ঢাকা, মঙ্গলবার,১৭ অক্টোবর ২০১৭

আলোচনা

এসএম সুলতান : তার শিল্পের জগৎ

রবিউল ইসলাম

১০ আগস্ট ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৬:৪৮


প্রিন্ট
আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী এসএম সুলতান

আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী এসএম সুলতান

আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী এসএম সুলতান। তিনি ১৯২৩ সালের ১০ আগস্ট নড়াইল জেলার নাসিমদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। এবার তার ৯৪তম জন্মবার্ষিকী। এক দরিদ্র রাজমিস্ত্রি পরিবারে তার জন্ম। আর বেঁচে থাকার সংগ্রামের জন্য কাছাকাছি হয়েছেন। শিশুকাল থেকে প্রকৃতি তাকে হাতছানি দিয়েছে। চার পাশের গরিব মানুষ আর কৃষকেরা ছিলেন তার আত্মার প্রতিবেশী।

তাদের জীবন সংগ্রাম তাকে ভাবিয়ে তুলেছিল। তার অন্তর্দৃষ্টি তাকে এক অভিনবরূপে মানুষ চিনতে শিখিয়েছে। তাই যখন তার তুলি তার মনের কথা প্রকাশ করেছে সেখানে কৃষকদের পেশিবহুল আলেখ্যই ফুটে উঠেছে। এ তার অন্তরের ছবি।

আহমদ ছফা সুলতানের চিত্রকর্ম সম্পর্কে এক দীর্ঘ বাক্য শুরু করেছেন এভাবে- শেখ মুহম্মদ সুলতানের আঁকা গুরুভার নিতম্ববিশিষ্ট এ সকল স্বাস্থ্যবর্ত কর্মিষ্ঠা লীলা চঞ্চলা যারা স্পর্ধিত অথচ নমনীয় সর্বক্ষণ সৃজনলীলায় মত্ত অহল্যা পৃথিবীর প্রাণ জাগানিয়া, এ সকল সুঠাম কান্ত কৃষাণে তার বাংলার প্রকৃতি আর এই অপরূপ মানুষগুলোর জনজীবনে নিয়ে ছবির ঘনিষ্ঠ বর্ণনা রয়েছে।

সুলতান স্কুলের চৌকাঠ না পেরিয়েই যখন কলকাতায় গেলেন তার ছবির হাত দেখে কলকাতা আর্ট স্কুলের গভর্নিং বডির সদস্য শাহেদ সোহরাওয়ার্দী তার ভর্তির জন্য সুপারিশ করেন। বিশ্বখ্যাত চিত্র সমালোচক শাহেদ সোহরাওয়ার্দী তার মধ্যে যে সম্ভাবনা দেখেছিলেন, তার জন্যই লাল মিয়ার একাডেমিক যোগ্যতা নিয়ে মাথা ঘামাননি। তার ডাক নাম লাল মিয়ার বদলে শাহেদ সোহরাওয়ার্দী নাম দিলেন শেখ মুহাম্মদ সুলতান সংক্ষেপে তিনি এসএম সুলতান নামে পরিচিত।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চার দেয়ালের বাইরে সমাজ ও প্রকৃতির পাঠশালায় তার শিক্ষা। তিন বছর পর শিক্ষা সমাপ্ত করে ভারত ভ্রমণে বের হন। কাশ্মিরে যান। সেখানকার উপজাতিদের মাঝে কিছুকাল বসবাস করেন। ফাঁকে ফাঁকে তার ছবি আঁকা চলেছে।

ঢাকায় শিল্পকলা একাডেমিতে তার প্রথম চিত্রপ্রদর্শনী। তার ছবি দেখে অনেকেই বিস্মিত হয়েছিলেন। একবারেই নতুন এ দেশের কোনো চিত্রশিল্পীর দৃষ্টিভগ্নি ও আঁকা রীতিনীতির সঙ্গে সুলতানের ছবির মিল নেই। নেই আমাদের চেনা জগতের মানুষগুলোর সঙ্গেও। এক অবিরাম বিস্ময়ের উৎসরণ তার ছবিগুলো।

এসএম সুলতান করাচি তথা তৎকালীন পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে চিত্রপ্রদর্শনী করেছেন। ঢাকায় এসেছিলেন। কিন্তু তার বাউফুল স্বভাব, খ্যাপাটের মতো আচরণ, সব মিলে একাডেমির পরিবেশ ক্ষুণ্ন হবে এই আশঙ্কায় আর বাধা পথে চলার মানসিকতার অধিকারী চিত্রশিল্পের গুরুরা যেমন তাকে জায়গা দিতে ঘোর আপত্তি করেছিলেন, ছাত্ররাও তাতে সায় দিলেছিল সেদিন।

সে কথা এখন আর কেউ বলে না, দেশ তাকে গ্রহণ না করলেও বিশ্ব শিল্পীদের সঙ্গে তার ছবির যৌথ প্রদর্শনী হয়। পিকাসো, সালভেদর দালি, পল ক্লী প্রমুখের সাথে তার এই যৌথ প্রদর্শনী। একমাত্র এশীয় প্রতিনিধি ছিলেন এসএম সুলতান। পঞ্চাশের দশকে তিনি দেশে ফিরলেন। গ্রামের বাড়িতে শিশুদের জন্য লেখাপড়া ছবি আঁকার স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। দেশে আর পাঁচজন চিত্রশিল্পীর সামনে পার্থক্য রয়েছে। অন্যদের ছবি আঁকার সাধনার পেছনে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার পরিচিত অর্জনের আশা আকাক্সক্ষা নিহিত থাকে। সুলতান জীবনকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

তিনি নিজ গ্রামে শিশুদের নিয়ে কাটিয়েছেন, তাদের শিক্ষিত করেছেন বাইরের জগতের উপযোগী করানোর জন্যই নয়, তাদের অন্তর জগতের উদ্ভাসনও তার লক্ষ্য। ঢাকার চিত্রশিল্পীরা যেমন আমিনুল ইসলাম, সৈয়দ জাহাঙ্গীর প্রমুখ তাকে বার বার চেয়েছেন নিজেদের মধ্যে কিন্তু যার কাছে বিশ্বনিখিল নিজস্ব জগত ঢাকার পরিসরে তাকে বাঁধা ছিল কঠিন।

তার যৌবনের দিনগুলো কেটেছে ভারত এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। শেষ পর্যায়ে স্থিতি হলো শিশুদের মাঝে নিজের গ্রাম জীবনের পরিবেশপ্রসূত জীবনে।

সুলতান ছিলেন চিরকুমার। সাধনাই ছিল তার সঙ্গী। শিল্পের সাধনাই নিবেদিতপ্রাণ। শিশুদের প্রতি তার অপরিসীম দরদ ও সহানুভূতি ছিল। জীবনে বহু ছবি এঁকেছেন। অনেক ছবি হারিয়েছে, নষ্ট হয়েছে অনেক, অনেকে ছবি নিয়ে গেছে, অনেকে দাম বলেও যায়নি।

তার ছবি আঁকার বিষয়, কর্ম কৌশল তার জীবন থেকে নেয়া। তার প্রতিটি ছবি প্রকৃতির কথা বলে, কথা বলে বাস্তবতার। তিনি পৃথিবীর সেরা আটজন চিত্রশিল্পীর মধ্যে অন্যতম। তিনি ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নেন। উপমহাদেশের চিত্র গগনে তিনি জ্যোতির্ময় নক্ষত্র।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫