ঢাকা, শুক্রবার,১৮ আগস্ট ২০১৭

আলোচনা

রোমানিয়ায় রবীন্দ্রনাথের কথামালা

শামসুদ্দোহা চৌধুরী

০৩ আগস্ট ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৮:০৩


প্রিন্ট
রবীন্দ্রনাথ রোমানিয়ায় গিয়েছিলেন ২০ নভেম্বর ১৯২৬ সালে

রবীন্দ্রনাথ রোমানিয়ায় গিয়েছিলেন ২০ নভেম্বর ১৯২৬ সালে

রবীন্দ্রনাথ রোমানিয়ায় গিয়েছিলেন ২০ নভেম্বর ১৯২৬ সালে। রোমানিয়ায় অবস্থান করেছিলেন দু’দিন। রোমানিয়ার সাতটি পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে ২৫টি খবর বেরিয়েছিল। সে সময়ের বুখারেস্টের জনপ্রিয় পত্রিকা ‘আদেভ্যারুল’ ‘সত্য’ পত্রিকার প্রথম পাতায় ‘বিশিষ্ট অতিথির আগমন’ শিরোনামে রবীন্দ্রনাথের রোমানিয়ায় আগমন সম্পর্কিত খবরটি প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্র পরিচয় বিধৃত করে সে সময়ের রোমানিয়ার সাংবাদিকেরা লিখেছিলেন ‘নিঃসন্দেহে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আদর্শ মনুষ্যত্বের এক বিরল নিদর্শন’ এ কথাটি বললেও অত্যুক্তি হবে না।

২০ নভেম্বর বিকেল ৪টায় রবীন্দ্রনাথ বুখারেস্টে পৌঁছেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ দেশ থেকে বের হন ১২ মে, শান্তিনিকেতনে জন্মোৎসবের কয়েকদিন পর। ইতালি, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক, জার্মানি, চেকোশ্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি, যুগোশ্লাভিয়া ও বুলগেরিয়া ঘুরে রোমানিয়া আসেন। রোমানিয়া থেকে তুরস্ক, গ্রিস, মিসর ভ্রমণ করে ডিসেম্বরে দেশে ফেরেন। যুগোশ্লাভিয়ায় কবিকে রাজোচিত সংবর্ধনা দেয়া হয়, বুলগেরিয়ায় সেখানে মন্ত্রীদের পদমর্যাদা সম্পন্ন সেলুন গাড়িতে ভ্রমণ করেছেন। বুলগেরিয়ায় কবির সম্মানে একদিনের রাষ্ট্রীয় ছুটিও ঘোষণা করা হয়। ‘মানুষের সংস্কৃতি’ ও ‘বিশ্বের প্রগতি’ নামে দুটি বক্তৃতা দেন সেখানে।

বুলগেরিয়ার মানুষ কবির প্রতি এত আগ্রহান্বিত হয়েছিল, নদীপথে কবিকে বিদায় জানাতে রোমানিয়ায় সীমান্ত পর্যন্ত কবিভক্তদের দুটি জাহাজ ভাড়া করতে হয়েছিল। রোমানিয়ার রাজার নিমন্ত্রণে কবি রোমানিয়া এসেছিলেন। ওখানকার সাহিত্যপ্রেমিকদের কাছে ১৮৯৭ সাল থেকেই রবীন্দ্রনাথের পরিচিতি ছিল তাঁর ‘শকুন্তলা’ গ্রন্থ রোমানিয়ান ভাষায় অনুবাদের ফলে। ‘উনিভেরসুল’ ‘বিশ’ কাগজের প্রতিনিধি জি লুঙ্গুলেস্কু ২১ নভেম্বরের কাগজে লিখলেন ‘ভারতীয় কবি যেন ঈশ্বরের দূত, তাঁর দেহ যেমন সৌন্দর্যের আদর্শ, চোখের ভাবও তেমনি মায়াময়, বড় বড় কালো চোখে যৌবনের দীপ্তি, মহত্তের পাণ্ডুরতা আর মাধুর্য। মুখের দুদিকে ছড়িয়ে পড়ছে কোঁকড়া চুল, ধূসর রঙের যে রেশমি পোশাকটি তাঁর লম্বা ছিপছিপে তনুদেহকে ঘিরে রয়েছে, তার ওপরে পড়ে চুলগুলো অসম্ভব চিকচিক করছে, রুপালি চুলের সাথে মিলেছে রুপালি দাড়ি, তাঁর অনবদ্য কণ্ঠস্বর এমনিভাবে অভিভূত করে ফেলেছিল যে, মনে হচ্ছিল ইনি অমরত্বের বাণীর প্রচারক এক মহাগুরু।’

কোনো বিদেশী সাংবাদিকের কলমে প্রাচ্যের এক ৬৫ বছরের বৃদ্ধ সম্পর্কে চেহারার এমন লাবণ্যময় বর্ণনা সচরাচর দেখা যায় না। ফ্যাসিস্ট নেতা মুসোলিনির ইতালিতে রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণ ইউরোপিয়ানরা ভালো চোখে দেখেনি। রোমানিয়ার এক সাংবাদিক রবীন্দ্রনাথের ইতালি ধারণা সম্পর্কে জানতে চান, রবীন্দ্রনাথ এর উত্তরে বলেন ‘সুন্দর দেশ, সুন্দর মানুষ ইতালির, কিন্তু ওদের হিংসাত্মক কার্যকলাপ আমি পছন্দ করি না, এটা আপনারা ভালো করেই জানেন।’ ‘সত্য’ কাগজের প্রতিনিধির খাতায় অটোগ্রাফ দেয়ার পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ লিখেন-

‘কত অজানারে জানাইলে তুমি
কত ঘরে দিলে ঠাঁই।
দূরকে করিলে নিকট বন্ধু,
পরকে করিলে ভাই।’

২১ নভেম্বর রোমানিয়ার বিশিষ্ট সাহিত্যিক এবং সাংবাদিকেরা কবির সাথে এক প্রেস কনফারেন্সে মিলিত হন। কবি তাঁর ভাষণে বলেন ‘দূরে দূরে যারা থাকে, তারা যখন পরস্পরের সাথে মিলিত হয়, তারা তখন বুঝতে পারে তারা একে অন্যের কত আপন, কত নিকট। ভূগোলের সীমানা মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে, কিন্তু সভ্যতা, সংস্কৃতি ও শিল্পকলা মানুষকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ রাখে চিরকাল।’ পরদিন ২২ নভেম্বর বেলা ১১টায় রবীন্দ্রনাথ বুখারেস্টের ন্যাশনাল থিয়েটারে ইংরেজিতে ভাষণ ও বাংলায় কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ভাষণ শোনার জন্যে রাস্তাঘাট ছিল লোকে লোকারণ্য, রাস্তায় গাড়ি ঘোড়া চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেই রাজপথে সেদিন ভারতবর্ষের কবির জয়যাত্রা সূচিত হয়েছিল।

এ দৃশ্য দেখে আবেগাপ্লুত কবি তার ভাষণে বলেন ‘মানব জীবনের সঙ্গে বিশ্ব জীবনের সুর মেলানোই ভারতের পরম আকাক্সক্ষা, প্রকৃতির সাথে আমরা যতই শত্রুতা করি না কেন, প্রকৃতি আমাদের বন্ধুই থেকে যায়, তা না হলে মানুষের সভ্যতার অস্তিত্ব থাকত না। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, সভ্য মানুষ প্রকৃতিকে জয় করেছে, কিন্তু প্রকৃতিই চির বিজয়িনী। আমার জীবন সম্পর্কে কোনো জ্ঞানগর্ভ কথা আমি বলতে চাই না, কবির ভূমিকা ফুলের ভাষা বাতাসের হাহাকার, সমুদ্রের দীর্ঘশ্বাসের সাথে তুলনীয়, ফুল যেমন সৌন্দর্য দিয়ে মানুষকে প্রভাবিত করে, কবিরাও তেমনি সুর সৌন্দর্য দিয়ে মানুষকে প্রভাবিত করে। আমি এ দেশে দার্শনিক বা প্রবক্তা রূপে আসিনি, পরিপূর্ণতার প্রতি উন্মুখ যে মানবতা তার পূজারি কবিরূপে এসেছি।’

রাজকীয় নাট্যশালার বিমুগ্ধ শ্রোতাদের উদ্দেশে কবি তাঁর মোহগ্রস্ত ভাষণে বলেন- ‘ভারতবর্ষের কলকাতা শহরে আমার জন্ম, সেই শহরকে আকর্ষণ করার মতো তেমন কোনো সৌন্দর্য নেই, প্রকৃতির কোনো কমতি ছিল না, আমার পৈতৃক বাড়ির কাছেই ছিল সূর্যের আলোয় উজ্জ্বল একটি তালবন, তার গান আমার কাছে এনে দিত ভারতের বনবাসী আর অন্য মহাদেশের পল্লব মর্মর। বাড়ির বাগানে বসে আমি প্রাচীন কবিদের অনুসরণ করে কবিতা লেখা শুরু করেছিলাম। একদিন আশ্চর্য হয়ে দেখলাম, তাঁদের সাথে আমার লেখা আর মেলে না। তারা একান্তই আমার, কোনো এক স্বর্গীয় উপলব্ধি যেন আমাকে পথ দেখিয়ে দিলো, নিশ্চিতরূপে জানলাম যে, আমার কাজ হলো আনন্দ এবং আলোয় ভরা, ঈশ্বরের সৃষ্ট এই পৃথিবীর জয়গান গাওয়া।’

বৈষ্ণব কাব্য সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য ছিল-‘মানবাত্মা এবং দেবাত্মার মধ্যে যে অবিচ্ছিন্ন প্রেমের ধারা বইছে, তা আমি ঔ কাব্যধারা থেকে জেনেছি, যে চিরন্তন প্রেম মানুষ ও দেবতাকে একই বন্ধনে বেঁধে রেখেছে কবিতা তারই অভিব্যক্তি, একদিন সকালে যখন গাছের ফাঁক দিয়ে সূর্য উঠছিল, তখন আমার ভেতরে এক অপূর্ব অনুভূতি জাগল। রাস্তা দিয়ে যে সমস্ত মানুষ কাজে যাচ্ছিল, তাদের ভেতরে যেন প্রত্যক্ষ করলাম, তখনই আমার অন্তরে সীমার মাঝে অসীমের অস্তিত্ব অনুভব করলাম। আমার ইউরোপে আসার উদ্দেশ্য মানুষকে জানা, তাদের হৃদয়ের কাছে আসা, এ আমার শিক্ষামূলক ভ্রমণ।’

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরের ইউরোপের অবস্থা বর্ণনা করে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘তোমরা ইউরোপের মানুষ সবসময় সশস্ত্র, তোমরা মুখে বল শান্তি চাও, কিন্তু চল ভুল পথে। যখনই কোনো অশান্তির কারণ ঘটে, সে অশান্তির কারণ মূলোৎপাটন না করে তোমরা শান্তির দূতকে বধ করো, তোমাদের সভ্যতার দাক্ষিণ্যে তোমরা যে উন্নতি করেছ, তোমাদের উন্নতি এশিয়া মহাদেশকেও ছাড়িয়ে গেছে, কিন্তু আত্মশক্তিকে অবহেলা করে এক বিরাট স্থায়ী বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছ, জীবনের অসুস্থ দিকটির প্রতি তোমাদের এত লোভ কেন তা আমি বুঝে ওঠতে পারি না।’

ইউরোপের সাহিত্য সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য ছিল- ‘তোমাদের সাহিত্যিকদের মধ্যে টলস্টয় এবং রোমা রোল্যার সাহিত্য আমার ভালো লাগে, এ দেশে আসার কারণে তোমাদের লোকসংস্কৃতি ও লোকনাট্য সম্পর্কে জানতে পেরেছি, তোমাদের নাচের অঙ্গভঙ্গি এবং পোশাকের বর্নবিন্যাসও সুন্দর যা আমাকে মুগ্ধ করেছে।’ মুর্হুমুর্র্হু করতালির মধ্যে রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য শেষ হয়, বক্তৃতার পরে স্তেইকা নামের একজন রোমানিয়ান রবীন্দ্রনাথের ‘খাঁচার পাখি ছিল সোনার খাঁচাটিতে’ এবং ‘একি তব সবই সত্য’ রোমানিয়ান ভাষায় পাঠ করে শোনান। অনুষ্ঠান শেষে রবীন্দ্রনাথ রোমানিয়ার রাজা ফার্দিনান্দের দেয়া ভোজসভায় অংশগ্রহণ করেন।

কোনভোরবির লিতেরারের ‘সাহিত্য সংলাপের’ প্রতিনিধি উল্লেখ করেছিলেন ‘পৃথিবীর বাইরের কোনো জগতের দূতের মতো রবীন্দ্রনাথ আমাদের সামনে দিয়ে চলে গেলেন আমাদের দিয়ে গেলেন স্বপ্নলোকের সুসংবাদ, তাঁর চোখের দৃষ্টি বিধাতার ধ্যানে মগ্ন।’

সেদিনই রোমানিয়া থেকে কবি বিদায় নিয়েছিলেন, বুখারেস্ট থেকে ট্রেনে করে কবি কৃষ্ণসাগরের ‘কনস্তান্তসা’ বন্দরে এলেন, সেখানে সি মুরেসান নামক একজন অধ্যাপক কবিকে বিদায় সম্ভাষণ জানালেন।

বিদায়যাত্রাকালে অধ্যাপক মুরেসান রবীন্দ্রনাথকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন- ‘আজকের এই পাশবিকতার জগতে গ্যায়টের মতো আপনিও একজন আলোকের সাধক, আলো আরো আলো দিন আমাদের।’

জাহাজ ছাড়ার সময় হয়ে এলো, বন্দরে নেমে আসছে সন্ধ্যা, ধীর কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ উত্তর দিয়েছিলেন- ‘রোমানিয়ায় যে অল্পক্ষণ ছিলাম, আপনাদের আতিথেয়তা আমার চিরদিন মনে থাকবে।’

ইতোমধ্যে কবির জাহাজ ছুটে চলেছে তুরস্কের ইস্তাম্বুলের দিকে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫