ঢাকা, মঙ্গলবার,২৪ অক্টোবর ২০১৭

প্রাণি ও উদ্ভিদ

বর্ষায় গুণে ভরা চালতা

আব্দুর রাজ্জাক ঘিওর (মানিকগঞ্জ)

১২ আগস্ট ২০১৭,শনিবার, ১৯:২৫


প্রিন্ট
গুণে ভরা চালতা

গুণে ভরা চালতা

বর্ষায় বৃষ্টিভেজা চালতা ফুলের অনন্য সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে কবি জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন, চালতা ফুল কি আর ভিজিবে/না শিশিরে/জলে নরম গন্ধের ঢেউয়ে?... 


লম্বাটে খাঁজকাটা ঘন পাতার ডালের ডগায় বর্ষায় ফোটে চালতা ফুল। ধবধবে সাদা চালতা ফুলের সৌন্দর্য় অন্যান্য ফুলের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। সুন্দর এ ফুলটি বর্ষার উপহার হিসেবে আমরা সবাই পেয়ে থাকি। ফল হিসেবে চালতার যেমনি রয়েছে গুণ, তেমনি এর ফুলও সৌন্দর্য বিকাশের পাশাপাশি মানবজীবনে নানা উপকারে আসে।


মাঝারি আকারের চিরহরিৎ উদ্ভিদ চালতাগাছ। সারা দেশের মতো মানিকগঞ্জেও সাধারণত গৃহস্থ বাড়ির আনাচে কানাচে, ঝোপ-জঙ্গলে, রাস্তার ধারে এ গাছের দেখা মেলে। আবার উদ্যানেও শোভাবর্ধনে লাগানো হয়। তবে দিন দিন এ গাছের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। এ গাছটি পরিত্যক্ত জায়গায় এমনিতেই বেড়ে ওঠে। আমাদের চার পাশের গাছগাছালির ভেতর অজান্তেই গাছটিতে ফুল ফোটে। এ ফুল সাধারণত ভোর থেকে ধীরে ধীরে বিকশিত হয়। দুপুর হলে ফুটন্ত ফুলটি ধীরে ধীরে মলিন দেখা যায়। 


জানা যায়, এর আদি নিবাস দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। শ্রীলঙ্কা, চীন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশে এই গাছ জন্মে। বিশেষত এটি ভারতবর্ষীয় উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিত। ফুল সাদা, বড় আকৃতির সুগন্ধযুক্ত। পাপড়ি মোটা। চালতা যে অংশটি ফল হিসেবে ব্যবহার করা হয় সেগুলো ফুলের বৃতি। আসল ফল থাকে এ বৃতির ভেতরে। ফলের অভ্যন্তরে থাকে বীজ। বীজ চকচকে আঠা দিয়ে বেষ্টিত। 


বাংলাদেশ পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন নেত্রী লক্ষ্মী চ্যাটার্জি বলেন, অঞ্চলভেদে চালতাকে চালিতা ও চাইলতে নামে পরিচিত। অম্লমধুর চালতা ফল বেশ লোভনীয়। শরত-হেমন্ত ফল পাকার সময়। শীতকাল পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। চালতার ফল হয় টকমিষ্টি। আচার, চাটনি, টক ডাল রান্নায় ব্যবহৃত হয়। পাকা ফল পিষে নিয়ে লবণ, কাঁচামরিচ দিয়ে মেখে খাওয়া যায়। চালতার শাঁস নানা খাদ্যে ব্যবহার করা হয়। জেলি ও শরবত তৈরির হয় চালতা ফল থেকে। 


দেখতে সুন্দর বলে শোভাবর্ধক তরু হিসেবেও কখনো কখনো উদ্যানে লাগানো হয় এই গাছ। চালতার সাদা রঙের ফুল দেখতে সুন্দর; এটি সুগন্ধযুক্ত। চালতার বৈজ্ঞানিক নাম ডিলেনিয়া ইন্ডিকা, ইংরেজি নাম এলিফ্যান্ট আপেল। এ গাছ উচ্চতায় ১৫ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। গ্রামবাংলায় সাধারণত বনে-জঙ্গলে এ গাছ জন্মে; কখনো কখনো দু-একটি গাছ বাড়ির উঠানে দেখা যায়। চালতা অপ্রকৃত ফল; মাংসল বৃতিই খাবারযোগ্য। 


মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালের আরএমও ডা: মো: লুৎফর রহমান জানান, চালতা একটি অবহেলিত ফল হলেও এর রয়েছে নানা খাদ্যগুণ। চালতা ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, ভিটামিন ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’র ভালো উৎস। প্রচুর ভিটামিন ‘সি’ থাকায় এই ফল স্কার্ভি ও লিভারের রোগ প্রতিরোধ করে। এ ছাড়াও চালতায় রয়েছে বিশেষ ধরনের কিছু অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা জরায়ু ও স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। 


বিশিষ্ট আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক উত্তম পালিত বলেন, ঠাণ্ডা ও কাশির জন্য পাকা চালতার রস চিনি মিশিয়ে খেলে উপকার পাওয়া যায়। শুধু ফল নয়, চালতার মূল ও পাতারও রয়েছে ঔষধি গুণ। মচকে গিয়ে ব্যথা পেলে সেখানে চালতাগাছের মূল ও পাতা পিষে প্রলেপ দিলে ব্যথা কমে যায়।


এ ছাড়াও নৌকার তলদেশে, যন্ত্রপাতির হাতল তৈরিতে এর কাঠ ব্যবহার করা হয়। কারণ এ কাঠ মধ্যম শক্ত, ভারী ও পানিতে টেকসই। জ্বালানি হিসেবেও ভালো ও উন্নত মানের কয়লা তৈরি করা যায়। বাকল ট্যানিন হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫