ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৭ আগস্ট ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

নানা রঙের দিনগুলো

এস আর শানু খান

১২ আগস্ট ২০১৭,শনিবার, ১৭:৫৮


প্রিন্ট
নানা রঙের দিনগুলো

নানা রঙের দিনগুলো

আমার বাপ-চাচারা সাত ভাই পাঁচ বোন। বোনদের বিয়ে দিয়ে স্বামীর বাড়ি পাঠিয়ে দিলেও দাদার মৃত্যুর পর একই ভিটায় সাত ভাইয়ের সাত পরিবারের বসবাস। দাদার জমিজমার বাহুল্যতা ছিল বলে বাড়ির ভিটায় অনেক জায়গা ছিল। আর তাইতো যৌথ পরিবার ভেঙে সাত পরিবার হলেও একই ভিটায় আলাদা বাড়ি করে থাকতে একটুও সমস্যা ছিল না। আমার বাবা-ভাইদের মধ্যে সেজো ছিলেন। মানে বড় কাকার পরে মেজো কাকা এবং তার পরজনই হলেন আমার বাবা। বাড়ির ভেতর একটা শোরগোল বিরাজমান থাকত সব সময়। তবে বিরক্তিকর শোরগোল নয়। সে শোরগোলটা ছিল অদ্ভুত মজার শোরগোল। বাড়ির ছোট বলতে ছিল অনেকেই। সমবয়সীর ভেতরে ছিলাম রিপা, রেকসনা আর আমি। আর আমার থেকে অনেক ছোট হলেও দয়াল খাজাও থাকত আমার সাথে। ভালো নাম রুবেল হলেও বাড়ির সবাই ওকে দয়াল খাজা, কখনোবা গজা বলত।

রিপা ছিল আমার থেকে এক বছরের বড়। ও ছিল আমার নোয়া কাকার মেয়ে। বয়সে আমার বাবার ছোট হলেও বিয়ে করেছিল আমার বাবার খানেকটা আগে। যার জন্য এই সমীকরণ। আর রেকসনা ছিল বড় কাকার মেয়ে। রেকসনাও আমার থেকে মাস তিনেকের বড় ছিল। সবার বাড়ির একদম উত্তরে ছিল বড় চাচা অর্থাৎ রেকসনাদের বাড়ি। বড় চাচা বিদেশে থাকেন। রেকসনা ছোট বেলায় এতটাই কালো ছিল যে, বড় চাচী নিজের মেয়ে নিজেই জিয়েল মাছ বলে ডাকতেন। বড় চাচী সাইজে খাটো হলেও বর্ণে ছিল এক সাদা ধবধবে। আর রিপা ছোটবেলা থেকেই একদম নরম স্বভাবের মানুষ। ওর চিন্তাধারাগুলোও ছিল একদম সহজ সরল। আমাদের বাড়ির উত্তরে এবং রেকসনাদের বাড়ির দক্ষিণে ছিল রিপাদের বাড়ি। অর্থাৎ নোয়া চাচার বাড়ি। বাড়িগুলো একদম লাগালাগি। অনেক বড় হয়ে বুঝেছি যে কোনটা রিপাদের বাড়ি আর কোনটা আমাদের বাড়ি। কেননা সেই ছোটবেলা থেকেই দেখেছি নোয়া চাচী আর আমার মায়ের ছিল এক অন্তরের অন্তর সম্পর্ক।

ছোট বেলায় নোয়া চাচীদের বারান্দায় আমাকে আর রিপাকে পাটিতে বসিয়ে অ, আ, ক, খ শিখাতেন। নোয়া চাচী মজার মজার সব গল্প জানতেন। বিভিন্ন ছলেবলে আমাকে আর রিপাকে শিখাতেন। স্পষ্ট মনে আছে, নোয়া চাচী চক আর স্লেটে হাত ধরে লেখা শিখাতেন। আর মজা করে বলতেন, গোল গোল বকের ছাও, ডানে টান দিলে অনেস্বর ‘ং’। বামে টান দিলে হতন্ত ‘ত’। বড় চাচী একটু একসেরে স্বভাবের হওয়ায় রেকসনাদের বাড়ি কেউই যেতে চেত না। ওদের বাড়িটাই কেমন যেন ভুতুড়ে বাড়ি মনে হতো। কেমন যেন উল্টো উল্টো লাগত। কেননা একটুও মনে পড়ে না যে কোন দিন আমরা ওদের বাড়ি বা ওদের বারান্দায় গিয়ে বসে খেলা করেছি। ছোট বেলায় কত না রঙ বেরঙের খেলা খেলতাম আমরা। কখনো পুতুলের বিয়ে, কখনো নিজেরাই বর-বউ। কখনো দোকানদার আর খরিদ্দার, কখনো বিভিন্ন জাতের গাড়িওয়ালা আর যাত্রী, ভাড়া নেয়া-নিয়ি। টাকার হিসাবে কখনো আতা গাছের পাতা। আবার কখনো বা শুকনো কাঁঠালের পাতা।

কখনো কখনো ধনুক বানিয়ে সবাই লাইনে দাঁড়িয়ে পাটকাঠি ছুড়তাম নদীর ভেতর। আর পাল্লা দিতাম কার পাটকাঠি কত দূরে যায়। রেকসনা মেয়ে হলেও ছেলেদের মতো প্রায় অনেক স্বভাবই ওর ভেতর বিদ্যমান ছিল। ও আমাদের সাথে ঠিক ছেলে মানুষের মতো ক্রিকেট খেলত। ফুটবল খেলত। কিন্তু রিপার দ্বারা এগুলোর কোনটিই সম্ভব ছিল না কখনো। কেননা রিপা এগুলো বুঝতই না ভালো করে।
আমরা ডাক্তার-রোগী খেলতাম। আমি ডাক্তার সাজতাম আর ওরা রোগী হয়ে নানা রকম রং ঢং করতে করতে আমার চেম্বারে হাজির হতো। আমি কচুপাতায় পাটকাঠির কলম দিয়ে ওষুধ লিখে দিতাম আর সেগুলো ওরা কিনতে ওষুধের দোকানে যেত এবং সেই ওষুধের দোকানদারও আমি সাজতাম। এভাবেই রোগী দেখা ও কেনাবেচা চলত।

কখনো আবার ভাই সেজে বোনের বাড়ি বেড়াতে যেতাম মিষ্টি নিয়ে। মিষ্টি বানানোর জন্য এ বাড়ি ও বাড়ির আনাচে কানাচে গিয়ে খোঁজ করতাম মিষ্টির প্যাকেট। কারো বাড়ি সত্যিকার অর্থে কোনো কুটুম আসছে, আমরা গিয়ে খোঁজ করতাম যে মিষ্টি এনেছে নাকি। কিংবা কোনো বিস্কুট এনেছে নাকি। প্যাকেট খুবই দরকার। কখনোবা এটা আমি নেবো, ও নেবে, ও নেবে!! এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বেধে যেত। রাগ করে বলত আর খেলব না। কিন্তু সেই রাগটা ছিল একদম ভাতের মাড়ের মতো। মুহূর্তের মধ্যে আবার একত্র হতাম। মিষ্টির প্যাকেটের ভেতর নারকেলের গুটি, ইটের খোয়া, মাটি ভর্তি করে মিষ্টি বানিয়ে বেড়াতে যেতাম বোনের বাড়ি। কখনো আবার শীতের ভিজোই পিঠাতে খাওয়াতে যেতাম বোনের বাড়ি। আর রিপা, রেকসনা বিভিন্ন রকমের খাদ্য আইটেম রান্না করত। পাটকাঠি ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো করে লুডুস রান্না করত। ইটের সুরকি দিয়ে সেমাই রান্না করত। আর বিভিন্ন আকার আকৃতির পাতা দিয়ে বিভিন্ন আইটেমের পিঠা বানাত।

মূলত সেই সময়টা ছিল অনুকরণের সময়। আমরা যেটা দেখতাম বাস্তবে সেটাই নিজেদের ভেতর জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করতাম। কত না মজার ছিল সেই সময়টা। কত না মধুর ছিল সেই প্রতিটা ক্ষণ। আহারে মধুময় স্তৃতিবিজড়িত সোনালি শৈশব। হায়রে সোনাফলা দিনগুলো। বড্ড মনে পড়ে তোমাদের। বড্ড মন পোড়ে সেই সময়টার জন্য।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫