ঢাকা, সোমবার,২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

এত আশা করার কিছু নেই

মীযানুল করীম

১২ আগস্ট ২০১৭,শনিবার, ১৯:০৯


মীযানুল করীম

মীযানুল করীম

প্রিন্ট

তিনজন মহিলাকে একসাথে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগের সূত্রে ইরান যখন বিশ্বমিডিয়ায় আলোচিত হচ্ছে, তখন ভারতে ভাইস প্রেসিডেন্ট বা উপরাষ্ট্রপতি পদে বিজেপি নেতার নির্বাচন কোনো সাড়াই জাগাতে পারেনি। ইরানে ভয়াবহ যুদ্ধের মাঝেও পার্লামেন্টসহ জাতীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ধারাবাহিকতা ক্ষুণ্ন হয় না। তবুও মুসলিম অধ্যুষিত দেশটির গণতন্ত্র নাকি আসলে গণতন্ত্র নয়, ‘মোল্লাতন্ত্র’। অপর দিকে মার্কিন মিত্র ভারতে গণতন্ত্রের নামে যত কারসাজি ও বৈষম্য চলুক, তবুও ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্ররূপে প্রশংসিত।

ভারত যদি প্রকৃত অর্থেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়ে ওঠে, তাহলে আমাদের এই উপমহাদেশে এর অনুকূল প্রভাব পড়াই স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তবে সে ধরনের কোনো ইতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশ বা প্রতিবেশী অন্যান্য রাষ্ট্রে পড়তে দেখা যায় না। এর কারণ- ক. ভারতীয় গণতন্ত্রের আলোচিত দিকের পাশাপাশি অন্ধকার দিকও আছে, যা কম গুরুত্ববহ নয়। খ. ভারতের রাষ্ট্রকাঠামোতে কর্তৃত্বকারী মহল তাদের গণতন্ত্রের গ্রহণীয় বিষয়গুলো আশপাশের দেশগুলোতে অনুসৃত হোক, তা আন্তরিকভাবে চায় না। কারণ, তাহলে গণতন্ত্রের চর্চা ও প্রাতিষ্ঠানিকতার পথ ধরে এসব দেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আকাক্সিক্ষত রূপান্তর ঘটবে, যা আধিপত্যকামী অভ্যন্তরীণ কিংবা বাইরের শক্তির কাম্য নয়।

ভারতের প্রতিষ্ঠাতাদের একটা বড় অংশের মতো আজো সে দেশের রাজনীতিসহ বিভিন্ন অঙ্গনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের অনেকেই সত্যিকার গণতন্ত্র কায়েম হোক- এই প্রত্যাশা আন্তরিকভাবে লালন করে থাকেন। কিন্তু দেশটার সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের বিশাল অংশের মজ্জাগত সাম্প্রদায়িকতা এবং নিজেদের মাঝে ধর্মের নামে জাতপাতের বিভাজন ও বৈষম্য এ ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে রয়েছে।
এত দিন ভারতের রাষ্ট্রপতি ছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায় এবং উপরাষ্ট্রপতির পদে আসীন ছিলেন মোহাম্মদ হামিদ আনসারী। দু’জনই সাবেক ক্ষমতাসীন দল কংগ্রেসের লোক। প্রণব রাজনীতির অঙ্গনে খুবই তৎপর এবং বিভিন্ন সময়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত ছিলেন। সে তুলনায় আনসারী কম পরিচিত মুখ। তবে তিনি সংশ্লিষ্ট সবার কাছে গ্রহণীয় ছিলেন উপরাষ্ট্রপতি পদে।

ষাটের দশকের রাষ্ট্রপতি ও শিক্ষাবিদ জাকির হোসেনের মতো হামিদ আনসারী একগোছা শ্মশ্রুশোভিত। তিনি বাংলাদেশেও এসেছিলেন। এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট কুলদীপ নায়ার ভারতের বিঘোষিত ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির প্রেক্ষাপটে অহিন্দু ব্যক্তিত্ব তথা সংখ্যালঘু মুসলিম হামিদ আনসারীকে রাষ্ট্রপতি পদে সর্বসম্মতভাবে নির্বাচিত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এভাবেই ভারত গণতন্ত্রের প্রকৃত চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বিশ্বে প্রশংসনীয় নজির স্থাপন করতে পারে বলে তার মতো অনেকেরই বিশ্বাস। কিন্তু জাতীয়তাবাদের নামে ক্ষমতাসীনদের হিন্দুত্ববাদী মানসিকতা আর কংগ্রেস দলের ম্রিয়মাণ ভূমিকা এবং এড়িয়ে চলার প্রবণতায় কুলদীপের কণ্ঠ চাপা পড়ে যায়। হামিদ আনসারী রাষ্ট্রপ্রধান হওয়া দূরের কথা, এই পদে প্রার্থী পর্যন্ত হতে পারেননি। ভারতীয় শাসক মহলের ধর্মনিরপেক্ষতা আর অসাম্প্রদায়িকতার বুলির সাথে বাস্তবতার ব্যবধান কতটা, তা এর মধ্য দিয়ে প্রকট হয়ে ওঠে।

নতুন উপরাষ্ট্রপতি হয়েছেন বিজেপির চেনা মুখ বেঙ্কাইয়া নাইডু। তাই গণতন্ত্রের প্রশ্নে তার ভূমিকা কতটা দৃঢ় হবে তা জনগণের কাছে অচেনা বা অজানা নয়। টিভিতে প্রায়ই তার মুখ দেখা যায় কয়েক বছর ধরে। হিন্দুত্ববাদী মহলের একজন শীর্ষনেতা হিসেবে তিনি দলের হাইকমান্ডের প্রতি বরাবর ‘কৃতজ্ঞতার পরিচয়’ দেবেন বলে তার কাছে মুসলিম-খ্রিষ্টান-দলিতদের তেমন কিছু নেই প্রত্যাশার। উপরাষ্ট্রপতি হওয়া যে তার কাছে হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো সৌভাগ্য, তা বক্তব্যেই স্পষ্ট। উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে প্রথম প্রতিক্রিয়ায় বললেন, ‘এ পদে অধিষ্ঠিত হব বলে আমি আশা করিনি।’
বেঙ্কাইয়া নাইডু পূর্বসূরি হামিদ আনসারী থেকে দায়িত্ব নেয়ার আগের দিন হামিদ এমন কিছু তিক্ত সত্য উচ্চারণ করেছেন, যা এত দিন বলতে পারেননি। মেয়াদ শেষ হওয়ার এক দিন আগে টিভিকে দেয়া সর্বশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘ভারতে মুসলমানেরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।’

অর্থাৎ গান্ধী-নেহরু স্বাধীন ভারত প্রতিষ্ঠার ৭০ বছর পরও এই বিরাট দেশটির ১৫ কোটি মুসলমান নিজেদের জান-মাল-ইজ্জতকে নিরাপদ ভাবতে পারছেন না। দেশটির সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় এর দায় এড়াতে পারে না কিছুতেই। ১০ আগস্ট হামিদ আনসারীর কার্যকাল শেষ হওয়ার দিন তার এই বক্তব্য মিডিয়ায় এসেছে।

এই প্রবীণ ব্যক্তিত্ব রাজ্যসভার চেয়ারম্যানও। দুঃখের সাথে তিনি বলেন, ভারতের সমাজে অসহিষ্ণুতা ও নজরদারির পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। মুসলমানদের মনে ভীতি ও অস্বস্তি বিরাজ করছে। তাদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিটি পদক্ষেপে নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে সংখ্যালঘু মুসলিমরা।

এহেন পরিস্থিতির বিষয়ে অনেকের সাথে আলাপের কথা জানিয়ে হামিদ আনসারী বলেন, গণপিটুনিতে মৃত্যু, নজরদারি, গরু জবাইয়ের ওপর বিষেধাজ্ঞা ও ঘরওয়াপসি (ধর্মান্তরিত হিন্দুদের হিন্দুধর্মে প্রত্যাবর্তন) বিদ্যমান অসহনশীলতার জন্ম দিয়েছে। এতে ভারতীয় মূল্যবোধ হয়ে পড়ছে খণ্ডবিখণ্ড। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় প্রশাসন অক্ষম হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে যেভাবে যেকোনো নাগরিকের ‘ভারতীয়’ হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, তা নিদারুণ অস্বস্তিকর। কথায় কথায় বারবার নিজের জাতীয়তাবোধ প্রমাণ করতে বলা হচ্ছে, যা পুরোপুরি অযৌক্তিক। আমি একজন ভারতীয়, এটাই প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট।’

আনসারী বিদায়বেলায় বেদনার্ত কণ্ঠে বলেছেন, ‘শুধু গত ৭০ বছর নয়, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বহুমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সমাজে আমাদের বসবাস। কিন্তু সেই সমাজ এখন সঙ্কটের মুখে।’ তিনি বলেন, ‘সরকারের নীতির সমালোচনা করার সুযোগ না থাকলে গণতন্ত্র পরিণত হয় স্বৈরতন্ত্রে।’
বাংলাদেশের কিছু মিডিয়া প্রণব মুখার্জি ভারতের রাষ্ট্রপতি হওয়ায় যেমন উল্লসিত হয়েছিল, তেমনি এবার তার স্বাভাবিক বিদায়েও অস্বাভাবিক বেদনা প্রকাশ করেছে। কারণ তিনি ‘বাংলাদেশের জামাইবাবু’। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার এমন কোনো ক্ষমতা কিংবা দৃঢ়তা ছিল না ক্ষুদ্র বাংলাদেশের প্রতি বৃহৎ ভারতের কোনো বঞ্চনা বা অবিচারের অবসান ঘটানোর ক্ষেত্রে।

একইভাবে, ভারত-বাংলাদেশের অনেক মিডিয়া নতুন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ দলিত জনগোষ্ঠীর লোক হওয়ায় এত বেশি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে যেন এতে ভারতের লাঞ্ছিত ও নির্যাতিত কোটি কোটি দলিতের ক্ষমতায়ন ঘটেছে এবং তারা আর ব্রাহ্মণ্যবাদ বা বর্ণ হিন্দুদের হাতে নিগ্রহ-নিপীড়ন ও বঞ্চনা-বৈষম্যের শিকার হবে না। অতীতে শিক্ষাবিদ জাকির হোসেনের মতো গান্ধীর সহকর্মী রাষ্ট্রপতি ছিলেন। এরপর এই পদে ছিলেন আসামের বাঙালি মুসলমান ফখরুদ্দীন আলী আহমদ (যার পূর্বপুরুষ বাংলাদেশের ‘বাঙাল’)। মাত্র কয়েক বছর আগে ভারতের রাষ্ট্রপতি ছিলেন প্রখ্যাত পরমাণুবিজ্ঞানী ‘মিসাইলম্যান’ এ পি জে আবদুল কালাম। কিন্তু এর পরও ভারতীয় মুসলমানদের ক্ষমতায়ন দূরে থাক, তাদের ভাগ্য আরো খারাপ হয়েছে। হিন্দুত্বের উত্থানের বিপরীত অনুপাতে কোটি কোটি মুসলিম নাগরিক কার্যত গরুর চেয়ে অধম বলে গণ্য হচ্ছে। তাদের ভবিষ্যৎ বলতে কিছু নেই।

রামনাথ কোবিন্দ দলিত সন্তান হয়েও অনেক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, অনেক ত্যাগ কষ্ট পরিশ্রম করে আজকের এই পর্যায়ে উঠে এসেছেন। এটা সত্যিই প্রশংসনীয় ও শিক্ষণীয়। কিন্তু তিনি হিন্দুত্ববাদী তথা সাম্প্রদায়িক সংগঠনের লোক অল্প বয়স থেকেই, তা ভুলে গেলে ভুল করা হবে। বিজেপি বর্ণ হিন্দুদের আধিপত্য কায়েমের দল- এই সমালোচনা থেকে রেহাই পেতে দলটি দলিতদের জন্য এমনকি মুসলমানদের জন্য নিজস্ব কিছু লোক দিয়ে ফ্রন্ট খুলেছে। রামনাথ কোবিন্দ অনেক আগে থেকেই এ ফ্রন্টের লোক হিসেবে হিন্দুত্ববাদী হাইকমান্ডের একান্ত অনুগত ও আস্থাভাজন ব্যক্তি। রাষ্ট্রপতি হিসেবে এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই স্বাভাবিক।

রামনাথ কোবিন্দ রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে ছিলেন বিহারের রাজ্যপাল বা গভর্নর। সেই বিহারের (বর্তমান ঝাড়খণ্ডের রাঁচি) লোক জগজীবনরাম দলিত সন্তান। তিনি ইন্দিরার আমলে প্রতিরক্ষামন্ত্রীসহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন বহু বছর। মন্ত্রী হিসেবে জাঁদরেল হলেও এই দলিত সন্তান নিজ জনগোষ্ঠীর ভাগ্য ফেরাতে পারেননি। দলিতরা আজো উচ্চবর্ণের হিন্দুর কাছে অচ্ছুৎ-অশুচি। জগজীবনের কন্যা মীরা কুমার বিগত কংগ্রেস আমলে কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টের স্পিকার ছিলেন। অতীতে রাষ্ট্রপতি ছিলেন এম কে নারায়ণন, যিনি একজন দলিত। কিন্তু এতে কি ভারতের কোটি কোটি দলিতের দুর্দিন দূর হয়েছে? হয়নি।

ভারত ‘বৃহত্তম গণতন্ত্র’, অর্থাৎ বিশ্বে সর্বাধিক জন-অধ্যুষিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্ররূপে অভিহিত। একই ভারত এখন সর্বাধিক দাসের দেশও। শুনে যে কেউ চমকে উঠতে পারেন। হ্যাঁ, ভারতে এই একবিংশ শতাব্দীর অত্যাধুনিক যুগেও অসংখ্য মানুষ দাসতুল্য চরম অমানবিক জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। বলা বাহুল্য, তাদের বেশির ভাগই হিন্দু সম্প্রদায়ের শূদ্র শ্রেণীর মানুষ। তারাই দলিত, অচ্ছুৎ, অস্পৃশ্য নামে পরিচিত।

গত শুক্রবার মিডিয়ার খবর : ‘বৈশ্বিক দাসত্বসূচকে দশম বাংলাদেশ, শীর্ষে ভারত।’ এই শীর্ষস্থান অধিকার করা গৌরবের নয়, লজ্জার। কারণ এটা কৃতিত্ব নয়, কলঙ্ক।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা ক্ষেত্রে বিভিন্ন রাষ্ট্রের অগ্রগতি বা অবনতির মান ও মাত্রা পরিমাপের জন্য স্বীকৃত কিছু সূচক থাকে। এ ক্ষেত্রে ‘দাসত্বসূচক’ আছে বলে অনেকেরই জানা নেই। দাসপ্রথার আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি ঘটেছে বহু আগেই, কিন্তু ডিজিটাল যুগের বিশ্বগ্রামেও দাস আছে কোটি কোটি। মানবতার এই চরম অবমাননার দিক দিয়ে ভারত সবার আগে!

অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ওয়ার্ক ফ্রি ফাউন্ডেশন ১০ আগস্ট প্রকাশ করেছে Global Slavery Index 2016. বিশ্বের দাসত্বসূচক-সংক্রান্ত এই প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বিশ্বে এখন সাড়ে চার কোটিরও বেশি মানুষ ‘আধুনিক দাস’ হিসেবে জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছে। এ তালিকায় সবার উপরে ভারত, যে দেশে ‘আধুনিক দাস’ এক কোটি ৮৩ লাখ ৫৪ হাজার ৭০০ জন। বাংলাদেশের ১৫ লাখ ৩১ হাজার ৩০০ মানুষ এই পর্যায়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। দাসত্বসূচক-২০১৪তে বাংলাদেশ ছিল নবম স্থানে। ‘দাস’-এর যে সংজ্ঞা নির্ধারিত ও গৃহীত হয়েছে, তা হলো- বলপূর্বক শ্রমে কিংবা বিয়েতে বাধ্য করা, যৌনবাণিজ্যে নিয়োগ এবং মানবপাচারের শিকার হওয়া।

এই সূচকের পরিসংখ্যান বাংলাদেশে জিডিপি আর উন্নয়ন নিয়ে সরকারি তোড়জোড়ের পাশাপাশি যে অন্ধকার দিক, সেটাকে তুলে ধরছে। একই সাথে ভারতের গণতন্ত্র নিয়ে গৌরবের সারবত্তাকে করেছে প্রশ্নবিদ্ধ। যারা দলিত জনগোষ্ঠীর লোক রাষ্ট্রপতি হওয়াকে ভারতীয় গণতন্ত্রের বিরাট সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন, তাদের কাছে প্রশ্ন- এই রাষ্ট্রপতির কী ক্ষমতা আছে যে, তিনি ‘আধুনিক দাস’দের দলিত জীবনকে আশার আলোয় উদ্ভাসিত করতে পারবেন?

ভারতের গণতন্ত্র সর্বাঙ্গীণভাবে সফল ও সুন্দর হতো ধর্ম ভাষা বর্ণের বৈষম্য, বিশেষত মুসলিমবিদ্বেষ যদি সমাজ থেকে দূর হয়ে যেত। ইদানীং গৃহপালিত পশু গরুর বেশি মূল্য দেয়া হচ্ছে বৃহত্তম সংখ্যালঘু সম্প্রদায় মুসলমানদের চেয়ে। উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতার অপপ্রয়োগ বা ছত্রছায়ায় এবং জাতীয়তাবাদ ও সংস্কৃতির নামে কোটি কোটি মুসলমানের জীবন বিপন্ন করে তুলেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এসব দেখেও হয় নীরব নতুবা অতি বিলম্বে দু-চার কথায় ফাঁকাবুলি আওড়ান। এটা ওয়াকিবহাল মহলের মতে, লোক দেখানো ও চোখ ধোয়ানো (আইওয়াশ)।

এই অবর্ণনীয় পরিস্থিতিতে মুসলিম সম্প্রদায় ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীসহ গণতন্ত্রকামী শান্তিপ্রিয় মানুষের জন্য আরো উদ্বেগজনক হলো, ভারতের বিরোধী দল আপসকামিতা ও কোন্দলের কারণে সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়াতে পারছে না। ফলে Democracy-এর আবরণে Mobocracy চলছে এবং প্রশাসনের নামে স্বেচ্ছাচারিতা উঠছে চরমে। এর মাশুল প্রায় পুরোটাই দিতে হচ্ছে প্রধানত মুসলমানদের, অনেক ক্ষেত্রে দলিত জনগোষ্ঠীকে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে খ্রিষ্টানদের। গণতন্ত্রের নামে Populism বা জনতুষ্টিবাদের জয়জয়কার বিবেকবান মানুষকে করে তুলছে উদ্বিগ্ন। ভারতে এখন যারা সরকার ও সমাজ দাবড়ে বেড়াচ্ছেন, সেই চরম ক্ষমতাবান ও উদ্ধত ব্যক্তিদের গায়ে জাতীয়তাবাদের উত্তরীয় থাকলেও এর ভেতরে লুকানো রয়েছে সাম্প্রদায়িকতার মারণাস্ত্র। তারা মুখে গণতন্ত্রের বুলি আওড়ে বাস্তবে বহুত্ববাদের কবর রচনা করছেন। সারা দেশে চাপিয়ে দেয়ার প্রয়াস চলছে এক দল, এক ভাষা ও এক সংস্কৃতিকে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫