ঢাকা, বুধবার,১৬ আগস্ট ২০১৭

শেষের পাতা

জামায়াতের দুর্গে তৎপর দুই জোটের ৬ নেতা

চট্টগ্রাম-১৫ আসন

আরফাত বিপ্লব লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম)

১৪ আগস্ট ২০১৭,সোমবার, ০০:০০ | আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০১৭,সোমবার, ০১:৪৫


প্রিন্ট
জামায়াতের দুর্গে তৎপর দুই জোটের ৬ নেতা

জামায়াতের দুর্গে তৎপর দুই জোটের ৬ নেতা

দক্ষিণ চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা এবং সাতকানিয়ার উপজেলা (আংশিক) নিয়ে গঠিত সংসদীয় আসন চট্টগ্রাম-১৫। স্বাধীনতার পর মাত্র একবার এ আসনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী বিজয়ের মুখ দেখেন। তাও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে।

জামায়াতের দুর্গ বা ভোটব্যাংক খ্যাত এ আসনে ইতোমধ্যে নিজ দল বা জোট থেকে মনোনয়ন পাওয়ার আশায় তৎপর হয়েছেন দুই প্রধান জোট ২০ দল ও ১৪ দলের ছয় নেতা। তারা হলেন- বর্তমান সংসদ সদস্য প্রফেসর ড. আবু রেজা মোহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভী, সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মাওলানা আ ন ম শামশুল ইসলাম, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির উপপ্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন, সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বনফুল অ্যান্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শিল্পপতি এম এ মোতালেব সিআইপি, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ও সাতকানিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল গাফফার চৌধুরী, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির প্রচার সম্পাদক ও লোহাগাড়া সমিতি-চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল মোস্তফা আমিন।

সম্প্রতি বর্তমান সংসদ সদস্য ড. নদভী লোহাগাড়া বটতলী মোটর স্টেশনে যুব সমাবেশের নামে শোডাউন করার পরদিন চুনতীতে পদযাত্রা ও মেজবানের আয়োজন করেন আমিনুল ইসলাম আমিন। এ ক্ষেত্রে উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি-সম্পাদককে সাথে পান আমিনুল ইসলাম আমিন। নয়া দিগন্তকে তিনি বলেন, আমি কোনো শোডাউন করিনি। যা করেছি তা আমার ধারাবাহিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেরই অংশ। তবে দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয় তাহলে সে চ্যালেঞ্জ গ্রহণে প্রস্তুত আছি।

ড. নদভী নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়নের জয়যাত্রায় আমি আমার সর্বোচ্চটা দিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। লোহাগাড়া-সাতকানিয়ার মানুষ আমার সাথে আছে। আমি বিশ্বাস করি এবারো আমাকে মনোনয়ন দিয়ে এলাকার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার সুযোগ দেয়া হবে।

অন্য দিকে গত ঈদে বিভিন্ন স্থানে বিলবোর্ড-ব্যানার-ফেস্টুনের মাধ্যমে নিজের তৎপরতা জানান দেন এম এ মোতালেব সিআইপি। মুঠোফোনে আলাপকালে নয়া দিগন্তকে তিনি বলেন, আমি গতবারও মনোনয়ন প্রাপ্তির কথা ছিল; কিন্তু হঠাৎ করে অজানা কারণে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়ে যাওয়ায় তা আর হয়ে উঠেনি। এবারো নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন পাওয়ার লক্ষ্যে মাঠে-ময়দানে কাজ করে যাচ্ছি। আশা করি এবার নেত্রী আমাকে মনোনয়ন দেবেন।

অন্য দিকে বিএনপির মনোনয়নের লক্ষ্যে হাইকমান্ডের কাছে ধরনা দিচ্ছেন সাবেক ব্যাংকার আব্দুল গাফফার চৌধুরী। তিনি একসময় সৌদি আরব বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। নয়া দিগন্তকে তিনি বলেন, আমি গতবারের আগেরবারও বিএনপির মনোনয়ন চেয়েছিলাম; কিন্তু এ আসন জোটের শরিকদলের কাছে ছেড়ে দেয়ার কারণে আমাকে নমিনেশন দেয়া হয়নি। এবার অবহেলিত সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার উন্নয়নের লক্ষ্যে আমি ২০ দলীয় জোটের শীর্ষনেতাদের কাছে এ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশা করি।

এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশ ইত্যাদি করে মাঠ গরম করার চেষ্টায় আছেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির প্রচার সম্পাদক নাজমুল মোস্তফা আমিন। ইতোমধ্যে লোহাগাড়া ও সাতকানিয়ার বিভিন্ন স্থানে ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের ব্যানারে একাধিক সভা করেছেন তিনি। নয়া দিগন্তকে তিনি বলেন, আমি বিএনপি তথা ২০ দলীয় জোটের মনোনয়ন পাওয়ার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। বিএনপি স্থায়ী কমিটির সাবেক সদস্য কর্নেল অলি আহমদ দল ত্যাগের পর কেউ এ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন পাননি। এবার আমি তৃণমূল নেতাকর্মীদের সংগঠিত করছি। তবে ২০ দলীয় জোটের প্রধান নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যাকে মনোনয়ন দেবেন আমি বিনাবাক্য ব্যয়ে তার হয়ে নির্বাচনে কাজ করে যাবো।

এ দিকে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আমলে এলাকার সাধারণ মানুষ নানাভাবে জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হওয়ায় এ আসনে জামায়াতের জনপ্রিয়তা যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি বলে মনে করেন মহানগর শ্রমিক নেতা এস এম লুৎফর রহমান। জামায়াত সূত্রে জানা গেছে, এবারো এ আসনে লড়বেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা শামশুল ইসলাম। ইতোমধ্যে নির্বাচনী কমিটিও করা হচ্ছে পাড়ায় পাড়ায়। চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের আমির জাফর সাদেকের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মাওলানা শামশুল ইসলামকে লোহাগাড়া-সাতকানিয়ার জনগণ ২০০৮ সালের মতো আবারো বিপুল ভোটে বিজয়ী করবেন বলে আমরা আশাবাদী। ধর্মপ্রাণ তৌহিদি জনতার দুর্গ ও পীর আউলিয়ার আবাসভূমিতে ইসলামি ব্যক্তিত্বকেই জনগণ বিজয়ের মুকুট পরাবে ইনশাআল্লাহ।

লোহাগাড়া-সাতকানিয়া আসনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কোনো নেতাই দুইবার মনোনয়ন পাননি। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছিলেন তৎকালীন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মরহুম আক্তারুজ্জামান চৌধুরী বাবু। সেবার তিনি জামায়াত প্রার্থী আলহাজ শাহজাহান চৌধুরীর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। এ সময় ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেছিলেন আলহাজ মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী প্রকাশ মোস্তাফিজ মিয়া। ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আক্তারুজ্জামান চৌধুরী বাবু আর এ আসনে মনোনয়ন পাননি। তখন নৌকার টিকিট পান ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মাঈনুদ্দিন হাসান চৌধুরী।

নির্বাচনে বিজয় ছিনিয়ে নিয়ে যান তৎকালীন বিএনপি স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য ও সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী কর্নেল (অব:) অলি আহমদ বীর বিক্রম। ২০০০ সালে বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী ঐক্যজোট ও জাতীয় পার্টির একাংশ মিলে চারদলীয় জোট গঠন করে। তারা জোটবদ্ধভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে। ২০০১ সালের নির্বাচন ঘনিয়ে এলে তৎকালীন চট্টগ্রাম-১৪ তথা লোহাগাড়া-সাতকানিয়া আসনে নতুন সঙ্কট দেখা দেয়। বিএনপির কর্নেল অলি ও জামায়াতের শাহজাহান চৌধুরী দু’জনই চারদলীয় জোটের মনোনয়ন চেয়ে বসেন। একপর্যায়ে জোটের হাইকমান্ড দু’জনকেই ভোটের মাঠে ছেড়ে দেয় এবং যিনি জিতে আসবেন তাকে গ্রহণের ঘোষণা দেয়া হয়। সেবার নৌকার মাঝি ছিলেন মরহুম শিল্পপতি আলহাজ জাফর আহমদ চৌধুরী। তিনি সে সময় চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের কো-চেয়ারম্যান ছিলেন। সেই নির্বাচনে বিএনপির কর্নেল অলি ও আওয়ামী লীগের জাফর আহমদ চৌধুরীকে ধরাশায়ী করে বিজয়ের মুকুট পরেন শাহজাহান চৌধুরী।

২০০৭ সালে ১/১১’র সরকার ক্ষমতায় এসে সব কিছু তছনছ করে দেয়। দেশের দুই প্রধান নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া গ্রেফতার হন। দুই বছর স্থায়ী হয় সেই সরকার। পরে ২০০৯ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী হন তৎকালীন চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের আমির মাওলানা আ ন ম শামশুল ইসলাম। নৌকার মনোনয়ন পান চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাভোকেট এ কে এম সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। অবশ্য সেবারও কর্নেল (অব:) অলি আহমদ নির্বাচন করেন। তবে ধানের শীষ নিয়ে নয়, ছাতা মার্কা নিয়ে। তার আগেই বিএনপি ছেড়ে এলডিপি গঠন করেন তিনি। কর্নেল অলি ও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী দু’জনই জামায়াতের শামশুল ইসলামের কাছে পরাজিত হন। স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে এ আসনে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়ে রেকর্ড গড়েন মাওলানা শামশুল ইসলাম। সে সময় সারা দেশে জামায়াতের পাওয়া মাত্র দু’টি আসনের মধ্যে এটি একটি।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫