ঢাকা, শুক্রবার,২০ অক্টোবর ২০১৭

যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা

উ.কোরিয়াকে অবশ্যই ‘উস্কানিমূলক’ আচরণ বন্ধ করতে হবে : যুক্তরাষ্ট্র

নয়া দিগন্ত অনলাইন

১২ আগস্ট ২০১৭,শনিবার, ১৫:১৪


প্রিন্ট
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, উত্তর কোরিয়াকে ‘অবশ্যই তাদের উস্কানিমূলক আচরণ বন্ধ করতে হবে।

পিয়ংইয়ংয়ের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি জোরদার এবং টেলিফোনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে তার কথা বলার পর শনিবার সকালে যুক্তরাষ্ট্র এ দাবি জানায়।

এদিকে হোয়াইট হাউস বলছে, গুয়ামে উত্তর কোরিয়ার ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকির পর মার্কিন সামরিক বাহিনী এ দ্বীপের নিরাপত্তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।

হোয়াইট হাউস আরো জানায়, ট্রাম্প গুয়ামের গভর্নর ইদি কালভোকে টেলিফোন করে ‘আশ্বস্ত’ করেছেন যে মার্কিন সামরিক বাহিনী আমেরিকার বাকি অংশের পাশাপাশি গুয়ামের জনগণের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করবে।

হোয়াইট হাউসের এক বিবৃতিতে বলা হয়, টেলিফোনে পৃথক আলাপে ট্রাম্প ও শি জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে উত্তর কোরিয়া বিষয়ক প্রস্তাব পাশ হওয়ায় এর প্রশংসা করেন। তারা উভয়ে কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি ও স্থিতিশীলতা অর্জনে এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেন।

এতে আরো বলা হয়, কোরীয় উপদ্বীপকে পরমাণু অস্ত্র মুক্ত করতে এ দুই প্রেসিডেন্ট তাদের পারস্পরিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তারা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন যা উত্তর কোরিয় সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও প্রেসিডেন্ট শি এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন যে উত্তর কোরিয়াকে অবশ্যই তাদের উস্কানিমূলক আচরণ বন্ধ করতে হবে।’

এতে আরো বলা হয়, ট্রাম্প এ বছরের শেষের দিকে চীনে শি’র সাথে ‘খুবই ঐতিহাসিক’ বৈঠকের অপেক্ষায় রয়েছেন।

উত্তেজনা উসেক দিলো উ.কোরিয়া

উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় টিভিতে বাচ্চাদের একটি কার্টুন ছবি প্রচার করা হয়েছে। গল্পটি জঙ্গলের বন্ধুদের নিয়ে সাজানো। আর এর মধ্যে দিয়ে কার্যত আমেরিকা বিরোধী একটা বার্তা দেয়া হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় টিভির তৈরি "হেজহগের কাছে বাঘ পরাজিত" নামের এই কার্টুন ছবি দেখে বাইরের দর্শকদের মনে হবে এটা ছোট্ট এক হেজহগের প্রাণ-কাড়া এক গল্প। যেখানে হেজহগ তার গায়ের কাঁটা ফুলিয়ে আর সূক্ষ্মবুদ্ধি কাজে লাগিয়ে হম্বি-তম্বি করা বাঘের আস্ফালন বন্ধ করে দিয়েছে।

হেজহগের গায়ে থাকে সজারুর মত কাঁটা। ছোট্ট এই প্রাণীটি গায়ের কাঁটা গুটিয়ে নিজেকে ছোট্ট একটা তুলোর বলে পরিণত করতে পারে- কিন্তু প্রয়োজনে সেই গায়ের কাঁটা ফুলিয়ে আত্মরক্ষায় তা ব্যবহার করতে পিছপা হয়না এই হেজহগ।

পর্যবেক্ষকরা বলেন, উত্তর কোরিয়ার গণমাধ্যম খুব সহজবোধ্য নয়- এতে হঠাৎ করে কোনো কিছু প্রচারিত হয় না। সব কিছুর পেছনেই কার্যকারণ বা উদ্দেশ্য থাকে। বাচ্চাদের এ অনুষ্ঠানটি তৈরি করা হয়েছিল রাষ্ট্রীয় টিভিতে শিশুদের এক ঘণ্টার অনুষ্ঠানের অংশ হিসাবে এবং এই কার্টুন ছবিকে দেখা হচ্ছে পিয়ংইয়ং ও ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রতিফলন হিসাবে।

এই কার্টুনের গল্প প্রাচীন এক লোক-কাহিনির ভিত্তিতে তৈরি করা। এই গল্পে জঙ্গলের ছোট ছোট প্রাণীদের নেতৃত্ব দেয় খরগোশ- তাদের হাতে লাল আর্মব্যান্ড বা লাল ফেট্টি বাঁধা। একদিন তাদের এসে শাসায় উদ্ধত বাঘ- হম্বিতম্বি করে বলে আমার বশ্যতা তোমাদের স্বীকার করতে হবে।

কিন্তু কূটবুদ্ধি হেজহগ বাঘকে জব্দ করে। কারণ নিজেকে রক্ষা করতে সে গুটিয়ে ছোট্ট তুলোর বলটি হয়ে যায় আর সুযোগ বুঝে গায়ের কাঁটা উচিয়ে বাঘের নাকে খোঁচা দেয়। উপায় না দেখে বাঘ পালায়। অন্য ছোট জন্তুরা যারা প্রথমদিকে বাঘের আনুগত্য মেনে অনিচ্ছায় হলেও মেনে নিতে রাজি ছিল- তারা তখন বিজয়ী হেজহগের সাহস ও কূশলী বুদ্ধির তারিফ করে উৎসবে মেতে ওঠে।

কমলা রঙের বাঘটা কে?

হয়ত এই বাঘ নিয়ে সাধারণের মনে প্রশ্ন উঠত না, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এই কার্টুনের ভূয়সী প্রশংসা করে একটি নিবদ্ধ প্রকাশ করে বলে এটি সর্বকালের সেরা একটি কাহিনি। তারা লেখে এই কমলা রঙের বাঘটা আমেরিকার প্রতীক- অন্য ছোট জন্তুগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আর সাহসী অথচ বিপজ্জনক হেজহগটি হল উত্তর কোরিয়া।

রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কেসিএনএ- তে নিবন্ধটি লিখেছেন একটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের একজন কর্মী কিম জং-সন। "খেপিয়ে তোলা যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধ করা উচিত" এই শিরোনামে লেখা এই নিবন্ধে কিম বলছেন উত্তর কোরিয়ার ব্যাপারে আমেরিকার "অজ্ঞতা" দেখে আমার পুরনো প্রচলিত রূপকথার গল্প "হেজহগের কাছে বাঘ পরাজিত" মনে পড়ে গেল।

''হঠকারী ওই বাঘটা জঙ্গলের অন্য যেসব জন্তুদের ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছিল তাদের চরিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত সাহসী হেজহগটার চরিত্রের। এটা বর্তমানের বাস্তবতাকেই তুলে ধরেছে। কোনো দেশেরই আমেরিকাকে প্রশ্ন করার সাহস নেই,'' বলেন কিম।

''এদের পাশে আমার নিজের দেশকে দেখে গর্ব বোধ হচ্ছে।''

অতীতে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং আন রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত টেলিভিশনকে নির্দেশ দিয়েছিলেন বাচ্চাদের অনুষ্ঠানের মান বাড়াতে এবং এমন ধরনের অনুষ্ঠান করতে যা দেশের বাচ্চাদের জন্য প্রাসঙ্গিক হয়। তার এই নির্দেশের ফসল মনে করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও উ.কোরিয়া মধ্যে যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়ছে
উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কথার লড়াই ক্রমশ বেড়ে চলছে। উত্তর কোরিয়া জানিয়েছে তারা প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ গুয়ামের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে চলতি মাসেই হামলা চালাতে প্রস্তুত।

গতমাসে উত্তর কোরিয়া পরপর দুটি আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার পরেই নতুন করে উত্তেজনা শুরু হয় দেশ দুটির মধ্যে। ইতোমধ্যেই উত্তর কোরিয়ার ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরো জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

তবে হুমকি-ধামকি যতই হোক, বিশ্লেষকরা মনে করছেন- পরমাণু শক্তিধর দুটি দেশের মধ্যে সরাসরি সঙ্ঘাতের সম্ভবনা কম। কেউ কেউ মনে করছেন, কিম জং উন তার পরমাণু অস্ত্রকে দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। এর মাধ্যমেই তিনি চাচ্ছেন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা।

বার্তা সংস্থা এপির পিয়ংইয়ং ব্যুরোর সাবেক প্রধান ও উইলসন সেন্টারের ফেলো জিন লি মনে করেন, শুধু উত্তর কোরিয়া কেন, এই অঞ্চলের কোনো দেশই আরেকটি যুদ্ধ চায় না। কিন্তু কিম জং উনের এই আগ্রাসী পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হলো পরমাণু শক্তিধর দেশ হিসেবে উত্তর কোরিয়ার স্বীকৃতি লাভ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নিজের জনগণকে রক্ষা করতে সক্ষম নাগরিকদের কাছ থেকে এমন আস্থা অর্জন।

তিনি বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে কিম যা চান, তা-ই করছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিম তার জনগণকে বিশ্বাস করাতে চাইছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ভূখণ্ডের অস্তিত্ব বিলীন করতে চায়। এই ভয় কোরীয়দের ঐক্যবদ্ধ করে এবং দেশের সম্পদ ব্যয় করে পারমাণবিক বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির পক্ষে সমর্থন গড়ে তোলেন’। তিনি মনে করেন যেকোনো ভুল হিসাব বা আকস্মিক কোনো ঘটনা এই অঞ্চলকে সামরিক সঙ্ঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারে।

ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্নের কোরিয়ান স্টাডিজ বিভাগের সিনিয়র লেকচারার জিয়ং সং মনে করেন, ওয়াশিংটনের সাথে পিয়ংইয়ংয়ের প্রকাশ্য কিংবা গোপন সংলাপের আগ পর্যন্ত দেশ দুটির কথার যুদ্ধ চলতেই থাকবে এবং কিমও তার অস্ত্র পরীক্ষা অব্যাহত রাখবেন।

জিয়ং বলেন, ‘কোরীয় সমস্যার কোনো সামরিক সমাধান নেই। উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। ক্রমাগত শক্তি প্রদর্শন মূলত তাদের সরকারে টিকে থাকার কৌশল। সে জন্য সব পথই খোলা রয়েছে, উত্তর কোরিয়া একাধিকবার সংলাপের প্রস্তাবও দিয়েছে। তারা চায় ১৯৫৩ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাতিল করে নতুন একটি শান্তি চুক্তি করতে’।

এই বিশ্লেষক মনে করেন দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রতায় ভাঙন ধরানোর একটি চেষ্টাও রয়েছে উত্তর কোরিয়ার। একই সাথে তারা দক্ষিণের নতুন প্রেসিডেন্ট মুন জা-ইনের আন্তঃকোরীয় সম্পর্ক উন্নয়ন প্রচেষ্টায়ও ভাঙন ধরাতে চায়। তিনি আরো বলেন, উত্তর কোরিয়া তাদের পারমাণবিক অস্ত্র প্রত্যাহার করেই আলোচনায় বসতে রাজি হতে পারে। কারণ বিশ্বে তাদের কোনো মিত্র নেই। মস্কো কিংবা বেইজিং নতুন করে কোনো যুদ্ধ চায় না। আবার ট্রাম্পও কিমকে শান্ত করতে সরাসরি সংলাপে বসতে রাজি হতে পারেন।

তবে এই দুই বিশ্লেষকের সাথে কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করেছেন সিউলের কুকমিন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ও এনকে নিউজের ডিরেক্টর আন্দ্রেই ল্যানকোভ। তিনি মনে করেন, উত্তর কোরীয় সংবাদমাধ্যমগুলো প্রতিনিয়ত যে প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে শিগগিরই তার শিকার হবেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এরপরই সম্ভবত তিনি কোরীয় উপদ্বীপে বিমানবাহী রণতরী পাঠাবেন।

সংলাপ সম্ভব কি না সে বিষয়ে ল্যানকোভ বলেন, ‘কোরিয়া হয়তো তাদের পূর্ণ পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের পরই কর্মসূচি বন্ধ করতে রাজি হবে, তার আগে নয়। যুদ্ধের সম্ভাবনা কম হলেও তারা কূটনৈতিক সমাধানেও আগ্রহী নয়। যুক্তরাষ্ট্রের মানচিত্র থেকে শিকাগোকে নিশ্চিহ্ন করার সক্ষমতা অর্জনের পর তারা আলোচনার পথ খুঁজতে চাইবে। আগামী কয়েক বছরে তারা হয়তো এই সক্ষমতাও অর্জন করবে।’

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫