ঢাকা, রবিবার,১৭ ডিসেম্বর ২০১৭

আলোচনা

জীবন ও মরণ লীলা

ড. আব্দুর রহিম

০৩ আগস্ট ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৭:৪৪


প্রিন্ট
১৩৪৮ বঙ্গাব্দের বাইশে শ্রাবণ বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সারা বিশ্ববাসীকে কাঁদিয়ে মহাপ্রয়াণের দিকে যাত্রা করেন

১৩৪৮ বঙ্গাব্দের বাইশে শ্রাবণ বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সারা বিশ্ববাসীকে কাঁদিয়ে মহাপ্রয়াণের দিকে যাত্রা করেন

১৩৪৮ বঙ্গাব্দের বাইশে শ্রাবণ বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সারা বিশ্ববাসীকে কাঁদিয়ে মহাপ্রয়াণের দিকে যাত্রা করেন। সেই দিন মাথার ওপরে ছিল শ্রাবণের নীলাকাশ। তার আগের রাতটাও শ্রাবণী জোছনায় আলোকিত ছিল।

রবীন্দ্র কাব্যে মৃত্যু ভাবনা বারবার ফিরে এসেছে। জীবনের প্রথম পর্যায়ে রচিত ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’ কাব্যের ‘মরণ’ কবিতায় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন- মরণ রে,/ তুঁ হুঁ মম শ্যামসমান/... মৃত্যু-অমৃত করে দান।/ তুঁ হুঁ মম শ্যামসমান কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম জীবনেই মৃত্যুকে প্রেমিকের মর্যাদা দিয়েছেন। তবে তার অর্থ এই নয় যে, কবি জীবনবাদী ছিলেন না। কবি মাটির মানুষকে ভালোবেসেছেন এবং মানুষের মাঝেই বেঁচে থাকতে চেয়েছেন। এ জন্য দেখি ‘কড়ি ও কোমল’ কাব্যের ‘প্রাণ’ কবিতায় কবি বললেন- মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে/মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।/এই সূর্যকরে এই পুষ্পিত কাননে/জীবন্ত হৃদয় মাঝে যদি স্থান পাই। কবি জীবনকে যেমন ভালোবেসেছেন, তেমনি মৃত্যুকেও। মূলত কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মৃত্যু বলতে ধ্বংসপ্রাপ্ত কিংবা বিনাশ বোঝাননি, তিনি মৃত্যু বলতে বুঝিয়েছেন স্থানান্তর। ‘নৈবেদ্য’ কাব্যের ‘মৃত্যু’ কবিতায় কবির স্পষ্ট উচ্চারণ- জীবন আমার/এত ভালোবাসি বলে হয়েছে প্রত্যয়,/মৃত্যুরে এমনি ভালোবাসিব নিশ্চয়॥/ স্তন হতে তুলে নিলে কাঁদে শিশু ডরে,/ মুহূর্তে আশ্বাস পায় গিয়ে স্তনান্তরে।।

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, মানুষের নিত্য-সত্তা, যাকে কবি নিত্য আমি বলে অভিহিত করেছেন, তা অসীমেরই অংশ। সৃষ্টিকে সম্পূর্ণ করার জন্য এই অসীমই মনুষ্যরূপে জন্মগ্রহণ করেছেন। কবি ‘শ্যামলী’ কাব্যের ‘আমি’ কবিতায় বলেছেন- ওদিকে অসীম যিনি, তিনি স্বয়ং করেছেন সাধনা/মানুষের সীমানায়/তাকেই বলে আমি। ‘সেজুঁতি’ কাব্যের ‘জন্মদিন’ কবিতায় কবি বলেছেন, পৃথিবীর মায়াবন্ধন মায়াজাল, জীবনের আসক্তির ডালি ও অপবিত্র সঞ্চয় মানুষকে ভগ্ন মৃৎপাত্রের মতো মৃত্যুর আহ্বানে ফেলে চলে যেতে হয়। মৃত্যুর আহ্বানে মানুষ যাত্রা করে।

কবির ভাষায়- হেথা আমি যাত্রী শুধু, অপেক্ষা করিব, লব টীকা/মৃত্যুর দক্ষিণ হস্ত হতে, নূতন অরুণ লিখা/যবে দিবে যাত্রার ইঙ্গিত। (জন্মদিনে) কবির মতে, মৃত্যুতে কোনো বিশেষ জন্মের বিনাশ ঘটে- কিন্তু প্রাণ বিনষ্ট হয় না। সে বিশ্বব্যাপী অনন্ত প্রাণ প্রবাহে মিশে যায়। মৃত্যু জীবনের শেষ পরিণতি নয়- জীবন হচ্ছে অসীমের অংশ। মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে কবি বিশ্বপ্রকৃতি ও মানবজীবনকে নতুনভাবে উপলব্ধি করেছেন। মানুষের এই ক্ষণিক জীবনেই ‘ভূমাবোধ’ অর্থাৎ সর্বব্যাপী পুরুষের বোধ হয়েছে। মানুষের এই ক্ষণস্থায়ী দেহের মধ্যেই মুক্ত আত্মা বাস করে। সুতরাং মানুষ জ্বরা মৃত্যুর অধীন নয়। চিরন্তন মানবের উদ্দেশ্যে কবি ‘পরিশেষ’ কাব্যের ‘অগ্রদূত’ কবিতায় বলেছেন- তোমার যাত্রা সীমা মানিবে না/কোথাও যাবে না থামি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের শেষ পর্যায়ে রচিত কাব্যগুলোর মধ্যে অর্থাৎ ‘রোগশয্যায়’, ‘আরোগ্য’, ‘জন্মদিনে’, ‘শেষ লেখা’য় তাঁর জীবন-মৃত্যু ভাবনা এমন দার্শনিকতায় উন্নতি হয়েছে, তাঁকে যে ঋষি বলা হয় তা যেন যথার্থ হয়েছে। কবির সারা জীবনের সাধনা, তাঁর ধর্মবোধ, তাঁর জীবন মৃত্যু সম্পর্কে চরম ও পরম উপলব্ধি তাঁর শেষ পর্যায়ের কাব্যগুলোতে বাণীরূপ পেয়েছে। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবন মৃত্যুকে বর-বধূর সম্পর্কের রূপেকে কল্পনা করেছেন। বর ও বধূর মধ্যে যেমন প্রেমের বন্ধন নিবিড়, তেমনি জীবন ও মৃত্যুর মধ্যেও গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

আসন্ন মৃত্যুর পদধ্বনির মধ্যেও কবির চোখে মৃত্যুর রূপ ভয়াবহ নয়, তখনো মৃত্যু তার কাছে বর-বধূর সম্পর্কের মতোই মধুর। ‘রোগশয্যায়’ কাব্যের ৩৭ সংখ্যক কবিতায় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন- ধূসর গোধূলি লগ্নে সহসা দেখিনু একদিন/মৃত্যুর দক্ষিণ বাহু জীবনের কণ্ঠে বিজড়িত/রক্ত সূত্র গাছি দিয়ে বাঁধা/চিনিলাম তখনি দোহারে/দেখিলাম নিতেছে যৌতুক/ বরের চরম দান মরণের বধূ/দক্ষিণ বাহুতে বহি চলিয়াছে যুগান্তরের পানে। মূলত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মৃত্যুকে জীবন থেকে আলাদা করে দেখেননি। জীবন ও মৃত্যুর মাঝে একটি ঘনিষ্ঠ সংযোগ রয়েছে বলে তাঁর বিশ্বাস হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে মৃত্যু জীবন থেকে জীবনান্তরে যাওয়ার ক্ষণিক বিরাম মাত্র। মৃত্যুর মধ্য দিয়েই বিধাতা জীবনকে নবীণ করে তোলেন। ‘শেষ সপ্তক’ কাব্যের ৪৯ সংখ্যক কবিতায় কবি বলেছেন- আমি মৃত্যু রাখাল/ সৃষ্টিকে চরিয়ে চরিয়ে নিয়ে চলেছি/যুগ হতে যুগান্তরে/নব নব চারণ ক্ষেত্রে। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মৃত্যুর মধ্যে অখণ্ড শান্তি কামনা করেছেন। ‘বীথিকা’ কাব্যের ‘রাত্রিরূপিনী’ কবিতায় কবি মৃত্যুর উদ্দেশ্যে বলেছেন- তুমি এসো অচঞ্চল/এসো স্নিগ্ধ আবির্ভাব/তোমারি অঞ্চল তলে লুপ্ত হোক যত ক্ষতি লাভ/... সে গম্ভির শান্তি আনো তব আলিঙ্গনে/ক্ষুব্ধ এ জীবনে। ‘নবজাতক’ কাব্যে কবি মৃত্যুর মধ্যে যে একটি বিশেষ উদ্দেশ্য রয়েছে, সে কথা অনুভব করেছেন। কবির ভাষায়- কেন এই আসা আর যাওয়া/কেন হারাবার লাগি এতখানি পাওয়া। (শেষ কথা)

‘রোগশয্যায়’ কাব্যে জীবন মৃত্যুর ধারণাটি একটি দার্শনিক প্রত্যয়ের সাথে ব্যাখ্যা তো হয়েছে। কবি অনুভব করেছেন, জীবন ও মরণ উভয়ের লীলাই অনন্ত। তিনি অনুভব করেছেন, নামহীন সমুদ্রের উদ্দেশ্যে জীবনের চিরকালীন যাত্রা। তাই তিনি বলেছেন- অনিঃশেষ প্রাণ/অনিঃশেষ মরণের স্রোতে ভাসমান/...নাহি তার শেষ। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনুভব করেছেন- দেহের সীমা অতিক্রম করে তাঁর অন্তরতম সত্তার যাত্রা আদি জ্যোতির পানে। সে আদি চৈতন্যপ্রবাহ কবির জীবনের মূলে প্রবাহিত, ক্ষুদ্র সীমার মধ্যে তা কখনো আবদ্ধ হতে পারে না। সমগ্র সৃষ্টি যেই আদি-জ্যোতির আনন্দকেই প্রকাশ করছে। ‘রোগশয্যায়’ কাব্যের ২৮ সংখ্যক কবিতায় কবি বলেছেন- আদি যায় শূন্যময়, অন্তে যার মৃত্যু নিরর্থক।

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনদেবতা, পরমপুরুষ, সত্য, আনন্দ, অন্তরতম ইত্যাদি মূলত স্রষ্টারই বহ-নামের বহিঃপ্রকাশ। স্রষ্টার সাথে প্রেমলীলাই কবির সারা জীবনের সাধনা। স্রষ্টার পৃথিবী এ জন্য তাঁর কাছে মধুময় মনে হয়েছে। মৃত্যুর প্রান্তে এসে কবির হৃদয়ে তাই অনন্তের আনন্দ বিরাজ করে। কবি ‘আরোগ্য’ কাব্যে বলেছেন- এ দ্যুলোক মধুময়, মধুময় পৃথিবীর ধূলি-/অন্তরে নিয়েছি আমি তুলি এই মহামন্ত্রখানি/চরিতার্থ জীবনের বাণী।/দিনে দিনে পেয়েছিনু সত্যের যা কিছু উপহার/মধুরসে ক্ষয় নাই তার।/তাই এই মন্ত্রবাণী মৃত্যুর শেষের প্রান্তে বাজে/সব ক্ষতি মিথ্যা করি অনন্তের আনন্দ বিরাজে।/শেষ স্পর্শ নিয়ে যাব যবে ধরণীর/বলে যাব, ‘তোমার ধূলির/তিলক পরেছি ভালে;/দেখেছি নিত্যের জ্যোতি দুর্যোগের মায়ার আড়ালে। সত্যের আনন্দরূপ এ ধূলিতে নিয়েছে মুরতি/এই জেনে এ ধুলায় রাখিনু প্রণতি। (মধুময় পৃথিবীর ধূলি) মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সত্যের স্বরূপ ও আত্মার চরম উপলব্ধ হোক, এ কামনা ‘আরোগ্য’ কাব্যের শেষ কবিতাটিতে ব্যক্ত হয়েছে। কবির ভাষায়- এ আমির আবরণ সহজে স্খলিত হয়ে যাক/চৈতন্যের শুভ্র জ্যোতি/ভেদ করি কুহেলিকা/সত্যের অমৃতরূপ করুক প্রকাশ।

স্রষ্টার সাথে কবির যেহেতু প্রেমের সম্পর্ক, তাই কবি স্রষ্টাকে বলেছেন ‘ছলনাময়ী’। স্রষ্টাকে উদ্দেশ করে কবি তার শেষ কবিতায় উচ্চারণ করেছেন- তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি/বিচিত্র ছলনাজালে/ হে ছলনাময়ী।/...অনায়াসে যে পেরেছে ছলনা সহিতে/সে পায় তোমার হাতে/শান্তির অক্ষয় অধিকার।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫