ঢাকা, বুধবার,১৬ আগস্ট ২০১৭

প্রথম পাতা

প্রধান বিচারপতি-কাদের বৈঠক নিয়ে আলোড়ন

আরো আলোচনা হবে, সময় হলে সব কিছু জানতে পারবেন : কাদের

জাকির হোসেন লিটন

১৪ আগস্ট ২০১৭,সোমবার, ০০:০০


প্রিন্ট

প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার সাথে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বৈঠক নিয়ে রাজনীতি ও বিচারাঙ্গনে তুমুল আলোচনা চলছে। তবে এ বৈঠকের বিষয়বস্তু সম্পর্কে ক্ষমতাসীন দল বা সরকারের তরফ থেকে কোনো কিছু স্পষ্ট করা হয়নি। স্বয়ং আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হকও এ বৈঠকের বিষয়বস্তু সম্পর্কে অবগত নন বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। ফলে প্রধান বিচারপতি ও ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদকের এ বৈঠক ব্যাপক কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।
শনিবার রাতে প্রধান বিচারপতির সরকারি বাসভবনে অনুষ্ঠিত প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী এ বৈঠক নিয়ে ইতোমধ্যেই চরম উদ্বেগ ও শঙ্কার কথা জানিয়েছে বিএনপি। তবে বৈঠকের বিষয়বস্তু নিয়ে আওয়ামী লীগ বা সরকারের কেউ সরাসরি কোনো কথা না বললেও মূলত ষোড়শ সংশোধনী বাতিল ও পর্যবেক্ষণ নিয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক প্রধান বিচারপতির কাছে সরকার ও আওয়ামী লীগের অবস্থানই তুলে ধরেছেন বলে বিভিন্ন সূত্র বলছে।
বৈঠকের কথা স্বীকার করে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গতকাল এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমি মাননীয় প্রধান বিচারপতির বাসায় গিয়েছিলাম। তার সাথে আমার দীর্ঘক্ষণ আলোচনা হয়েছিল। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে যে পর্যবেক্ষণ বা অবজারভেশন ছিল তা নিয়ে আমাদের পার্টির বক্তব্য জানিয়েছি। আরো অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে দীর্ঘক্ষণ।’
তবে আলোচনার ফলাফল সম্পর্কে কিছু জানাতে চাননি ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, ‘তার (প্রধান বিচারপতি) সাথে আলোচনা হয়েছে, দীর্ঘক্ষণ। আরো আলোচনা হবে। আলোচনা শেষ হয়নি। শেষ হওয়ার আগে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। সময় হলে আপনারা সব কিছু জানতে পারবেন। আমিও বলব।’
আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সূত্র জানায়, এ রায় নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চরম অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে বলে প্রধান বিচারপতিকে জানিয়েছেন ওবায়দুল কাদের। তবে রায়কে কেন্দ্র করে অনাকাক্সিক্ষত কোনো পরিস্থিতি তৈরি হোক বা বিচার বিভাগের সাথে নির্বাহী বিভাগের মুখোমুখি অবস্থান হোক তা সরকার চায় না। তাই রায়ে থাকা অপ্রাসঙ্গিক পর্যবেক্ষণ বাদ দিয়ে রাজনৈতিক মহলে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে বিচার বিভাগের দায়িত্ব আছে। সে জন্য প্রধান বিচারপতিকে এ দায়িত্ব নিয়ে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি নিরসন করতে অনুরোধ জানান ওবায়দুল কাদের।
তবে প্রধান বিচারপতি তাৎক্ষণিকভাবে তার কোনো অবস্থান আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদককে জানাননি। জানা গেছে, সাক্ষাতের অগ্রগতি শনিবার রাতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অবহিত করেছেন ওবায়দুল কাদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা জানান, ‘প্রধান বিচারপতির সাথে আলোচনা আরো চলবে। আলোচনা ফলপ্রসূ হলে পরে রায় নিয়ে আমরা আমাদের কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করব।
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বেঞ্চ গত ৩ জুলাই বিচারপতি অপসারণ সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে দেয়া হাইকোর্টের রায় বহালের পক্ষে মত দেন। এরপর ১ আগস্ট ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায় কয়েকটি বিষয়ে পর্যবেক্ষণসহ প্রকাশ করা হয়। রায় ঘোষণার পর থেকেই সরকারের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এ রায়কে ঐতিহাসিক আখ্যায়িত করে সরকারের পদত্যাগ দাবি তুলেছে।
আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো জানায়, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের এ রায় এবং পর্যবেক্ষণকে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় আঘাত হিসেবে দেখছেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। বিশেষ করে সব বিচারপতির সর্বসম্মত রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত ‘রাজনীতিতে ব্যক্তিবাদ’, সামরিক শাসন, ‘অপরিপক্ব সংসদ’, দুর্নীতি, সুশাসন, মুক্তিযুদ্ধ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সমালোচনা করেন। বিষয়টি নিয়ে বিস্মিত ও চরম ক্ষুব্ধ হন সরকারের কর্তা ব্যক্তিরা। বিশেষ করে কারো ‘একক নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়নি’ এবং ‘বর্তমান সংসদ অপরিপক্ব’ আদালতের এ পর্যবেক্ষণকে কোনোভাবেই তারা মেনে নিতে পারছেন না। সে জন্য এ রায় ঘোষণার পর কিছু দিন চুপ থাকলেও গত কয়েক দিন ধরে দলটির নেতারা মুখ খোলা শুরু করেছেন। বিশেষ করে প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছেন তারা। দল ও সরকারের শীর্ষ-পর্যায় থেকে শুরু করে মধ্যম সারির নেতামন্ত্রীরাও আদালতের রায় নিয়ে কথা বলছেন। কেউ কেউ ব্যক্তিগত বিষয়ে আক্রমণ করে অবিলম্বে প্রধান বিচারপতির স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না হলে অপসারণও দাবি করেছেন। প্রয়োজনে দাবি আদায়ে আন্দোলনে নামারও হুমকি দিচ্ছেন তারা। দাবি আদায়ে সারা দেশে তিন দিনের কর্মসূচি পালন করছেন আওয়ামী লীগ পন্থী আইনজীবীরাও।
অন্য দিকে এ রায়কে ঐতিহাসিক উল্লেখ করে সিনিয়র আইনজীবী এবং বিএনপিসহ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো অভিনন্দন জানিয়েছে। রায়ের কঠোর সমালোচনা, প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ এবং আন্দোলন কর্মসূচিকে আদালতের চরম অবমাননা হিসেবে মনে করছেন তারা। একটি রায় ঘিরে সরকারের এমন আচরণকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ এবং বিচারাঙ্গনের ওপর চরম চাপ বলেও মনে করছেন অনেকে।
তারা বলছেন, এর আগেও একাধিকবার বিচার বিভাগের ওপর চাপের এমন ঘটনা ঘটেছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামিরা খালাস পেয়ে গেছেন এমন গুজবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও ভাঙচুর করেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। একই শাসনামলে রাজধানীর বস্তি উচ্ছেদ নিয়ে ড. কামাল হোসেনের করা একটি রিট পিটিশন আদালতের গেটে হাজারো বস্তিবাসীকে জড়ো করে বিচার বিভাগের ওপর চাপ তৈরি করেন তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। এবারো পরিস্থিতি সে রকম কিছুর দিকেই যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানায়, ষোড়শ সংশোধনী বাতিল নিয়ে আওয়ামী লীগ বা সরকারের তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই। কিন্তু রায়ের পর্যবেক্ষণকেই তারা আপত্তিজনক হিসেবে মনে করছেন। কারণ পর্যবেক্ষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলা হয়েছে। বর্তমান সংসদকে অপরিপক্ব বলে সমালোচনা সরকারবিরোধীদের দাবি সত্য বলে প্রমাণ করেছে। এ পর্যবেক্ষণ যদি বহালই থাকে তবে ভবিষ্যতে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে আওয়ামী লীগের ওপর। এমনকি এ পর্যবেক্ষণ নিয়ে ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথও পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। যার ফসল ঘরে তুলবেন আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর সমালোচকেরা। সে জন্য এ পর্যবেক্ষণকে সরকার চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। পর্যবেক্ষণ এক্সপাঞ্জ করতে যা যা করার সবই করবে সরকার।
এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ গতকাল বলেছেন, ‘পর্যবেক্ষণে বঙ্গবন্ধুর প্রতি অবমাননা করা হয়েছে। কেউ যদি বলে একজন একটা দেশ স্বাধীন করতে পারে নাই। একজন একটা দেশ গঠন করতে পারে না। এ উক্তি খুবই দুঃখজনক।’
তিনি বলেন, ‘রায় নিয়ে আমাদের কোনো মন্তব্য নেই। কিন্তু রায়ের পর্যবেক্ষণে যেসব কথা বলা হয়েছে তা দুঃখজনক। রায় নিয়ে নয়, রায়ের বাইরে আমাদের (সংসদ সদস্য) অপরিপক্ব বলা হয়েছে, তা খুবই দুঃখজনক কথা। আমরা লেখাপড়া জানা শিক্ষিত মানুষ।’
দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে দেশের মানুষ জানে। বঙ্গবন্ধু যে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তা চন্দ্র সূর্যের মতোই সত্যি। এটা নিয়ে রায়ে যা বলা হয়েছে তা জনগণ মেনে নেবে না, ক্ষমা করবে না। সুতরাং এ রায়ের পুনর্বিবেচনা জরুরি।’
দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, ‘এই রায়ে জনগণের অধিকারকে হরণ করা হয়েছে। সংবিধানে আছে সব কিছুর মালিক জনগণ। সুতরাং জনগণের প্রতিনিধিদের হাতেই ক্ষমতা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। বলা যায়, রায় সংবিধানপরিপন্থী। আর ইতিহাসের মীমাংসিত বিষয় মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু নিয়ে যে বক্তব্য দেয়া হয়েছে এতে করে স্বাধীনতাবিরোধীদের উসকানি দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে অমীমাংসিত অবস্থানে নিতে চাইছে। সুতরাং এ রায় প্রত্যাখ্যান করছি।’
আওয়ামী লীগের নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানায়, রায় নিয়ে দল ও সরকারের অবস্থান প্রধান বিচারপতির কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। রায় ও পর্যবেক্ষণ বহাল থাকলে সরকারের নির্বাহী ও বিচার বিভাগের সাথে একটা দূরত্ব তৈরি হবে বলেও আশঙ্কার কথা জানান প্রধান বিচারপতিকে। সে জন্য রায়ের পর্যবেক্ষণ কিভাবে একপাঞ্জ করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করেন তিনি। সে অনুযায়ী আওয়ামী লীগ বা সরকার সামনে পদক্ষেপ নেবে বলেও প্রধান বিচারপতিকে জানিয়ে দেন তিনি।
এ দিকে প্রধান বিচারপতির সাথে ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বৈঠককে নজিরবিহীন হিসেবে আখ্যায়িত করছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সিনিয়র আইনজীবীরা। বৈঠকের খবরে চরম উদ্বেগ ও শঙ্কার কথা জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও। গতকাল এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘গতকাল (শনিবার) রাতে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বাসায় গিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং সেখানে তিনি নৈশভোজে অংশ নিয়েছেন। এতে আমরা বিস্মিত হয়েছি। কারণ ইতোমধ্যে এরাই (আওয়ামী লীগ) প্রধান বিচারপতিকে উদ্দেশ করে সন্ত্রাস ও সঙ্ঘাতের ভাষায় কথা বলেছেন।’
অন্য দিকে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার সাথে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বৈঠকের বিষয়ে গতকাল এক অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘প্রধান বিচারপতির সাথে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের সাক্ষাৎ হয়েছে বলে আমি শুনেছি। এখনো সাক্ষাতের বিষয়বস্তু জানি না। তবে এটা ঠিক যে বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ এবং আইন বিভাগের মধ্যে আলাপ-আলোচনা চলতে পারে। দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাবেন।’
আনিসুল হক আরো বলেন, ‘পথ চলতে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হতে পারে। দেশের স্বার্থে আলাপ-আলোচনার পথ সব সময়ই খোলা। এ ক্ষেত্রে সাংবিধানিক সঙ্কটের কোনো শঙ্কা নেই বলে আমরা মনে করি।’

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫