কবি সুফি মোতাহার হোসেন
কবি সুফি মোতাহার হোসেন

সুফি মোতাহারের চিন্তার জগত

ফারুক মোহাম্মদ ওমর

বাংলা সাহিত্যের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম কবি সুফি মোতাহার হোসেন। তিনি মূলত সনেট রচয়িতা হিসেবেই খ্যাত। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও মোহিতলাল মজুমদারের সাথে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতার ফলেই তিনি কাব্যচর্চায় অনুপ্রেরণা লাভ করেন। মূলত সনেটেই তার কবি প্রতিভার স্বতঃস্ফূর্ততা প্রকাশ পেয়েছে বলে সর্বজননন্দিত।

আবার হেরিনু আজি জাহাঙ্গীর নগর নামেতে
পূর্ব বাঙলার বুকে আজিও যে গৌরবে স্পর্ধায়
বাদশাহী স্মৃতি বহে সর্বশিক্ষা আদি সভ্যতায়।

যেন আমি মৃত সত্তা ভ্রমিতেছি প্রাচীন জগতে
রহে তো ধরার বুকে, মরে শুধু মানুষ মরতে
সেই পথ মাঠ ঘাট তেমনি সকলি সর্বকালে
যেথা নিত্য বিকাশিছে নবীন জীবন প্রতি ঘরে।
নির্বাচিত সনেট-১৪ ঢাকা

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার সম্পাদিত ‘বাংলাকাব্য পরিচয়’ নামক গ্রন্থে সুফি মোতাহার হোসেনের দিনান্তে সনেটটি সঙ্কলিত করেন।

সুফি মোতাহার হোসেনের রচনার মধ্যে ‘চতুর্দশপদী’ কবিতার সংখ্যাই বেশি। তার সনেটের প্রধান উপজীব্য ছিল প্রেম এবং প্রকৃতি। তবে তার চতুর্দশপদী কবিতায় বিশ্বাসী আদর্শ ও মহান মানবিক মূল্যবোধ এঁকেছেন সাবলীল ভাষায়। তিনি সব কিছুকে দেখেছেন উদার মানবতাবাদী এবং সৌন্দর্যপিয়াসী কবির দৃষ্টিপাতে। সৌন্দর্যের হাতে সমর্পিত কবি তার কবিতায় রোমান্টিকতার আর্তির মধ্য দিয়ে প্রেম ও প্রকৃতিই বার বার উপজীব্য করেছেন।

বাংলার ঋতু-বৈচিত্র্যে নিসর্গ সৌন্দর্য ও পুষ্পশোভা বিকশিত হয়েছে ‘সনেট’-এর মেলবন্ধনে। স্বদেশের প্রাকৃতিক রূপ-সুষমায় একনিষ্ঠ কবি শুধু এ দেশের সীমানায় আটকে থাকেনি, তার কবিমন পাখা মেলেছে উদারতার আলোকবর্ষে বিশ্ব পটভূমিকায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই সুফি মোতাহার হোসেন ছান্দসিক কবি আবদুল কাদির ও কথাসাহিত্যিক, কবি বুদ্ধদেব বসুর বন্ধুত্ব লাভ করেন এবং এ সময়েই তিনি মোহিতলাল মজুমদারের সান্নিধ্যে আসেন। মোহিতলাল বাবু তাকে বলেন, ‘সুফি, তুমি সনেট লেখার অভ্যাস করো। মুসলমানদের মধ্যে কোনো ভালো সনেটকার নাই। তুমি এ ক্ষেত্রে নাম করিতে পারিবে।’

এর পর থেকেই তিনি সনেট সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন। বিএ পাস করার পর ১৯৩২-৩৩ সালে সুফি মোতাহার হোসেন কিছুকাল ফরিদপুর জজকোর্টে অফিসসহকারী পদে চাকরি করেন। অতঃপর শিক্ষকতা করার বাসনায় চাকরি ছেড়ে দেন। শুরু করেন শিক্ষকতার জীবন।

মাদারীপুর ও ভাঙ্গা পাইলট হাইস্কুল, ময়েজ উদ্দীন হাই মাদরাসা ও পটুয়াখালী স্কুলে শিক্ষকতা করে ১৯৫০ সালে ঈশান ইনস্টিটিউশনের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬৬ সালের ৩ অক্টোবর কবি পক্ষাঘাত রোগে আক্রান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত এ স্কুলেই সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদে কর্মরত ছিলেন।

প্রকৃতির বর্ণনায় সুফি মোতাহার হোসেন নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়েছেন।
বসন্ত নিয়ে কবির চিন্তা ধরা দেয় এভাবে-
কানন সভাতে আজি কলস্বরে উঠিছে বাজিয়া
প্রভাত রাগিণী সাথে বসন্তের গীতময় ধ্বনি-।
তরুতে পল্লবে শাখে দক্ষিণের পবন নিস্বনি’
দিতেছে রসের দোল, রসাবেশে থাকিয়া থাকিয়া
দীর্ঘ-স্বরা বিহঙ্গরা বনে বনে ফিরিছে ডাকিয়া-।
সপ্তবর্ণ-দলে যেন ফুটিয়াছে হৃদয়-হরণী
বসন্তের শতদল আলোকিয়া আকাশ ধরণী,
করিছে আনন্দ রব্ চারিদিক্ তাহার ঘিরিয়া-।
বসন্তের হৃদয়ের ডাক ওই শুনিতে কি পাও
গরবী কোকিল কণ্ঠে, মর্মরিত পবন-স্বননে,
ব্যাকুল বিহঙ্গ স্বরে, ছন্দোময় সঙ্গীত উচ্ছ্বাসে
প্রহরে প্রহরে কাঁপা ফুলময় তরঙ্গে উধাও
দিবস নিশার তলে প্রকৃতির আনন্দ নর্তনে
থাকিয়া থাকিয়া জাগা দীপ্ত-রাগ অধীর-উল্লাসে
সনেট-বসন্ত

কবির রচিত ‘মানবধর্ম’, ‘মানবতা’, ‘বিশ্বমানবতা’, ‘সংহতি’, ‘বিশ্বসংহতি’, ‘বিশ্বমঙ্গল’, ‘স্বপ্নাগতা’, ‘সোনার বাংলা’ প্রভৃতি কালজয়ী কবিতা পাঠে কাব্যপিপাসু মানুষের হৃদয়ে এনে দেয় এক অপার প্রশান্তি। বিশ্বজনীন মানবতাবোধ ও মানব মৈত্রীই ছিল তার কাব্যসাধনার মূল উপজীব্য।

কবি সুফি মোতাহার হোসেনের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থের মধ্যে ‘সনেট সঙ্কলন’ ১৯৬৫, ‘সনেট সঞ্চয়ন’ ১৯৬৬ ও ‘সনেটমালা’ ১৯৭০ সালে প্রকাশ পায়। সাহিত্যক্ষেত্রে অবদানের জন্য তিনি ১৯৬৫ সালে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৭০ সালে প্রেসিডেন্ট পুরস্কার এবং ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। তাকে ফরিদপুর শহর-উপকণ্ঠ ভবানন্দপুরের নিজ বাড়িতে সমাধিস্থ করা হয়।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.