ঢাকা, সোমবার,১১ ডিসেম্বর ২০১৭

আলোচনা

রবীন্দ্র নাটক : মানবিক দৃষ্টিকোণ

ড. মুহাম্মদ জমির হোসেন

০৩ আগস্ট ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৭:২৮


প্রিন্ট
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) মূলত কবি হিসেবেই পরিচিত। কাব্যিকতা অবশ্য তাঁর মজ্জাগত স্বভাব। কবিতা ছাড়াও সাহিত্যের নানান শাখা-প্রশাখায় তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ লক্ষণীয়। এবং সব ক্ষেত্রেই তিনি সমানভাবে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করেছেন। সাফল্য অর্জন করেছেন নাট্যরচনা ও নাট্যচর্চায়। রবীন্দ্রনাথ জীবনভর সৃষ্টিশীল সাধনায় কবিতা রচনাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। বলা যায়, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কাব্য সাধনা আত্মনিয়োগ করেন।

আবার এ কথাও বলা যায়, পাশাপাশি তিনি সারা জীবন ধরেই নাট্যরচনায় নিরতনিষ্ঠ ছিলেন। মাত্র বিশ বছর বয়সে রচিত বাল্মীকি প্রতিভা (১৮৮১ খ্রি:) থেকে শুরু করে মৃত্যুর কিছু দিন পূর্বেও তিনি নাটক রচনা করেছেন। তবে এসব নাট্যরচনাকালেও তাঁর কাব্যধর্মিতা এতটুকু ক্ষুণ্ন হয়নি। নাটকের বস্তুগত দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতময় কাহিনী চরিত্রের মধ্যেও কাব্যিকতায় একটা আবহ-অনুষঙ্গ লক্ষ করা যায়। এর ফলে রবীন্দ্র নাট্যধারায় একটা আলাদা মাত্রামহিমা যুক্ত হতে দেখা যায়, যা বাংলা নাট্য সাহিত্যের ইতিহাসে একটা ব্যতিক্রমী অধ্যায় যুক্ত করতে সক্ষম হয়।

তা ছাড়া রবীন্দ্রনাথ বাংলা নাট্যসাহিত্যে একটা বৈচিত্র্যবহুল পরম্পরা যুক্ত করেছেন। তিনি প্রচলিত নিয়মনীতি ভেঙে গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, ঋতুনাট্য, নৃত্যনাট্য ও রূপক সাংস্কৃতিক নাট্যধারার প্রবর্তন করেন। তা ছাড়া রবীন্দ্রনাথই প্রথম বাংলা সাহিত্যে পাঠযোগ্য নাটক (জবধফরহু উৎধসধ) রচনা করেন; যা মঞ্চায়নের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে পাঠোপযোগী হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ বাংলা নাট্য সাহিত্যে একটা যুগান্তকারী অধ্যায় রচনা করেন। সব মিলিয়ে রবীন্দ্রনাথ বাংলা নাটকে কিছু অভাবনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

বিসর্জন (১৮৯০) রবীন্দ্র রচিত একটি কাব্যনাট্য। রবীন্দ্রনাথের প্রায় অর্ধশত নাট্যরচনার মধ্যে বিসর্জন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি নিয়ে সমালোচকরা নানামাত্রিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে প্রবৃত্ত হন। তা ছাড়া বিসর্জন নিয়ে সমকালীন সমাজে তুমুল সমালোচনার ঝড় ওঠে। সামাজিকভাবে রবীন্দ্রনাথকে অনেকটা তোপের মুখে পড়তে হয়। বিশেষত, সনাতন হিন্দু সম্প্রদায় রবীন্দ্রনাথের প্রতি খড়গহস্ত হয়ে পড়ে।

বিসর্জন নাটকে হিন্দু সমাজের বলি প্রথা ও প্রতিমা পূজাকে অন্বিষ্ট হিসেবে গ্রহণ করা হয়, যা নাটকের শেষে অসার প্রতিপন্ন করতে দেখা যায়। এবং প্রতিমাগুলো গোমতীর জলে বিসর্জন দেয়া হয়। দেবীর অস্তিত্বকে মিথ্যা-মহামিথ্যা বলে মন্তব্য করতে দেখা যায়। এসব দৃশ্যপট সনাতন হিন্দু সমাজকে প্রচণ্ডভাবে ক্ষেপিয়ে তোলে। ফলে বিসর্জন নাটকের বিরুদ্ধে একটা সম্প্রদায় ওঠেপড়ে লেগে যায়।

কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কোনো ভাবেই দমার পাত্র নন। তিনি বিসর্জন রচনা করে অত্যন্ত সাফল্যের সাথে তা মঞ্চস্থ করেন। এবং বারবার বিপুল দর্শকনন্দিত পরিবেশে তা মঞ্চস্থ হতে থাকে। বিসর্জন নাটকের প্রতি রবীন্দ্রনাথ নিজেও দারুণভাবে আকৃষ্ট ছিলেন। এই নাটকের প্রতি ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের প্রগাঢ় ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ লক্ষ করা যায়। রবীন্দ্রনাথ নিজে এ নাটকের প্রধান দুই চরিত্রে অভিনয় করেছেন। রঘুপতি ও জয়সিংহ চরিত্রে অভিনয় করে তিনি ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করেন। এ নিয়ে সমকালীন পত্রপত্রিকায় খবর ছাপা হয়। সেখানে রবীন্দ্রনাথের অভিনয় প্রতিভা নিয়ে ভূয়সী প্রশংসা করতে দেখা যায়। তা ছাড়া বিসর্জন নাটকের পরিচালক হিসেবেও রবীন্দ্রনাথ বিস্ময়কর সাফল্য দেখিয়েছেন। এসব কারণে বলা যায় বিসর্জন রবীন্দ্রনাথের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে পরিগণিত।

নাটক সাধারণত বস্তুগত দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত ও মানবিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত বহন করে। পরস্পরবিরোধী শক্তির প্রচণ্ড সঙ্ঘাত ও অনিবার্য পরিণতি নাটকীয় পরিণতিকে ত্বরান্বিত করে থাকে। এক অদৃশ্য শক্তি মানবিক সম্পর্কের মধ্যে বিপর্যয় ঘটায়। মানুষ অসহায়ভাবে এই বিপর্যয়ের শিকারে পরিণত হয়। দ্বন্দ্বময়, সঙ্ঘাতের প্রাবল্য নিয়েই নাটকের সার্থকতা বা ব্যর্থতা নির্ণীত হয়ে থাকে। রবীন্দ্রনাথের অধিকাংশ নাটকে এই দ্বন্দ্বমুখরতা নিতান্তই স্বল্প। সেখানে অন্তর্গত ভাবভাবনার আধিক্য লক্ষ করা যায়। আধুনিক মননশীল ভাবভাবনা স্থান করে নেয়। সূক্ষ্ম রুচিবোধ পরিশ্রুত চলনবলন নাটকীয় কাহিনী ও চরিত্রকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এ দিক থেকে বিসর্জন অনেকটাই ব্যতিক্রম।

বিসর্জন নাটকে মঞ্চের যাবতীয় বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয় মাত্রায় ফুটে ওঠে। এর মধ্যে তথাকথিত ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি ও চিত্তধর্মের সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করে। এক দিকে ধর্মের অন্ধ বিধিবিধান, অন্য দিকে মানবিকবোধ- এই দু’য়ে মিলে বিসর্জন নাটকে একটা প্রচণ্ড দ্বন্দ্বমুখর পরিবেশ তৈরি করে দেয়। তবে সব কিছু ছাপিয়ে নাটকের পরিণাম ভাবনায় মনুষ্যত্ববোধেরই জয়গান কীর্তিত হয়েছে। মানবতার কবি রবীন্দ্রনাথ মনুষ্যধর্মের নিত্যতা ও সত্যতার বিজয়গাথা রচনা করেছেন। নাটকে মোহময় মানবী অর্পণা চরিত্রের মধ্য দিয়ে অনুরূপ ভাবভাবনা ফুটিয়ে তোলেন। ধর্মান্ধ মানসিকতা বরাবরই মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিকে অস্বীকার করে। একটা সশঙ্কভীতির রাজ্য কায়েম করতে চায়। মানুষের অজ্ঞতাকে পুঁজি করে ধর্মান্ধ নিজের আধিপত্য বিস্তার করে। অথচ মানুষ ও মনুষ্যত্ববোধ সব সময় তা মানতে নারাজ। মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি বরাবরই নিজস্ব ভাষায় নিজেকে প্রকাশ করে থাকে।

রবীন্দ্রনাথ বিসর্জন নাটকে হিন্দুধর্মের সামাজিক প্রথা- প্রতিমা পূজা, বলিদান ও পুরোহিততন্ত্রকে নির্মম বাস্তবতার সাথে তুলে ধরেছেন এবং এই হিংস্র উন্মত্ত প্রথার অমানবিক দিকটি নাটকীয় কৌশলে উপস্থাপন করতে সক্ষম হন। তা ছাড়া নাটকীয় পরিণতিতে এর মধ্যে একটা মানবিক মহিমা আরোপ করা হয়। প্রতিমা পূজার ধারক-বাহক পুরোহিত রঘুপতি শেষ পর্যন্ত সব কিছু ফেলে দিয়ে মানবিক চেতনায় স্বর্কীয় অস্তিত্ব ফিরে পায়। নাটকীয় পরিণতির একপর্যায়ে রঘুপতি পুত্র জয়সিংহকে বেদনাহত কণ্ঠে বলে,

‘ফিরে আয়, ফিরে আয়, তোরে ছাড়া আর
কিছু নাহি চাহি, অহঙ্কার অভিমান
দেবতা ব্রাহ্মণ সব থাক, তুই আয়।’

বিসর্জন নাটকে মমতাময়ী মানবীর প্রতীক অপর্ণার জয়জয়কার পরিলক্ষিত হয়। ক্ষুদ্র বালিকা অপর্ণার কাছেই অহংপরায়ণ রঘুপতির পরাজয় ঘটে। রাজ্যের একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী রঘুপতির অবস্থা নিদারুণ অবলম্বনহীন হয়ে দাঁড়ায়। রঘুপতির মধ্যেও মানবিক বোধবুদ্ধির আত্মপ্রকাশ ঘটে। পুত্র জয়সিংহের আত্মবিসর্জনের মাধ্যমে তাঁর আত্মগত ভাবান্তর সম্ভবপর হয়ে ওঠে। রঘুপতির যাবতীয় শক্তির উৎস প্রতিমাদেবী মিথ্যা প্রতিপন্ন হয়। এবং রঘুপতি নিজেই প্রতিমাকে গোমতীর জলে নিক্ষেপ করে। পরিশেষে পূজা, বলি প্রথা ও দেবীকে ছাপিয়ে অপর্ণার মধ্যেই জননীদেবীর মূর্তি খুঁজে পায়-

‘রঘুপতি। পাষাণ ভাঙিয়া গেল-জননী আমার
এবার দিয়েছে দেখা প্রত্যক্ষ প্রতিমা
জননী অমৃতময়ী।’

মূলত বিসর্জন নাটকের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ মানবিক বোধবুদ্ধির জয়গান উপস্থাপন করেছেন। ধর্মান্ধ হিংস্রতায় অসারত্ব প্রমাণ করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। এখানে দেখা যায়, ধর্মের অন্ধ হিংস্রতা ভ্রাতৃহত্যার মতো অপরাধকেও উসকে দেয়। রাজ্যের প্রতিটি নরনারী এই অসার ধর্মপ্রথার কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ধর্মের এই কদর্য রূপকে তুলে ধরেছেন। এবং পরিশেষে তা মানবিকতার নান্দনিক মোড়কে অভিষিক্ত করেন।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫