ঢাকা, বুধবার,১৮ অক্টোবর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

ডুবতে বসেছে ‘পলিটিক্যাল’ ব্যাংকগুলো

জি. মুনীর

১৩ আগস্ট ২০১৭,রবিবার, ১৯:৪৯ | আপডেট: ১৩ আগস্ট ২০১৭,রবিবার, ২০:০১


জি. মুনীর

জি. মুনীর

প্রিন্ট

অর্থনীতিতে ব্যাংক খাতের নিরতিশয় গুরুত্ব সব মহলে স্বীকৃত। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জনগণের সার্বিক কল্যাণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো পালন করে বহুমুখী ভূমিকা। একটি ব্যাংক কী পরিমাণ আমানত সংগ্রহ করতে পারল, তার ওপর নির্ভর করে এর ঋণদানের সক্ষমতা। ‘থিওরি অব ফিন্যান্সিয়াল ইন্টারমেডিয়েশন’-এ ঋণকে বিবেচনা করা হয় আইটপুট হিসেবে, আর আমানতকে বিবেচনা করা হয় ইনপুট হিসেবে। এই আমানত ও ঋণ ব্যবস্থাপনাকে ব্যাংক ব্যবসায়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য ধরা হয়। ব্যাংক ব্যবসায়ে বড় ধরনের অপর গুরুত্বপর্ণ বিষয় হচ্ছে ব্যাংকের সলভেন্সি (পরিশোধ ক্ষমতা) ও ফিন্যান্সিয়াল মানেজমেন্ট (আর্থিক ব্যবস্থাপনা)। এ খাতের ব্যবসায়ের অনেক কিছুই নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকটি এর তারল্য ব্যবস্থাপনা কতটুকু দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করতে পারল, তার ওপর। এসবের যেকোনো একটিতে ঘাটতি দেখা দিলে ব্যাংকগুলো যেমন ভালোভাবে ব্যবসায় পরিচালনা করতে পারে না, তেমনি সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থনীতিতে ব্যাংক খাত ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারে না। সে জন্য ব্যাংক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর সাফল্য নিশ্চিত করতে চাইলে ব্যাংক পরিচালনার ভার অভিজ্ঞ ও দক্ষ লোকদের হাতে ন্যস্ত করতে হয়।

আমাদের দেশে নতুন ব্যাংক অনুমোদন দেয়ার আগে বাংলাদেশ ব্যাংককে অতি মাত্রায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হয় অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকটি এসব সক্ষমতার অধিকারী হতে পারবে কি না। এ জন্য ব্যাংক অনুমোদনের আগে এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে বেশ কিছু হোম ওয়ার্ক করতে হয়। যে কেউ চাইলেই তাকে ব্যাংক খোলার অনুমোদন দেয়া যায় না। এখানে বাংলাদেশ ব্যাংককে সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে যে ব্যাপারটিতে, তা হলো- এই যাচাই-বাছাইয়ের কাজে যেন কোনো ধরনের পলিটিক্যাল ইনফেকশন বা রাজনৈতিক সংক্রমণ না ঘটে। এই রাজনৈতিক সংক্রমণের বাইরে থেকে ব্যাংক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনপ্রার্থীর ব্যাকগ্রাউন্ড সততার সাথে চেক করে দেখতে হয় এবং ব্যাংক প্রতিষ্ঠান খোলার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত শর্তাদি বিবেচনায় রাখতে হয়। যদি এসব বিষয় অর্থনৈতিক মাপকাঠিতে মাপা হয়, এবং তার ভিত্তিতে ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেয়া হয়- তবে নতুন অনুমোদন পাওয়া ব্যাংকটি ব্যবসায় সফল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংক কি সব ক্ষেত্রে এসব বিবেচনা মাথায় রেখে নতুন ব্যাংক কোম্পানির অনুমোদন দেয়ার সুযোগ পায়?

এর সরল উত্তর : পায় না। স্বীকার করতেই হবে, ২০১২ সালের দিকে ৯টি নতুন ব্যাংক অনুমোদন দেয়ার সময় বাংলাদেশ ব্যাংক রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে এসব বিষয় বিবেচনায় নেয়ার সুযোগ পায়নি। ওই সময় যখন এই ৯টি নতুন ব্যাংক খোলার অনুমোদনের প্রশ্নটি সামনে আসে, তখন বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমে বলেছিল, বাংলাদেশে আর কোনো নতুন ব্যাংক খোলার দরকার নেই, কারণ তখন দেশে ৪৭টি বিশেষায়িত, সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশী ব্যাংক চালু ছিল। এমনটি বলার পর নতুন ৯টি ব্যাংক খোলার অনুমোদনের ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে প্রবল রাজনৈতিক চাপ আসে। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক ৩৭টি নতুন ব্যাংক খোলার আবেদন হাতে পায়। এর মধ্য থেকে ৯টি নতুন ব্যাংক খোলার অনুমোদন দেয়া হয়। ২০১২ সালে অনুমোদন পাওয়া ৯টি ব্যাংকসহ বাংলাদেশে এখন মোট ৫৭টি ব্যাংক চালু রয়েছে। যেখানে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পর এখানে চালু ছিল মাত্র ছয়টি ব্যাংক। বর্তমানে চালু ৫৭টি ব্যাংকের মধ্যে চারটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক, ৯টি বিদেশী বাণিজ্যিক ব্যাংক, ৫টি বিশেষায়িত বাণিজ্যিক ব্যাংক, আর বাকি ৩৯টি ব্যাংক হচ্ছে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে গঠিত বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদের পরিচালকদের যোগ্যতা প্রবলভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ তাদের নিয়োগ চলে প্রবল রাজনীতিকায়নের মাধ্যমে। সবচেয়ে দুর্ভাগ্য হচ্ছে, আমাদের দেশে ব্যাংক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেয়া হয় রাজনৈতিক বিবেচনা তাড়িত হয়ে। এরই নাম রাজনৈতিক সংক্রমণ। ২০১২ সালে নতুন ৯টি ব্যাংকের অনুমোদন ছিল এ ধরনের রাজনৈতিক সংক্রমণের প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

আমরা জানি, যথার্থভাবেই নতুন ব্যাংক স্থাপনের প্রস্তাবনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু অবশ্যপালনীয় শর্তাবলি রয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে : প্রতিটি অরগ্যানাইজিং গ্রুপকে কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ ছাড়াই ৪০০ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন দেখাতে হবে এবং গ্রুপের প্রত্যেক অরগ্যানাইজারকে কমপক্ষে এক কোটি টাকার শেয়ার ধারণ করতে হবে, একই সাথে ট্যাক্স রিটার্ন ও সার্টিফিকেট দাখিল করতে হবে। তা ছাড়া গুরুত্বের সাথে জোর তাগিদ দেয়া আছে ব্যাকগ্রাউন্ড চেক ও ফিটনেস টেস্টের মাধ্যমে স্পন্সর/ডিরেক্টরের যোগ্যতা যাচাই করে দেখতে। কিন্তু রাজনৈতিক চাপের কাছে এসবই মার খায় উল্লিখিত ৯টি নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের বেলায়। নিয়মনীতি অনুযায়ী নতুন ব্যাংক কোম্পানি প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত ক্ষমতা ন্যস্ত রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক এই ৯টি ব্যাংকের লাইসেন্স দিয়েছে নির্ধারিত শর্তাবলি যাচাই-বাছাই করে দেখার আগেই। সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে এ তথ্য জানা গেছে। এভাবে রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠান খোলার পরিণাম ফল যে ভালো নয় তা আজ আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।

উল্লিখিত এই ৯টি ব্যাংক হচ্ছে : মেঘনা ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক, সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক, ফার্মার্স ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক। এরই মধ্যে এই ব্যাংকগুলোকে অনেকে পলিটিক্যাল ব্যাকিং ব্যাংক নামে অভিহিত করতে শুরু করেছেন। কারণ, এই ব্যাংকগুলো শুরু থেকেই পলিটিক্যাল ব্যাংকিং বা রাজনৈতিক আনুকূল্য ভোগ করে আসছে। এসব ব্যাংকের মালিকেরা যথাযথ নিয়মবিধি অনুসরণ না করেই ব্যাংক ব্যবসায় নেমেছেন রাজনৈতিক আনুকূল্যেও পথ ধরে। এই ৯টি ব্যাংকের বেশির ভাগ পরিচালক ও চেয়ারম্যান সরাসরি আওয়ামী লীগ অথবা এর নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক দলের রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট।

সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) পরিচালিত এক জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন এই ৯টি ব্যাংকের ব্যাংক ব্যবসায় পরিস্থিতি সুষ্ঠুভাবে চলছে না। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চতুর্থ প্রজন্মের এসব ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি অব্যাহতভাবে অবনতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। এর কারণ, এসব ব্যাংকের মালিকেরা যথাযথভাবে নিয়ম-নীতি অনুসরণ না করেই রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংক চালুর লাইসেন্স পেয়েছিলেন। এই ৯টি ব্যাংকে আর্থিক সূচক জোরদার করার ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ, এসব ব্যাংকের পরিচালকেরা ক্ষমতাসীন দল বা দলগুলোর রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক জানতে পেরেছে, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক নিয়ম-নীতি লঙ্ঘন করে ৭০১ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে। গত ২৯ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংক পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয় ব্যাংকটিতে করপোরেট গভার্নেন্স প্রতিষ্ঠার জন্য। গত ২০ মার্চ কেন্দ্রীয় ব্যাংক এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চেয়ারমানের কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে এই মর্মে নোটিশ দিয়ে জানতে চায়- কেন যথাযথ ব্যবস্থাপনা করতে ও আমানতকারীদের স্বার্থরক্ষায় ব্যর্থতার জন্য ব্যাংকটির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে না। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন পর্যন্ত ব্যাংকটির শীর্ষ ব্যবস্থাপকদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

২০১৫ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানতে পারে, ফার্মার্স ব্যাংক যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই ৪০০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে। এর ফলে এর ঋণখেলাপির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ২০১৬ সালের ১৩ জানুয়ারি এই ব্যাংকটিতে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয়। উল্লেখ্য, ফার্মার্স ব্যাংকের মহীউদ্দিন খান আলমগীর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। উল্লিখিত সমীক্ষা প্রতিবেদন মতে, নতুন ব্যাংকগুলোতে নিচে থেকে উপরের স্তরের পদগুলোতে নিয়োগে নানা অনিয়ম করা হয়েছে। এসব ব্যাংকের পরিচালকদের অনেকেই উঁচু মাপের রাজনৈতিক ক্ষমতাধর ব্যক্তি হওয়ায় এরা ঋণ বিতরণে নানা অনিয়ম করে থাকেন অবলীলায়।

গত ১০ আগস্ট ঢাকায় বিআইবিএম যে সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তাতে বলা হয়Ñ সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে আসা চাপের প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইচ্ছার বিরুদ্ধে উল্লিখিত ৯টি ব্যাংককে অনুমোদন দেয়। আজ এসব ব্যাংক সার্বিক ব্যাংক খাতে কোনো ইতিবাচক অবদান রাখতে পারছে না। ২০১২ সালে যখন এসব ব্যাংকের অনুমোদন দেয়ার প্রশ্ন আসে, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছিল, দেশে নতুন করে আর কোনো ব্যাংক চালুর কোনো প্রয়োজন নেই।

তখন সরকারের চাপের মুখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক খোলার ৩৭টি আবেদন গ্রহণ করে। এর মধ্যে উল্লিখিত ৯টি ব্যাংককে অনুমোদন দেয়া হয়। বিআইবিএমের ‘অ্যান ইভালুয়েশন অব দ্য পারফরম্যান্স অব দ্য নিউ কমার্শিয়াল ব্যাংকস’ শীর্ষক প্রতিবেদন মতে, প্রকৃতপক্ষে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার আগেই এসব ব্যাংক চালুর লাইসেন্স দেয়। এই প্রতিবেদন মতে, এই ৯টি নতুন ব্যাংক আমানতকারীদের অর্থ ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়ে অধিকতর মুনাফার লোভে আগ্রাসী সম্প্রসারণ মনোভাব প্রদর্শন করছে। জরিপ মতে, অনিয়মের কারণে এসব ব্যাংকের নন-পারফর্মিং লোন গত দুই বছরে উল্লখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। এসব ব্যাংকে নন-পাফরর্মিং লোন রেশিও বেড়েছে গত দুই বছরে, আর এ ক্ষেত্রে শীর্ষে অবস্থান করছে ফার্মার্স ব্যাংক। এই ৯টি ব্যাংকের মধ্যে তিনটি স্পন্সর হচ্ছে অনাবাসী-বাংলাদেশীরা। এই ব্যাংক তিনটি হচ্ছে : এনআরবি ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক এবং এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক। বাকিগুলো স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উদ্যোগে চালু হয়।

প্রতিবেদন মতে, গত চার বছরে ব্যাংকগুলো উল্লেখযোগ্য মাত্রায় এর লোকবল বাড়িয়েছে। তবে ব্যাংকগুলো ট্যালেন্ট মার্কেটে সে মাত্রায় এর সুনাম বাড়াতে পারেনি। গত চার বছরে এসব ব্যাংকে ছয় হাজার ৬১০ জনকে নিয়োগ দিয়েছে। কিন্তু এসব ব্যাংকে এন্ট্রি লেভেলের পদগুলোতে নিয়োগের বেলায় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টির ওপরই বেশি জোর দেয়া হয়েছে। প্রার্থীর শিক্ষায়তনিক যোগ্যতা ও পেশাগত দক্ষতাকে আমলে নেয়া হয়নি। তা ছাড়া এসব ব্যাংকে পুরনো ৪৭টি ব্যাংক থেকে উচ্চতর পদ ও বেতন দিয়ে লোক এনে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এর ফলে পুরো ব্যাংক খাতে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয়।

বিআইবিএমের সুপারনিউমারি প্রফেসর ইয়াসিন আলী বলেন, আশা করা হয়েছিল তিনটি এনআরবি ব্যাংক বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, এগুলো পুরনো ব্যাংকগুলোর মতোই গতানুগতিক কাজ করছে। অথচ লাইসেন্স নেয়ার সময় এসব ব্যাংকের প্রতিশ্রুতি ছিল বিদেশী আমানত সংগ্রহ করার। ২০১৬ সালে পুরনো ব্যাংকগুলো যেখানে শাখা নেটওয়ার্ক বাড়িয়েছে পাঁচ শতাংশ, সেখানে এসব নতুন ব্যাংক বাড়িয়েছে ৩৪ শতাংশ। বিআইবিএমের অপর সুপারনিউমারি প্রফেসর হেলাল আহমেদ চৌধুরী মনে করেন, নতুন এসব ব্যাংক এতটা আগ্রাসীভাবে ঋণ বিতরণ করা ঠিক হবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, কিছু নতুন ব্যাংক ব্যাপকভাবে ব্যাংক খাতের নিয়মকানুন লঙ্ঘন করেছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুর্নীতি বন্ধে পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব ব্যাংককে ২০১২ সালে লাইসেন্স দিয়েছে স্পন্সরদের আগের রেকর্ড পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই। তার মতে, এসব ব্যাংকের পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাওয়ার আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত এসব ব্যাংকের একীভূত করার কথা চিন্তভাবনা করা। কিন্তু দেশে এই একীভূত করার সংস্কৃতির অভাবে এই একীভূত করার কাজটি হবে খুবই কঠিন।

মোট কথা হচ্ছে, নতুন এসব ব্যাংকের দুরবস্থার জন্য দায়ী শুরু থেকেই সব ক্ষেত্রে রাজনীতিকায়নের প্রাধান্য। প্রভাবশালীদের এসব ব্যাংকে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই চলে সব কিছু। এর ফলে কী ঘটতে পারে, তা আমরা দেখছি এই ৯টি ব্যাংকের ক্ষেত্রে। এর আগেই আমরা জেনেছি, রাজনীতিকায়ন কিভাবে আমাদের সরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতে পুকুর চুরি-সাগর চুরির ঘটনা ঘটেছে এবং এখন ঘটে চলেছে। আমাদের গোটা ব্যাংক খাত এখন রাজনীতিকায়নের ফাঁদে আটকা পড়েছে। এ থেকে উদ্ধারের একমাত্র উপায় ব্যাংক খাতকে রাজনীতিকায়নের দুষ্ট চক্র থেকে বের করে আনা।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫