ঢাকা, সোমবার,১৮ ডিসেম্বর ২০১৭

মতামত

উপমহাদেশের প্রথম মুসলিম পাইলট

হাবিবুর রহমান সিজার

১৩ আগস্ট ২০১৭,রবিবার, ১৯:৫৭ | আপডেট: ১৩ আগস্ট ২০১৭,রবিবার, ২০:২২


প্রিন্ট
ক্যাপ্টেন মোস্তফা আনোয়ার

ক্যাপ্টেন মোস্তফা আনোয়ার

উপমহাদেশের প্রথম পাইলট ও প্রথম বাঙালি মুসলিম পাইলট ক্যাপ্টেন মোস্তফা আনোয়ার কবি গোলাম মোস্তফার জ্যেষ্ঠ ছেলে। ১৯১৭ সালের ২৪ জুলাই ঝিনাইদহ জেলার কমলাপুর গ্রামের মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। পৈতৃক নিবাস ঝিনাইদহের মনোহরপুর গ্রামে।

কলকাতার হেয়ার স্কুলে অধ্যয়নকালে তিনি বোম্বাইয়ে মার্চেন্ট নেভি শিপ ‘ডাফরিন’ জাহাজে যোগ দেন। ১৯৩৭ সালে সেখান থেকে ‘এক্সট্রা ফার্স্ট’ ক্লাস সার্টিফিকেট এবং উৎকৃষ্ট সিনিয়র ক্যাডেট ক্যাপ্টেন হওয়ার জন্য ‘সয়ার’ পুরস্কার লাভ করেন। এরপর তিনি ব্রিটিশ-ভারত স্টিম নেভিগেশন কোম্পানিতে ক্যাডেট পদে দুই বছর চাকরি করেন। ১৯৪১ সালে তিনি ভারতীয় বিমানবাহিনীর ভলান্টিয়ার রিজার্ভে যোগ দিয়ে বিশেষ কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন। এই সময় তিনি তার কোর্সের শ্রেষ্ঠ পাইলট হওয়ার সম্মান লাভ করে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। এরপর কিছুকাল তিনি এয়ারফোর্স ট্রেনিং স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। ১৯৪৬ সালে তিনি এয়ারলাইন্সে যোগ দেন এবং ১৯৫০ সালে এয়ার ইন্ডিয়ায় সরকার অনুমোদিত চেক পাইলট নিযুক্ত হন। তিনি ১৯৫৩ ও ১৯৫৪ সালে কলকাতায় ‘পাইলট ইনচার্জ’ ছিলেন। ১৯৫৩ সালের ফেব্র“য়ারি থেকে ১৯৫৮ সালের জুলাই পর্যন্ত কলকাতার নৈশ এয়ারমেলের ভারপ্রাপ্ত পাইলট ছিলেন। ছয় বছর ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স করপোরেশনে চাকরি করেন।
সেখানে ক্যাপ্টেন আনোয়ার ভিআইপি পাইলট ছিলেন। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর পণ্ডিত জওয়াহেরলাল নেহরু চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইকে যখন দিল্লিতে আসার আমন্ত্রণ জানান, তখন ক্যাপ্টেন আনোয়ার কুনমিং গিয়ে তাকে নিয়ে আসেন এবং সফর শেষে চীনে পৌঁছে দেন।

১৯৫৯ সালের ফেব্র“য়ারি মাসে ক্যাপ্টেন মোস্তফা আনোয়ার পাকিস্তানের নাগরিকত্ব অর্জন করে পাকিস্তানে আসেন এবং সিনিয়র কমান্ডার হিসেবে পিআইএতে যোগ দেন। এ সময় পিআইএ ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স করপোরেশনকে ৬০ হাজার টাকা দিয়ে ক্যাপ্টেন মোস্তফা আনোয়ারকে সংগ্রহ করে। কারণ, তিনি ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের সাথে চুক্তিবদ্ধ ছিলেন এবং তার ট্রেনিংয়ের জন্য ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স এই টাকা ব্যয় করেছিল।

১৯৫৯ সালে পিআইএ তাদের আমেরিকান ইন্সট্রাক্টর ক্যাপ্টেন রবার্ট বার্ন হেলরের পরিবর্তে আনোয়ারকে ‘ভাইকাউন্ট’-এর চেক পাইলট করতে চেয়েছিল। যেহেতু পিআইএ ইণ্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের পরের মডেলের ‘ভাইউন্ট কিনেছিল, আনোয়ারকে সেই নতুন মডেলের বিমানের ট্রেনিং নেয়ার জন্য ১৭ ফেব্র“য়ারি করাচিতে নিয়ে গিয়ে ১৯ ফেব্র“য়ারি ইমার্জেন্সি পাসপোর্ট করে তাকে বিমান কনভারশন কোর্সে শিক্ষালাভের জন্য ব্রিটেনে পাঠানো হয়। তিনি তখন মাসে দুই হাজার ৫০০ টাকা বেতন পেতেন।

রবার্ট বার্ন তার কাজের শেষ দিনে (১৪ আগস্ট ১৯৫৯) তিনি একজন জুনিয়র পাইলটকে ট্রেনিং দিচ্ছিলেন। সেদিন তিনি করাচি বিমানবন্দরের ওপরেই ছয়টি ল্যান্ডিং ও ছয়টি টেকঅফের পরীক্ষা নেন। এ সময় ক্যাপ্টেন আনোয়ার কৌতূহলী হয়ে অবজারভার হিসেবে সেই প্লেনে উঠলে জুনিয়র পাইলটটির ভুলে করাচি বিমানবন্দরের ওপরেই প্লেনটিতে আগুন ধরে যায়। ক্যাপ্টেন রবার্ট শরীরে মারাত্মক আঘাত পান ও ক্যাপ্টেন আনোয়ার মাথায় মারাত্মক আঘাত পাওয়ার পর উভয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হন। যে পাইলটের ভুলে এ দুর্ঘটনা ঘটেছিল, তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফ্লাইং ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। যে বিমানটিতে দুর্ঘটনা ঘটেছিল তার নাম ছিল ‘সিটি অব ঢাকা’।

ভাইকাউন্ট বিমানটি দুর্ঘটনায় পতিত হওয়ার আগে ট্রেনিংয়ের জন্য প্রায় ৩ ঘণ্টা আকাশে ওড়ে। আনোয়ার মাত্র ৪২ বছর বয়সে কর্মের মাঝেই প্রাণ হারান। তার মৃত্যুর খবর শুধু পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানেই নয়, ভারত ও স্পেনের পত্রিকা, ইংল্যান্ডের ‘দি গার্ডিয়ান’ ও নিউ ইয়র্কের New York Tims-এ ছাপা হয়েছিল। এ সময় উভয় পাকিস্তানে তার মৃত্যুর ঘটনা জাতীয় শোকে পরিণত হয়েছিল। ক্যাপ্টেন আনোয়ার যখন মারা যান তখন তার লগবুকে ১৪৫০০ ঘণ্টা ফ্লাইং আওয়ারস রেকর্ড করা ছিল। সিভিল ও এয়ারফোর্স মিলিয়ে পাকিস্তানি পাইলটদের মধ্যে আর কেউ এত অধিক সময় বিমান চালনা করেননি। তার পর যিনি ছিলেন তার নাম আসগর খান, তখন যার মাত্র ৭০০০ ঘণ্টা বিমান চালানোর অভিজ্ঞতা ছিল।

১৫ আগস্ট ১৯৫৯ সালে ‘পাকিস্তান টাইমস’-এ ক্যাপ্টেন আনোয়ারের জীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছিল : Mostafa had about 14000 hours flying to his credit, which no Pakistani pilot has ever attained. (ফ্লাইং আওয়ার আসলে ১৪৫০০ ঘণ্টা)। ক্যাপ্টেন আনোয়ারের মৃত্যুতে পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জাকির হোসেন ও দৈনিক আজাদ সম্পাদক মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ তার কাছে পাঠানো পত্রে গভীর শোক প্রকাশ করেন।

ক্যাপ্টেন আনোয়ারের লাশ ১৭ আগস্ট ১৯৫৯ সালে রোববার বেলা ১টা ৩০ মিনিটে ঢাকায় আনা হয়। এ সময় মোস্তফা আনোয়ারের ছেলে প্রদীপ আনোয়ার তার শোকসন্তপ্ত পিতামহ কবি গোলাম মোস্তফাকে যখন সান্ত্বনা দেন, তখন সমবেত সবার চোখই অশ্র“সজল হয়ে ওঠে। ওই দিন অপরাহ্ণে শান্তিনগরের মোস্তফা মঞ্জিলের বাসভবনে নামাজে জানাজা শেষে আজিমপুর গোরস্থানে দাফন করা হয়।

ক্যাপ্টেন মোস্তফা আনোয়ার ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই কবিতা লিখেছেন। এর মধ্যে তার ‘সিভিল সার্ভিস এভিয়েশন অব ইন্ডিয়া’ নামক গ্রন্থটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
১৯৪৫ সালের ২৪ এপ্রিল কলকাতায় বিয়ে করেন। স্ত্রী সুস্মিতা ইসলাম একজন সুলেখিকা। তার ছেলে ক্যাপ্টেন প্রদীপ আনোয়ার ও মেয়ে মনীষা আনোয়ার বাবলী।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫