ঢাকা, বুধবার,১৩ ডিসেম্বর ২০১৭

আফ্রিকা

উ. কোরিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দিল ৩৫ লাখ মানুষ

নয়া দিগন্ত অনলাইন

১৩ আগস্ট ২০১৭,রবিবার, ১১:৪১ | আপডেট: ১৩ আগস্ট ২০১৭,রবিবার, ১১:৫২


প্রিন্ট
পিয়ংইয়ংয়েরে কিম ইল-সুং চত্বরে লাখ লাখ মানুষের বিক্ষোভ সমাবেশ

পিয়ংইয়ংয়েরে কিম ইল-সুং চত্বরে লাখ লাখ মানুষের বিক্ষোভ সমাবেশ

পিয়ংইয়ং বলেছে, সম্ভাব্য মার্কিন হামলা মোকাবেলা করতে কমপক্ষে ৩৫ লাখ মানুষ দেশটির সেনাবাহিনীতে নাম লিখিয়েছে। উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন দলের মুখপাত্র রোডং সিনমুনে এ খবর দিয়েছে।

আমেরিকার বিরুদ্ধে হাজার হাজারবার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য উত্তর কোরিয়ার সব মানুষ জেগে উঠছে বলে এতে উল্লেখ করা হয়।

এতে আরো বলা হয়েছে, পিয়ংইয়ংয়ের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে আমেরিকার সাথে উত্তেজনা নতুন করে তুঙ্গে ওঠার পরপরই উত্তর কোরিয়ার সেনাবাহিনীতে ৩৫ লাখ মানুষ নাম লিখিয়েছে। দেশটির সেনাবাহিনীতে যারা নাম লিখিয়েছে তাদের মধ্যে সাবেক সেনাসদস্য এবং ছাত্ররা রয়েছেন।

এদিকে, গত বুধবার পিয়ংইয়ংয়ের কিম ইল-সুং চত্বরে লাখ লাখ মানুষ বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর এ বিক্ষোভ সমাবেশ করা হয়।

মধ্য আগস্টেই যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন গুয়াম দ্বীপে আঘাত হানার পরিকল্পনা শেষ হবে বলে জানিয়েছে উত্তর কোরিয়া।

উত্তর কোরিয়ার বার্তা সংস্থা কেসিএনএ লিখেছে, ‘‘ট্রাম্পের মতো ব্যক্তির সাথে সফল আলোচনা সম্ভব নয়৷ শুধুমাত্র কঠোর বলপ্রয়োগই তার ক্ষেত্রে কাজ করবে৷’’

পরমাণু কার্যক্রমের কারণে জাতিসঙ্ঘ উত্তর কোরিয়ার উপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা জারির পর দেশটি ওয়াশিংটনকে ‘মারাত্মক শিক্ষা’ দেয়ার হুমকি দেয়৷ এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প জানান, উত্তর কোরিয়া নতুন করে অ্যামেরিকার বিরুদ্ধে আরো হুমকি দিলে সে দেশের উপর এমন মারাত্মক হামলা চালানো হবে, যা বিশ্বে কেউ কখনো দেখেনি৷ ট্রাম্পের এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় উত্তর কোরিয়া গুয়ামের উপর হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে৷

যদিও চীন ও উত্তর কোরিয়ার মাঝে বরাবরই খুব ভালো কূটনৈতিক সম্পর্ক আছে, সম্প্রতি এই সম্পর্কে ফাটল ধরেছে৷ এর প্রমাণ হয়, জিলিন প্রদেশের দক্ষিণ সীমান্তে উত্তর কোরিয়ানদের ওপর আগের চেয়ে অনেক বেশি কড়াকড়ি আরোপ করেছে চীন৷ শুধু পাসপোর্টই নয়, পর্যটকদের সব ডিভাইস ও লাগেজ জমা রাখতে হয় কর্তৃপক্ষের কাছে৷

উত্তর কোরিয়ার হুমকির পর বিশ্লেষকরা উত্তেজনা প্রশমনের উপায় নিয়ে ভাবছেন৷ কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকায় কোনো এক পক্ষের নেয়া পদক্ষেপ যদি অন্যপক্ষ সঠিকভাবে বুঝতে না পেরে পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায় তাহলে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা৷

বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার কাছে অনেক পরমাণু অস্ত্র থাকলেও পরিস্থিতি যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায় সেজন্য ওয়াশিংটন ও মস্কোর মধ্যে হটলাইন, স্যাটেলাইট সহ নানান ব্যবস্থা চালু আছে৷ এমনকি ভারত ও পাকিস্তানও প্রতিবছর জানুয়ারিতে যার যার পরমাণু অস্ত্রের সংখ্যা এবং সেগুলো কোথায় আছে তা একে অন্যকে জানিয়ে থাকে৷ এর মাধ্যমে কোনো পক্ষ যেন ভুল করে কোনো পরমাণু স্থাপনায় হামলা না চালায় সেটি নিশ্চিত করা হয়েছে৷

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় চিন্তিত বিশ্লেষকরা৷ সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার একজন উপদেষ্টা জন ওল্ফসথাল রয়টার্সকে বলেছেন, ‘‘আমাদের মধ্যে (দুই দেশের মধ্যে) কিছু অ্যাডহক ও অ্যানালগ উপায়ে যোগাযোগের ব্যবস্থা আছে৷ কিন্তু সঙ্কট সমাধানে কার্যকর হতে পারে এমন পরীক্ষিত কোনো মাধ্যম নেই৷’’

জাতিসঙ্ঘে থাকা যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার মিশনের মাধ্যমে অনেক সময় দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ হয়ে থাকে৷ এছাড়া বেইজিংয়ে দুই দেশের দূতাবাসের মাধ্যমেও যোগাযোগ হয়৷ আর দুই দেশের সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা হয় পানমুনজমে৷ কোরীয় উপত্যকায় অবস্থিত এই স্থানেই ১৯৫০-৫৩ কোরীয় যুদ্ধের সময় যুদ্ধবিরতি চুক্তি সই হয়েছিল৷
এছাড়া চীন কিংবা সুইডেনের মাধ্যমেও কখনও কখনও যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার কাছে বার্তা পাঠিয়ে থাকে৷

১৮৯৮ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ গুয়াম৷ তবে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড থেকে এটি অনেক দূরে অবস্থিত৷ তবে জাপান, কোরিয়া, ফিলিপাইন্স থেকে এটি কাছে৷ পিয়ংইয়ং থেকে গুয়ামের দূরত্ব প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার৷ জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার পর্যটকরা গুয়ামে বেড়াতে যান৷

গুয়ামে জন্ম নেয়া শিশুরা মার্কিন নাগরিক হলেও তাদের ভোটাধিকার নেই৷

গুয়ামে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ ও বিমানঘাঁটি রয়েছে৷ প্রায় ছয় হাজার মেরিন সেনা সেখানে মোতায়েন রয়েছে৷ পঞ্চাশের দশকে কোরীয় যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র গুয়াম ঘাঁটি ব্যবহার করেছে৷ এছাড়া ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ও গুয়ামের বিমানঘাঁটি বহুল ব্যবহৃত হয়েছে৷

উত্তর কোরিয়া-যুক্তরাষ্ট্র সঙ্কট কতটা উদ্বেগের?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ নিয়ে এখনি ততটা আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই। তারা কিছু যুক্তিও তুলে ধরেছেন-

১. কোনো পক্ষই যুদ্ধ চাচ্ছে না

কোরিয়া উপদ্বীপে একটি যুদ্ধ কারো জন্যই সুবিধা আনবে না। উত্তর কোরিয়ায় ক্ষমতাসীনদের প্রধান লক্ষই হচ্ছে ক্ষমতায় টিকে থাকা। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি যুদ্ধ বেধে গেলে ক্ষমতার আসন নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে।

বিবিসির যুদ্ধ বিষয়ক সংবাদদাতা জোনাথন মার্কুস বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আর উত্তর কোরিয়ার মধ্যে যুদ্ধ হলে তা আরো বড় আকারে ছড়িয়ে পড়বে। ফলে তা উত্তর কোরিয়ার জন্য হবে আত্মঘাতী। আবার ঠিক এই কারণে তড়িঘড়ি পারমানবিক অস্ত্রের মালিক হতে চাইছে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জঙ-উন। কারণ আর যাই হোক, তিনি লিবিয়ার গাদ্দাফি বা ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের ভাগ্য বরণ করতে চান না।

আবার যুক্তরাষ্ট্রও সহজে উত্তর কোরিয়ায় হামলা চালাবে না। কারণ তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দক্ষিণ কোরিয়া বা জাপানের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। যুদ্ধে অনেক প্রাণহানি ঘটবে, বিশেষ করে সাধারণ আমেরিকান আর সৈনিকদের। সর্বোপরি, ওয়াশিংটন এমন কোন ঝুঁকিতে যেতে চায়না, যার ফলে আমেরিকান ভূখণ্ডে কোন পারমানবিক হামলা হতে পারে।

২. শুধু কি কথার লড়াই?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তর কোরিয়াকে যেভাবে হুমকি দিয়েছেন, সেটা একজন প্রেসিডেন্টের জন্য ব্যতিক্রম। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, যুক্তরাষ্ট্র পুরোদমে যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে।

মার্কিন একজন জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, উত্তেজক কথাবার্তা বাড়ছে মানে এই নয় যে, আমাদের অবস্থানও বদলাচ্ছে।

সবচেয়ে বড় ব্যাপার, দুই দফা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার পর, জাতিসংঘের মাধ্যমে অবরোধ আরোপের সেই পুরনো পথেই পথেই হেঁটেছে যুক্তরাষ্ট্র।

এখনো কূটনীতিকরা আশা করছেন, রাশিয়া আর চীনের সহায়তায় উত্তর কোরিয়াকে আলোচনার টেবিলে আনা যাবে।

যদিও কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে, এরকম উত্তেজক পরিস্থিতিতে কোন ভুল বোঝাবুঝি থেকেও একটি যুদ্ধ বেধে যেতে পারে।

৩. আগেও এরকম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পিজে ক্রাউলে যেমনটা বলেছেন, ১৯৯৪ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্র একবার সশস্ত্র যুদ্ধের কাছাকাছি চলে এসেছিল। তখন পারমানবিক কমপ্লেক্সে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষককে প্রবেশে বাধা দিয়েছিল দেশটি। তবে কূটনীতি দিয়েই তা সমাধান করা হয়েছে।

এরপর অনেক বার যুক্তরাষ্ট্র, জাপান আর দক্ষিণ কোরিয়ায় হামলার হুমকি দিয়েছে উত্তর কোরিয়া। কিন্তু সেগুলো কখনো বাস্তব হয়নি।

আর এখন ডোনাল্ড ট্রাম্প যেভাবে পাল্টা হামলার হুমকি দিচ্ছেন, তাও একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের আচরণের পক্ষে যুক্তিসঙ্গত নয়। এটাই যা একটু আশঙ্কার যে, তিনি হঠাৎ করে কোন কাণ্ড ঘটিয়ে বসবেন কিনা। তবে তার এ ধরণের কোন কাজে নিশ্চয়ই তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন বাধা দেবেন।

আর তাই ট্রাম্পের এরকম ব্যতিক্রমী আচরণের কারণে করো উদ্বিগ্ন হওয়ার দরকার নেই বলেই মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

আর তাই হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দক্ষিণ কোরিয়াও আগাম একটি যুদ্ধের আশঙ্কায় খুব একটা উদ্বিগ্ন নয়।

একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলছেন, এখনো পরিস্থিতি সঙ্কট সময়ে পড়েনি। আশা করা হচ্ছে, শান্তিপূর্ণভাবেই বিষয়টির সমাধান হবে। এটাই হচ্ছে আশাবাদের বিষয়।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫