ঢাকা, শুক্রবার,১৫ ডিসেম্বর ২০১৭

উপসম্পাদকীয়

ভাঙা জানালা

আলমগীর মহিউদ্দিন

৩১ জুলাই ২০১৭,সোমবার, ১৭:৫২


আলমগীর মহিউদ্দিন

আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রিন্ট

প্রায় চার যুগ আগে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় দু’জন অধ্যাপক লক্ষ করেন একটি বাড়ির এক জানালায় ফুটো এবং খানিকটা ভাঙা। ভাবলেন, এটা মেরামত করা উচিত, নতুবা পোকামাকড় ঢুকবে। দু-তিন দিন পর সেই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় লক্ষ করলেন, জানালাটা তখনো মেরামত হয়নি। এর সপ্তাহখানেক পর দেখলেন, সেই রাস্তার কয়েকটি বাড়ির জানালা ফুটো এবং ভাঙা। যেন কারা ঢিল মেরে ভেঙে দিয়েছে। বিষয়টি এই অনুসন্ধানী দুই অধ্যাপককে ভাবিয়ে তুলল। তারা অনুসন্ধান, পর্যবেক্ষণ ও আলোচনার পর একটি নিবন্ধ লিখলেন। নিবন্ধটি তাৎক্ষণিক সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করল এবং আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়াল। এমনকি কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশ তারই নিরিখে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হলো এবং এ বিষয়ে আইন রচনা করল, যা সারা বিশ্বে এখন নানাভাবে ব্যবহার হচ্ছে।

অধ্যাপক জেমস কিউ উইলসন ও জর্জ কেলিং যৌথভাবে লিখেছিলেন ‘ভাঙা জানালা’ শিরোনামের একটি নিবন্ধ। আর অপরাধতত্ত্ববিশারদেরা ফেঁদে বসলেন ‘ব্রোকেন উইন্ডো থিওরি’ (ভাঙা জানালা তত্ত্ব)। গত চার যুগ ধরে এই তত্ত্বের ওপর নির্ভর করে যেসব আইন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের সব রাষ্ট্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য নির্মাণ করেছে, তা সেই বহু শতাব্দীর অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের স্বীকৃতি দেয়। তা হলো বিশ্বের অনেক ছোট্ট ঘটনা যুগান্তকারী কর্মকাণ্ডের জন্ম দেয়।


উইলসন ও কেলিং ছোট্ট ঘটনাকে রূপক হিসেবে ধরে তার তত্ত্বটি তুলে ধরেছিলেন। তারা বলেছিলেন, যেকোনো সমাজের ‘ছোট্ট অব্যবস্থা ও অভদ্র্রতা ক্রমে বিশাল অপরাধের জন্ম দেয়।’ পর্যবেক্ষণের বর্ণনা দিয়ে তারা উল্লেখ করলেন, ‘প্রথম জানালার ফুটো এবং ভাঙাটি যখন দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিনেও মেরামত হয়নি বা এটা যে ভেঙেছে তা বাড়ির মালিক বা বাসিন্দাদের দৃষ্টিতে আসেনি বলে রাস্তার দুষ্ট ছেলেদের কাছে প্রতিভাত হলো, তখন তারা আরো জানালা ভাঙল এবং সে রাস্তার সব দুষ্টরা এক হয়ে কাজটি শুরু করলে বাসিন্দাদের সাথে সঙ্ঘাত এবং সংঘর্ষ হলো। অর্থাৎ পুরো সমাজটার মাঝে বিভাজন, অসহ্যতার বিকাশ ঘটতে থাকল।’ উইলসন বলেছেন, এমনটি শুধু সমাজের ব্যাপারেই ঘটে না, এটা রাষ্ট্রীয়পর্যায়ে এবং দুই বা বিভিন্ন রাষ্ট্রের মাঝেও ঘটতে পারে।
‘ভাঙা জানালা’ তত্ত্বে বলা হয়, এমন ছোট্ট বিষয়ের ওপর নজর না দিলে দুষ্ট বালক অথবা ছোট্ট অপরাধীরা ধরে নেয়, এ এলাকায় কোনো খবরদারি নেই। তাই তারা তাদের অগ্রহণীয় কর্মকাণ্ডগুলো প্রথমে ছোট আকারে করলেও, তা শিগগির প্রসারিত করে এবং একবার এর ব্যাপকতার সীমা ছাড়িয়ে গেলে সরকার-রাষ্ট্র উভয়েই একপর্যায়ে বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কারণ তখন স্বাভাবিক সামাজিক প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়। সমাজবিজ্ঞানী ওয়েজলি স্কোগান তার অনুসন্ধানে দেখিয়েছেন- কিছু সামাজিক অব্যবস্থা, যার সাধারণ উৎপত্তি হয় ভাঙা জানালার ঘটনার মতো ছোট বিষয়কে উপেক্ষার মধ্য দিয়ে এবং পরিশেষে বিশাল সমস্যার সৃষ্টি হয়। যেমন ছিনতাই, ধর্ষণ ও চুরিসহ নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনাগুলো।

এই তত্ত্বের প্রথম ব্যবহার করেন নিউ ইয়র্ক সিটি পুলিশ কমিশনার উইলিয়াম ব্রাটন। উইলসন তার নিবন্ধে বলেছিলেন, ‘পাড়ার মধ্যে রাস্তায় যাতে নোংরা না জমে, দুষ্টরা ছোটখাটো দুষ্টামির সীমা না পেরোয়, তার ওপর তীক্ষè দৃষ্টি রাখতে হবে। কখনো কখনো এগুলো সুন্দর রাখার জন্য অভিযান চালাতে হবে। তা হলে অপরাধগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে না এবং বড় সমস্যার সৃষ্টি হবে না।’ পুলিশ কমিশনার ব্রাটনের কাছে এ বার্তা অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য মনে হলে, তিনি বিশেষ বাহিনী গঠন করেন। তাদের মূল কাজ ছিল ‘জীবনকে অর্থবহ’ করার উদ্দেশ্য নিয়ে পুলিশ পাড়ার মাঝে টহল দেয়া এবং প্রয়োজনে এই অসভ্যদের আটক করা। ফলে দেখা গেল, নিউ ইয়র্কের আন্ডারগ্রাউন্ড ও সাবওয়েতে ছিনতাইসহ সব অপরাধ হঠাৎ কমে গেছে। ব্রাটন উৎসাহী হলেন পুলিশের ক্ষমতা বাড়ালেন এবং পুলিশি ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণের সীমা শিথিল করলেন।

এখানেই ব্রাটন ভুল করলেন এবং যার পরিণাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বে এর প্রতিফলন ঘটে। ভুলটা হলো আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী সরকারি কর্মচারীদের যেমন তাদের সঠিক কাজ করার অধিকার এবং সুযোগ থাকবে, তেমনি তাদের নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালনার জন্য কিছু বাধানিষেধ থাকতে হবে। নতুন জনগণের সাধারণ অধিকার, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং জীবনধারণের সাধারণ পথ ও সরকারি বাহিনীগুলো নিয়ন্ত্রণের কাজ নিয়ে নেবে। ফলে সামাজিক সঙ্ঘাত ও সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে উঠবে।


মারকাস রজেনবম তার ‘রিকনসিডারিং ব্রোকেন উইন্ডো’ বইতে এই বিষয়টি তুলে ধরেছেন চমৎকার করে। তিনি দেখিয়েছেন- নিউ ইয়র্ক পুলিশের কেউ অপরাধ করতে পারে এই ধারণার বশবর্তী হয়ে কাউকে আটক করার প্রবণতা নিউ ইয়র্কের রাস্তাকে অনেকের কাছে ভীতিপ্রদ করেছে। পুলিশ প্রায়ই কোনো স্থানে গল্পরত আড্ডা থেকে কাউকে কাউকে আটক করে। এতে পুলিশের সাথে তাদের সংঘর্ষ হয়। রজেনবম বলেছেন, এই অবস্থার ফলে নিউ ইয়র্কে শান্তির চেয়ে অস্বস্তিই বেশি হচ্ছে। লেখক রজেনবম বলেছেন, ‘এখন বিশ্বে বেশির ভাগ দেশের পুলিশ এই নিউ ইয়র্কের পুলশের কর্মকাণ্ডকে নকল করছে। ফল একই ঘটনা ঘটেছে- ক্রমান্বয়ে পুলিশি রাজত্ব কায়েম হচ্ছে।’ লেখক ফিলিপ জিমবারডো (স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়) একটি ঘটনা উল্লেখ করে বলেছেন ‘‘অপরাধ দমনে পুলিশি তৎপরতা ‘ভাঙা জানালা তত্ত্ব’ হতে উদ্ভব হয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে সে অভূতপূর্ব সাফল্য দেখিয়েছিল, তা আজ সাধারণ মানুষের কাছে ভয়াবহ অবস্থা ধারণ করেছে। কারণ পুলিশ এ তত্ত্ব থেকে বেরিয়ে এসে জননিয়ন্ত্রণ এবং নিজ স্বার্থে নিয়োগ করেছে।’’ জিমবারডো যে ঘটনাটি উল্লেখ করেছিলেন তা হলো, তিনি দুটি গাড়ি হুড খোলা অবস্থায় ফেলে রেখেছিলেন। একটি নিউ ইয়র্কের গরিব এলাকায়, অপরটি পালো আলটোর ধনী এলাকায়। নিউ ইয়র্কের গাড়িটি নানা অংশ খুলে নেয়া শুরু হয় ১০ মিনিট পরেই, তবে পালোর গাড়িটি অক্ষত রইল দু’দিন। তখন জিমবারডো গাড়িটির সামনের কাচটা ভেঙে দিলেন। এর ১০ মিনিটের মধ্যে পালোতে রাখা গাড়ির বেশির ভাগ অংশ হারিয়ে গেল। তিনি প্রমাণ করলেন যখনই অপরাধীদের কাছে এটা প্রতিভাত হবে যে কোনো বিষয়ে যত্ন বা পর্যবেক্ষণ নেই, তখনই তারা সে ক্ষেত্রে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

ভাঙা জানালা তত্ত্বে বলা হয়েছিল, ‘যখনই কোনো এলাকায় স্লোগান লেখা হয়, ছবি আঁটা হয় তখনই সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষের নজর দেয়া উচিত। নতুবা, এর প্রতিকার হচ্ছে না বা এর প্রতি অনীহা দেখানোর অভিযোগ এলে পুরো বিষয়টি অশান্তি ও সঙ্ঘাতের দিকে চলতে থাকে।’
এই ভাঙা জানালা তত্ত্বের ফলে যে পুলিশি তৎপরতা ও পর্যবেক্ষণ শুরু হয়েছিল চার যুগ আগে, এখন তা আর জনপ্রিয় নয়। কেনো? প্রশ্ন করেছেন এই তত্ত্বের উৎগাতা জর্জ কেলিং। তিনি দেখিয়েছেন, পুলিশ শান্তি-শৃঙ্খলার নামে সমাজে তাদের স্বার্থ ও ক্ষমতার ব্যবহার করে বেশি, ফলে সাধারণ নাগরিক পুলিশকে বাবু হিসেবে ভাবতে চায় না। কেলিং বলেছেন, ‘তারা প্রতিবেশীদের মাঝে শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য পুলিশি পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রণ চেয়েছিলেন। কিন্তু এখন শুধু নিয়ন্ত্রণই হচ্ছে। এই নিয়ন্ত্রণে বাড়াবাড়ি হওয়ার ফলে জনগণের ভরসা উঠে যাচ্ছে।’ কেলিং একটি মারাত্মক বিষয়ের উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দাসব্যবস্থার উৎপাটন সম্ভব হচ্ছে না, পুলিশি ব্যবস্থার কারণে। কারণ তারা সাদা এবং কালোর মাঝে পক্ষপাতপূর্ণ। আফ্রিকান-এশিয়ান বা এমন গাত্রবর্ণের মানুষেরা মার্কিন নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও পক্ষপাতিত্বের স্বীকার, কেলিং বলেছেন।
এ বিষয়ে বেশ কড়া সমালোচনা করেছেন সারা চিলড্রেস ফ্রন্টলাইন পত্রিকার এক নিবন্ধে। তিনি উল্লেখ করেছেন, একই অপরাধে একজন সাদা চামড়াকে কোনো ‘ব্লু সমন’ (সমনজারি করা) দেয়া হয় না, অথচ একজন কালো চামড়ার একই অপরাধীকে এই সমনের আওতায় আনা হয়। ‘সারাহ চিলড্রেস উল্লেখ করেছেন, ‘একমাত্র নিউ ইয়র্কেই ২০১০ এবং ২০১৫ সালের মাঝে ১৮ লাখ এমন সমন আফ্রিকান-আমেরিকানদের ওপর জারি করা হয়।’ এর ফলে নিউ ইয়র্কে এই ছয় বছরে সামাজিক অশান্তির কোনো কমতি দেখা যাচ্ছে না। সব অপরাধই কালোরা করছে বলে, এখন ধারণা দেয়া হচ্ছে। ফ্রন্টলাইনের আর একটি মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য।

এবার নিউ ইয়র্ক সিটিবাসী আইন পাস করেছে, যেখানে পুলিশকে একাধারে শান্তি রক্ষার জন্য জনগণের সাথে সংযোগ বাড়াতে বলেছে, অপরদিকে তারা যেন জনগণকে অযথা হয়রানি না করে, তার নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। তাদের বলা হয়েছে পুলিশ জনগণের বন্ধু, রক্ষক কিন্তু প্রভু নয়।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫