ঢাকা, মঙ্গলবার,২৪ অক্টোবর ২০১৭

প্রথম পাতা

বন্যা পরিস্থিতির অবনতি

দুই জেলায় রেড অ্যালার্ট; তিন জেলায় ১৭ জনের মৃত্যু

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

১৪ আগস্ট ২০১৭,সোমবার, ০০:০০ | আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০১৭,সোমবার, ০১:০২


প্রিন্ট
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে নতুন করে বন্যা দেখা দেয়ায় নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে লোকজন : নয়া দিগন্ত

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে নতুন করে বন্যা দেখা দেয়ায় নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে লোকজন : নয়া দিগন্ত

সারা দেশে বেশির ভাগ নদনদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। বাড়ছে পানিবন্দী মানুষের সংখ্যা। বন্যায় দিনাজপুরে ১৪ জন, কুড়িগ্রামে দুইজন ও ঠাকুরগাঁয়ে একজন মারা গেছে।
নীলফামারীতে রেড অ্যালার্ট জারি, নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়েছে তিস্তাপাড়ের মানুষকে। লালমনিরহাটেও রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে, তিস্তা তীরবর্তী এলাকায় মাইকিং করে লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়েছে। উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলায় রেললাইনে পানি উঠায় ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। বন্যায় রোপা আমনের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। সাময়িক বন্ধ রয়েছে লালমনিরহাট-বুড়িমারী রুটে রেল চলাচল।
দিনাজপুর সংবাদদাতা জানান, জেলার সব নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্রধান নদী পুনর্ভবার পানি বিপদসীমার ৮০ সেন্টিমিটার এবং আত্রাইয়ে ৮৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল রোববার ভোরে মাহুতপাড়া তুত বাগানের কাছে শহর রা বাঁধ ভেঙে গেছে। সেখানে প্রথমে বিজিবি এবং পরে সেনাবাহিনীর রংপুর ৬৬ ডিভিশনের একটি বিশেষ উদ্ধারকারী টিম বাঁধটি মেরামতের চেষ্টা চালাচ্ছে। শহরের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। দোকানপাট অধিকাংশ বন্ধ থাকতে দেখা গেছে। মানুষ স্কুল-কলেজ, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদরাসাসহ বিভিন্ন উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে।
শহরের সাথে আশপাশের জেলা-উপজেলাসহ রাজধানী ঢাকার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় রেল যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন রয়েছে। দু’দিন ধরে শহরের স্কুল-কলেজ অঘোষিতভাবে বন্ধ রয়েছে। গতকাল বন্যাপরিস্থিতির অবনতির জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান ডিগ্রি পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়। হিলি স্থলবন্দরের আমদানি-রফতানি বন্ধ রয়েছে। বন্যাজনিত কারণে জেলায় ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে কাহারোল উপজেলায় একই পরিবারের তিনজনসহ ৫ জন, বিরল উপজেলায় ৫ জন ও সদরে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
জেলার ১৩ উপজেলার কয়েক লাখ পানিবন্দী মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। পাবর্তীপুর-পঞ্চগড় লাইনে রেল চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। দিনাজপুর-ঢাকা মহাসড়কের আমবাড়ী এলাকায় একটি ব্রিজ ভেঙে যাওয়ায় ফুলবাড়ী-ঘোড়াঘাট মহাসড়ক ও দিনাজপুর-পাবর্তীপুর সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি সড়ক তিন ফুট পানির নিচে রয়েছে।
কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা জানান, কুড়িগ্রামে নদনদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। কুড়িগ্রাম-রংপুর মহাসড়কের কাঁঠালবাড়ি থেকে চওড়াহাট পর্যন্ত সাড়ে চার কিলোমিটার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কুড়িগ্রামের সাথে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। অন্য দিকে কুড়িগ্রাম-ভুরুঙ্গামারী সড়ক তলিয়ে যাওয়ার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে নাগেশ্বরী, ভুরুঙ্গামারী ও ফুলবাড়ী উপজেলাসহ সোনাহাট স্থলবন্দরের যোগাযোগ ব্যবস্থা।
কুড়িগ্রাম পৌরসভা এলাকার ভেলাকোপায় দুলু মিয়ার দেড় বছরের শিশু বাবু বন্যার পানিতে ডুবে ও হলোখানা ইউনিয়নের খামার হলোখানায় খালেকের স্ত্রী জোসনা (২৫) সাপের দংশনে মারা গেছে। বন্যার পানিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তলিয়ে যাওয়ায় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সাড়ে ৫০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
সেতু পয়েন্টে ধরলার পানি বিপদসীমার ১২৪ সেন্টিমিটার, চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার এবং পাটেশ্বরী পয়েন্টে দুধকুমারের পানি বিপদসীমার ১৩৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে জেলার রৌমারী, রাজিবপুর, চিলমারী, উলিপুর, নাগেশ্বরী, ভুরুঙ্গামারী, ফুলবাড়ী ও সদর উপজেলার ৬০ ইউনিয়নের প্রায় দুই লক্ষাধিক মানুষ। তলিয়ে গেছে ৪০ হাজার হেক্টরের রোপা আমন ক্ষেত।
পানির তীব্র স্র্রোতে সদরের আরডিআরএস বাজারে ৩০ মিটার ও ফুলবাড়ী উপজেলার গোড়কমণ্ডলে ১৫ মিটার বাঁধ ভেঙে নতুন করে ১০টি গ্রাম ও কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের বাংটুর ঘাট এলাকায় বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে ২০টি গ্রাম নতুুন করে প্লাবিত হয়েছে।
ঠাকুরগাঁও সংবাদদাতা জানান, ঠাকুরগাঁও শহর ও নি¤œœাঞ্চলের প্রায় ২০টি গ্রামে পানি ওঠায় শত শত ঘরবাড়ি ডুবে গেছে, শতাধিক পরিবার আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে। শহরের দোকানে ও বাড়িঘরে পানি ওঠে বৈদ্যুতিক জিনিস নষ্ট হয়েছে। লোকজন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ও কলেজ-বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছে। বন্যার্তদের উদ্ধারে নেমেছে জেলা প্রশাসন, ফায়ার ব্রিগেড, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী এবং ইএসডিও নামে একটি এনজিও। আবুল হোসেন সরকার কলেজে আশ্রয় নেয়া ৩০০ জনের মধ্যে এলাকাবাসী ও কলেজ কর্তৃপক্ষ খিচুরি বিতরণ করেছেন। এদিকে পীরগঞ্জের নিয়ামত গ্রামে রেহেনা পারভীন নামে এক নারীর ঘরে বন্যার পানি প্রবেশ করায় তিনি বন্যা আতঙ্কে মারা গেছেন। রেলপথ পানিতে ডুবে যাওয়ায় শনিবার সকাল থেকে ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
প্রবল স্র্রোতে শহরের পুরনো টাঙ্গন বেইলি ব্রিজ দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং বালিয়াডাঙ্গীর রূপগঞ্জ তীরণই ব্রিজের সংযোগ সড়ক ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। জেলার টাঙ্গন ও হরিপুর নাগর নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলা প্রশাসক আবদুল আওয়াল জানান, ভারী বর্ষণে জেলায় তিন শতাধিক ঘরবাড়ি তিগ্রস্ত হয়েছে। মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিস কাজ করছে। বাকিদের উদ্ধারের জন্য সেনাবাহিনী কাজ শুরু করেছে। শতাধিক আশ্রয়কেন্দ্রে বন্যাদুগর্তদের আশ্রয় ও ত্রাণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সিলেট ব্যুরো জানায়, সিলেটের চার উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। সুরমা-কুশিয়ারার সব ক’টি পয়েন্টের পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বেড়েছে সীমান্ত নদী ধলাই, পিয়াইন, বড়গাঙ ও সারীতেও। এতে পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন লাধিক মানুষ। পানি উঠে যাওয়ায় বিভিন্ন শিাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। পিছিয়ে দেয়া হয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় সাময়িক পরীাও।
সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ ক থেকে পাওয়া তথ্য মতে, গতকাল রোববার বেলা ৩টায় কানাইঘাটে সুরমা নদী বিপদসীমার ১০৫ সেন্টিমিটার, সিলেটে সুরমা নদী বিপদসীমার ৩০ সেন্টিমিটার, শেওলায় কুশিয়ারা বিপদসীমার ৬৫ সেন্টিমিটার, আমলশীদের কুশিয়ারা বিপদসীমার ৭৪ সেন্টিমিটার এবং শেরপুরে কুশিয়ার নদীর পানি বিপদসীমার ১২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উজানে বৃষ্টিপাতের কারণে পানি প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছে পাউবো।
বন্যাকবলিত গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, জৈন্তাপুর ও কানাইঘাট উপজেলার গ্রামীণ রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। তবে বন্যার্তদের সহায়তায় এখন পর্যন্ত কোনো ত্রাণ তৎপরতা দেখা যায়নি।
বগুড়া অফিস ও সারিয়াকান্দি সংবাদদাতা জানান, বগুড়ায় যমুনা নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় ৫০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৩৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, শনিবার বিকেলেও বিপদসীমার নিচ দিয়ে যমুনা নদীর পানি প্রবাহিত হচ্ছিল। কিন্তু সন্ধ্যার পর তিস্তা ব্যারাজের গেট খুলে দিলে হু হু করে পানি বাড়তে থাকে। অতিরিক্ত পানির চাপে সারিয়াকান্দি উপজেলার চন্দনবাইশায় পুরনো বাঁধে ভাঙন ধরেছে। এ ছাড়াও চালুয়াবাড়ী ইউনিয়নের মানিকদাইড় চরে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে।
সারিয়াকান্দি উপজেলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান জানান, উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ইউনিয়নগুলো হলো- কাজলা, চালুয়াবাড়ী, চন্দনবাইশা, কর্ণিভাড়ী, বোহাইল ও হাটশেরপুর।
নীলফামারী সংবাদদাতা জানান, রোববার সকাল থেকে তিস্তার পানি বিপদসীমার ৪০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে তিস্তায় রেড অ্যালার্ট জারি করে মানুষজনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ভারতীয় একাধিক গণমাধ্যম ও বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া খবরে জানা যায়, ভারত গজলডোবা ব্যারাজের ৫৪টি স্লুইস গেট খুলে দেয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা সতর্কীকরণ ও পূর্বাভাস কেন্দ্র জানিয়েছে, শনিবার রাত সাড়ে ৯টায় ভারত তাদের অংশের তিস্তা নদীতে রেড অ্যালার্ট জারি করেছে। গজলডোবার গেট খুলে দেয়ার খবরে বাংলাদেশে তিস্তা অববাহিকায় সতর্কতা জারি করেছে ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড। তিস্তার পানি অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় তিস্তা ব্যারাজ এলাকার ফাড বাইপাস হুমকির মুখে পড়েছে। সেখানে অবস্থান করা ডালিয়া পাউবোর কর্মকর্তারা জানান, পানি বৃদ্ধির কারণে শনিবার রাত থেকে জেলার ডিমলা উপজেলার তিস্তা অববাহিকার গ্রাম ও চর এলাকায় মাইকিং ও ঢোল শহরত করে মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নিচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। রোববার সকালে ডিমলা খালিশাচাঁপানী ইউনিয়নের বাঁইশপুকুরের একটি সাইট বাঁধ ধসে গেছে।
এদিকে নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে জেলার ডিমলা উপজেলার নদীতীরবর্তী ৩০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এসব গ্রামের পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দী রয়েছেন বলে জানান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজার রহমান জানান, তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি স্লুইস গেট খুলে দিয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হয়েছে।
লালমনিরহাট সংবাদদাতা জানান, জেলায় বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। রোববার দুপুরে দোয়ানী পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ৬৫ সেন্টিমিটার ও কুলাঘাট পয়েন্টে ধরলা নদীর পানি বিপদসীমার ১০৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।
তিস্তা ও ধরলা নদীর ৬৩টি চর তলিয়ে গেছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন জেলার পাঁচটি উপজেলার পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ। বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে ১৪৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। রেললাইনের ওপরে পানি উঠে যাওয়ায় রোববার সকাল থেকে সাময়িক বন্ধ রয়েছে লালমনিরহাট-বুড়িমারী রুটে রেল চলাচল। তিস্তা ব্যারাজের সব ক’টি গেট খুলে দিয়ে পানি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় ব্যারাজ রক্ষার্থে রোববার রাত ২টার সময় কেটে দেয়া হয়েছে ফাড বাইপাস সড়ক। এতে রাতেই পানি ঢুকে পড়ে হাতিবান্ধা উপজেলার লোকালয়ে। ব্যারাজ এলাকায় জারি করা হয়েছে রেড অ্যালার্ট। লোকজনকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যেতে করা হচ্ছে মাইকিং। পানি ঢুকে পড়েছে জেলা শহরে। সদর হাসপাতাল থেকে কুলাঘাট ইউনিয়ন পর্যন্ত ছয় কিলোমিটার রাস্তা তলিয়ে গেছে। জেলার ৪৫টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়েছে।
সরেজমিন রোববার সকালে হাতিবান্ধা উপজেলার তিস্তা পাড়ে গিয়ে দেখা যায়, লোকজন বাড়িঘর দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে। উঁচু রাস্তার দুই ধারে কোনো রকমে মাথা গোঁজার ঠাই বানিয়ে নিচ্ছে বানভাসি লোকজন। চরম সঙ্কট দেখা দিয়েছে শুকনা খাবারের। তলিয়ে গেছে হাজার হাজার বিঘা জমির সদ্য রোপণকৃত আমন ধান, সবজিসহ নানা ফসল ও ভেসে গেছে পুকুরের মাছ।
জেলা প্রশাসক সফিউল আরিফ বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ইউপি চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে বন্যাকবলিত এলাকায় খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। তাদের মাঝে শুকনা খাবার ও ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় ৪৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৬৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। দ্রুত পানি বৃদ্ধির ফলে কাজীপুর, বেলকুচি, চৌহালি, শাহজাদপুর ও সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার দুই শতাধিক গ্রাম পুনরায় বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। নদী তীরবর্তী অনেক নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ হাসান ইমাম জানান, পানি আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস সূত্রে জানা গেছে, বন্যাপরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুদ রয়েছে।
সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, সুনামগঞ্জে সার্বিক বন্যাপরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। সুরমার পানি বিপৎসীমার ৮২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড। স্থগিত রয়েছে ছয়টি উপজেলার আট শতাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় সাময়িক পরীা। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বেশ কয়েকটি উপজেলায় সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা।
বন্যায় প্রায় চার হাজার হেক্টর জমির রোপা আমন ধান তলিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় অর্ধশতাধিক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পানি প্রবেশ করেছে। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। বন্যায় ভেসে গেছে ৫ শতাধিক পুকুরের মাছ।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো: কামরুজ্জামান বলেন, জেলার প্রত্যেক উপজেলায় ১০ মেট্রিক টন চাল ও ১০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে তাহিরপুর উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দী রয়েছে। জেলার ছয়টি উপজেলার বাজারগুলোর দোকানপাট তলিয়ে হাটবাজার বন্ধ রয়েছে। খেটে খাওয়া মানুষেরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। সীমান্তবর্তী নদী জাদুকাটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এ নদী ছাড়াও অন্যান্য নদীর পানি বাড়ায় নতুন নতুন এলাকাগুলো প্লাবিত হয়েছে। ফলে বেকার হয়ে পড়েছেন জেলার লক্ষাধিক মানুষ। বাড়িঘরে পানি উঠে যাওয়ায় আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে প্রায় ২৫ হাজার পরিবার।
কিশোরগঞ্জ (নীলফামারী) সংবাদদাতা জানান, কিশোরগঞ্জ উপজেলায় বিভিন্ন নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের নিচু এলাকার বাড়িঘর ও ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। বিভিন্ন ইউনিয়নের কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। পানিবন্দী বাড়ির লোকজন ¯ু‹লের বারান্দায় আশ্রয় নিয়েছে। তলিয়ে যাওয়া এলাকা পরিদর্শন করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মেহেদী হাসান। পানিবন্দীদের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ৮.৯ মেট্রিক টন চাল ও উপজেলা পরিষদ থেকে এক লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ৫ হাজার ২০০ হেক্টর জমির আমনক্ষেত ও খরিপ-২ মওসুমের ৪০ হেক্টর জমির শাকসবজির ক্ষেত তলিয়ে গেছে। উপজেলায় ২১৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে উপজেলা কৃষি বিভাগ।
গাইবান্ধা সংবাদদাতা জানান, জেলায় গত রোববার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্রের পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ২৯ সেমি. এবং ঘাঘট নদীর পানি ৮ সেমি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া করতোয়া ও তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে এখন বিপৎসীমার সামান্য নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এ দিকে পানি বৃদ্ধির ফলে সুন্দরগঞ্জের তিস্তা, গাইবান্ধা সদরের ব্রহ্মপুত্র, ফুলছড়ি ও সাঘাটায় যমুনা এবং গোবিন্দগঞ্জে করতোয়া নদীসংলগ্ন নি¤œাঞ্চল ও বিস্তীর্ণ চর এলাকায় পানি ঢুকে পড়েছে। ফলে ওইসব এলাকার আমনতে, বীজতলা, শাকসবজি ও অন্য ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: মাহবুবুর রহমান জানান, গাইবান্ধাসহ পাশের এলাকায় আবার বন্যা দেখা দিতে পারে।
সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা জানান, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সাত ইউনিয়ন প্লাবিত হয়ে পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন প্রায় ৩০ হাজার মানুষ। তলিয়ে গেছে দুই হাজার হেক্টর আমনক্ষেত। অনেকেই বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছেন। বন্যাকবলিত এলাকায় দেখা দিয়েছে খাদ্য, ওষুধপত্র, স্যানিটেশনসহ বিশুদ্ধ পানির তীব্র সঙ্কট।
কাপাসিয়া ইউপি চেয়ারম্যান জালাল উদ্দিন সরকার জানান, ভাটি কাপাসিয়া, লালচামার এলাকায় নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। তারপুর ইউপি চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম জানান, তার ইউনিয়নের পানিবন্দী তিন হাজার পরিবার সরকারিভাবে কোনো সহায়তা পায়নি। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র জানায় বন্যায় ১৬ শ’ হেক্টর আমন ধান, ৪২ হেক্টর বীজতলা, ৪৫ হেক্টর শাকসবজি নিমজ্জিত হয়েছে।
খাগড়াছড়ি সংবাদদাতা জানান, টানা বর্ষণে খাগড়াছড়ির নি¤œাঞ্চল আবারো প্লাবিত হয়ে দীঘিনালার দুই ইউনিয়নসহ জেলার পাঁচ শতাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বর্ষণ অব্যাহত থাকায় পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে।
গত শনিবার দুপুর মাইনী নদীর পানি বেড়ে গিয়ে নি¤œাঞ্চল ডুবে গিয়ে সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় রাঙ্গামাটির লংগদু উপজেলার সাথে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। হঠাৎ মাইনী নদীর পানি বেড়ে গিয়ে দোকানপাটে ঢুকে যাওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী তিগ্রস্ত হয়েছেন।
রোববার বিকেল পর্যন্ত দীঘিনালা উপজেলার হাজাছড়া, ৩নং কলোনি এলাকায় পাহাড়ধসে ৫টি বাড়ি ধসে পড়েছে। তবে লোকজন নিরাপদ আশ্রয়ে থাকায় কোনো য়তি হয়নি বলে জানিয়েছেন দীঘিনালা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো: মাহাফুজুর রহমান। অন্য দিকে, মাটিরাঙ্গা উপজেলায় ধলিয়া নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে গ্রামীণ সড়ক।
খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক রাশেদুল ইসলাম জানান, পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে সরিয়ে আনতে উপজেলা প্রশাসন কাজ করছে।
আদমদীঘি (বগুড়া) সংবাদদাতা জানান, আদমদীঘি উপজেলার জিনইর, শালগ্রাম, কদমা, করজবাড়ী, কাশিমিলা, কেশরতাসহ বিভিন্ন গ্রামের ৩ হাজার ১০ হেক্টর জমির রোপা আমনক্ষেত প্লাবিত হয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিসার ও কৃষিবিদ কামরুজ্জামান জানান, বৃষ্টিতে প্রায় ৩ হাজার ১০ হেক্টর জমির রোপা আমন ধান তলিয়ে গেছে। দুই-একদিনে মধ্যে পানি নেমে গেলে ধান গাছের তেমন ক্ষতি হবে না।
আটোয়ারী (পঞ্চগড়) সংবাদদাতা জানান, দীর্ঘ খরার পর টানা পাঁচ দিনের প্রবল বর্ষণে পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার নি¤œাঞ্চলে বন্যা হয়েছে। গত বুধবার হতে আটোয়ারীতে মুষলধারে বৃষ্টি পাত শুরু হয়। দুই-এক দিনের মধ্যে বৃষ্টি না থামলে উঠতি ফসল আমন, শসা, করলাসহ অন্যান্য রবিশস্যের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাড়িঘরে পানি ওঠায় বেশ কিছু এলাকার লোকজন বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন। এ দিকে রেলপথ ডুবে যাওয়ায় ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে।
অব্যাহত ভারী বর্ষণে তোড়িয়া ভায়া নিতুপাড়া-ফকিরগঞ্জ বাজার সড়কের শিঙ্গিয়া ব্রিজ সংলগ্ন রাস্তা, নিতুপাড়া-সিঙ্গিয়া কাঁচা রাস্তাসহ গোটা উপজেলার প্রায় ২০টি রাস্তা ভেঙে উপজেলা সদরের যোগাযোগবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এ দিকে ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় রেলপথের নয়নীবুরুজ এলাকায় ৫০২/১ থেকে ৫০৪/৫ এলাকা পর্যন্ত প্রায় ২ কিমি. রেলপথ পানির নিচে ডুবে যাওয়ায় ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে।
নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, নাগেশ্বরী চর বেরুবাড়ী রাস্তা ভেঙে কয়েকটি বাড়ি বিলীন হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তীব্র স্রোতে পাগলির ব্রিজ, মন্নেয়ার ব্রিজ, নুনখাওয়া ব্রিজ ভেঙে যাওয়ায় নাগেশ্বরীর সাথে ১০টি ইউনিয়নের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। দুধকুমর, গংগাধর, ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপৎসীমার ১১৮ সেমি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন ২ লক্ষাধিক মানুষ। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান বন্ধ হয়ে গেছে। ভেসে গেছে সহস্রাধিক মৎস্যঘেরের মাছ। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান সরকার জানান, বন্যায় ১৪ হাজার ৩৬০ হেক্টর জমির আমন, ২৯০ হেক্টর বীজতলা এবং ২১০ হেক্টর সবজিক্ষেত তলিয়ে গেছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবু হায়াত মো: রহমতুল্লাহ জানান, বানাভাসীদের জন্য ৪০ মে. টন চাল এবং শুকনো খাবারের জন্য ২ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
রৌমারী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, রৌমারীতে তলিয়ে গেছে হাজার হাজার একর রোপা আমন ধান ও বীজতলা। ধান তলিয়ে যাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন কৃষক। ধান রোপণের কাজ শেষ হতে না হতেই টানা বর্ষণে শেষ হয়ে গেল কৃষকের স্বপ্ন। সরেজমিনে কৃষকের সাথে আলাপকালে তারা বলেন, ধান রোপণের পর অবশিষ্ট বীজতলা তলিয়ে গেছে। তারা সরকারিভাবে বীজ সরবরাহের দাবি জানান।
ভূরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, ভূরুঙ্গামারীতে বন্যাপরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। উপজেলার দশটি ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তলিয়ে গেছে। বাকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্যার্তদের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বাড়ছে বন্যার্তদের ভিড়।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যার্তদের ২৫ টন চাল ও ২ লাখ টাকা মূল্যমানের ৯০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হবে বলে জানা গেছে। বন্যার কারণে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৫ সালের চলমান ডিগ্রি পাস কোর্সের গতকালের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।
মান্দা (নওগাঁ) সংবাদদাতা জানান, মান্দা উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত আত্রাই নদীর পানি গতকাল বিপৎসীমার ৫০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে। বেশ কয়েক স্থানে ভাঙন দেখা দেয়ায় বন্যাপরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে।
গতকাল কশব ইউনিয়নের পাজরভাঙ্গা সমির শাহর বাড়ির নিকট বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ ভেঙে ২৭৫টি পরিবারের বাড়িঘর নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া দক্ষিণ চকবালু হিন্দুপাড়া নামক স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ ভেঙে গেলে ৫০-৬০টি বাড়ি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বন্যাকবলিত মানুষ খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সঙ্কটে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুর রশিদ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: নুরুজ্জামান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
পতœীতলা (নওগাঁ) সংবাদদাতা জানান, বন্যাার পানিতে পতœীতলাসহ আশপাশের এলাকায় ডুবে গেছে আমনক্ষেত ও রাস্তাঘাট। আত্রাই নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পতœীতলা গোডাউন পাড়ায় নদীর বাঁধে ধস শুরু হয়েছে।
পতœীতলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: আব্দুল মালেক জানান, ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধে আপাতত বালুর বস্তা ফেলার প্রক্রিয়া চলছে। বাঁধে ব্লক বসানোর কাজ প্রক্রিয়াধীন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নওগাঁ জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী মো: আনোয়ার হোসেন বলেন, বাঁধের ধসের জায়গায় ব্লক ফেলানো হবে।
ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) সংবাদদাতা জানান, ঘোড়াঘাটের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে বন্যা দেখা দেয়ায় লোকজন বিপাকে পড়েছেন। নতুন করে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে পৌর এলাকার বালুপাড়া, চামপাতলি, রিশিঘাট, বোদর, সাতপাড়া, ভন্নাপাড়া, শ্যামপুর ও লালমাটি এলাকায়। এ ছাড়াও বেশ কিছু মাছের ঘেরের মাছ বের হয়ে গেছে।
রংপুর অফিস জানায়, রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলে বন্যাপরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। ভেঙে গেছে তিনটি শহর রক্ষা বাঁধ। দুর্গত লোকায় শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি সামলাতে সিভিল প্রশাসনের সৈয়দপুর ও দিনাজপুরের দুর্গত এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ মেরামত ও বন্যার্তদের উদ্ধারে মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনী।
পানির প্রবল স্রোতের কারণে বিভিন্ন এলাকার বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় প্লাবিত হয়েছে তিস্তা অববাহিকায় ১৫২ কিলোমিটার এলাকার চরাঞ্চল ও নি¤œাঞ্চল। তিস্তা-ঘাঘট যমুনেশ্বরী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় রংপুরের সদর, পীরগাছা, কাউনিয়া, পীরগঞ্জ ও মিঠাপুকুর উপজেলার ৮৫টি গ্রামসহ পানির নিচে তলিয়ে গেছে রোপা আমনসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষেত। লাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।
পার্বতীপুর (দিনাজপুর) সংবাদদাতা জানান, পার্বতীপুরে বন্যাপরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। প্লাবিত হয়েছে উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন। তলিয়ে গেছে ১৮ হাজার হেক্টর জমির আমন ক্ষেত। ভেসে গেছে আড়াই হাজার পুকুরের মাছ। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে শতাধিক গ্রামের মানুষ। ভেঙে পড়েছে শতাধিক কাঁচা বাড়ি। গবাদিপশু নিয়ে মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে স্থান নিতে শুরু করেছে। তিনটি আশ্রয় কেন্দ্র খুলেছে উপজেলা প্রশাসন। বিতরণ করা হচ্ছে রান্না করা খাবার। রেললাইনে পানি ওঠায় পার্বতীপুর- পঞ্চগড় ও পার্বতীপুর-বিরল এ দুই রেলপথে ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়াও ফুলবাড়ী-দিনাজপুর মহাসড়কের পার্বতীপুর-পাঁচবাড়ী অংশের ১৬ কিলোমিটার সড়ক বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় দিনাজপুরের সাথে ঢাকার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ রোববার ভোর থেকে বন্ধ রয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তরফদার মাহমুদুর রহমান বলেন, উপজেলার সব কটি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়েছে। তিনটি আশ্রয় কেন্দ্রে রান্না করা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।
ইসলামপুর (জামালপুর) সংবাদদাতা জানান, ইসলামপুরে আবারো বন্যা দেখা দিয়েছে। যমুনার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নদীর তীরবর্তী সাত ইউনিয়নের ১২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। রোববার বন্যার পানি যমুনার বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে বিপদসীমার ৬৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
প্রথম দফা বন্যার পর বানভাসীরা ঘরে ফিরতে-না-ফিরতেই আবারো দ্বিতীয় দফা বন্যা এ অঞ্চলের মানুষদের চরম সঙ্কটে ফেলে দিয়েছে। বন্যার সাথে পাল্লা দিয়ে শুরু হয়েছে নদী ভাঙন। সাপধরী ইউপি চেয়ারম্যান জয়নাল অবেদীন জানান, এ বছর বন্যায় তার ইউনিয়নে দেড় শতাধিক ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। নির্মাণাধীন জোনকী-২ আশ্রায়ণ প্রকল্পটি ভাঙনের হুমকিতে পড়েছে।
ফুলছড়ি (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা জানান, ফুলছড়ি উপজেলার সার্বিক বন্যাপরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। উপজেলার নি¤œাঞ্চলের ২২টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ফুলছড়ি তিস্তামুখঘাট পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার ৫০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। টানা বৃষ্টি ও বন্যায় বিঘিœত হচ্ছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বিরামহীন বৃষ্টি ও বন্যার পানিতে বন্যাকবলিত এলাকায় জনদুর্ভোগ ক্রমেই বাড়ছে।
নওগাঁ সংবাদদাতা জানান, নওগাঁয় নদীর পানি বাড়ার সাথে সাথে আত্রাই উপজেলার আট ইউনিয়নে আমনচাষি কৃষকদের মাঝে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। ২৫ টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে নাজুক পরিস্থিতি রয়েছে বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের। বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে ফসলহানি যাতে না হয় এ জন্য নজর রাখছে উপজেলা প্রশাসন। জলাবদ্ধাতায় নওগাঁ পৌরবাসী চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।
ইউপি সদস্য আব্দুল মজিদ মল্লিক বলেন, ২০১৫ সালে উপজেলার ফুলবাড়িতে বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে গেলেও তা আজো সংস্কার করা হয়নি। আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: মোখলেছুর রহমান বলেন, কোনো জায়গায় যেন বাঁধ ভেঙে জনগণের জানমালের ক্ষতি না হয় এ জন্য আমরা সজাগ দৃষ্টি রাখছি।
ধর্মপাশা (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, ধর্মপাশায় বন্যার পরিস্থিতি চরম অবনতি হয়েছে। উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ২০টি গ্রামের কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ঢলের পানিতে বীজতলা নষ্ট হয়েছে ও গবাদি পশুর খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে। ১৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্লাবিত হওয়ায় সেগুলোতে দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা স্থগিত রাখা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: মামুন খন্দকার বলেন, পানিবন্দী পরিবারগুলোর জন্য বিভিন্ন বিদ্যালয়ে আশ্রয় কেন্দ্র খোলার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউপির চেয়ারম্যানদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তালিকা তৈরি করার জন্য।
ময়মনসিংহ অফিস জানায়, জেলার সীমান্তবর্তী ধোবাউড়া উপজেলার কালিকাবাড়ি গোদারাঘাট এলাকায় নিতাই নদীর প্রবল স্রোতে উত্তর পাশের তীর ভেঙে ১০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ভাঙনের কবলে পড়েছে কয়েকটি দোকান ও বাড়িঘর।
দক্ষিণ মাইজপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফজলুল হক জানান, উপজেলার ১ নম্বর দণি মাইজপাড়া ইউনিয়নের কালিকাবাড়ি গ্রামের এজাহারের বাড়ির নিকট প্রায় ১০০ ফুট নদীর তীর ভেঙে ১০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। স্থানীয় সাংবাদিক সিরাজুল ইসলাম জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন প্লাবিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। কালিকাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে বলে এলাকাবাসী তাকে জানিয়েছেন।
হিলি (দিনাজপুর) সংবাদদাতা জানান, হিলি স্থলবন্দর ও এর আশপাশের এলাকার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। হিলি স্থলবন্দর ও এর আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা আরো বেড়েছে। হিলি স্থলবন্দরের আমদানি-রফতানি কাজে ব্যবহৃত একমাত্র সড়কসহ বিভিন্ন সড়ক দুই থেকে তিন ফুট পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে বন্দরের আমদানি-রফতানি কার্যক্রম।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫