ঢাকা, শনিবার,২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭

আগডুম বাগডুম

শাবলু ও হলুদ পাখির ছানা

শওকত নূর

০৫ আগস্ট ২০১৭,শনিবার, ০০:০০


প্রিন্ট


শাবলুটা খুবই কম কথা বলে। যেটুকুও বা বলে তা খুব টেনে টেনে ও একেবারে ধীরে। অল্প বয়সেই ওর ভেতরে কেমন একটা ভাবুক ভাব দেখা দিয়েছে। শহরে খাওয়া-দাওয়া, স্কুল, পড়ালেখা, আম্মু কিংবা আব্বুর সাথে চুপচাপ বসে থাকা, ঘুমের সময় টানা ঘুমÑ এই ওর জীবন। গ্রামে এলে ঘুম থেকে জেগে বারান্দায় বসে গাছপালা কিংবা আকাশের দিকে মায়াবী চোখে চেয়ে থাকবে। ওর সমবয়সী ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে শত ডাকলেও টুঁ-শব্দটি করবে না; তাদের কাছে যাওয়া তো দূরের কথা। ওর ছোট ভাই লাভলুটা আবার একেবারেই বিপরীত। সকালে ঘুম থেকে জেগেই ইয়াহু বলে এই জোরে এক চিৎকার দেবে। শহরে থাকলে বারান্দায় এসে হাত নেড়ে গাড়ি ঘোড়া ডাকবে। গ্রামে এলে ছেলেমেয়েদের ওই দলটির সাথে হইহই করে মিশে যাবে। দিনভর ঘুড়ি নিয়ে বা ফড়িং ধরতে ছুটবে, গাছে চড়ে পাখির বাসায় হানা দেবে, কুকুর, বিড়াল বা ছাগল ভেড়াকে উত্ত্যক্ত করবেÑ আরো কত কী।
সে দিন সাতসকালে গ্রামের বাড়ির ওই ছেলেমেয়েগুলো ঠিক করল লাভলুকে নিয়ে ওরা লাভলুদের ঘরের পেছনের ঝোপের ভেতরকার পাখির বাসায় হানা দেবে। বেশ কিছু দিন হলো বাসাটা তৈরি হয়েছে। নিশ্চয়ই এখনো ওখানে ডিম থেকে বাচ্চা ফুটেছে। মই নিয়ে ওরা সবাই একত্রে হাজির হলো গাছটার নিচে। ওদের মধ্যকার সবচেয়ে দুষ্টু ছেলেটার নাম বিশু। সে তর তর করে উঠে গেল গাছের মাথায়। সিসার পাতিলে করে পেড়ে আনল এক জোড়া হলুদ পাখির ছানা। মাথা ঝুঁকে সবাই দেখতে লাগল ছানা দু’টিকে। খুব চিঁচিঁ শব্দ করছে তারা। ছেলেমেয়েগুলো বুদ্ধি-পরামর্শ করছে কী করবে এ দু’টিকে নিয়ে। সেই ফাঁকে নানা ভাষায় তাদের সাথে কথা বলছে। জবাবে ওরা শুধু হাঁ করে বলছেÑ চিঁ,চিঁ, চিঁ।
হঠাৎ সবাই চমকে পেছন ফিরে তাকায়। ওরা জানেই না শাবলু কখন ওদের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। সে চোখ পিটপিট করে টানা সুরে বলছে, ভা-ই-য়া! পাখির ছানা পেড়ে আনা ভালো না। ওদের আম্মু কাঁদবে। বইয়ে পড়নি জীবে দয়া করে যেইজন? আম্মুও তো আমাদের বলেছে। লাভলু তৎক্ষণাৎ বলল, এই সরো তোমরা সবাই। পাখির বাচ্চা দু’টিকে বাসায় দিয়ে আসি। বড়দের কথা মানতে হয়। বিশু সঙ্গে সঙ্গে উচ্চস্বরে চিৎকার দিলো, বড়দের কথা মানতে হয়। অন্যরাও তা শুনে একই কথা বলে চিৎকার দিলো। বিশু বললÑ থাক, আমিই দিয়ে আসি ছানা দু’টিকে। সে এক মুহূর্তে মই বেয়ে উঠে বাচ্চা দু’টিকে ওদের বাসায় রেখে এলো। হলুদ পাখিটা ফুড়ুৎ করে বাসায় ঢুকেই শব্দ করে উঠল; চিক্চিক্চিক্। টিটাটুটোও। টিট্, টিট্, টিট্। টিটা টুটোও। টিট্টি ট্টিট্।
পর দিন দুপুর বেলা হঠাৎ শাবলুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ একজন বলল ওকে বাইরে বাড়ির দিকে হেঁটে যেতে দেখা গেছে। সেই সূত্রে এদিক-সেদিক নানা জায়গায় খোঁজা হলো। কিন্তু কোথাও ও নেই। ওর মা মুখভার করে বারান্দায় মুখ গোমড়া করে উঠানে বসে আছেন। ওর বাবা এ বাড়ি ও বাড়ি করে মাত্রই উঠানে পা রেখেছেন। এমন সময় ঘরের পেছন থেকে হলুদ পাখিটা এসে উঠানে শুয়ে থাকা বিড়ালের পিঠে ছোঁ মেরে বলল, টিটাটুটোও; টিট্, টিট! টিটাটুটোও টিট্ টিট্ টিট্। শব্দ করতে করতে উড়ল সে। বিড়াল ছুটল তার পেছনে। বিড়ালের পেছনে ছুটল লাভলুদের বাড়ির কুকুর। এবারে সবাই অবাক হয়ে তাদের পেছনে ছুটল।
শব্দ করতে করতে হলুদ পাখিটা তার বাসার ওই গাছটার মাথায় গিয়ে বসল। বিড়াল ও কুকুর গাছটার নিচে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। সবাই অবাক হয়ে দেখল শাবলু অসহায়ের মতো গাছের ডালে বসে আছে। পাখিটা তার কাছাকাছি এসে বারবার বলতে লাগলÑ টিটাটুটোও, টুট্ টুট্ টুট্। বিড়াল কুকুর শাবলুর দিকে চেয়ে নিজ নিজ শব্দ করছে।
শাবলুকে নামাতে দ্রুত মই আনানো হচ্ছে। ওর মা কাঁদো কাঁদো মুখে থ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ওর বাবা কিছুটা রাগতস্বরে বললেন, তুই গাছে উঠলি যে! কী ব্যাপার? কেন উঠেছিস গাছে?
ছানা দেখতে। ছানার জন্য মায়া হলো যে।
কিভাবে গেছিস গাছে?
মই দিয়ে উঠেছি।
কিন্তু সে মই কই?
হবু দাদু নিয়ে গেছেন।
তোর হবু দাদু মই নিয়ে গেছেন? তিনি দেখেছেন তোকে গাছে? আর মইটা যখন তিনি নিয়ে গেলেন তুই কিছু বললি না তাকে?
শাবলু মনে মনে ভাবল, এমন ভুল আর কখনো হবে না। কিন্তু ও মুখ ফুটে কিছুই বলতে পারল না। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে নিচের মানুষগুলোর দিকে চাইল।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫