ঢাকা, বুধবার,১৬ আগস্ট ২০১৭

অর্থনীতি

সীমান্তপথে পালে পালে আসছে ভারতীয় গরু

খুলে দেয়া হয়েছে ৩১ করিডোর; চরম হতাশায় লাখ লাখ খামারি

জিয়াউল হক মিজান

১১ আগস্ট ২০১৭,শুক্রবার, ১৪:৫২


প্রিন্ট
প্রতিকী ছবি

প্রতিকী ছবি

গরু আমদানির জন্য সমঝোতার ভিত্তিতে ভারতীয় সীমান্তের ৩১টি করিডোর খুলে দেয়া হয়েছে। গরু আনার ৯৬টি অবৈধ পথেও পাহারা শিথিল করা হয়েছে। ফলে প্রতিদিন পালে পালে ভারতীয় গরু বাংলাদেশে প্রবেশ করছে সীমান্তপথে। আর এতেই রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে তিন লাখ খামারির, যাদের অনেকেই নিজে না খেয়ে গরুকে খাওয়াচ্ছেন আসন্ন কোরবানির ঈদ উপলক্ষে কিছুটা লাভের আশায়। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, ঈদের আগে পর্যন্ত সীমান্ত এভাবে খোলা থাকলে দেশের ৭০ হাজার খামারি এবং আরো প্রায় সাড়ে তিন লাখ গরুচাষিকে পথে বসতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতীয় সীমান্তে অহরহ বাংলাদেশী হত্যাকাণ্ডের প্রধান কারণ হিসেবে গরুর চোরাচালানকেই দায়ী করা হচ্ছে। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সও (বিএসএফ) এ বিষয়ে একমত। ফলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যতবারই সীমান্ত হত্যা বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে বিএসএফ ততবারই বলেছে গরুবাণিজ্য উদারীকরণ করে দেয়ার কথা। এমতাবস্থায় অনেকটা বাধ্য হয়েই গরুর বিষয়ে নমনীয়তা প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ।

প্রাণয় এড়াতে সীমান্ত উন্মুক্ত করে দেয়ার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল হোসেন গত ২ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ওখানে (ভারত) একটা সমস্যা আছে। গরু জবাই দিতে পারে না, ঘাসের সমস্যা। ওরা বেশি পাগল থাকে আমাদের দেশে গরু পাঠানোর জন্য। আমাদের প থেকে বলা হয়েছে, গরু আসুক, গরু আসা কোনো সমস্যা না। করিডোরে যেন কোনো রাখাল মারা না যায়। আমরা বলেছি দুই দেশের রাখাল করিডোর দিয়ে জিরো লাইন পর্যন্ত যাক। ওরা (ভারতীয়রা) জিরো লাইনে গরু দিয়ে যাক, আর এরা জিরো লাইন থেকে গরু নিয়ে আসুক। সীমান্তে কড়াকড়ির ফলাফল সম্পর্কে বিজিবি প্রধানের আশঙ্কা, ‘সীমান্ত হত্যা কমেছে। তবে এটা সাস্টেইনেবল না। যেকোনো সময় বাড়তে পারে, আবার আরো কমতেও পারে। আমরা চাই না সীমান্তে একজন মানুষও খুন হোক।’

বাংলাদেশে গরু পাঠানোর ক্ষেত্রে ভারতের বিভিন্ন উগ্রবাদী সংগঠনের তীব্র প্রতিরোধের মধ্যেও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বৈধভাবে গরু এসেছে তিন লাখ ৭৪ হাজার ৯৭৫টি। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে ৭৭ হাজার ৪৪১টি, ফেব্রুয়ারি মাসে ৫৯ হাজার ২৭৫টি, মার্চ মাসে ৫০ হাজার ৭০০টি, এপ্রিল মাসে ২৯ হাজার ৩৫৬টি, মে মাসে ৫১ হাজার ২২৬টি এবং জুন মাসে ৯৬ হাজার ৯৭৭টি গরু এসেছে। এ তথ্য বিজিবির। বেসরকারি হিসেবে অবৈধ পথে গরু এসেছে বৈধ পথের অন্তত ১০ গুণ।

সূত্র মতে, কেবল জুলাই মাসেই গরু এসেছে বছরের প্রথম ছয় মাসের সমান। আর কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে চলতি আগস্ট মাসে ভারত থেকে বৈধ ও অবৈধ পথে অন্তত ৪০ লাখ গরু আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিজিবির শিথিলতায় রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, সাতক্ষীরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, শেরপুর প্রভৃতি সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার গরু প্রবেশ করছে বলে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন সূত্রের মাধ্যমে জানা যায়। এসব গরুর জন্য সামান্য শুল্ক ধরা হলেও বড় অংশই আসছে চোরাই পথে। সূত্র মতে, শেরপুরের শ্রীবরদী সীমান্তের দুর্গম এলাকা বালিঝুড়ি, নালিতাবাড়ির পশ্চিম সমেশ্চুড়া গ্রামসহ বেশ কিছু জিরো পয়েন্ট দিয়ে প্রতিনিয়তই ভারতীয় গরু ঢুকছে।

সূত্র মতে, গরু আনার ক্ষেত্রে পাচারকারীরা প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন কৌশল গ্রহণ করছে। ভারতের আসাম রাজ্য থেকে গরু পাচার করা হচ্ছে ব্রহ্মপুত্র নদের পানিতে সাঁতার কাটিয়ে। এর আগে সুড়ঙ্গ দিয়ে গরু পাচার, বাঁশে বেঁধে তারকাঁটার বেড়া টপকে গরু পাচারসহ ও আরো কয়েকটি উপায়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে গরু পাচারে ছবি সংবাদমাধ্যমে প্রচার হয়। আইনশৃঙ্খলাবাহিনী বলছে, দুর্গম এলাকায় হওয়ায় শতভাগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না।

বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীর সাথে কথা বলে জানা যায়, ভারত থেকে অবৈধ পথে এসব গরু আসায় স্বল্প পরিমাণ টাকা শুল্ক জমা করলেও সব দিক ম্যানেজ করতে গরুপ্রতি প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা ব্যয় হয়ে যায়। গরুপ্রতি আরো প্রায় তিন হাজার টাকা দিতে হয়।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট এলাকার ইউপি চেয়ারম্যানের জন্য গরুপ্রতি রাখতে হয় ৪০০ টাকা, বিজিবির জন্য ২০০, যারা গরুগুলো সীমান্ত থেকে খোয়াড় পর্যন্ত আনে তাদের ১০০, যার জায়গা ব্যবহার করে হাট বসানো হয়েছে তাকে ১৫০, খোয়াড় পরিষ্কার পরিছন্নকারীকে ৫০, যে ব্যক্তি করিডোর করার জন্য যায় তাকে ১০০। বাকি দুই হাজার টাকা দেয়া হয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে।

এদিকে দেশে যে পরিমাণ গরু-মহিষ, ছাগল-ভেড়া রয়েছে তাতে কোরবানির চাহিদা পুরোপুরি মেটানো সম্ভব জানিয়ে ভারত থেকে চোরাই কিংবা বৈধ পথে গরু আনা বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশন। ২৯ জুলাই জাতীয় প্রেস কাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলন করে এ দাবি জানায় সংগঠনটি।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ২০১৬ সালে পশু কোরবানি হয় এক কোটি চার লাখ দুই হাজার। এর মধ্যে গরু-মহিষ ছিল ৪৮ লাখ ২০ হাজার এবং ছাগল-ভেড়া ছিল ৫৫ লাখ ৮২ হাজার।

বর্তমানে এক কোটি ১৫ লাখ ৫৫ হাজার কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে জানিয়ে বলা হয়, এর মধ্যে গরু-মহিষ আছে ৪০ লাখ। আর ছাগল-ভেড়া আছে ৭৫ লাখ ৫৫ হাজার। যা দেশের মোট চাহিদা সম্পূর্ণভাবে পূরণ করতে সম। এ অবস্থায় যদি পশু আমদানি ও চোরাইপথে আসা বন্ধ না করা যায়, তাহলে দেশীয় গরু লালন-পালনকারীরা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। যা ভবিষ্যতে দেশের গোশত শিল্পের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করবে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫