ঢাকা, রবিবার,১৯ নভেম্বর ২০১৭

স্বাস্থ্য

প্যারালাইসিস রোগের চিকিৎসা

 ডা: এম এ শাকুর

০১ আগস্ট ২০১৭,মঙ্গলবার, ১৮:৪১


প্রিন্ট
প্যারালাইসিস রোগের চিকিৎসা

প্যারালাইসিস রোগের চিকিৎসা

প্যারালাইসিস রোগটির কথা হয়তো অনেকেই শুনেছেন। এ রোগে আক্রান্ত রোগীও হয়তো দেখেছেন। তবে এ রোগীর চিকিৎসা ও পরিচর্যা সম্পর্কে হয়তো অনেকেই অবগত নন। চিকিৎসা ডাক্তার করবেন, কিন্তু পরিচর্যা করতে হবে রোগীর পাশে যারা থাকবেন তাদেরকেই। তাই আজ এ ধরনের একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করছি।

প্যারালাইসিস রোগের কারণ অনেক। যেমন- স্ট্রোক, ট্রমাটিক ব্রেইন ইনজুরি, নার্ভ ইনজুরি, ব্রেইন টিউমার, স্পাইনাল কর্ড টিউমার, মটর নিউরন ডিজিজ, পোলিও মাইলাইটিস, গুলেন বেরি সিনড্রম, প্রোলাপস ডিস্ক, ভিটামিন বি-১২ এর অভাব, স্পাইনাল কর্ড কম্প্রেসন ইত্যাদি।

এসব কারণ ছাড়াও আরো কিছু কারণ আছে, যা প্যারালাইসিসের জন্য ঝুঁকি বহন করে যেমন- উচ্চ রক্তচাপ, সিগারেট, পান, ডায়াবেটিস, মদ গ্রহণ, হাইপারলিপিডেমিয়া, হৃদরোগ ইত্যাদি।

তবে যেকোনো কারণে ব্রেইন বা স্পাইনাল কর্ডের টিসু নষ্ট হলে বা ওই টিসুতে চাপ পড়লে প্যারালাইসিস হতে পারে।

উপসর্গ-

• হাত বা পা নড়াচড়া করতে না পারাষ হাঁটতে অসুবিধা, এমনকি হাঁটতে না পারা

•  দাঁড়াতে অসুবিধা হওয়া বা দাঁড়াতে না পারা

• বসতে অসুবিধা হওয়া বা বসতে না পারা

• অনেক সময় রোগীর এক পাশের হাত বা পা অবশ হয়ে যায়

• কথা বলতে না পারা বা কথা বলতে অসুবিধা হওয়া

• চোখে কম দেখাষ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া

• বমি হওয়া

• খিঁচুনি হওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

চিকিৎসা : এ ধরনের প্যারালাইসিস রোগ দেখা দেয়ার সাথে সাথে রোগীকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে এবং প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। তবে প্যারালাইসিসের জন্য রোগীর ওষুধের চেয়েও বেশি দরকার হলো পরিচর্যার এবং প্রশিক্ষণের। ওষুধ হিসেবে প্রয়োজন অনুযায়ী পেনটস্রিফাইলিন, ভিমপোসিটিন, এসপিরিন ইত্যাদি দেয়া যেতে পারে।

এ ছাড়া প্যারালাইসিসের কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা করতে হবে। যেমন- উচ্চরক্তচাপের জন্য প্যারালাইসিস হলে এন্টি-হাইপারটেনসিভ ওষুধ দিতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে রক্তচাপ খুব সতর্কতার সাথে ধাপে ধাপে কমাতে হবে। এ ছাড়া অন্য কোনো সমস্যা থাকলে সমস্যাসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
পরিচর্যার ক্ষেত্রে-

•  অজ্ঞান রোগীদের জন্য বিছানা ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে

• নাকের মাধ্যমে পরিমিত পরিমাণে খাবারের ব্যবস্থা করতে হবেষ আধা ঘণ্টা পরপর রোগীর পজিশন পরিবর্তন করতে হবে

• রোগীকে প্রস্রাব-পায়খানা করানোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। দরকার হলে ক্যাথেটার, বেডপ্যান ইত্যাদি ব্যবহার করতে হবে

• রোগীর শরীরের সব জোড়ার প্রতি যত্নবান হতে হবে যাতে জোড়াগুলো শক্ত হয়ে না যায়। এ জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট নিয়মে ব্যায়াম করাতে হবে।

• বিভিন্ন প্রকার ফিজিক্যাল থেরাপি যেমন ইনফ্রারেড, সর্টওয়েভ ইলেকট্রিক্যাল স্টিমুলেশন থেরাপি প্রয়োজন অনুযায়ী দিতে হবে।

রোগী যখন সুস্থ হয়ে উঠবে তখন তাকে বিভিন্ন প্রকার প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে। কথা স্পষ্টভাবে বলার জন্য স্পিচ থেরাপি দিতে হবে। রোগীর হাঁটাচলার জন্য প্রশিক্ষণ দিতে হবে। প্রয়োজনে গেট ট্রেনিংয়ের আওতায় প্যারালাল বার ওয়াকিং, রোলেটর ওয়াকিং ও ক্র্যাচ ওয়াকিং এমনকি লাঠির সাহায্যে হাঁটার প্রশিক্ষণ দিতে হবে। যদি কোনো রোগী হাঁটতে অক্ষম হয় তবে তাকে হুইল চেয়ার দিয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। হাত ও পায়ের দুর্বলতার জন্য নির্দিষ্ট নিয়মে নির্দিষ্ট ব্যায়াম করতে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিবর্তন অর্থাৎ রোগীর সামর্থ্য অনুযায়ী থাকার ঘর, কিচেন, বাথরুম, অথবা অফিস কক্ষে পরিবর্তন আনতে হবে। যেমন- স্যাঁতস্যাঁতে ফ্লোর বা স্লিপি ফ্লোরকে কার্পেট দিয়ে মুড়ে দেয়া, প্রয়োজনীয় হাতল দিয়ে চলাচলের সুবিধা করে দেয়া, বাথরুমে উঁচু কমোড তথা ধরে বসার জন্য ব্যবস্থা করে দেয়া ইত্যাদি। এই পরিবর্তন রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী করতে হবে। রোগীর যতটুকু সামর্থ্য আছে তার আলোকে তাকে কোনো কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে এবং তাকে আয় করার জন্য ব্যবস্থা করে দিতে হবে। যেমন- একজন প্যারাব্লেজিক অর্থাৎ যার পা দুটো প্যারালাইজড কিন্তু হাত দিয়ে কাজ করতে পারে, তাকে একটি ক্ষুদ্র ব্যবস্থা যেমন- পান দোকানের ব্যবস্থা করে দেয়া যেতে পারে। দৈনন্দিন কাজের জন্য তাকে কিছু এডাপ্টিভ ডিভাইজের ব্যবস্থা করে দিতে হবে।সর্বোপরি তার আমোদপ্রমোদ তথা বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে পারার ব্যবস্থা করে দিতে হবে, যাতে সে মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে পারে।

এ ক্ষেত্রে সমাজসেবকরা যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারে।এভাবে যদি একজন প্যারালাইসিসে আক্রান্ত প্রতিবন্ধীকে চিকিৎসা তথা পুনর্বাসন করা যায় তবে সেও হয়ে উঠতে পারে সমাজের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং এভাবেই একজন প্রতিবন্ধী সমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই আসুন, আমরা সবাই প্যারালাইসিসে আক্রান্ত প্রতিবন্ধী ব্যক্তির চিকিৎসায় সহায়তা করি এবং তাকে সমাজের একজন কর্মক্ষম ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তুলি।

লেখক : অধ্যাপক, বাতব্যথা বিশেষজ্ঞ, ইবনে সিনা পেইন, ফিজিওথেরাপি অ্যান্ড রিহেবিলিটেশন সেন্টার, বাড়ি নং-৪৮, রোড নং-৯/এ, ধানমন্ডি, ঢাকা। ফোন : ০১৮১৯-৪১০০৮০।

 

  • সর্বশেষ
  • পঠিত

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫