয়নি তার। এরপর সে তার ভাইয়ের সাথে ঢাকায় এসে ফার্মগেট এলাকায় থাকতো। মাত্র ১৩ বছর বয়সে ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর ফার্মগেট এলাকা থেকে তাকে চাকরির প্রলোভনে ফরিদপুরে নিয়ে আসে এক অজ্ঞাতনামা নারী। এরপর তাকে লিজা (৪০) নামে এক নারী দালালের কাছে ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেয়। লিজা রথখোলা যৌনপল্লীতে এক নারী সর্দারনীর হয়ে কাজ করতো।

প্রাপ্ত কাগজপত্রে দেখা গেছে, ২০১৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি মোখলেসুর রহমান নামে জনৈক নোটারি পাবলিকের সহায়তায় ১৩ বছরের ওই কিশোরীকে ২০ বছর বয়স দেখিয়ে একটি হলফনামার (নং- ২৭৭, তারিখ-০৯/০২/২০১৪) মাধ্যমে পতিতাবৃত্তির আইনী সনদ বের করা হয়। তৎকালীন টিএসআই (টাউন সাব-ইন্সপেক্টর) তখন প্রত্যক্ষ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কিশোরীর শারিরীক সক্ষমতা ও হলফনামার সত্যতা নিশ্চিত করে। এর পুরো প্রক্রিয়াই সম্পন্ন হয় মোটা অংকের টাকার মাধ্যমে।

মামলা সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনার প্রায় চার বছর পর ওই কিশোরী গোপনে র‌্যাব-৮কে মোবাইলে তাকে আটকে রেখে পতিতাবৃত্তিতে লিপ্ত করার বিষয়টি জানায়। এরপর গত ৮ আগস্ট সেখানে অভিযান চালিয়ে ওই কিশোরীসহ আরো দু’জন অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীকে উদ্ধার করা হয়। তাদেরও একাজে লিপ্ত করায় লিজা ও নারায়ণ নামে দু’জকে আটক করা হয়।

পরে আটককৃত দু’জনসহ উদ্ধার হওয়া কিশোরীদের কোতয়ালি থানায় হস্তান্তর করে র‌্যাব। কোতয়ালি থানায় রাতেই ওই কিশোরীকে বাদি করে লিজা ও নারায়ণকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়। লিজা গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার শিবপুর গ্রামের জনৈক মোতাহার হোসেনের মেয়ে। মানব পাচারকারীদের নিকট থেকে কিশোরীদের মোটা অংকের টাকায় কিনে রথখোলা পতিতাপল্লীর রিজিয়া বেগম নামে এক নারীর বাড়িতে রেখে সে তাদের দিয়ে জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তিকে বাধ্য করাতো। আর রিজিয়া বেগমের বাড়ির দেখভাল করতো মৃত মুকুন্দ লাল চক্রবর্তীর ছেলে নারায়ণ চক্রবর্তী (৫৫)।

কিশোরীকে বাদি করে লিজা ও নারায়ণকে আসামি করে মামলা দায়েরের পর উদ্ধার করা অন্য দুই কিশোরীকে সেফহোমে পাঠিয়ে দেয়া হয়। আর থানা থেকে বিনা বাধায় বেরিয়ে এলে ওই কিশোরীকে আবারও রথখোলা যৌনপল্লীতে নিয়ে আসে মানবপাচারকারী চক্রটি।

উদ্ধার হওয়া অপর এক কিশোরীর বাড়ি দলপুর যাত্রাবাড়ি। নোটারি পাবলিক দিয়ে তার নামে ২০০৪নং- হলফনামাটি করা হয় ২০১৫ সালের ১৩ জুলাই। ওই হলফনামায় বয়স দেখানো হয় ২৩ বছর। আর একই বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি তৈরি করা ৩৫৪নং- হলফনামায় উদ্ধার হওয়া আর এক কিশোরীর বয়স দেখানো হয় ১৯ বছর। তার বাড়ি ভোলা জেলার পৌর নবীপুর।

মিথ্যা হলফনামা তৈরির পর কোতয়ালি থানার তৎকালীন টিএসআইকে দিয়ে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে তাদের শারিরীক সক্ষমতা ও হলফনামার সত্যতা নিশ্চিত করা হয়।

জিজ্ঞাসাবাদে সাংবাদিকদের নিকট মামলার বাদি ওই কিশোরী জানায়, থানা থেকে বের হলে তাকে আবারও যৌনপল্লীতে নিয়ে আসা হয়। আটক লিজাকে সে আম্মা বলে সম্মোধন করে।

এ ব্যাপারে অনুসন্ধানে জানা গেছে, রথখোলা যৌনপল্লীর ওই বাড়ির মালিক রিজিয়া বেগম বর্তমানে দেশের বাইরে রয়েছে। তার বাড়িটির দেখভাল করে নারায়ণ। আর সেখানে অবস্থানরত মেয়েদের নিরাপত্তা ও থানা পুলিশ তদারকী করে রিজিয়া বেগমের মেয়ে ফুরফুরী ওরফে রোজিনা বেগম (৪০)। এই ফুরফুরী বেগম রথখোলা পতিতাপল্লীর সবচেয়ে প্রভাবশালী সর্দারনী। তাকে সহায়তা করে তারই ছোটবোন ববি (৩৫)। ববি শহরের গোয়ালচামট খোদাবক্স রোডের জনৈক ইলিয়াস শেখের স্ত্রী বলে জানায়।

ববি জানায়, ফরিদপুর রথখোলা পতিতাপল্লীতে প্রায় ৯শ’ মেয়ে রয়েছে। তার দাবি, পুলিশ টাকা খেলেও প্রায়ই ঝামেলা করে। হলফনামা করা মেয়েদের নিয়ে যেনো পুলিশ ঝামেলা না করে সেজন্য তিনি আদালতের মাধ্যমে হলফনামা করার অনুরোধ জানায়।

নির্ভরযোগ্য অপর একটি সূত্র জানায়, প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীদের নানা প্রলোভনে ধরে অমানুষিক নির্যাতনের মাধ্যমে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হয়। মাঝেমধ্যে র‌্যাব-পুলিশের অভিযানে দু’চারজনকে উদ্ধার ও জড়িতদের আটক করা হলেও মোটা অংকের টাকা পয়সা খরচ করে তারা আবার সদর্পে ফিরে আসে। এখনও কয়েকশ’ অপ্রাপ্তকিশোরী মেয়েকে সেখানে আটকে রেখে জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হচ্ছে। কিছু এনজিও ও সমিতি সেখানে কাজ করলেও তাদের মূল ধান্দা থাকে দৈনিক চাঁদা তোলার প্রতিই। এ ব্যাপারে কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়ে আটক মেয়েদের উদ্ধার ও ধরাছোয়ার বাইরে থাকা নারী পাচারকারীদের গ্রেফতারের জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫