ঢাকা, সোমবার,২৩ অক্টোবর ২০১৭

আলোচনা

শামসুর রাহমানের ছড়া : লৌকিক ও প্রতিবাদী চেতনা

ড. আশরাফ পিন্টু

১০ আগস্ট ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৭:১১


প্রিন্ট
শামসুর রাহমান

শামসুর রাহমান

আধুনিক বাংলা কবিতায় শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬) এক উজ্জ্বলতর জ্যোতিষ্ক। বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য বড় কবির মতো তিনিও ছোটদের জন্য অনেক ছড়া লিখেছেন। ‘এলাটিং বেলাটিং’, ‘ধান ভানলে কুঁড়ো দেব’, ‘গোলাপ ফোটে খুকির হাতে’, ‘লাল ফুলকির ছড়া’, ‘রংধনুর সাঁকো’, ‘নয়নার জন্য’, ‘হীরার পাখির গান’ ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য ছড়াগ্রন্ত’। প্রতিটি গ্রন্থের অধিকাংশ ছড়ার মধ্যেই ফুটে উঠেছে শিশুর প্রতি কবির অকৃত্রিম ভালোবাসা ও দরদ। তাঁর ছড়ায় আছে ছোটদের মনভোলানোর রূপকথার কাহিনী, আছে স্বপ্নরাজ্যের হাতছানি। সেইসাথে আছে লৌকিক ছড়ার রূপ-রস ও সমাজমনস্কতা।

শামসুর রাহমানের সাতটি ছড়াগ্রন্থের মধ্যে প্রথম দু’টি (‘এলাটিং বেলাটিং’ ও ‘ধান ভানলে কুঁঁড়ো দেব’) ছড়াগ্রন্থের নামকরণ করেছেন লৌকিক জীবনযাত্রা থেকে। প্রথম ছড়ার বই ‘এলাটিং বেলাটিং’ দিয়েই শুরু করা যাক। এটি আসলে একটি লৌকিক খেলার নাম। কবি ছড়ার শুরুতে যে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তার মধ্যেও লৌকিক রূপ-রস-গন্ধ লক্ষণীয়Ñ

যারা বেড়ায় উড়ে পক্ষিরাজের পিঠে,
যারা জিরোয় বসে স্বপ্নবাড়ির ভিটে,
যারা ভেলকি বোঝে হঠাৎ মিলের ফাঁদের,
ফাঁদের ফাঁদের ফাঁদের।
(ছড়ার এ-বই : এলাটিং বেলাটিং)

শুধু তাই নয়, ‘এলাটিং বেলাটিং’-এর প্রায় প্রতিটি ছড়ায় তিনি সচেতনভাবে লৌকিক জীবনের উপকরণ ব্যবহার করেছেন। যেমন-
নীলের ঘোড়া নীলের ঘোড়া পক্ষিরাজের ছা,
মেঘডুমাডুম আকাশপারে তা থৈ তা থৈ তা।
মেঘের দোলায় চললি কোথায়, কোন সে অচিন গাঁ
আয়-না নেমে গলির মোড়ে করবে না কেউ রা।
(আমায় নিয়ে যা : এলাটিং বেলাটিং)

লৌকিক বা আদি ছড়ার অকৃত্রিম রসকে সম্বল করে তিনি এগিয়ে নিয়েছেন তাঁর ছড়াগুলোকে। এ গ্রন্থের আরেকটি ছড়া যা লৌকিক ঢঙে লেখা-
আঁটুল বাঁটুল শামলা সাঁটুল শামলা গেছে হাটে
কুঁচবরণ কন্যে যিনি, তিনি ঘুমান খাটে।
খাট নিয়েছে বোয়াল মাছে, কন্যে বসে কাঁদে,
ঘটি-বাটি সব নিয়েছে কিসে তবে রাঁধে?
আর কেঁদো না আর কেঁদো না ছোলাভাজা খেয়ো,
মাটির উপর মাদুর পেতে ঘুমের বাড়ি যেয়ো।
(আঁটুল বাঁটুল ছড়া)

এ ছাড়া ‘জল-টুপটুপ’, ‘খোকন গেছে ক্ষীরসাগরে’, ‘জটিবুড়ির ছড়া’, ‘চরকাবুড়ি’, ‘খুকুমণির বিয়ে’- এই ছড়াগুলোর নাম থেকেই বোঝা যায় যে, আমাদের রূপকথার চরিত্র ও কাহিনী নিয়েই তিনি লৌকিক ঢঙে লিখেছেন এই ছড়াগুলো।

শামসুর রাহমানের দ্বিতীয় ছড়ার বইটির নামও ভীষণ সুন্দর- ‘ধান ভানলে কুঁড়ো দেব’ যা লৌকিক জীবন থেকেই নেয়া হয়েছে। এ বইয়ের ‘খেলা’ নামের ছড়াটিতে পুরোপুরি লোকছড়ার চিত্র ফুটে উঠেছে-
হাতি নাচছে ঘোড়া নাচছে/কদম তলায় কে?
সিংহ বলে আমায় তোরা/খ্যাংরা কাঠি দে।

এ বইয়ের ‘পণ্ডশ্রম’ ছড়া-কবিতাটি একটি লোকগল্প নিয়ে লেখা। ছড়াটির দ্বিতীয় লাইন ‘কান নিয়েছে চিলে’ একটি প্রবাদবাক্যও বটে। চিলে কান নিয়েছে শুনে সবাই চিলের পিছে ছুটছে, অথচ কেউ খেয়ালও করছে না, কান আদৌ চুরি হয়েছে কিনা! এমন একটি মজার লোকগল্প নিয়ে কবি শামসুর রাহমান লিখেছেন অসাধারণ এই ছড়াটি। এর শুরুটাই কিন্তু ভীষণ নাটকীয়-
এই নিয়েছে ওই নিল যা/কান নিয়েছে চিলে।
চিলের পিছে ঘুরছি মরে/আমরা সবাই মিলে।

এরপর সবাই মিলে কানের খোঁজে চিলের পিছে ছুটে মরছি; ছুটছি মাঠে, বিলে সাঁতার কাটছি, কানের শোকে মিটিং করছি, কিন্তু ‘কান মেলে না তবু’, সবাইকে অমন করে ছুটতে দেখে শেষে ছোট্ট একটি ছেলে এসে বলে-
নেইকো খালে নেইকো বিলে/নেইকো মাঠে গাছে
কান যেখানে ছিল আগে/কান সেখানেই আছে।

এই যে কবি লোকছড়ার নানা উপাদান তো বটেই, লোকছড়ার আঙ্গিকেই ছড়া রচনা করেছেন আগের দুটো বইতেই, সেটা কিন্তু বজায় থেকেছে পরেও। তৃতীয় ছড়ার বই ‘গোলাপ ফোটে খুকীর হাতে’ও কবি লোকছড়ার আঙ্গিক ব্যবহার করেছেন। বইটির এমন ছড়াগুলো হলো- ‘আয় ঘুমানি’, ‘বাদুড় বাদুড়’, ‘ঘোড়ার গাড়ি, ‘উকুনে বুড়ি’, ‘কলের বাঁশি’, ‘ইলিবিলি’ ইত্যাদি। পরের বইগুলোতেও ‘রংধনুর সাঁকো’ এবং ‘লাল ফুলকির ছড়া’ গ্রন্থেও কবি একই কাজ করেছেন।

এ ধরনের বহু ছড়া আছে শামসুর রাহমানের। লৌকিক বা আদি ছড়ার রূপ, বৈশিষ্ট্য, চিত্রকল্প- সবই অক্ষুণ্ণ রয়েছে তাঁর এ ছড়াগুলোতে। শিশুকে স্বপ্নরাজ্যে পৌঁছানোর জন্য তাঁর সে নিরন্তর চেষ্টা তা প্রতিফলিত হয়েছে এসব ছড়ায়। তবে শুধু লোকছড়ায় আটপৌরে ধারাকে আঁকড়ে ধরে তিনি ছড়া রচনা করতে চাননি। মূলত কবি বলেই তিনি ছড়ার ভেতরে আনতে পেরেছেন কাব্যিক লাবণ্য।

ছড়ার প্রাচীন ঐতিহ্য (লোক-বৈশিষ্ট্য) ও আধুনিকতার সমন্বয় ঘটাতে চেষ্টা করেছেন বহু ছড়ায়। যেমন ‘মামার বাড়ি’ ছড়াটি-
যাস নে খোকন যাস নে/ মামার বাড়ি যাস নে
চাস নে রে তুই চাস নে/ কৈ-চিঁড়ে দৈ চাস নে।
দৈ পাবে কই? দুধ নেই।
কৈ পাবে কই? ধান নেই।
কাক করে কা কা
মামার বাড়ি খাঁ খাঁ।

‘সাইক্লোন’ ছড়াটিতে আছে সাইক্লোন বা ঘূর্ণিঝড় হলে তখন কী অবস্থা হয় তারই প্রত্যক্ষ বিবরণ। ঘূর্ণিঝড়ের তোড়ে ঘরের চাল ওড়ে, গাছের ডাল ওড়ে, ডালার খই ওড়ে, তাকের বই-পঞ্জিকা-বিশ্বেকোষÑ সব ওড়ে। এখানে শুধু ঝড়ের বিবরণই দেননি কবি, ঝড় শেষে মানুষ যে কী অসহায় হয়ে পড়ে, সেটিও বুঝিয়ে দিয়েছেন একেবারেই সাদামাটা ভাষায়; কিন্তু উপসংহারে সেই সাদামাটার ভাষার মধ্যে আছে আধুনিক বা প্রতিবাদী চেতনা; সেইসাথে আছে লোকচেতনার সম্মিলন-
রোদ হচ্ছে বৃষ্টি হচ্ছে ? খেঁকশেয়ালের বে’
সর্বনাশা ঝড়ের পরে/কোমর বাঁধে কে?
(সাইক্লোন : ধান ভানলে কুঁড়ো দেব)

‘ধান ভানলে কুড়ো দেবো’ ছড়াগ্রন্থে’র সর্বশেষ ছড়া ‘আতা গাছে, ডালিম গাছে’-ও পাওয়া যায় লৌকিক ছড়ার রূপ-রসের মধ্যে প্রতিবাদী চেতনা। এই ছড়ার প্রতীকী ভাষার মধ্যে যেন আমাদের ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের কথা মনে করিয়ে দেয়। যে উর্দু ভাষা আমাদের পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল তেমনি যেন ইঙ্গিত দিচ্ছে নিচের পঙ্ক্তিগুলো-
আতা গাছে চারটি পাখি, ডালিম গাছে তিনÑ
সাতটি পাখি মনের সুখে নাচে তা ধিন ধিন।...
হুকুম এলো একই সুরে গাইতে হবে গান,
নইলে যেন সাতটি পাখির যাবে যে গর্দান।

‘লাল ফুলকি’ ছড়াগ্রন্থের ‘রূপকথা’টিতেও লৌকিক ছড়ার খোলসে আধুনিক প্রতিবাদী চেতনা লক্ষ করা যায়। মূলত এটি একটি রূপক ছড়া। তাঁর এই ছড়ার যে ‘ধন্য রাজা’ তা আসলে তৎকালীন স্বৈরশাসককে বুঝিয়েছিলেন। তখন ছড়াটি রীতিমতো মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল। ছড়াটি এমন-
আজব দেশের ধন্য রাজা/দেশজোড়া তাঁর নাম
বসলে বলেন, হাঁট রে তোরা,/ চললে বলেন, থাম।

এ ছাড়া ‘ছেলে ঘুমালো পাড়া জুড়ালো’ ছড়াটিকে তিনি নতুনভাবে প্রতিবাদী চেতনা নিয়ে লিখলেন-
ছেলে ঘুমায় না, পাড়ায় জুড়ায় না/বর্গিরা এলো দেশে।
বর্গি তাড়াবে তাই তো খোকন/ সাজল বীরের বেশে।...
(বর্গি তাড়ানো গান : লাল ফুলকির ছড়া)

তবে লৌকিক ঢঙের অনেক ছড়ায় তিনি সরাসরি সমসাময়িক চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর বহু ছড়াতেই আছে সমাজমনস্ক বক্তব্য, আছে প্রতিবাদী চেতনার রূপ। তিনি নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করেছেন সমাজের সমসাময়িক চিত্র। যেমন- যখন তেলের দাম খুব বেড়ে গিয়েছিল; রান্না করার তেলেরও, গাড়ি চালানোর তেলেরও। সে কথাও আছে ‘লাল ফুলকির ছড়া’-এর নিচের ছড়াটিতে-
সর্ষে তেলের ঘ্রাণ পাওয়া ভার/নেইকো ঘরে জ্বালানি / পণ্যগুলো হচ্ছে লোপাট/ধন্য চোরাচালানি।

‘ধান ভানলে কুঁড়ো দেব’ ছড়াগ্রন্থের ‘বক্তা’ শীর্ষক ছড়াতে ফুটে উঠেছে এক রাজনৈতিক নেতার চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য-
একজন লোক আছে চৌকশ বলিয়ে
তিলকে সে তাল করে বিদ্যেটা ফলিয়ে
কী যে বলে রাত দিন দেখে না তো তলিয়ে।

আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে আমরা স্বাধীন দেশ পেয়েছি। পেয়েছি আমাদের গর্বিত বাঙালি জাতির লাল-সবুজ পতাকা। সেই স্বাধীনতা অর্জনে বীর বাঙালি মুক্তিসেনার দল যে আত্মত্যাগের মহিমার মধ্য দিয়ে শত্রু সেনাকে কাবু করে বিজয় ফিরিয়ে এনেছে। সেই বিজয়ের উল্লাস ও আনন্দকে ধারণ করে শামসুর রাহমান লিখেছেন- ‘টুকটুকে লাল স্বাধীনতা’ নামক অসাধারণ পঙ্ক্তিমালায় অনবদ্য ছড়া। যেমন-
শত্রু সেনা বাংলা জুড়ে
ক্ষণে ক্ষণে জুলুম করে,
শহর এবং গ্রাম পোড়ালো
লাশ সাজালো থরে থরে।
তাই-না দেখে বীর বাঙালি
বন-বাদড়ে, মাঠে লড়ে।
মুক্তিসেনার দীপ্ত চোখে
প্রতিশোধের আগুন ঝরে।...
টুকটুকে লাল স্বাধীনতা
এলো সবার সুখের ঘরে।

পরিশেষে বলা যায়, বিষয়-বক্তব্যে, বৈচিত্র্যে ও উপস্থাপনায় শামসুর রাহমানের ছড়াগুলো আমাদের শিশুসাহিত্যের উজ্জ্বল সম্পদ। তাঁর ছড়া যেমন শিশুদের ঘুম পাড়ায়, স্বপ্ন দেখায়; তেমনি ঘুম তাড়ায় এবং সামনে অগ্রসর হতে শেখায়।

তিনি আদি বা লৌকিক ছড়ার রূপ-রস-গন্ধ ব্যবহার করে ছড়াকে করে তুলেছেন সমাজবাস্তবতা ও প্রতিবাদী চেতনার আকর।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫