ঢাকা, বুধবার,১৬ আগস্ট ২০১৭

ধর্ম-দর্শন

শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মাষ্টমী

শ্রীমদ্ভাগবত গীতা এবং ‘জ্ঞান ও ভক্তির সমন্বয়’

শিশির রঞ্জন দাস বাবু

১৩ আগস্ট ২০১৭,রবিবার, ১৯:৩৬


প্রিন্ট
শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মাষ্টমী

শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মাষ্টমী

ওঁ পূর্ণমদ : পূর্ণমিদং পূর্ণাঙ্গ পূর্ণমুদচ্যতে।
পূর্ণস্য পূর্ণমদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে॥
বাসুদেবসুতং বেবং কংসচানূর মর্দনম্। দেবকী পরমানন্দং কৃষ্ণ বন্দে জগৎগুরুম। নারায়ণং নমস্কৃত্য নরং চৈব নরোত্তম। দেবীং সরস্বতীং ব্যাসং ততো জনমুদীরয়েৎ। অর্থাৎ, যিনি শ্রী বাসুদেবের পুত্র দিব্যরূপধারী। কংস ও চানুর বধকারী এবং মাতা দেবকীর পরম আনন্দস্বরূপ, সেই জগৎগুরুম ও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বন্দনা করি। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং মনুষ্যশ্রেষ্ঠ অর্জুনকে এবং সরস্বতী ও শ্রী বেদব্যাসকে নমস্কার করে মহাভারতের কথা আলোচনা করা উচিত।

মধ্যরাত হতে কিছু সময় বাকি। মেঘমুক্ত আকাশ। তারকাগুলো জ্বল জ্বল করছে। রোহিনী নক্ষত্র উদিত হয়ে পৃথিবীকে জানিয়ে দিচ্ছে, শুভমুহূর্ত সমাগত। স্বর্গের দেবতারা দুন্দুভি বাজিয়ে ভগবানের মর্ত্যে আগমনের বার্তা ঘোষণা করছেন। আনন্দে আকাশ থেকে পুষ্প বৃষ্টি করছেন। মধ্যরাতে ঘন অন্ধকারে দেবকীর সন্তানরূপে জন্ম নিলেন শিশু কৃষ্ণরূপী মহাবিষ্ণু।

বাসুদেব বললেন, ‘কী অপরূপ শিশু জন্মগ্রহণ করেছেন। ভাগ্যের কী পরিহাস! এখনই কংস এসে শিশুটিকে হত্যা করবে।’ তিনি উপলব্ধি করলেন, এ তো সাধারণ শিশু নয়। এ যে নররূপে ভগবান স্বয়ং। তাঁর মনে কংসের ভয় দূর হলো।

তিনি বললেন, আপনার অসীম কৃপায় পৃথিবীর পরিত্রাতারূপে আমাদের ঘরে আবির্ভূত হয়েছেন। এখন আপনার জন্মের সংবাদ পেয়ে সে আপনাকেও বধ করবে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন, ‘দেবকী, তুমি সবার চেয়ে পবিত্র নারী। পূর্বজন্মে তুমি দীর্ঘকাল ধরে তপস্যা করেছিলে। তোমার অনন্তকালের সাধনায় তুষ্ট হয়ে তোমাকে একটি বর চেয়ে নিতে বলেছিলাম। তুমি প্রার্থনা করেছিলে, আমি যেন তোমার সন্তানরূপে জন্মগ্রহণ করি। অবতাররূপে আমার বিগত আবির্ভাবকালে তুমি আমার জননী হয়েছিলে এবং এবারো তোমার সন্তানরূপে জন্মগ্রহণ করেছি।’

বাসুদেব কারাকক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন। কারারক্ষীরা ঘুমে অচেতন। তিনি যমুনার তীরে এসে পৌঁছুলেন। হঠাৎ মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। অবিরাম বর্ষণে নদীতে বন্যা দেখা দিলো। কিন্তু বাসুদেবের চলার জন্য একটি শুকনো পথ তৈরি করে দিয়ে নদী দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। তিনি সেপথ ধরে হেঁটে নদীর অপর পাড়ে পৌঁছে নন্দের বাড়িতে নন্দরানী যশোদার ঘরে প্রবেশ করলেন। দেখল, যশোদার পাশে একটি সদ্যোজাত কন্যাসন্তান শুয়ে আছে। বাসুদেব নিজ পুত্রকে যশোদার পাশে শুইয়ে রেখে, ওই কন্যাটিকে নিয়ে মথুরায় এলেন।

কংস বলল, এ বালক দুটোকে মথুরা থেকে তাড়িয়ে দাও। নন্দকে গ্রেফতার করে হত্যা করো। সে আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এ শাস্তি তার প্রাপ্য। দুষ্ট বাসুদেবকে এখনই বধ করো। আমার পিতা উগ্র সেনকেও হত্যা করো। তাকে বিশ্বাস করি না। সে সর্বদাই আমার শত্রুর পক্ষ নিয়ে কথা বলে। গুরুজনের প্রতি কংসের এ অশ্রদ্ধা শ্রীকৃষ্ণ সহ্য করতে পারলেন না। তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন। শ্রীকৃষ্ণ তার দেহকে হালকা করে একপলকে গিয়ে উপস্থিত হলেন অলিন্দে, সেখানে কংস তার সিংহাসনে বসে আছে। কৃষ্ণ তার দিকে দ্রুতবেগে ধেয়ে আসছেন দেখে কংস ঢাল-তলোয়ার নিয়ে শ্রীকৃষ্ণকে প্রতিরোধ করতে প্রস্তুত হলো। শ্রীকৃষ্ণ এক ধাক্কায় কংসের মাথা থেকে রাজমুকুট ফেলে দিলেন। চুলের মুঠি ধরে তাকে সিংহাসন থেকে ছুড়ে ফেলে দিলেন। কংসের মৃত্যু হলো।

শ্রীকৃষ্ণ সর্বব্যাপী অপূর্ব মূর্তি। তার অসংখ্য মুখ, অসংখ্য চোখ, অসংখ্য বাহু ও অসংখ্য চরণ ত্রিলোকে তার মধ্যে বিরাজমান। সহস্র সূর্যের তুল্য উজ্জ্বল তার রূপ। শ্রীমদ্ভাগবত গীতা স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখের বাণী। কুরুক্ষেত্রে উপস্থিত আত্মীয়স্বজন দেখে যুদ্ধবিরত অর্জুনকে তিনি যে উপদেশ দিয়েছিলেন, তার নাম শ্রীমদ্ভাগবত গীতা। অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘যখন মৃত্যুর সম্মুখীন হবেন, তখন কিরূপে আপনাকে স্মরণ করতে পারবে’?

তিনি বললেন, হে অর্জুন, এ জগতে যার জন্ম আছে তার মৃত্যু সুনিশ্চিত। আবার মৃতের জন্মও অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু আত্মা অবিনশ্বর। আমার জন্মও নেই মৃত্যুও নেই। মানুষ যেমন জীর্ণ বস্ত্র ত্যাগ করে নববস্ত্র ধারণ করে, সে রকম আত্মাও জীর্ণদেহ ত্যাগ করে নতুন দেহ ধারণ করে। আত্মাকে অস্ত্রে ছেদন করা যায় না। অগ্নি দগ্ধ করতে পারে না। জল সিক্ত করতে পারে না এবং বায়ু কিছু করতে পারে না। পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ সব জীবের হৃদয়ে অবস্থিত পরমাত্মা এবং সর্বভূতের আদি, মধ্য-অন্ত। পরমাত্মা হিসেবে পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ সবার হৃদয়ে অবস্থান করেন। মানুষ যা চিন্তা করতে করতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে, পরজন্মে সে চিন্তার অনুরূপ হয়ে জন্ম পরিগ্রহ করে। মৃত্যুকালে কেউ তাকে চিন্তা করতে করতে দেহত্যাগ করলে পরজন্মে তাকে প্রাপ্ত হয়। যারা পরমায়ু লাভের জন্য সংযমের সাথে সুখ ভোগ করে শরীরকে সুস্থ ও নিরোগ রাখতে সচেষ্ট, আনন্দে কাল অতিবাহিত করেন, তারা সাত্ত্বিক। উগ্রবস্তু ও উগ্রভাব রাজসিক ব্যক্তির প্রিয়।

তপস্যা দুই প্রকার : শারীরিক ও মানসিক। পূজা আচার শারীরিক তপস্যার দৃষ্টান্ত। মানসিক তপস্যা হলো- সদা সত্য কথা বলা, প্রসন্নতা, সরলতা ও মনের সংযম। দান তিন প্রকার : সাত্ত্বিক, রাজসিক, তামসিক। যারা সাত্ত্বিক দাতা, তারা দেশ কালপাত্র বিচার না করে দান করেন; প্রত্যুপকারের আশায় দান করেন না। নিত্যযুক্ত মহাত্মাগণ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে চলে গেলে তাদেরকে আর এ দুঃখালয়ে ফিরে আসতে হয় না। ভগবানের সৃষ্ট অনন্ত কোটি ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে নিত্যকালই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভৌমলীলা প্রকটিত আছে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যখনি যেখানে ভৌমলীলা বিস্তারের উদ্দেশ্যে তার নিত্য পিতামাতা শ্রীবাসুদেব-দেবকীর শ্রীনন্দ যশোদার পুত্ররূপে নিজেকে শ্রী ব্রজেন্দ্র নন্দন ও শ্রী যশোদার নন্দনরূপে প্রকটিত করেন, তখনই সেখানে মহাত্মাগণ পরম সংসিদ্ধ লাভ করেন।

জয়শাস্ত্রে শ্রীমদ্ভাগবত গীতা মানবদেহের পরমাত্মা। মহাভারত শ্রী ব্যাসদেব রচিত প্রাচীন ও সর্ববৃহৎ মহাকাব্য এবং সনাতন ধর্মের সর্ববৃহৎ পুরাণ। মহাভারতের ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও তার প্রিয়তম ভক্ত অর্জুনের মধ্যে ধর্মবিষয়ক সারগর্ভ কথোপকথনের উল্লেখ রয়েছে। নর ও নারায়ণ অবতারে অর্জুন ছিলেন নর। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন নারায়ণ। শ্রীমদ্ভাগবত গীতা মহাভারতের প্রাণস্বরূপ। এটাকে পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জগৎ পরিচালনার সংবিধান বলা হয়েছে। শ্রীশঙ্করাচার্য সর্বপ্রথম এই গীতাকে মহাভারত থেকে বাইরে এনে টীকাভাষ্য রচনা করেন। তখন থেকে শ্রীমদ্ভাগবত গীতা পৃথক গ্রন্থ। সব বেদের সারবস্তু।

পৃথিবীর ৬০টি ভাষায় শ্রীমদ্ভাগবত গীতার অনুবাদ হয়েছে। এতে আছে ১৮টি অধ্যায় এবং ৭০০টি শ্লোক। রয়েছে আত্মাতত্ত্ব, সুনির্দিষ্ট মুক্তির পথনির্দেশ; কর্মবন্ধন মুক্তির কৌশল, সাধন মার্গ হিসেবে ভক্তি মার্গ, জ্ঞানমার্গ, কর্ম মার্গ, কর্ম সন্ন্যাস মার্গ, জ্ঞান-কর্ম-ভক্তির মিশ্র মার্গ, পুরুষ প্রকৃতিতত্ত্ব, প্রকৃতির ত্রিগুণতত্ত্ব, পুরুষোত্তমতত্ত্ব; দেব ও অসুর সম্পর্ক; বিভূতিতত্ত্ব, বিশ্বরূপ; দর্শনতত্ত্ব, মহাকাল; মহাপ্রলয়; অনন্তজীবন প্রভৃতি। এ শাস্ত্রের পাঠন, পঠন ও শ্রবণ প্রতিটি মানবের কর্তব্য।

আজ সোমবার বিভিন্ন দেশে পালিত হচ্ছে শুভ জন্মাষ্টমী। সারা বিশ্বে ধর্মে ধর্মে হানাহানি, ধর্ম নিয়ে চলছে মারাত্মক বাড়াবাড়ি। সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন করছে। মিয়ানমারের বৌদ্ধরা রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। তারা রোহিঙ্গা নরনারীকে হত্যা, ধর্ষণ ও পুড়িয়ে মারছে। মানবতা নিভৃতে কাঁদছে। অথচ গৌতম বুদ্ধের নীতি ও শিক্ষা তারা মানছে না। ভারতে গরু জবাইয়ের নামে নরহত্যা করছে হিন্দুরা। তারা মানছে না ধর্মের কথা, ‘নর হত্যা মহাপাপ নরকে বসতি।’ মধ্যপ্রাচ্যে ইহুদিরা নির্বিচারে মুসলমানদের হত্যা করছে।

এদিকে, কিছু লোক ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে মেধাবী যুবকদের ‘জঙ্গি’তে পরিণত করছে। ধর্মীয় উন্মত্ততার মধ্যে যেসব হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ ঘটছে, তার বিচার কোথাও হয় না। সব দেশেই সরকারই এসব মানবতাবিরোধী কাজে পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে। অথচ শান্তি, সম্প্রীতি ও সাম্যই প্রতিটি ধর্মের মর্মবাণী। বিশ্বের প্রতিটি মানুষ যেন তার ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রতিটি দেশের সরকার ও সমাজের। এ পৃথিবী ছেড়ে আমাদের সবাইকে পরপারে যেতে হবে। সে কথা মনে রেখে প্রত্যেক মানুষকে মানবতাবিরোধী, ধর্মীয় উন্মত্ততার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। এটাই হোক বিশ্বের প্রতিটি মানুষের কাছে শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমীর আহ্বান।

হিংসা, ক্রোধ, হত্যা, নির্যাতন দেখতে চাই না ধরণীকে। শিবম সত্যম সুন্দরম, দুঃখের পৃথিবীটা হোক আনন্দ আশ্রম। এটাই হোক প্রতিটি ধর্মের মানুষের কামনা। বাংলাদেশ হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, এ দেশ সবার। ‘সর্বে সুখিনঃ ভবন্ত, সর্বেসন্ত নিরাময়া, সর্বে ভদ্রানি পশ্যন্ত, মা-কাশ্চিহ দুঃখ ভাগ ভবেহ’। সকল প্রাণী সুখী হউক। সকলে নিরাময় হউক। সকলের কল্যাণ হউক। কেউ যেন দুঃখ না পায়। শুভ জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা, প্রীতি ও সম্ভাষণ।

msnislamtranport@yahoo.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫