ঢাকা, শনিবার,১৯ আগস্ট ২০১৭

নির্বাচন

সংলাপের দিকে তাকিয়ে ইসি

সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাস

শামছুল ইসলাম

০৫ আগস্ট ২০১৭,শনিবার, ১২:৪৭


প্রিন্ট
সীমানা বিন্যাসকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ-বিএনপি বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে

সীমানা বিন্যাসকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ-বিএনপি বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে

জাতীয় সংসদের নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বিষয়টি ইসির ঘোষিত রোডম্যাপেও গুরুত্ব পেয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি কমিশন। এ ক্ষেত্রে আসন পুনর্বিন্যাস না হলে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। উপেক্ষিত হবে সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সীমানা বিন্যাসসংক্রান্ত কমিটির আহবায়ক ও নির্বাচন কমিশনার মো: রফিকুল ইসলাম বলেন, সীমানা বিন্যাস আইনটি সংশোধন করতে গিয়ে আমরা দেখতে পেয়েছি এটি সহজ কোনো বিষয় নয়। অথচ এখন পর্যন্ত এই কাজে কোনো অগ্রগতি ঘটেনি। ২০১১ সালে সীমানা আইনের সংশোধনী সংক্রান্ত প্রণীত খসড়ার মধ্যে আমাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রয়েছে। বর্তমানে আমরা বিভিন্ন দেশের আইনে কী ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করে এই কাজটি করা হয় তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখছি। তিনি বলেন, সীমানা বিন্যাস আইনে সংশোধনী না আনা হলে পুরনো আইনের আলোকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সে ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার বিবেচনায় দু-একটি সীমানাতে পরিবর্তন আনা হতে পারে।

এ বিষয়ে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ১৯৮৪ সালে গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বাংলাদেশে ৩০০ আসন নির্ধারণ করা হয় এবং তার পরে ৮৬, ৯১, ৯৬, ৯৮, ২০০১ এ অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো এই আসনের ভিত্তিতে হয়েছে। কিন্তু ওয়ান-ইলেভেনের সরকার যখন আসে ২০০৮ এর নির্বাচনের আগে যে আসনগুলো ছিল, সেই আসনগুলোকে ভেঙে প্রায় ১৩৩টি আসন পুনর্বণ্টন করেছে ইসির নিজস্ব যে আইনকানুন আছে তার ব্যত্যয় ঘটিয়ে। অর্থাৎ ভৌগোলিক সীমারেখা, প্রশাসনিক সুবিধা এবং যোগাযোগব্যবস্থা এগুলো বিবেচনা না করে ১৩৩টি আসনে পুনর্বিন্যাসের নামে একটা জগাখিচুড়ি করা হয়েছে। সেই জন্য আমরা ২০০৮ এর পূর্ববর্তী যে আসনগুলো যেভাবে ছিল সেইভাবে পুনর্নির্ধারণ করার জন্য আমরা নির্বাচন কমিশনের কাছে দাবি জানিয়েছি। যেহেতু নির্বাচন কমিশনের হাতে নির্বাচনের আগে সীমানা পুনর্নির্ধারণের ক্ষমতা আছে তাই ১৩৩টি আসনে যে অসামঞ্জস্যতা আছে তা দূর করে আমরা ৩০০ আসন পুনর্বিন্যাস করার দাবি জানাই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদ্যমান সীমানা আইনে সংশোধনী আনা এবং তার আলোকে বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়ার পর ইসি দেখতে পায় কাজটি কঠিন। ফলে মাঝপথে এসে বোধোদয় হওয়ার কারণে সীমানা পুনর্বিন্যাস আইনের বদলে নির্বাচনী আইনে সংস্কারের দিকে বেশি মনোযোগী এখন কমিশন। গত ৩১ জুলাই সুশীলসমাজের সাথে অনুষ্ঠিত সংলাপে সংসদ ভেঙে নির্বাচন করা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সেনাবাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা, না ভোটের বিধান ফিরিয়ে আনা এবং সহায়ক সরকার নিয়ে তারা যতটা সোচ্চার ছিলেন, ঠিক উল্টো ছিলেন সীমানা বিন্যাস আইনে সংশোধনী আনার ক্ষেত্রে পরামর্শ দেয়ার ক্ষেত্রে।

সংলাপের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) খান মো: নুরুল হুদার বক্তব্যেও তা উঠে আসে। একজন সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, সীমানা বিন্যাস নিয়ে দু-একজনের বাইরে কেউ কোনো মতামত কিংবা পরামর্শ দেননি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সংসদীয় আসনের সীমানা বিন্যাস আইনে সংশোধনী এনে প্রচলিত জনসংখ্যা ও প্রশাসনিক অখণ্ডতার পাশাপাশি ভোটার সংখ্যা ও আসনওয়ারি সীমানার আয়তন যোগ করে যুগোপযোগী আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে হবে। সংশোধিত আইনে আয়তন অন্তর্ভুক্ত করা হলে পার্বত্য তিন জেলায় সংসদীয় আসন হতো ২৭টি। একইভাবে ঢাকায় তিনটি। দেশের অনেক জেলায় আসন একটিতে গিয়ে ঠেকতো। এই জটিলতা এড়াতে আয়তনের বিষয়টি থেকে ইতোমধ্যে ইউটার্ন করেছে কমিশন। এখন ভোটার সংখ্যার বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পথ খুঁজছে কমিশন। তাদের বক্তব্য, দেশ ভোটার নয়, জনসংখ্যাকে প্রতিনিধিত্ব করে। এমনকি সীমানা আইনে সংশোধনী না আনার পক্ষে জোরালো যুক্তি দাঁড় করার চেষ্টাও চলছে ইসির সংশ্লিষ্টদের।

এ দিকে, তিন শ’ সংসদীয় আসনের সীমানা বিন্যাস আইন নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং সংসদের বাইরে থাকা দল বিএনপির অবস্থান বিপরীত মেরুতে। ১/১১ এ টি এম শামসুল হুদা কমিশনের বিন্যাস করা সীমানাতেই আস্থা আওয়ামী লীগের। সীমানা পুনর্বিন্যাস আইন প্রণয়নের পর ২০০৮ সালেই প্রথম সংসদীয় আসনে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়। ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৩৩টিতে পরিবর্তন এনে সংসদীয় আসনকে ভেঙে চুরমার করা হয়।

এ নিয়ে বিএনপির তখনকার অভিযোগ আমলে নেয়নি সাবেক কমিশন। এমনকি বিদ্যমান সীমানা বিন্যাস আইনে ক্ষুব্ধ ব্যক্তি আদালতে গেলেও প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ কম। ফলে সে সময়কার বিন্যাস করা আইনে আওয়ামী লীগের ব্যাপক সুবিধা হলেও ক্ষতির মুখে পড়েন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা। ফলে সীমানা পরবর্তী নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলেও ব্যাপক প্রভাব পড়ে। বিএনপির প্রভাবশালী ও হেভিওয়েট প্রার্থীরা ধরাশায়ী হন এবং বিএনপি দুর্গ বলে পরিচিত মানিকগঞ্জ, নোয়াখালীসহ অনেক এলাকায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিজয়ী হন।

২০০৮ সালের সীমানা বিন্যাসপদ্ধতির কঠোর সমালোচক ছিলেন বিএনপিবিহীন ৫ জানুয়ারির নির্বাচন করা কাজী রকিবউদ্দীন কমিশনও। তাদের বিতর্কিত সীমানা বিন্যাসের কারণে এই কমিশনও সীমানা বিন্যাস না করেই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন সম্পন্ন করে।

ফলে অতীতের মতো সীমানা বিন্যাসকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ-বিএনপি বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় হওয়ার কারণে বিদ্যমান সীমানাতে আস্থা আওয়ামী লীগের। একইভাবে, ২০০৮ সালের আগের সীমানায় ফিরে গেলে ভোটে লাভবান হবে বিএনপি-এ কারণে পুরনো সীমানাতেই ফিরতে চায় দলটি। ইতোমধ্যে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ কমিশনের সাথে সাক্ষাৎ করে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করে এসেছে।

সীমানা বিন্যাসসংক্রান্ত সংশোধনী আইন ও বিধিমালার খসড়া আইনে সীমানা নির্ধারণ সংক্রান্ত কাজের পরিধির ৫(২) ক ও খ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংসদের আসনগুলো ভোটার সংখ্যা এবং জনসংখ্যার কোটার ভিত্তিতে প্রথমে জেলাপর্যায়ে বণ্টন এবং পরে জেলাগুলোয় বরাদ্দকৃত সংসদের আসনগুলোর সীমানা পুনর্নির্ধারণ।

সর্বশেষ আদমশুমারি প্রতিবেদনে জনসংখ্যা বিষয়ে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রকাশের অনূর্ধ্ব ১২ মাসের মধ্যে সীমানা পুনর্নির্ধারণ সংক্রান্ত কাজ শেষ করতে হবে বলা হয়েছে। জেলাপর্যায়ে আসন বণ্টনে বলা হয়েছে, প্রতিটি জেলায় ন্যূনপক্ষে একটি আসন এবং প্রতিটি সিটিতে ন্যূনতম একটি আসন এবং বিধি প্রণয়ন করে সিটির আসনসংখ্যা নির্ধারণ হবে। সীমানা বিন্যাস করার পর কমিশনের কাজকর্মের বৈধতা সম্পর্কে কোনো আদালত বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না।

অপর দিকে, বিধির ৩ ধারায় বলা হয়েছে, একাধিক জেলায় অবস্থিত ভূখণ্ড সমন্বয়ে কোনো আসন নির্ধারণ করা যাবে না, প্রতিটি জেলায় ন্যূনপক্ষে একটি আসন নির্ধারণ করতে হবে, নির্বাচনী এলাকার বর্তমান সীমানা যতদূর সম্ভব বহাল রাখা, ইউনিয়ন/উপজেলা/সিটি ও পৌরসভার ওয়ার্ড একাধিক আসনের মধ্যে বিভাজন না করা, প্রশাসনিক সুবিধা ও যোগাযোগব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রাখা।

এসব আইন ও বিধির খসড়া প্রণয়নের পর জটিলতার মুখে পড়ে কমিশন। এখন আইন ও বিধির খসড়া প্রণয়ন করেছে সেটিও লুকাতে মরিয়া ইসি। কারণ নির্বাচন কমিশনার মো: রফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা এখনো সীমানা সংক্রান্ত কোনো আইন ও বিধির খসড়া তৈরি করেনি। বরং ২০১১ সালে প্রণীত খসড়ার মধ্যে নিজেরা সীমাবদ্ধ আছি।

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারির আগের ৯০ দিনের মধ্যে একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবরের পর শুরু হবে একাদশ সংসদ নির্বাচনের সময় গণনা।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫